Exim Bank Ltd.
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

এক জাপানি মেয়ের স্বপ্নপূরণ

সঞ্জয় বসাক পার্থডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
এক জাপানি মেয়ের স্বপ্নপূরণ
ছবি: সংগৃহিত

নাওমি ওসাকার বয়স পাঁচ হতে হতে চারটি গ্র্যান্ডস্ল্যাম ঘরে তুলে ফেলেছেন উইলিয়ামস পরিবারের ছোটজন সেরেনা। একে একে সেই সংখ্যাটা এসে ঠেকেছে ২৩-এ। টেনিসের ইতিহাসে নিজেকে তুলেছেন অনতিক্রম্য উচ্চতায়। সেরেনাকে দেখেই বেড়ে ওঠেন নাওমি। টেনিসে নিজের আদর্শও মানেন তাকেই। ভাগ্যদেবীও বোধহয় ঠিক করে রেখেছিলেন নাওমির জীবনের সবচেয়ে খুশির মুহূর্তরে সাক্ষী রাখবেন সেরেনাকেই! প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম ফাইনাল, স্নায়ুচাপে ভোগাটা তাই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না নাওমির জন্য। কিন্তু তার খেলা দেখে কে বলবে, ২০ বছর বয়সী এই জাপানি কন্যার স্নায়ুচাপ বলে কিছু আছে! তর্কযোগ্যভাবে নারী টেনিসের সবচেয়ে বড় তারকা সেরেনাকে ৬-২, ৬-৪ ব্যবধানে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে উঁচিয়ে ধরেন নিজের প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা।

জাপানি বলা হলো বটে, তবে নাওমির জাতিগত পরিচয় নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে ধোঁয়াশা। কারণ তিনটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আছে তাঁর! এর পেছনে অবদান আছে নাওমির বাবা-মায়ের দারুণ প্রেম কাহিনীর। জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ওসাকায় জন্ম নেয়া নাওমির বাবা লিওনার্দ ফ্রাসোয়া একজন হাইতিয়ান আর মা তামাকি ওসাকা জাপানি। নিউইয়র্কের এক কলেজে অধ্যয়নরত ফ্রাসোয়া ঘুরতে গিয়েছিলেন জাপানের দ্বীপ হোক্কাইডোতে সেখানেই পরিচয় হয় তামাকির সঙ্গে। পরিচয় থেকে ভালো লাগা, সেই ভালো লাগা এক সময় রূপ নেয় ভালোবাসাতেও। কিন্তু তামাকির বাবা বর্ণবাদী ছিলেন। ফ্রাসোয়া কালো বর্ণের। আর তাতেই যত আপত্তি।

তবে বাবার আপত্তি কানে তোলেনি মেয়ে, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে পাড়ি জমায় ওসাকাতে। আর এই শহরে জন্ম প্রমীলা টেনিসের নতুন সেনসেশন নাওমি ওসাকার। জাপানে থাকার কারণেই, নাওমি ও তার বোন মারির নামের সঙ্গে যুক্ত হয় তাদের মায়ের নাম।

বাবা হাইতিয়ান আর মা জাপানি হওয়ায় এমনিই এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে নাওমির। তৃতীয় যে দেশটির সাথে সম্পৃক্ততা, সেটি সেরেনারই দেশ যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান নাওমি। আট-নয় বছর বয়স পর্যন্ত নিউইয়র্কে থাকলেও এরপর তারা চলে যায় ফ্লোরিডাতে। নাওমির টেনিসে হাতেখড়ি যুক্তরাষ্ট্রে। ফ্লোরিডা টেনিস এসবিটি একাডেমি ও প্রো-ওয়ার্ল্ড টেনিস একাডেমি থেকে টেনিসের শিক্ষা পেয়েছেন প্রথম জাপানি হিসেবে গ্র্যান্ডস্ল্যাম জেতা নাওমি।

তবে খুশির এই মুহূর্তটি একেবারে নির্ঝঞ্ঝাটে উপভোগ করতে পারেননি নাওমি। নিজের প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যাম জেতার রাতে নাওমির কৃতিত্ব অনেকটাই আড়াল হয়ে যায় সেরেনার বিতর্কিত আচরণের কারণে। ইশারায় কোচের সাহায্য নেয়ার জন্য সেরেনাকে সতর্ক করেন চেয়ার আম্পায়ার কার্লোস রামোস। এরপর রাগে-ক্ষোভে-হতাশায় কোর্টের মধ্যেই র‍্যাকেট ভেঙে ফেললে জরিমানা করা হয় এক পয়েন্ট। তখনই চেয়ার আম্পায়ারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সেরেনা। অশালীন অঙ্গভঙ্গির পাশাপাশি চেয়ার আম্পায়ারকে ‘চোর’ বলেও আখ্যা দেন তিনি। তিনবার কোড অফ কন্ডাক্ট ভঙ্গ করায় একটি গেমই জরিমানা করা হয় সেরেনাকে। এই যেমন ওয়াশিংটন পোস্টের স্পোর্টস কলামিস্ট স্যালি জেনকিন্সই লিখেছেন, ‘আমরা কখনোই জানতে পারব না তরুণ ওসাকা সত্যিই ইউএস ওপেনটা জিতেছে, নাকি চেয়ার আম্পায়ার সেরেনাকে তার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে গিয়ে ওসাকাকে সেটি উপহার দিয়েছেন।’

তবে সমালোচকেরা যা-ই বলুক, বর্তমানে র‍্যাঙ্কিংয়ে সাত নম্বরে থাকা ওসাকাকে নারী টেনিসের ভবিষ্যৎ রানি হিসেবেই দেখছেন অনেকে। নিউইয়র্কের অনেক পত্রিকার দাবি, নাওমিই হতে চলেছেন নারীদের এককে ভবিষ্যৎ নম্বর ওয়ান। কোর্টে এতসব বিতর্কের মাঝেও নিজের খেলা ও বিনয় দিয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন নাওমি। ট্রফি প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠানে কান্নাভেজা কণ্ঠে দর্শকদের উদ্দেশ্যে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, ‘যেভাবে সবকিছু শেষ হলো, তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী’। এরপর নিজের আদর্শ সেরেনার দিকে ফিরে মাথা নত করে বলেছেন, ‘তোমার বিপক্ষে খেলতে পেরে আমি সত্যিই ধন্য’। এমন বিনয়ের পর কি আর নাওমির গুণমুগ্ধ না হয়ে পারা যায়?

সেরেনার মতো নাওমিরও টেনিসে হাতেখড়ি তাঁর বাবার কাছেই। দুই মেয়ে মারি ও নাওমিকে একসঙ্গে টেনিস অনুশীলন করাতেন তিনি। মাত্র তিন বছর বয়সেই টেনিসের সঙ্গে পরিচয় তার। টেনিস পাগল নাওমি টেনিস ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। ব্লিচার রিপোর্টকে এমনটাও বলেছেন তিনি, ‘এই কাজটিই আমি পারি, এবং আমি এটিতেই সেরা।’ ২০১৩ সালে যখন পেশাদার টেনিসের জগতে পা রাখলেন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী নাওমিকে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হতো তিনি কোন দেশের হয়ে খেলতে চান। বাবার পরামর্শে জাপানের হয়েই খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, যাতে করে আরও বেশি সুযোগ সুবিধা পান তিনি।

তবে অর্ধ কৃশাঙ্গ ওসাকাকে শুরুতে জাপানিজরা খুব একটা আপন করে নিতে পারেনি। ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে ওসাকা বলেছিলেন, ‘যখন আমি জাপানে যাই, লোকেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আমার নাম দেখে তারা বোঝে আমি জাপানি, কিন্তু কোন জাপানিজের ক্ষেত্রে তারা সম্ভবত কালো গায়ের রঙ প্রত্যাশা করে না।’ তবে ধীরে ধীরে নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই স্বদেশীদের মন জয় করেছেন নাওমি। ২০১৬ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে গ্যালারিতে জাপানের পতাকা উড়তে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ওই টুর্নামেন্টে তাঁর প্রতি জাপানিজদের অকুণ্ঠ সমর্থন দেখেও বেশ অবাক হয়েছিলেন নাওমি।

তবে জাপানি ভাষাটা এখনো ঠিকভাবে রপ্ত করে উঠতে পারেননি মাত্র তিন বছর বয়সে দেশ ছাড়া নাওমি। তবে বুঝতে পারেন প্রায় পুরোটা। কিন্তু বলতে গেলেই জড়িয়ে ধরে আড়ষ্টতা। গত জানুয়ারিতে এই বিষয়ে টুইট করে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না আপনারা এটা জানেন কি-না, তবে আমি জাপানিজ ভাষা পুরোটাই বুঝি, যখন মন চায় তখন বলিও।’

বিশ্ব টেনিসে অনেক দিন ধরেই জাপানের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে রয়েছেন কেই নিশিকোরি। প্রথম জাপানিজ হিসেবে ২০১৪ সালে এই ইউএস ওপেনেই ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার মারিন চিলিচের কাছে হেরে শিরোপার স্বাদ পাওয়া হয়নি। তবুও জাপানিজরা হয়তো নিশিকোরিকে নিয়ে আশায় ছিলেন। তবে নিশিকোরি নয়, জাপানকে প্রথম গ্র্যান্ডস্ল্যামের স্বাদ দিলেন নাওমি। এই জয়ের পর জাপানে রীতিমত তারকাখ্যাতি পেয়েছেন নাওমি।

`প্রথম জাপানিজ হিসেবে গ্র্যান্ডস্ল্যাম জয়’ পরিচয়ে বেশ বিরক্ত হন নাওমি। সাংবাদিকদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু জাপানিজ নয়, তিনি একজন জাপানিজ-হাইতিয়ান। যে বাবার হাত ধরে টেনিসে আগমন, সেই বাবার দেশকে কীভাবে ভুলে যান মেয়ে! নাওমিও তাই নিজের হাইতিয়ান সম্পৃক্ততা নিয়ে বেশ গর্বিত। তবে টেনিস সংশ্লিষ্টদের এসব জাতিগত বিষয় নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে। তারা এখন মেতে আছেন নাওমির খেলোয়াড়ি দক্ষতা নিয়েই। র‍্যাকেট ম্যাগাজিনে লুইসা থমাস নামের একজন লিখেছেন, ‘নাওমি একদম প্রকৃতিগত শক্তির অধিকারী। সার্ভ দিয়ে পয়েন্ট আদায় করতে জানে, বিধ্বংসী ফোরহ্যান্ড দিয়েও প্রচুর পয়েন্ট পায়। ওর র‍্যাকেট স্পিড অত্যন্ত বেশি। এমনকি মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে বল মারতেন তিনি।’’

সেরেনাকে হারানো নাওমি এখন শুধু নিজ দেশেই নয়, পুরো টেনিস অঙ্গনেই আলোচিত। নিজের আদর্শকে যদি এভাবে অনুসরণ করে যেতে পারেন তিনি তবে কে জানে, একদিন হয়তো সেরেনা উইলিয়ামসের কাতারেই উচ্চারিত হবে নাওমি ওসাকার নাম। তবে সেজন্য পাড়ি দিতে হবে বিস্তর দূর্গম পথ। নাওমি ওসাকা কি পারবেন সেরেনার দেখানো পথে হেঁটে সাফল্যচূড়ায় উঠতে? উত্তর বলে দেবে সময়ই, ততদিন বরং টেনিসের এই নতুন সেনসেশনের খেলা উপভোগ করা যাক!

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
শিস দিয়েই দুই বাংলার তারকা জামালপুরের অবন্তী
শিস দিয়েই দুই বাংলার তারকা জামালপুরের অবন্তী
সুজির মালাই পিঠা
সুজির মালাই পিঠা
আশুরার রোজা: নিয়ম ও ফজিলত
আশুরার রোজা: নিয়ম ও ফজিলত
তরুণীদের বেডরুমে নেয়ার পর হত্যা করাই কাজ
তরুণীদের বেডরুমে নেয়ার পর হত্যা করাই কাজ
অবন্তী সিঁথির জয়জয়কার
অবন্তী সিঁথির জয়জয়কার
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ!
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ!
সূরা আল নাস এর গুরুত্ব ও ফজিলত
সূরা আল নাস এর গুরুত্ব ও ফজিলত
যৌনতায় ঠাসা ৫টি সিনেমা
যৌনতায় ঠাসা ৫টি সিনেমা
‘তারেকের তিন গাড়ি, আমার বোন চলে বাসে’
‘তারেকের তিন গাড়ি, আমার বোন চলে বাসে’
শচীনের সঙ্গে অভিনেত্রীর ‘গোপন’ সম্পর্ক!
শচীনের সঙ্গে অভিনেত্রীর ‘গোপন’ সম্পর্ক!
বিয়ে ছাড়াই মা হলেন জিৎ-এর প্রেমিকা!
বিয়ে ছাড়াই মা হলেন জিৎ-এর প্রেমিকা!
নিককে প্রকাশ্যে চুমু খেলেন প্রিয়াঙ্কা
নিককে প্রকাশ্যে চুমু খেলেন প্রিয়াঙ্কা
ন্যান্সি ও তার স্বামীকে গ্রেফতারের দাবি
ন্যান্সি ও তার স্বামীকে গ্রেফতারের দাবি
মিলনে ‘অপটু’ ট্রাম্প, বোমা ফাটালেন এই পর্নো তারকা!
মিলনে ‘অপটু’ ট্রাম্প, বোমা ফাটালেন এই পর্নো তারকা!
সূরা বাকারার শেষ অংশের ফজিলত
সূরা বাকারার শেষ অংশের ফজিলত
‘শাহরুখ’ আর রেডি গোয়িং টু জাহান্নাম!
‘শাহরুখ’ আর রেডি গোয়িং টু জাহান্নাম!
‘পবিত্র আশুরা’
‘পবিত্র আশুরা’
বিবাহিতা বা সন্তানের মা হলে ১০ লাখ জরিমানা!
বিবাহিতা বা সন্তানের মা হলে ১০ লাখ জরিমানা!
এ কেমন কাণ্ড পুলিশ পুত্রের!
এ কেমন কাণ্ড পুলিশ পুত্রের!
কাকে বিয়ে করবেন?
কাকে বিয়ে করবেন?
শিরোনাম:
দেশের দুই পুঁজিবাজারে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচকের উত্থান-পতনে লেনদেন চলছে দেশের দুই পুঁজিবাজারে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচকের উত্থান-পতনে লেনদেন চলছে ক্ষমতা হারানোর জ্বালা থেকেই মনগড়া কথা বলছেন এস কে সিনহা: ওবায়দুল কাদের ক্ষমতা হারানোর জ্বালা থেকেই মনগড়া কথা বলছেন এস কে সিনহা: ওবায়দুল কাদের এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ভারতের জয় এশিয়া কাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ভারতের জয় আদালতে হাজির হওয়ার মতো সুস্থ নন খালেদা জিয়া: অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার আদালতে হাজির হওয়ার মতো সুস্থ নন খালেদা জিয়া: অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার