এক দুর্ঘটনার কবলে প্রাণ হারায় লাখো মানুষ!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

এক দুর্ঘটনার কবলে প্রাণ হারায় লাখো মানুষ!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫১ ৫ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১১:০৯ ৫ এপ্রিল ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এটি। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল, রাত দেড়টার দিকে ঘটে যায় চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়। জানেন কি? ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় যে বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তার চেয়েও ৫০০ গুণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল চেরনোবিল দুর্ঘটনাটি। কীভাবে বিপর্যয়টি ঘটেছিল?

জানা যায়, চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট পারমাণবিক চুল্লীর সংখ্যা ছিল চারটি। ঘটনার রাতে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লী থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। ধারণা করা হয়, সেখানকার কর্মীদের গাফিলতির কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। নিরাপদ শীতলীকরণের ওপর একটি পরীক্ষা চালানোর সময় এই পারমাণবিক বিপর্যয় মেনে আসে। 

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ হলো, সামান্য পরিমাণ তেজষ্ক্রিয় জ্বালানি ব্যবহার করে অল্প খরচে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। অন্যদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখার জন্য অন্য কোনো উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হয়। তবে হঠাৎ যদি কখনো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই লোডশেডিং হয় তখন কি ঘটবে? সেরকমই এক নিরাপত্তাজনিত পরীক্ষা চালানোর সময় চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীদের ভুলকেই দায়ী করা হয়। তবুও বিষয়টি এতটা সহজ নয়। 

সেই রাতে চেরনোবিলে যে নিরাপত্তা পরীক্ষাটি চালানো হয়েছিল সে ধরনের পরীক্ষা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করার আগেই সম্পন্ন করার নিয়ম। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন না করেই, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করার উপযোগী বলে ঘোষণা করে। তখন চেরনোবিল কর্তৃপক্ষও দ্রুত এর নির্মাণ কাজ শেষ করার কৃতিত্ব দেখাতে গিয়েই সর্বনাশ ডেকে আনে। 

পারমাণবিক কেন্দ্রবিনা অনুসন্ধানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করার অনুমোদন দেয়। এর আগেও বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার পর ১৯৮২, ৮৪ ও ৮৫ সালেও এই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। তবে প্রতিবারই কোনো না কোনো সমস্যার কারণে পরীক্ষাগুলো ব্যর্থ হয়। তাই ১৯৮৬ সালে কর্তৃপক্ষ পুনরায় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর তখনই ঘটে যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডটি।

ঘটনার সূত্রপাত

রাতের শিফটে দায়িত্বরত কর্মীরা ভুল করে পারমাণবিক চুল্লীর টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানি প্রবাহিত করে। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে পারমাণবিক চুল্লীটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। পরপর প্রায় একই সঙ্গে সংঘটিত দুটি বিস্ফোরণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লীর ওপরের প্রায় এক হাজার টন ওজনের কংক্রিটের ঢাকনা সরে যায় এবং ছাদ ভেঙে যায়। তখনই এক বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি হয়। 

দুর্ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর বাইরের বাতাস ঢুকে পড়ার ফল আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পারমাণবিক চুল্লীর দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে সেখানে বিরাট অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। টানা ১০ দিন পর্যন্ত আগুন স্থায়ী ছিল। এতে করে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় তৈরি পদার্থ পরিবেশে প্রায় এক কিলোমিটার উঁচু অবধি ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর পারমাণবিক ধুলা পরিবেশের দূষণ বাড়িয়ে দেয়।

এই দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত পারমাণবিকভাবে সক্রিয় মেঘটি ইউক্রেন, বেলোরাশিয়া, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে, গ্রেট ব্রিটেনে এমনকি পূর্ব আমেরিকার ওপর পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো কোনো পারমাণবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যা বলা হয়েছিল

এই মহাবিপর্যয়ের জন্য কর্তব্যরত কর্মীদেরকেই দায়ী করা হয়। সেই রাতে পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা  ততটা জোরদার ছিল না। এমনকি পারমাণবিক চুল্লীটিও অনুপযুক্ত অবস্থায় চালানো হচ্ছিলো। যার ফলে শক্তি নির্গমণ অতিরিক্ত হয়ে যাওয়ায় দূর্ঘটনাটি ঘটে। আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্মীদের রাতের শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনাও দায়ী। এ কারণে তিনজনকে ১০ বছরের শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল।

তবে বিস্ফোরণের পূর্বে কর্তব্যরত কর্মীরা চাইলেই উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতো। যদিও তাদের পারমাণবিক চুল্লী বন্ধের এখতিয়ার ছিল না। যে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ চুল্লী বন্ধের নির্দেশ দিতে পারতেন গভীর রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহস ওইসব কর্মীদের ছিল না। ফলে তাদের চোখের সামনেই দুর্ঘটনাটি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দুর্ঘটনাটি সব তছনছ করে দেয়দুর্ঘটনার পরিণতি যা হয়েছিল

চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রে ঘটা এই বিষ্ফোরণের ফলে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য আশেপাশের প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সময় চেরনোবিলে প্রায় ১৪ হাজার বসতি ছিল। তেজষ্ক্রিয়তার সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে চলে আসে প্রায় দুই হাজার ৬০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। চেরনোবিল থেকে প্রায় তিন লাখ কোটি বুলেট বা পরমাণু ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বুলেট যেখানে পড়েছিল সেসব স্থান মুহূর্তেই গর্ত হয়ে গিয়েছিল। ভাবুন তো একবার কতটা ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল পৃথিবী। জানা যায়, যেসব পরমাণু চেরনোবিল থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেগুলো প্রায় ৫০ হাজার বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। 

এই দুর্ঘটনাটি ঘটা মাত্রই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চার কর্মী মারা যায়। সেই সঙ্গে ২৩৭ জন কর্মী ও দমকলবাহিনীর সদস্য মারাত্মকভাবে তেজষ্ক্রিয়তায় আহত হয়ে এক মাসের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনার ফলে স্বল্প সময়ে প্রায় চার হাজার ও দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয়তায় প্রায় লাখো মানুষ প্রাণ হারায়। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এই মহা বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এদের মধ্যে প্রায় ছয় লাখই ছিল শিশু। তবে ধারণা করা হয়, এর পরিমাণ আরো অনেক বেশি। 

বিপর্যয়ের পর যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়

এই ঘটনার পর পারমাণবিক দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যেই চুল্লীটি থেকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডটি ঘটেছিল সেটি একটি বিশাল কংক্রিটের খোলসে ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলা হয়। ৩৬ হাজার টন ওজনের ৩৫৫ ফুট উঁচু এক ধাতব গম্বুজ ঘিরে রেখেছে চুল্লীটি। এই অস্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত পারমাণবিক কেন্দ্রটির ধ্বংসাবশেষকে আটকে রাখার জন্য নির্মিত একমাত্র স্থাপনা। 

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চেরনোবিলের ধ্বংসাবশেষে থাকা গলিত প্রায় ২০০ টন পরমাণু জ্বালানি থেকে যে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়েছে তা হাজার বছরেও সম্পূর্ণ দূর হবে না। বর্তমানে চেরনোবিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কেউ বসবাস করে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস