এক টাকার টিকিট ৫০, বদলে গেছে পুরো চিড়িয়াখানা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৭,   ১১ সফর ১৪৪২

এক টাকার টিকিট ৫০, বদলে গেছে পুরো চিড়িয়াখানা

আদনান সাকিব, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৫ ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৪:১৯ ৯ আগস্ট ২০২০

ছবি: চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার মূল ফটক

ছবি: চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার মূল ফটক

চট্টগ্রামের মানুষের কাছে চিরচেনা পর্যটন কেন্দ্রের নাম চিড়িয়াখানা। শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন প্রাণীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার অন্যতম মাধ্যমও এটি। তবে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতো চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। দেখার যেন কেউ ছিল না। এই চিড়িয়াখানার কিছু অংশ পাহাড়ে। সেখানে ছিল না যাতায়াতের সিঁড়ি। দর্শনার্থীদের হাত ধরাধরি করে উঠানামা করতে হত। 

একদিকে অল্প সীমানা প্রাচীর থাকলে অন্যদিকে নেই। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হতো পশু-পাখি আর দর্শনার্থীদের ময়লা-আবর্জনা। এক কথায় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের নাকে হাত দিয়ে চলতে হতো। যার ফলে দর্শনার্থী ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। এছাড়া ছিনতাই ও অভ্যন্তরে দর্শনার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। 

বাঘেরাদুটি সিংহী ছিল-সিংহহীন নিঃসঙ্গ। নড়বড়ে খাঁচা থেকে বেরিয়ে লাফালাফি করত হনুমান। বেশির ভাগ প্রাণীর খাঁচা ছিল ভাঙা। যার কারণে আক্রমণের শিকার হয়েছেন অনেক দর্শনার্থী। চিড়িয়াখানার রাস্তা ছিল কাঁচা। সেই জণাজীর্ণ ও কর্দমময় স্থানের চেহারা আজ বদলে গিয়েছে। যেন প্রাণ পেয়েছে বন্দর নগরীর চিড়িয়াখানাটি। স্থানটিতে এখন প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী ভীড় জমাচ্ছে। 

এই চিড়িয়াখানার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন চট্টগ্রাম মীরসরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন ও বর্তমান চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডাঃ শাহাদাত হোসাইন শুভ। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে, আজ পাল্টে গেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার রূপ। ২০১৪ সালে এই চিড়িয়াখানার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র পৌনে দুই লাখ টাকা। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রাণীর খাবার বাবদ মাসিক ব্যয় প্রায় নয় লাখ টাকা। বড় ধরনের আর্থিক সংকট নিয়ে যাত্রা শুরু করে চিড়িয়াখানাটি। গত জুলাই মাসে চিড়িয়াখানাটি সাড়ে ছয় বছরে পদার্পণ করেছে। এই সময়ের মধ্যে বদলে গেছে চিড়িয়াখানা। 

ময়ূরএই চিড়িয়াখানার টিকিটের বর্তমান মূল্য করা হয়েছে ৫০ টাকা। এক সময়ের তিতির পাখির খাঁচায় এখন ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা একজোড়া বাঘসহ চিড়িয়াখানায় মোট বাঘের সংখ্যা পাঁচটি। আর তিতির পাখি গেছে নিজস্ব খাঁচায়। নিঃসঙ্গ সিংহী জোড়া পেয়েছে সিংহ সঙ্গী। ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে চিড়িয়াখানার চারপাশে সুউচ্চ সীমানা প্রাচীর। ময়লার স্তূপের জায়গাটি এখন সুনসান, দর্শনার্থীরা আড্ডা দেন। দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে সিঁড়ি নির্মিত হয়েছে, বানর-হনুমানের দল এখন নিজেদের ভাঙা খাঁচা ছেড়ে বাইরে নাচানাচি করতে পারে না। নতুন খাঁচার ভেতরই বসত করতে হয়। কুমিরের খাঁচা সম্প্রসারণ করে দ্বিগুণ করা হয়েছে।

১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে চিড়িয়াখানার প্রধান ফটক। বেড়েছে পশুর সংখ্যা। চিড়িয়াখানার অভ্যন্তরে ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ৩২ হাজার ১৬৪ বর্গফুট সড়ক। ফলে শীতকালেও আর ধুলার দেখা মেলে না চিড়িয়াখানায়। শিশুদের জন্য করা হয়েছে কিডস জোন। পাহাড়ি পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত হয়েছে ড্রেন ও গাইডওয়াল। দর্শনার্থী বসার জন্য বেঞ্চ তৈরি, শৌচাগার তৈরি, প্রায় এক হাজার ফলজ, বনজ ও ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অফিস ভবন আধুনিকায়ন, প্রাণীখাদ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা স্টোররুম, কোয়ারেন্টাইন রুম, অপারেশন থিয়েটারসহ আধুনিক প্রাণী হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে। এখন চিড়িয়াখানার কর্মীরা সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি পান প্রতি মাসের এক তারিখের মধ্যেই।

রয়েছে বিভিন্ন পাখিএসেছে নতুন অতিথি

৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি জেব্রা সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া বাঘ, সিংহ, ভাল্লুকের সঙ্গে সংগ্রহ করা হয়েছে গয়াল, হরিণ, ময়ূর, ম্যাকাও, ঘোড়া, ইমু ও উটপাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। আলাদা সংগ্রহশালা রয়েছে পাখিদের জন্য। যেখানে দেশ-বিদেশের হরেক রকমের পাখি দেখা যায়। নতুন করে জন্ম নিয়েছে সাত মাস বয়সী বাঘের বাচ্চা করোনা। পাশের খাঁচায় আছে বাংলাদেশের প্রথম সাদা বাঘ দুই বছর বয়সী ‘শুভ্রা’, যে এই চিড়িয়াখানায় আসা দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।

২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর ৩৩ লাখ টাকায় কেনা ১১ মাস বয়সী রাজ এবং ৯ মাস বয়সী পরীকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় আনা হয়। ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই বেঙ্গল টাইগার দম্পতি রাজ-পরীর তিনটি ছানার জন্ম হয়। যার মধ্যে দু্টি ছিল ‘হোয়াইট টাইগার’, অন্যটি কমলা-কালো ডোরাকাটা। চিড়িয়াখানার বাঘ দম্পতি রাজ-পরীর সংসারে গত বছর ৩০ ডিসেম্বর দুটি শাবকের জন্ম হয়। এরমধ্যে পরদিনই একটির মৃত্যু হয়। বেঁচে থাকা শাবকটিকে শুরুর দিকে ইনকিউবেটরে এবং পরে তিন মাস খাঁচায় নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়।

জিরাফএর মধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ১৯ মার্চ থেকে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। তারপর চার মাস পেরিয়ে গেছে, এখনো খোলেনি চিড়িয়াখানা। তাই দর্শনার্থীরা দেখা পায়নি নতুন বাঘ শাবকের। এর মধ্যে পাহাড় ঘিরে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সিড়ি যা আধুনিক ইকো-ট্যুরিজম হিসেবে তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা সরকারি কোনো ধরনের সাহায্য ছাড়াই পরিচালিত হয়। সকল বেতন, প্রাণী ক্রয়, তাদের খাদ্য ও উন্নয়নসহ সকল খরচ টিকিটের আয়ে পরিচালিত হচ্ছে। মহামারির কারণে চিড়িয়াখানা পাচঁ মাস বন্ধ হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক সমস্যা হয়নি।  

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিচালনা পরিষদের সদস্য সচিব রুহুল আমিন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, যখনই দায়িত্ব নিয়েছি তখন থেকে নানাবিধ পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। তার সঙ্গে অমূল পরিবর্তন করেছি। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় অসাধু চক্ররা জিম্মি করে রেখেছিল। আমি যখন কাজ শুরু করেছি তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে হুমকি এসেছে। তারা বলেছে, আমার বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দিবে। আমি সে চক্রকে ভেঙ্গে দিয়েছি। বিনা পারিশ্রমিকে আমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং যাব। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডাঃ শাহাদাত হোসাইন শুভ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমার সর্বোচ্চ দিয়ে আমি কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি অদূর ভবিষৎতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পশু-পাখি তে আরো সমৃদ্ধ হবে। যার জন্য সকলের ঔকান্তিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

বছরে লাখো দর্শানার্থীর আনাগোনা হয় এই চিড়িয়াখানায়প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান ফয়’স লেকের পাশে ছয় একর জমিতে বিনোদনের জন্য চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হওয়া চিড়িয়াখানাটি এক সময়ে হয়ে ওঠে চট্টগ্রামবাসীর বিনোদনের অন্যতম স্থানে। শুরুতে টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র এক টাকা। বর্তমানে এই চিড়িয়াখানার আয়তন প্রায় ১০ একর এবং বছরে প্রায় আট লাখ দর্শনার্থী এই চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করে।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস