এক নজরে জাতির পিতার জীবনী

ঢাকা, সোমবার   ৩০ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৬ ১৪২৬,   ০৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

এক নজরে জাতির পিতার জীবনী

শাহিদ আবেদীন মিন্টু ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০০:৪৯ ১৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ০১:৩১ ১৭ মার্চ ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি তিনি। দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধী দিয়েছিল ছাত্র-জনতা।

বঙ্গবন্ধুর  জন্ম ও শিক্ষা: ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন এবং মা'র নাম সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তার বড় বোনের নাম ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী; তার ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন তিনি। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৪ থেকে চার বছর তিনি বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। কারণ তার চোখে জটিল রোগের কারণে সার্জারি করাতে হয়েছিল এবং সেরে উঠতে বেশ সময় লেগেছিল। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।

রাজনৈতিক সক্রিয়তা: শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়। এ বছর স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবির উপর ভিত্তি করে একটি দল নিয়ে তাদের কাছে যান। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন তিনি। ১৯৪২ সালে এনট্র্যান্স পাস করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন। ১৯৪৩ সালে তিনি বেঙ্গল মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং বাঙালি মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান ।

১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের সম্মেলনে শেখ মুজিব বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কলকাতায় বসবাসকারী ফরিদপুরবাসীদের নিয়ে গঠিত ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মনোনীত হন। এর দুই বছর পর নির্বাচিত হন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের মহাসচিব। ১৯৪৭ সালে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হওয়ার সময়ে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হন তিনি।

পাকিস্তান-ভারত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। যার মাধ্যমে তিনি ওই প্রদেশের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন।

বাংলা ভাষা আন্দোলন: ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন গণ-পরিষদের অধিবেশনে বলেন, উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তার এই মন্তব্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদী শেখ মুজিব অবিলম্বে মুসলিম লীগের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করা হয় যাতে শেখ মুজিব একটি প্রস্তাব পেশ করেন। এখান থেকেই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই পরিষদের আহ্বানে ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট পালনকালে শেখ মুজিবসহ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ছাত্রসমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ শেখ মুজিব এবং অন্য ছাত্র নেতাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। পুলিশি কার্যক্রমের প্রতিবাদে শেখ মুজিব ১৯৪৮  সালের ১৭ মার্চ দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। ১৯ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর তাকে আটক করা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন।

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৩ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করার পর শেখ মুজিব মুসলিম লীগ ছেড়ে এই নতুন দলে যোগ দেন। তাকে দলের পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ায় শেখ মুজিব আটক হন এবং তার দুই বছর জেল হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার পর জেল থেকে নির্দেশনা দেয়ার মাধ্যমে তিনি ভূমিকা রাখেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩ টিতে বিজয় অর্জন করে, যার মধ্যে ১৪৩টি আসন পায় আওয়ামী মুসলিম লীগ। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জ আসনে বিজয় লাভ করেন। ১৫ মে তাকে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ৩০ মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমান বন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়। ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন তিনি। ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৭ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ পল্টন ময়দানে এক সম্মেলনে ২১ দফা দাবি পেশ করে, যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। শেখ মুজিব পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ৩ ফেব্রয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের বৈঠকে দল থেকে খসড়া সংবিধানে স্বায়ত্ত্বশাসন অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব রাখা হয়, যা তিনিই সরকারের কাছে পেশ করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একযোগে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দলের জন্য সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করার তাগিদে ১৯৫৭ সালে ৩০ মে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ৭ আগস্ট সরকারি সফরে চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশে সামরিক আইন জারি করে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ওই বছরের ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে আবারো আটক করা হয়।

তিনি ১৯৬১ সালে জেল থেকে ছাড়া পান। এবার তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাকে আবারো আটক করা হয়। ২ জুনের চার বছরব্যাপী মার্শাল ল' অপসারণের পর একই মাসের ১৮ তারিখে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৫ জুন তিনি অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিলে আইয়ুব খান আরোপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি লাহোরে গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। অক্টোবর মাস জুড়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্টের সমর্থন আদায়ে তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থান সফর করেন।

ছয় দফা আন্দোলন: সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এক বৈঠকের প্রস্তাবের ভিত্তিতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের মহাসচিব ও মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরের ১১ মার্চ একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, রাজনীতির নামে মৌলিক গণতন্ত্র প্রচলন (বেসিক ডেমোক্রেসি) এবং পাকিস্তানের কাঠামোতে এক-ইউনিট পদ্ধতির বিরোধী নেতাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন শেখ মুজিব। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মুজিব আইয়ুব-বিরোধী সর্বদলীয় প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন করেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন যা ছিল কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা। এই দাবি সম্মেলনের উদ্যোক্তারা প্রত্যাখান করেন এবং শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৬৬ সালে মার্চ মাসের ১ তারিখে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ছয় দফার পক্ষে সমর্থন আদায়ে দেশব্যাপী প্রচার কার্য পরিচালনা করেন। এই সময় তিনি বেশ কয়েকবার কারাবন্দী হন।

আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন: ১৯৬৮ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিব এবং আরো ৩৪ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এতে শেখ মুজিবকে পাকিস্তান বিভক্তিকরণের ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অভিযুক্ত আসামীদের বিচারকার্য শুরু হয়।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: বিচারকার্য চলাকালে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবি পেশ করে যার মধ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গণ আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের পর মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সবাইকে মুক্তি দেয়া হয়। এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়।

১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের আহ্বানে একটি সর্বদলীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব ছয়-দফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চাহিদাগুলো মেনে নেয়ার আহ্বান জানান এবং তা প্রত্যাখ্যাত হলে সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক জনসভায় শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত করা হবে। এরপর মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সমর্থ হন এবং ১৯৭০ সাল নাগাদ কার্যত ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৭০-এর নির্বাচন: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো, মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির বিরোধিতা করেন। তিনি ঘোষণা দেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালে তিনি সে সরকার মেনে নেবেন না। অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো শেখ মুজিবের আসন্ন প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের বিরোধিতা করে।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ইয়াহিয়া সংসদ ডাকতে দেরি করছিলেন। বাঙালিরা বুঝতে পারেন, মুজিবের দল আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন।

এদিকে ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। এ অভিযান শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

এদিন তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফয়সালাবাদের একটি জেলে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়।

১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযান অল্প সময়ের মধ্যেই হিংস্রতা ও তীব্র রক্তপাতে রূপ নেয়। রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ও পুলিশ রেজিমেণ্টে কর্মরত পূর্ব বাংলার সদস্যবৃন্দ দ্রুত বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আওয়ামী লীগ সদস্যরা কলকাতায় তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্ব প্রবাসে বাংলাদেশ সরকার গঠন করে।

৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় ফিরে সরকার গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দেয় পাকিস্তান সরকার। এরপর তিনি লন্ডন হয়ে নতুন দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী’র সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

নবরাষ্ট্র পুনর্গঠন সংগ্রাম: শেখ মুজিবুর রহমান অল্পদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

প্রায় ১ কোটি শরনার্থীকে পুনর্বাসন করার জন্য বৃহৎ সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে কৃষি, নগর অবকাঠামো ও কুটিরশিল্পের উপর রাষ্ট্রীয় তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পাঁচ-বছরের একটি পরিকল্পনা করা হয়।

বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং ওআইসি, জাতিসংঘ ও জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ভ্রমণ করে দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা চান। বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে একটি ২৫ বছর মেয়াদি মিত্রতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

বঙ্গবন্ধু তার অন্তর্বর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন এবং চারটি মূলনীতি হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র’ ঘোষণা করেন।

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয়। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং তিনি সরকার গঠন করেন।

হত্যাকাণ্ড: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ট্যাঙ্ক দিয়ে ধানমণ্ডিস্থ বাসভবনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়। এসময়  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবারের সদস্য এবং তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করা হয়। শুধুমাত্র শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান।
বঙ্গবন্ধুর মরদেহ তার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সামরিক তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয়। নিহত অন্যান্যদের ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবন: ১৯৩৪ সালে ১৪ বছর বয়সী শেখ মুজিবের সঙ্গে ৩ বছরের বেগম ফজিলাতুন্নেসার বিয়ে হয়। বিয়ের ৯ বছর পর ১৯৪২ সালে শেখ মুজিব ও ফজিলতুন্নেসার দাম্পত্যজীবন শুরু হয়। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যারা হলেন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। আর পুত্রদের নাম শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল।

স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনাশ করতে চেয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে মুছে দিতে নানা ষড়যন্ত্র করলেও বাঙালি জাতি তা প্রতিহত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে টানা তিনবার সরকার গঠন করে। মুজিব আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৭ মার্চ থেকে বছরব্যাপী সারাবিশ্বে পালন করা হবে ‘মুজিববর্ষ’।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস/আরএ/