এক বিহবল বাবুইয়ের গল্প ।। রিয়াদুল হক

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৪ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ৩০ ১৪২৭,   ২২ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

এক বিহবল বাবুইয়ের গল্প ।। রিয়াদুল হক

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:০১ ২৫ জুন ২০২০  

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

হুক্কার গড়গড় শব্দ আকাশ বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। তমিজ সাহেব সকাল থেকেই খুব আয়েসি ভঙিতে বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন। বাবুই পাখির বাসাটা একদম বাড়ির বারান্দা ঘেঁষে ওঠা গাছটায় আশ্রয় নিয়ে তৈরি হয়েছে। সে পাখির বাসার দিকে অবিরাম তাকিয়ে পাখিদের জীবন প্রবাহ দেখে সময় কাটে তমিজ সাহেবের। তমিজ সাহেব এদের শৈল্পিক বোনাকে অনেক মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। সারাদিন কত কেরিকেচি যে করে এই বাবুই। ঠোঁট দিয়ে খুঁচিয়ে ঘাসের আস্তরন সরিয়ে পেট দিয়ে ঘষে ঘষে নিজের বাসস্থান মসৃণ করে। তমিজ সাহেব মনে মনে ভাবে খুব ছোট হলেও রুচিবোধ আছে তাঁতি পাখিটার।

এতদিনে তমিজ সাহেব বুঝতে পেরেছেন যে তার উপস্থিতিতে পাখিগুলো ভীত নয়। তার প্রাত্যহিক সকালে হুক্কা টানার এই অভ্যাস তাকে বাবুইগুলোর কাছে পরিচিত করে তুলেছে। বাসাগুলো দেখে খুব অবাক হয় তমিজ সাহেব। একেবারে উলটানো কলসির মত  বাবুই পাখির বাসাগুলো। দেখে মনে হবে এই বুঝি পড়ে গেলো।

ইটের বাড়ির মধ্যখানে মসৃণ পিচঢালা পথ। সব লাল রঙা বাড়ির ছোট্ট খোঁপে চড়ই পাখির দৌঁড়। চারপাশ সবুজে ভরা। প্রধান মহলের পাশে ছোট ছোট দুর্গের মত মেহমান খানা। কয়েক পুরুষের চেষ্টায় শেষ হয়েছিল বাড়ির নির্মাণকাজ। বাড়ির দেয়ালের নান্দনিক কারুকার্য। জলসাঘর, বৈঠকখানা, বিশ্রামাগার। কোনো কিছুর কমতি রাখেনি তমিজ সাহেবের পূর্ব পুরুষেরা। বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে লাল ইটের রাস্তার শেষ মাথায় পূর্বপুরুষের দেয়া মসজিদ মাদরাসা আর সঙ্গে পুকুর ছোট ছোট বাচ্চাদের কিচির মিচির শব্দে পবিত্র কোরআন পাঠের মূর্ছনায় তমিজ সাহেবের ঘুম ভাঙ্গে প্রতিদিন সকালে। এরপর বারান্দায় এসে হেলান দেয়া চেয়ারে বসেন তমিজ সাহেব। গতকাল রাতে ঘুম বাবাজী ত্যাগ করেছে মধ্যরাতে তাও গ্রামবাসীর হাউ-কাউ শুনে। তমিজ সাহেব শঙ্কিত হয়ে বারান্দায় এসে দাড়িয়ে ঘটনাটা আঁচ করতে চেয়েছেন কিন্তু শেষ মেষ আর পারেননি। আজ সকালে তাই পালওয়ান অলিকে আবার তলব করেছেন। 

অলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তমিজ সাহেবের সামনে। 
কিরে কী হয়েছিলো গতরাতে?

মালিক এক মাদরাসার ছাত্র পানিতে পইরা লাফাইতাসিল কাঁটা মাছের লাহান
তারপর?

তারপর মালিক, আমি দৌড়াইয়া গিয়া পানি থেইকা উঠাইসি। কেউ সাহস কইরা আগায় না। আরেকটু হইলে গেসিল।
হতচ্ছাড়াটা সাঁতার জানে না তবে পানি নামতে গিয়েছে কেন এই গভীর রাতে। 
হে নামে নাই তো। জ্বীনে ধইরা একটা চুবা দিসে।

কী আজে বাজে বকিস তুই! অবাক হয় তমিজ সাহেব। 

হ সত্যি! কইতাসি মালিক। মসজিদের মধ্য হুইয়া আসিল নাকি। কে নাকি হেরে কোলে নিয়া পুস্কুনিত ফালাইসে। হে নাকি টের পাইসে কিন্তু কিসু কইবার পারে নাই। একজনরে জিগাইলাম এরম কেনো হইল?

হে কইল মসজিদের মধ্যে উপুড় কইরা ঘুমাইতাসিল। তাই জ্বীনে ধইরা টান দিসে। গ্রাম এলাকা এহানে কখন কি হয় কেউ কিসু কইবার পারে না।

তমিজ সাহেব মুচকি হেসে বলে, আচ্ছা বুঝলাম যা তুই এখান থেকে। তমিজ সাহেব গভীরভাবে চিন্তা করে এই এলাকায় জ্বীন আসবে কোথা থেকে? হয়ত ঘুমের মধ্যে হেটে গিয়ে নিজেই পানিতে পড়েছে। অনেকের ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস থাকে। তমিজ সাহেব গ্রামে বড় হলেও বিচক্ষণ ও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। সহজে অলৌকিক কিছু বিশ্বাস করেন না। উনি মনে করেন মানুষের মত ভয়ঙ্কর প্রাণী আর একটি নেই এই ধরায়। তাই মানুষকেই সবাই ভয় পায়।

হঠাৎ সানাইয়ের আওয়াজে খানিকটা চকিত হয় তমিজ সাহেব। হেলান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান হুক্কার পাইপ হাতে।

তমিজের তটস্থ দুই প্রহরী মোটামুটি কাল ষাঁড়ের মত সারা শরীরে সরিষার তেলে মেখে খেতে খামারে দৌড়াদৌড়ি করে। ওদের ঈষৎ কাল বরণে মথিত সরিষা সূর্যের খরতাপে যেন সর্বদা চিকচিক করে। তাই দোতলার বারান্দা থেকেও তমিজ এদের কার্যক্রম ঠাহর করতে পারে। এরা সারাদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় খাজনা আদায়ের জন্যে। কেউ যদি খাজনা আদায়ে অপারেগ হয়, সঙ্গে সঙ্গে দেয় ধরে দু’এক ঘাত। জমিদার তমিজের অগাধ বিশ্বাস এই দুই প্রহরীর উপর। খাজনা প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে গ্রামের প্রজাদের উপহার সামগ্রী হিসেবে পানের বিরা এক জোড়া নারকেল, একবিড়া পান আর বাতাশা বিলিয়ে দেয় তমিজ সাহেবের পাণ্ডারা। খুব উঁচু দরে খাজনা আদায়ের জন্যে অনেক অভাবি মানুষই খাজনা দিতে পারে না আর সেই সুযোগে তমিজ সাহেব হাতিয়ে নেয় তার জমি জমা। এভাবেই গরে তুলেছেন তিনি তার সাম্রাজ্য। অবশ্য এই খাজনার একটা অংশ আবার ব্রিটিশ রাজাদের তহবিলে যায়। ব্রিটিশ রাজারা তো  আর দেখতে আসে না কে কত খাজনা তুলল তাই দেখা যায় প্রজাদের দেয়া সিংহ ভাগ খাজনাই তমিজ সাহেব নিজ সিন্দুকে পুড়ে মেতে উঠেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অন্য এলাকার জমিদারদের সঙ্গে। 
অলি আর রমজান এরই মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে। অলি এরই মধ্যে বলে উঠলো, অই তোরা কই যাস!! সানাই থামা। তোরা জানস না এই বাড়ির সামনে সানাই বাজান নিষেধ। আর তোরা জুতা পরসস কেন? খুল জুতা খুল। এক্ষুণি খুল। 

বরযাত্রীদের দল ষাঁড়ের মতো কাল দুই প্রহরীকে দেখে যেন ভূত দেখার মত অবস্থা। পালকিতে বউ এখনো বসে আসে। বেহারাগুলোর একদম নড়চড় নেই। সবাই এরই মধ্যে জুতা খুলে হাতে নিয়েছে।

রমজানও ডাক দিয়ে উঠলো, এক বৃদ্ধ মাস্টারকে ছাতা হাতে দেখে।
মাস্টার সাব ছাতাটা বন্ধ করেন?
কেন বাবা? কম্পিত কণ্ঠে মাস্টারের প্রশ্ন। 

আপনি জানেন না আমাগো এই জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে আর ছাতা মাথায় দিয়া যাওয়া নিষেধ।
বাবা আমরা তো পাশের গ্রামের বাসিন্দা। বুঝি নাই। ক্ষমা কইরা দাও। আর হবে না। 

না মাফ করন যাইব না। ওই তোরা সবাই কান ধইরা উঠবস কর। মাস্টার সাব শুধু আপনে বাদে। আপনি শিক্ষিত লোক। 

সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। 
অই তোরা কই তাকাইয়া আসস কান ধর সবাই। অলি গর্জে ওঠে।

অলি আর রমজান কী করছিস তোরা? তমিজ সাহেবের গর্জন যেন অলির গলাকেও হার মানাল এবার।

ওনাদের কিছু বলিস না। ওনাদের আমার মেহমান খানায় নিয়ে আয়। আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করতে বল। 

সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠা বাঘ যেন বিড়ালের মত মিউ মিউ শব্দে সুর পাল্টে ফেলল। বরযাত্রী সেদিনে জন্যে স্থগিত করলো যাত্রা। না করেও উপায় নেই। এই সমগ্র গ্রামের জমিদারের দাওয়াত । না করলে বেয়াদবি হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মেহমানখানায় একদল সেবক নিয়োজিত করা হলো। তমিজ সাহেবের গোসলের সময় হয়েছে। বিশাল বাড়ির ঠিক পিছনেই দেয়ালের ঘের দেয়া একটি পুকুর। ওখানেই সন্তপর্ণে সাঁতার কাটেন তমিজ সাহেব। বয়স হলেও প্রতিদিন পুকুরে নামতে ভুলেন না। খুব আয়েস করে সাঁতার কাটেন। শরীর আধ ডোবা অবস্থায় বেশ কিছুক্ষন গা ভাসিয়ে রাখেন। তারপর কিছুক্ষণ উলটো দিকে সাঁতার কাটেন। সাতারে ছোটকাল থেকেই পারদর্শী তমিজ। যেহেতু শীতের মৌসুম তাই দুপুর কালেও একটা ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস শরীরে কাঁপুনি দিয়ে যায় তমিজ সাহেব সাঁতার থেকে উঠেই হাল্কা গা মুছে ঘরের অন্দরে চলে যান। হাতে তেল নিয়ে মালিশ করার সময় নেই তমিজ সাহেবের তাই। একেবারে সরিষার তেলের ভাঁড়ে পা ডুবিয়ে দেয়া একটা বদভ্যাসে পরিনত হয়েছে যা ওনার নামের সার্থকতাকে মলিন করেছে। তেল মাখা শেষ না হতেই খাবার পরিবেশন শেষ। খুব পরিমিত আহার তমিজ সাহেবের। খাওয়ার সময় পাঁচ আঙুলের মাথা ব্যতীত অন্য কোন অংশে এঁটো হবে না। রূপোর থালা রূপোর চামচ ও গ্লাসে খাবার গ্রহণ করাটাকে তমিজ সাহেব স্বাস্থ্যকর মনে করেন। কাঁচা মরিচ না হলে খেতে পারেন না তমিজ সাহেব। খাওয়ার আবার নমুনা আলাদা। একটি নলা মুখে পুড়ে আরেক হাতে মরিচের ঘ্রাণটা নাকে শুঁকলেই তৃপ্তি তমিজ সাহেবের। 

খাওয়া শেষে ঘরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবারও বারান্দায় এসে অসিন হয়েছেন তমিজ সাহেব। বারান্দার সদর দরজা থেকে সোজা দেখা যায় সিঁড়ি ঘর। দৃষ্টি সিমানা ওখানেই বিস্তৃত তমিজ সাহেবের। হঠাৎ দেখলো হন্তদন্ত হয়ে রমজান ছুটে আসছে। রমজান যখন দৌড়ে আসে তমিজের উদ্দেশ্যে তখন তমিজ সাহেবের মনে হয় এই বুঝি কাল প্রকাণ্ড ষাঁড় তার দিকে ধেয়ে আসছে। এবং কাছে এসে রমজান যখন দাঁড়ায় তখন রমজানের পাকানো গোঁফের ফাঁকে নাকের পাঁটাগুলো ফুলে উঠে আবার নেমে যায়। বিশাল ভুঁড়িটা যেন কোঁচ দেয়ার ধূতির উপর উপচে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে।

মালিক মালিক!

কিরে কী হয়েছে তোর? ষাঁড়ের মতো ফুসছিস কেন? একটু জিরিয়ে নে তারপর কথা বল। রমজান একটু বিরতি দিয়ে শুরু করলো। 
‘মালিক পাশের গ্রামের জমিদার তো আমাদের থেইকা আগাইয়া গেলো।’
কেন কী হয়েছে?

আমাদের থেইক্যা দুইডা পুকুর বেশি খোদাইসে।

তাহলে চুপ করে তোরা কি দেখছিস? আমাকে বলতে আসছিস কেন? তোদের যা করনীয় তাই কর। আমি হেরে গেসি এটা আমি শুনতে চাই না। তোদের জমি দেয় আছে। বলাও আছে বলেছিলাম কাজ বন্ধ না করতে কই গেছে সব শালারা।

আমি এক্ষুণি দেখতাসি। আপ্নে চিন্তা কইরেন না। আজকে রাতেই দুই পুকুর খুদাইয়া ফালামু। আমগো মাতি কাতা আসে অনেকটা। তমিজ সাহেব মুহূর্তেই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পুকুর খননের এই ঐতিহ্য অনেক পুরানো। এক গ্রামের জমিদার আরেক গ্রামের জমিদারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুকুর খনন করে। যে যত খনন করতে পারে তার সুনাম আর প্রতিপত্তি তত বেশি। এই খেলা হচ্ছে ক্ষমতার খেলা। তমিজের বাবা রমিজ উদ্দিন তরবারির কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে এই জমিদারি পাওয়া। 

এখন তমিজ সাহেবের বয়স হয়েছে। তমিজ সাহেব মাঝে মাঝেই চিন্তায় ডুব দেন তার ছেলেকে নিয়ে। 

একটা মাত্র ছেলে। অনেক নরম মনের মানুষ শফিউদ্দিন। গ্রামের মানুষের জন্যে তার মন কাঁদে। প্রজাদের দুঃখ সুখে নিজেই দৌড়ে যান বাবার মত বসে হুকুম দেন না। বয়সে এখনো অনেক ছোট। তাই তার অনেক ভুল তমিজ সাহেব ক্ষমার চোখে দেখেন। এক ছেলে বলে কথা। সফি উদ্দিন যখন বাড়ির বাইরে পা রাখেন তখন থেকে শুরু হয় নিয়মের বালাই। এই বংশের প্রথম নিষেধ হল অন্যের বাড়ির অন্ন মুখে দেয়া যাবে না। কিন্তু সফিউদ্দিন আনায়েসে যে কারো বাড়ির সামনে গিয়ে তাদের হাতের জল পান করেন। আশেপাশের পাইক পেয়াদার নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি এই কাজ করে বেড়ান। এই জমিদারের শেষ বংশধর বলে সব ধর্ম বর্ণের মানুষ আসে তাকে পায়ে ধরে সালাম করতে কিন্তু তিনি সর্বদাই বাঁধ সাধেন বলেন, আমাকে হাত তুলেই সালাম দিবেন। আমার চরণ স্পর্শের কোনো দরকার নেই। মাঝে মাঝে জুতা কিনতে শহরে যান। রাস্তায় হাঁটা নিষেধ। সঙ্গে পাইক পেয়াদারা যায়। জমিদার বাড়ি থেকে বাজারের দূরত্ব কয়েক মাইল।। বাবার নির্দেশে সাফিউদ্দিন সবার কাঁধে কাঁধে থাকেন। তাই নিচে নেমে খেলার সুযোগ থাকে না। 

কয়দিন ধরে তমিজ সাহেবের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কোনো কিছুই পেটে রাখতে পারছেন না। যা খাচ্ছেন উগড়ে দিচ্ছেন। বাড়ির পাইক পেয়াদারা খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। সবাইই ভাবছেন হয়তো সাহেবের অন্তিমকাল উপস্থিত হয়েছে। গ্রামের এবং গ্রামের বাইরে সব কবিরাজ, চিকিৎসকরাই আশা ছেড়ে দিয়েছে। অপারেগ হয়ে কলকাতা থেকে দুজন চিকিসক আনা হয়েছে। তারা ৪/৫ দিন ধরে আছেন। সর্বদা তমিজ সাহেবের সব শারীরিক সব বিষয়াদি নির্ণয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ করেই ওই বাড়ির অন্দরে এক সূফী ব্যক্তির আগমন। তমিজ সাহেব অসুস্থ থাকেলও তার কর্মচারী ও ভৃত্যগণ সূফী সেই আল্লাহ ভক্ত ব্যক্তির মেহমানদারিতে সর্বক্ষণ সজাগ দৃষ্টি দিয়ে রেখেছেন। সূফী ব্যাক্তির খুব ইচ্ছে হয় এই প্রজ্ঞাবান জমিদারের সঙ্গে একবার দেখা করার। কিন্তু অসুস্থতার কারনে কোনোভাবেই সাক্ষাৎ মিলছিল একদিন দেখা হয়ে গেলো। বিছানায় শায়িত তমিজ সাহেবকে দেখে সূফী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে হাত তুললেন। অনেক দুয়া করলেন। সারারাত তমিজ সাহেবের শিয়রের পাশে বসে থাকলেন। সকাল হলো। বাবুর্চি খানসামাদের ডাকলেন খিচুরি বানাতে বললেন। খিচুড়ি তৈরি হলো। পরিবেশন করা হলো তমিজ সাহেবের সামনে। এই খিচুড়ি দেখে কলকাতার চিকিৎসকরা সাংঘাতিক অবাক ও বিক্ষুব্ধ হলেন বললেন উনি যদি এই খিচুড়ি খান তবে আমরা ওনার বেঁচে থাকার গ্যরান্টি দিতে পারব না। 

আমরা চললাম বলেই চিকিৎসকরা প্রস্থান করেন। খিচুড়ি খাওয়ার পরপরই রাজ্যর ঘুমে তলিয়ে গেলেন তমিজ সাহেব। চারদিন টানা ঘুমালেন। চারদিন পর ঘুম থেকে উঠেই সব খানসামাদের হুকুম দিলেন খাবার দিতে তার নাকি বেজায় খিধে পেয়েছে। সেই পুণ্যবান ব্যাক্তির প্রতি শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে গিয়ে ছিলেন তমিজ সাহেব। সূফী দরবেশকে রেখে দিতে চেয়েছিলেন তমিজ সাহেব তার মেহমান খানায় আজীবন। কিন্তু উনি একদিন চলে গেলেন এই বলে, ‘তোমার সব কিছুই একদিন ধুলায় উড়বে। আমাকে তুমি রাখবে কোথায়।’ সেই থেকে মনটা মোচড় খেয়েছে তমিজ সাহেবের আর ঠিকই হচ্ছে না। 

ইদানীং প্রতি রাতেই বাবুই পাখিকে স্বপ্ন দেখেন তমিজ সাহেব।  উনি দেখেন আমাবস্যার রাতে বারান্দায় উনি বসে আছেন। সমগ্র জমিদার বাড়িটিকে যেন ক্ষনিকের অন্ধকার গ্রাস করেছে। এ যেন পিন পতন নিস্তব্ধতা। প্রকৃতি যেন কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নিমন্ত্রণ দিচ্ছে।
আর বাবুই পাখির বাসাটা একদম আলোকিত। আরাম কেদারা থেকে উঠে গাছটার কাছাকাছি গিয়ে দেখলেন বাবুই তার ঘর আলোকিত করার জন্যে বেশ কিছু জোনাকি পোকা ধরে এনে ঘরের ভেতর ছেড়ে দিয়েছে। তাই ঘরটা এতো অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে। ঘুম ভেঙ্গে যায় তমিজের। অন্দরের হাল্কা আলো হাল্কা অন্ধকারে বারান্দায় যায় তমিজ সাহেব। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। 

বাবুই পাখির ঘরটার কাছাকাছি গিয়ে দেখেন। ভেতরটা খালি মনে গেলো পাখিটা? প্রশ্ন বিদ্ধ হয় তমিজের মন। 

পূব আকাশটা যেন রঙ হারিয়ে এক তামাটে রূপ নিয়েছে। ধোয়াটে মেঘগুলো দৈত্য রূপ নিয়েছে। এই প্রথম মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। সূফী দরবেশের উক্তিটি  হঠাৎ করেই মনের কোনে উঁকি দেয়? প্রশ্নবিদ্ধ মন নিয়ে অন্দরে চলে যান তমিজ সাহেব। 

সকাল বেলা বেলা ঘুম থেকে উঠেই হুক্কার স্বাদ নিচ্ছেন তমিজ সাহেব এবং স্বপ্ন নিয়ে বিশ্লেষণে মগ্ন। হঠাৎ চোখ গেলো অন্দরের সরু রাস্তার দিকে। রমজান হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে দৌড়ে আসছে। তমিজ হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে থামতে বলে। খানিকটা জিরিয়ে রমজান শুরু করে তার বক্তব্য।
মালিক পুকুর খুইদা ফালাইসে। আপনি এহন আবার ইচ্ছাপুর এলাকার জমিদারের সমান সমান।

সমান হলে চলবে না। আরেকটা শুরু করতে বলে দে এখনি। তমিজ সাহেব হুক্কা নামিয়ে উত্তর দেয়। 

যা বলেন মালিক তাই হবে। কিন্তু মাটি খুঁড়ার পর একখান লাশ পাওয়া গেসে। শরীরটা একদম গরম এবং সতেজ। দেইখ্যা মনে হয় এই মাত্রই দাফন হইসে মালিক। কী করমু কিছুই বুঝতাসিনা। সবাই কাম বন্ধ কইরা রাখছে।

কাজ বন্ধ থাকবে কেন? কাজ চালিয়ে যেতে বল। ওটাকে অন্য কোথাও ভালোভাবে দাফন করে দে। 

জো হুকুম মালিক। রমজান আবারো বীর দর্পে বেরি যায় মালিকের হুকুম নিয়ে। তমিজসাহেব এখনো চিন্তায় মগ্ন। মসজিদের ইমাম সাহেবকে তলব করেছেন তমিজ সাহেব। ইমাম সাহেব এসে বারান্দায় দাঁড়ালেন। তমিজ সাহেব ইশারায় বসতে বললেন হুক্কার পাইপটা নামিয়ে মউলানা সাহেবের মুখোমুখি বসলেন।

আপনাকে তলব করেছি এক বিশেষ কারনে। 
জি হুজুর আমি শুনতে পেয়েছি।
কিভাবে শুনলেন আমি তো আপনাকে কিছুই বলিনি।

মাফ করবেন আমার অনিচ্ছাসত্তেও আপনার সঙ্গে রমজানের কথোপকথন আমার কানে চলে আসে। তাই বাধ্য হয়ে শুনছিলাম। যদি আমার মতামত নেন তবে লাশটাকে ওভাবে সরিয়ে নেয়া মঙ্গল হবে না। কোন পুণ্যবান ব্যাক্তির লাশ হলে বেয়াদবি হয়ে যাবে। 
মাফ করবেন সেই বিষয়ে আমি আপনার মতামত চাইনি। এটা আমার একক সিদ্ধান্ত। আড়ি পেতে শোনাও একটা বেয়াদবি।
ক্ষমা করবেন হুজুর!! বেয়াদবি নিবেন না। হাল্কা কাশি দিয়ে নিজের অপারগতা প্রকাশ করে মউলানা সাহেব।

আপনাকে আমি ডেকেছি ভিন্ন একটা কারনে। ইদানীং প্রতি রাতেই আমি একটা স্বপ্ন দেখি।

জী! কী স্বপ্ন মালিক। 
এই বাবুই পাখির বাসাটাকে স্বপ্ন দেখি। 
জী!! এই বাসাটা!!
জী হ্যা!!
অবাক হচ্ছেন!! 
জী না!! দেখতেই পারেন।
কখনো বাবুই পাখির বাসা বানানোর কৌশল দেখেছেন?

জী না হুজুর!!! আমার আর সেই বিচক্ষণ চোখ কোথায় বলুন!! পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে পারি মসজিদে। এক ওয়াক্ত শেষ না হতেই আরেক ওয়াক্তের প্রস্তুতি নিতে হয়। সময় পাই না।

আমি প্রতি রাতেই স্বপ্ন দেখি। বিষণ্ণ কালো রাত। চারিদিকে আমাবস্যার অন্ধকার। আমি এই বারান্দায় দাড়িয়ে আছি। এই তামাটে অন্ধকারের বুকে শুধু এক টুকরো আলো দেখি এই বাবুই পাখির বাসার ভিতরে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে দেখি অনেকগুলো জোনাকি পোকা বাবুইয়ের বাসাটাকে আলোকিত করে রেখেছে। তারপরেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছু বুঝলেন? তমিজ সাহেব তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ইমাম সাহেবের দিকে। 

মউলানা সাহেব চুপ করে থাকে কিচ্ছুক্ষণ। মাথা নিছু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে এক বার। তমিজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে ভুল হলে মাফ করবেন হুজুর মনে হয় কোনো পরিবর্তনের নিশানা। পুরো গ্রামের উপর বিপদ ঘনিয়ে আসতেছে। আপনি আমাদের মা-বাপ। এই গ্রামটা আপনার দয়া দাক্ষিণ্যে চলে। অই পুকুরটা খনন কইরেন না। আর ওই লাশটাকে ওখানেই সমাহিত করে দেন হুজুর।

তমিজ সাহেব মুহূর্তেই রেগে ওঠেন। চেয়ার থেকে সদর্পে উঠে দাঁড়ান। পায়চারি করার মতো করে হেঁটে সামনে এগিয়ে যান। তমিজ সাহেবের আকস্মিক এই রূপ দেখে মউলানা ভড়কে যান।

আপনি আবারো ওই এক প্যাঁচাল নিয়েই আছেন? আপনাকে আমি সেই বিষয়ে নাক না ঢুকাতে নিষেধ করলাম একবার।

হুজুর ক্ষমা করবেন। সব কিছুর সঙ্গে সব কিছু সম্পর্কিত। বললেন বেশ কিছু দিন ধরেই দেখছেন। তার অর্থ আপনাকে কোনো পদক্ষেপ নিতে বারণ করা হচ্ছে। আপনি এই গ্রামের বিজ্ঞ অভিভাবক। এই গ্রামের ভালো-মন্দ আপনার কর্মের সঙ্গে নিহিত। তাই হয়তো আপনাকে দেখানো হচ্ছে। ওই গুমোট অন্ধকার তামাটে আকাশ হচ্ছে আপনার কুকর্ম আর বাবুই পাখির আলোকিত ঘরটা হচ্ছে আপনারই সুকর্ম। 
আপনি আসতে পারেন মউলানা...। মউলানার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তমিজ সাহেবের উত্তর। মউলনা কুর্নিশ করে বেরিয়ে যান। চিন্তিত চিত্তে মউলানা বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। সমগ্র আকাশ হলদেটে হয়ে আছে। এই যেন এক সোনালি দুপুর। 

বিকেল থেকেই অস্থির লাগছে তমিজ সাহেবের। আজ হঠাৎ নিজের পূর্ব পুরুষদের একবার দর্শনের ইচ্ছে জাগলো মনে। তাদের সবার ছবি বৈঠকখানার পাশেই একটা সংগ্রহশালায় সারি সারি টাঙানো আছে। প্রত্যেকটা চেহারায় কেমন যেন এক আলোর দ্যুতি দেখতে পান তমিজ সাহেব। কত সাহসিকতার সঙ্গেই না এই রাজ্য চালনা করে গেছেন তারা। ব্রিটিশ রাজারা আসতেন বেড়াতে এই বাড়িতে। তাদের দেয়া উপঢৌকনগুলো খুব যত্নে রেখেছেন তমিজ সাহেব। বিশাল এক হাতির দাত জোড়া সংগ্রহশালায় আছে যা এক ব্রিটিশ বন্ধু তমিজের বাবার জন্যে উপহারস্বরূপ এনেছিলেন। সংগ্রহশালা থেকে বের হয়ে এসে আবার বারান্দায় দাঁড়ালেন। বাবুই পাখিটাকে আজ সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছেন না তমিজ সাহেব। পাখিটা আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকে। আজ তবে কেন দেখা দিচ্ছে না। 

রমজান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে।
মালিক পুকুর তৈরি সম্পন্ন হইছে। 
ভালো খবর। ঘোষণা দিয়ে দে পুরো গ্রামে যে এখন আমিই সেরা জমিদার দশ গ্রামে। সবচে বেশি পুকুর আমিই খনন করেছি। 
জী মালিক!! এখুনি মাইকিং কইরা দিতাছি। 
শুন ওই লাশটার কী করেছিস?

ওইটা আরেক জায়গায় দাফন কইরা দিছি। আপনি চিন্তা কইরেন না। এত কিছু শোনার পরও মনের অস্থিরতা কমছে না তমিজ সাহেবের। বাবুই পাখিটাকে দেখলে হয়তো ভালো লাগতো। কিন্তু সেও কোথায় হারিয়েছে। সন্ধ্যা পার হয়ে গভীর হলো রাত। তমিজ সাহেব জেগে থেকে খানিকটা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়েছেন। হঠাৎ চাপা আর্তনাদে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তমিজ সাহেবের।

আগুন আগুন!!! বাঁচাও। আগুন লাগসেরে!!! তমিজ সাহেব বিছানা থেকে এক লাফে উঠে পড়লেন। 
চিৎকার করতে রমজান আর অলি দৌড়ে আসছে। 

হুজুর হুজুর জলদি চলেন আগুন লাগসে!!

কী বলিস তোরা ?

হ হুজুর জলদি বাইর হন। আগুন দাউ দাউ কইরা পুরা বাড়িতে ছড়াইয়া পরতাসে।
সফি কোথায় আমার ছেলে? 

আপনি চিন্তা কইরেন না হেরে আমরা আগেই বাহির করসি। এখন জলদি চলেন হুজুর। না চাইতেও বের হতে হয় তমিজ সাহেবকে এই বাড়ি থেকে। আজ বহুবছর পর নিজে এই বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বাইরে যাওয়া ছেরে দিয়েছিলেন। মহলের দরজার ধবল পর্দাগুলো আগুনের ছোঁয়া পেয়ে ফুল্কি দেয়া লুচির মত পুড়ছে। দৌড়ে বের হওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসাটার দিকে চোখ পড়লো। পাখি তো অনেক আগেই উড়াল দিয়েছিল। আজ বাসাটাও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, অন্ধকার তামাটে গোমট আকাশ যেন তাচ্ছিল্য করে তাকিয়ে আছে। 

রমজান চিৎকার করে অলিকে বলছে, হুজুরের জুতাগুলো নে। খালি পায়ে নামাইস না আমার হুজুর রে। উনি আমাদের মাথা। এই পুরা গ্রামের মাথা। চোখের পলকে বিশাল রাজবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। তমিজ সাহেব রিক্ত হাতে ছেলে শফিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখলেন। পরবর্তীতে একটা ছোট মেহমানখানায় তমিজ সাহেব আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাতেও আগুন লাগলো কোনো এক অনাহুত কারনে। পর পর আরো সাত বার ওই রাজবাড়িতে আগুন লেগেছিল। কিছুই অবশিষ্ট রয়নি সেই বাড়ির। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর