একদিন স্বপ্নের দিন

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৬ ১৪২৬,   ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

একদিন স্বপ্নের দিন

 প্রকাশিত: ১৪:২৪ ২১ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১৭:৩২ ২১ জুলাই ২০১৮

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মাহবুব হাসান বাবর

ইরার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কেন যে ওকে বারবার মনে পড়ছে তা বুঝে উঠতে পারছে না মৃদুল। ভোরে ঘুম থেকে জেগেই বারবার ওর কথা মনে পড়ছে। ইরা চলে গেছে প্রায় ন'বছর। স্বামীর সাথে ইটালীতে সেটেল্ড। অন্যান্য বন্ধুদের সাথে প্রায়ই কথা হয় ইরার। কিন্তু মৃদুলকে কখনো ফোন দেয়নি। আর সেও যোগাযোগের চেষ্টা করেনি কখনো। নিজের ভেতরের চাপা অভিমানগুলো নিজের ভেতরেই বয়ে বেড়াচ্ছে এতগুলি বছর। পরিবর্তন- বিবর্তন আর প্রগতির কারনে মৃদুলও বছর তিনেক আগে সংসারী হয়েছে। নিজে ঠকেছে আর নন্দিনীকে ঠকাচ্ছে।

নন্দিনী মৃদুলের স্ত্রীর নাম। সংসারের প্রয়োজন ছাড়া ওর সাথে তেমন কথাবার্তা হয় না। ন'টা পাঁচটা অফিস শেষে ক্লান্ত দেহ নিয়ে যখন ঘরে ফেরে তখন নন্দিনী প্রতিক্ষা করে। ঘরে ঢুকতেই একগ্লাস বরফ পানি নিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। টাই খুলতে খুলতে হাত বাড়িয়ে দেয়। শার্টের বোতাম খুলতে থাকে। নন্দিনীর মুখের দিকে তাকালে সে চোখ বড়বড় করে তাকায়।

নন্দিনী বহুবার বলেছে

- তুমি কি কাউকে ভালবাসতে? মৃদুল তার এ প্রশ্নের উত্তরটা বারবার এড়িয়ে গেছে। মৃদুল কখনো নন্দিনীকে ঠকাতে চায়নি কিন্তু সে ঠকেই যাচ্ছে।

দুই

নন্দিনী তখন তিনমাসের প্রেগন্যান্ট। হঠাৎ ব্লিডিং শুরু হলো। দ্রুত হসপিটালে নিয়ে গেলে পরীক্ষা- নিরিক্ষা করে জানা গেলো পেটের বাচ্চাটা মারা গেছে। নন্দিনীকে অ্যাবরশন করাতে গিয়ে আরেক ঝুঁকিতে পড়তে হলো। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছিলো। টানা তেরোদিন হসপিটালে রেখে ট্রিটমেন্ট করাতে হয়েছে।

হসপিটাল থেকে বাসায় আনার পর নন্দিনী কেমন যেন অসংলগ্ন আচরণ করতো। একদিন রাতে এক ভয়ংকর কাণ্ড করে বসলো। রাত তখন প্রায় তিনটে। ঘুমের ভেতর কান্নার শব্দ পেয়ে জেগে উঠলো মৃদুল। ও দেখে বিছানায় নন্দিনী নেই। পাশের রুম থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। বিছানা থেকে উঠে পাসের রুমে যেতেই নন্দিনী বিশ্রী গালমন্দ করতে লাগলো। কাছে যেতেই মৃদুলের মাথায় ফুলদানি দিয়ে আঘাত করলো। তখন কপাল বেয়ে রক্তের ফোটা পড়ছে। নন্দিনি হতবাক! কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পাশের রুমে গিয়ে ডেটল এনে রক্তাক্ত ক্ষত ধুয়ে মুছে দিয়ে বললো,

- মৃদুল কিছু মনে করো না। আমার কি যেন হয়েছে! আমি যা কিছু করছি নিজে করছি না। কে যেন করাচ্ছে।

মুদুল মনে মনে ভাবছে,

ও কি কিছুটা হ্যালুসিনেশনে ভুগছে, নাকি ঘাড়ে জ্বিন টিন এলো।

তবে তার দুঃশ্চিন্তায় কাটলো সারারাত।

পরদিন ডক্টরের চেম্বারে গিয়ে সব খুলে বললে ডক্টর বললেন নন্দিনিকে প্রচুর সময় দিতে। প্রয়োজনে তাকে নিয়ে বাইরে কোথাও বেড়িয়ে আসতে।

নন্দিনী মানসিকভাবে অসুস্থ। পেটের সন্তান নষ্ট হবার জন্য তার এমন হচ্ছে।

নন্দিনীর মাকে খবর দেয়া হলো। সাথে ওর ছোট বোনও এলো। নন্দিনী ধীরে ধীরে সুস্থ এবং স্বাভাবিক হতে শুরু করলো। তবে কিছুতেই তার ছোটবোনকে তার বাড়ি থেকে যেতে দেবে না এমন কথা বললে মৃদুল বললো,নিনিতের কলেজ আছে তো! বরংচ মা-ই থাকুক।

না তা সে মানলো না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো এখানে থেকেই নিনিত পড়বে।

বেশ ক’দিন কেটে গেলো। নন্দিনী খুব হাসিখুসি আর স্বাভাবিকভাবেই দিন কাটাচ্ছিলো। একদিন রাতে মৃদুল ওকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে গেলে নন্দিনী হাত ছাড়িয়ে বলে,

মৃদুল তখন অনার্স ফাস্ট ইয়ারে। পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ী পড়ে কৃষ্ণচুড়ার নিচে ইরা একটি ছেলের সাথে বসেছিলো। হালকা পাতলা গড়নের মেয়েটির চোখদুটো বড়। ইউনিভার্সিটির সবুজ চত্বরে সেদিন অনেক সুন্দরীর দেখা মিললেও কেন যেন ইরার দিকেই চোখ গিয়ে আটকে যাচ্ছিলো

- মৃদুল তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।

মৃদুল চোখ বন্ধ করে বললো,

- হ্যা বলো

ও বললো,

- উঠে বসো। কথাটা খুব সিরিয়াস

মৃদুল চোখ খুলে দেখলো নন্দিনী ততক্ষণে উঠে বসেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে। মৃদুল ওকে বললা,

- কি হয়েছে বলোতো?

নন্দিনী চুপচাপ থাকলো। অনেকক্ষণ দুজনের মাঝে কোনো কথাবার্তা হলো না। তারপর একসময় বললো,

- কি হলো শুনবে না আমার কথা!

মৃদুল উঠে বসলো। ও মৃদুলের দিকে না তাকিয়েই বললো,

- মৃদুল তোমাকে যে কথাটি আমি বলবো তোমার কথা দিতে হবে কথাটি তুমি রাখবে।

মৃদুল এবার রেগে গেলো কিন্তু প্রকাশ না করেই বললো,

- কি কথা আগে বলবেতো।

নন্দিনি আবার বললো,

- না তোমাকে কথা দিতে হবে

ততক্ষণে সহ্যের সীমাটা অতিক্রম করে যাচ্ছে। মনে মনে মৃদুল ভাবছে ওর মাথায় কি আবার কোনো প্রোবলেম হলো কিনা!

মৃদুলের মাথাটাও কেমন যেন ঘুরছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ আবার নন্দিনী ওর মাথা ফাটাবে।

এসব ভাবতে ভাবতে নন্দিনী বসা থেকে শুয়ে পড়ে বললো,

- আচ্ছা ঠিক আছে কাল সকালে বলবো,

মৃদুল এখন রাগে ঘামছে। কথা না বাড়িয়ে সে ও শুয়ে পড়লো।

তিন

অন্যদিনের মতো আজ সকালটা ফুরফুরে মেজাজে নেই মৃদুল। কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে নন্দিনী স্বাভাবিক না। নন্দিনী ঘুম থেকে উঠেই নিনিতের রুমে বসে আছে। মৃদুলের খুব ডাকতে ইচ্ছে করছিলো। আবার কি ভেবে ডাকলো না। অফিসে যাবার জন্য রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে এসে দেখে নন্দিনী এবং নিনিত দুজনেই আছে। কেউ খাওয়া শুরু করেনি। মৃদুল আসতেই নিনিত বলে উঠলো,

- দুলাভাই আপনার কি কোনো কারনে মন খারাপ?

মৃদুল হেসে উত্তর দিলো,

- এতো সুন্দর শালী থাকতে কোনো দুলাভাইরই মন খারাপ হতে পারে না।

নিনিত হিহি করে হেসে উঠলো। কিন্তু নন্দিনীর ভেতরে তেমন কোনো অনুভূতি মনে হলো না।

খাবার বসে মৃদুল একটি কথাও বললো না। নিনিত নাস্তা সেরে চলে যাবার পর মৃদুল নন্দিনীকে বললো,

- কাল রাতে কি যেন বলতে চেয়েছিলে? এখন বলো।

নন্দিনী চুপচাপ কোনো কথাই বলছে না। মৃদুল আবার বললো,

- কি হলো বলো!

নন্দিনী কোনো কথা না বলে বেসিনে চলে গেলো। মৃদুলও পুরোপুরি না খেয়ে বেসিনে হাত ধুয়ে রুমে গিয়ে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

আজ অফিসে মন বসছে না মৃদুলের। ইরার কথা মনে পড়ছে। ইরার স্মৃতিগুলো কেন যেন কখনই ভুলতে পারে না। বারবার মনে পড়ে। প্রথম দেখার দিনের কথা খুব মনে আছে। কি কথা হয়েছিলো তাও দাড়ি কমা সেমিকোলনসহ মনে আছে।

মৃদুল তখন অনার্স ফাস্ট ইয়ারে। পহেলা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ী পড়ে কৃষ্ণচুড়ার নিচে ইরা একটি ছেলের সাথে বসেছিলো। হালকা পাতলা গড়নের মেয়েটির চোখদুটো বড়। ইউনিভার্সিটির সবুজ চত্বরে সেদিন অনেক সুন্দরীর দেখা মিললেও কেন যেন ইরার দিকেই চোখ গিয়ে আটকে যাচ্ছিলো। কিন্তু সাথে ছেলেটিকে দেখে বুকের ভেতরটা খুব ভারী হয়ে উঠছিলো। সেদিনের পর থেকে ইরার জন্য কি এক অদ্ভুত টান শুরু হলো। মাসখানেক পর ডিপার্টমেন্টের এক বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারলো সেদিনের সেই ছেলেটি ওর ছোটমামা।

জীবনের কিছু স্মৃতিময় কষ্ট থাকে। সে কষ্টগুলোর নিজস্বতা আছে। আছে স্বতন্ত রংও।

ইরাকে নিয়ে এমন শত শত স্মৃতি আজও  মৃদুলের বুকের বাম অলিন্দে ভর করে আছে।

শেষ প্রহরের পাখিরা যেমন নীড়ে ফেরে, মৃদুলও অফিস শেষে বাড়ী ফেরে। স্বপ্ন ভঙ্গ হয় প্রতিনিয়ত তার। গদবাধা নামতার মতো জীবনটা মনে হয়। বাড়ী ফিরেই কলিংবেলে দুবার শব্দ হবার পর নন্দিনী দরজা খুলবে। শোবার ঘরে যেতে যেতে পিছু হাটবে। তারপর একগ্লাস বরফ পানি নিয়ে হাতে দিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে টাই খোলার সময় মৃদুলের চোখে চোখ রেখে বলবে

:দুপুরে কিছু খেয়েছো!

এ জীবন আর মৃদুলের ভাল লাগে না। ইরা তার জীবনের সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।

চার

রাত তখন বারোটা ছুইছুই। ইদানিং নন্দিনী বেশ রাত পর্যন্ত নিনিতের রুমে কাটায়। মৃদুল কখনো ডাকে না। আজ ডাকছে,

:নন্দিনী এ ঘরে একটু আসবে!

দুবার ডাকার পর নন্দিনী এলো। মৃদুল খুব স্বাভাবিকভাবেই বললো,

:কাল রাতে তুমি যেন কি বলতে চেয়েছিলে?

নন্দিনী মুখ নিচু করে বললো,

:হ্যা বলবো

তাহলে বলি বলি করে বলছো না কেন? মৃদুল একটু রেগেই কথাটি বললো।

হঠাৎ দরজায় চোখ পড়তেই দেখে নিনিত দাঁড়ানো। মৃদুল স্বাভাবিক হয়ে বললো,

:আরে নিনিত যে। এসো ভেতরে এসো।

নিনিত রুমের ভেতরে ঢুকে নন্দিনীর গা ঘেষে বসলে মৃদুল বললো,

:কি খবর নিনিত তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে?

নিনিত স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলো,

:হ্যা দুলাভাই ভালোই চলছে।

এমন সময় নন্দিনী নিনিতের দিকে তাকিয়ে বললো,

:নিনিত তুই তোর রুমে যা। অনেক রাত হলো শুয়ে পড়।

নন্দিনীর কথাগুলো নিনিতের পছন্দ হলো না। কারন নিনিত আর নন্দিনী প্রায়ই রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত গল্প করে। তারপরও নিনিত মন খারাপ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

মৃদুল নন্দিনীকে বললো,

:কী ব্যাপার তুমি নিনিতকে এভাবে পাঠিয়ে দিলে কেন?

নন্দিনী কোনো কথা বললো না। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললো,

:তোমাকে কাল রাতে যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম আজ তা বলবো।

মৃদুল কেন যেন ঘামছে। কপালে ঘাম চিকচিক করছে।

:চলো ব্যালকনিতে গিয়ে বসি! মুদুল কথাটি বলতেই নন্দিনি বলে উঠলো,

:না মৃদুল আমার কথাগুলি তোমার ভাল লাগবে না।

মৃদুল ভ্রু কুচকে বলল,

:কী কথা বলবে তো আগে!

নন্দিনী কোনো ভূমিকা না টেনেই সরাসরি বললো,

:মৃদুল আমি আর তোমার সাথে সংসার করতে চাই না। আমি সেপারেট চাই। আমি চাই তুমি আবার বিয়ে করে সংসারী হও। মৃদুল এবার আরো ঘামছে। মনে মনে ভাবছে নন্দিনীর মাথায় নিশ্চিত আবার প্রোবলেম হয়েছে। এমন সময় দরজার সামনে থেকে নিনিত বলে উঠে,

:হ্যা দুলাভাই আপা ঠিকই বলেছে...

মৃদুল দরজার দিকে তাকিয়ে মনে ধাক্কা খেলো।

নিনিত এক পা দুপা করে ভেতরে এসে বললো,

:আপা অনেক ভেবে চিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে।

মৃদুল নিনিতকে ধমক দিলো। মৃদুলের ধমক খেয়ে সে ঘাবড়ালো না বরংচ সেপারেটের কথা গড়গড় করে বলতে লাগলো। নন্দিনী কোনো কথা বলছে না। সে দেয়ালের দিকে মুখ করে আছে।

মৃদুল কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কি বলবে কিংবা কি করবে। এত রাত না হলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতো।

হঠাৎ নন্দিনি বলে উঠলো,

:আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। তুমি এখন কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার।

মৃদুল নন্দিনীর কাছে গিয়ে হাত ধরার চেস্টা করলে সে হাত ছাড়িয়ে নেয়।

নিনিতকে রুম থেকে যেতে বললে নন্দিনি বলে,

:যেতে হলে আমিও যাবো। তোমার সাথে আজকের পর থেকে আমার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

এ কথা বলে নিনিত আর নন্দিনি পাশের রুমে চলে যায়।

মৃদুল একা রুমে বসে ঘামতে থাকে। প্রতিক্ষা করে সকালের জন্য। সারারাত নির্ঘুমই কাটিয়ে দেয়।

ইরার কথা আজ তার মনে পড়ছে না। কেন যেন নন্দিনীকে ইরার চেয়েও আপন মনে হচ্ছে।

পাঁচ

দিন- মাস যেতে থাকে। মৃদুল আর নন্দিনীর দূরত্বও বাড়তে থাকে। তবে দূরত্বের ধরণটা কিছুটা পাল্টেছে। কবে যে নন্দিনীর সাথে শারিরিক সম্পর্ক হয়েছে তা মৃদুলের মনে নেই। নিনিত আর নন্দিনী আলাদা রুমেই ঘুমায়। দুজনের মধ্যে যেভাবে দূরত্ব বাড়ছে তার চেয়ে সেপারেট হয়ে যাওয়াটাই ভালো। এসব প্রায় দিনই ভাবে মৃদুল। কিন্তু সমাজ আর পরিবারের কথা ভেবে সে কিছু করতে পারছে না। এদিকে নন্দিনীও ইদানিং সেপারেট চাচ্ছে না। সে স্পষ্ট বলে দিয়েছে ডিভোর্স সে চায় না তবে একই বেডে সে ঘুমাতে পারবে না। বাইরে তার সাথে ঘুরতে যেতে কিংবা কোনো আত্মীয়র বাসায় যেতে পারবে না।

মৃদুল খুব স্বাভাবিকভাবেই সব মেনে নিয়ে মনের চাপা কস্ট বুকে চেপে আছে।

সেদিন নিনিত আর নন্দিনী না বলেই বাবার বাড়ি বেড়াতে গেলো। পাশের বাসায় চাবিটা রেখে নিনিত মৃদুলকে ফোনে জানালো তারা বাবার বাড়ি যাচ্ছে। অদ্ভুত সংসারের বেড়াজালে মৃদুল বারবার হোচট খেতে থাকলো। ইরার সাথে সংসার করলে হয়তো জীবনটা এমন হত না। আসলেই পৃথিবীতে পুরুষের ভালবাসার কোনো মূল্য নেই। পুরুষের টাকাই যেন সব। টাকাওয়ালা পুরুষরা সম্ভবত সুখ কিনতে পারে।

তিনদিন হয়ে গেলো নন্দিনীর ফেরার নাম নেই। সেদিন বাসায় ফিরে মৃদুল নন্দিনীকে তিন চারবার ফোন দেবার পর রিসিভ হলো। তাও আবার রিসিভ করলো নিনিত। ফোন ধরে বললো,

- আপু বিজি আছে পরে ফোন দেন

মৃদুলের রাগটা কন্ট্রোল করতে পারলো না। বলেই ফেললো,

- থাক ওর আর আসতে হবে না।

কথাটা শুনে নিনিতের ভেতর কোনো রি-অ্যাকশন দেখা দিলো না। খুব স্বাভাবিকভাবেই ফোনটা রেখে দিলো।

নন্দিনীকে দিয়ে মৃদুলের তেমন কোনো কাজ নেই। তারপরও বাড়িটা কেমন যেন শুন্য শুন্য মনে হচ্ছে। অফিস থেকে ফিরলেই বাসাটায় ঢুকতেই কেমন যেন গা ছমছম করে। ভৌতিক একটা ব্যাপার। হঠাৎ মৃদুলের এমন মনে হবার কারণ কি তা জানে না। তবে মেন্টালি ডিসঅর্ডার কাজ করছে সম্ভবত। ইদানিং ঘুরেফিরে ইরার কথাই মনে পড়ছে মৃদুলের। কোনো এক বসন্তে ইরা মৃদুলকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি দিয়েছিলো। সে পাঞ্জাবির দুটি পকেটে ছিলো দুটি চিঠি। একটি কাগজে মাত্র দুটি লাইন আর অন্যটিতে তেত্রিশটি বাক্য। দুটি লাইনের চিঠিতে লেখা ছিল,

"মৃদুল,

কস্টের রং কি জানো?

জানলে জানিও।

আর অন্যটা তেত্রিশটি বাক্যের মধ্যে কয়েকটি বাক্য আজও মনে আছে,

"মৃদুল তুমি আমাকে অনেক ভালবাসো তা আমি জানি। হয়তো আমিও তেমনটিই। তবে মনে রেখো, তোমার আমার আশাটা কখনই পূরণ হবে না।"

সত্যিই পূরণ হয়নি। জীবনের যোগ- বিয়োগ, গুণ-ভাগ মিলিয়ে সে দেখেছে,

হিসেবের খাতা শূণ্য- একেবারেই শুণ্য।

ইরা ক্লাসের সবচেয়ে সেরা ছাত্রী না হলেও বুদ্ধিমত্তায় ছিলো অসাধারণ। পরিস্থিতি সামলে নেয়ার মতো এক্সটা ক্ষমতা তার মধ্য ছিলো। বন্ধুত্বের ভেতরেও যে এক ধরনের ঘোর থাকে কিংবা থাকে জীবন বদল করার মানসিকতা তা সে বারবারই অনেক বন্ধুদের ব্যাপারে সিরিয়াস হয়েছে। এটা ছিলো নিতান্তই বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা। এজন্যই ও ছিলো সবার কাছে প্রিয় এবং হেল্পফুল একজন। একদম ভেঙ্গে যাওয়া ভালবাসাকে ও টেনে টুনে দুজনকে মিলিয়ে দিয়ে বিয়ে পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে। দিব্যি কতজনে সে সংসার করছে। অথচ নিজের ভাঙ্গা ঘরে কখনও আলো জ্বালাতে পারে নি। ইরা সুখেই আছে- ইরারা সুখেই থাকে। হারিয়ে যায় শুধু মৃদুলেরা। কেউ নস্ট মৃদুল হয় -কেউ অসুখী মৃদুল হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর