Alexa একদিনেই পানাম নগর ও মায়াদ্বীপ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৭ ১৪২৬,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

ঈদে ঘোরাঘুরি

একদিনেই পানাম নগর ও মায়াদ্বীপ

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৫ ৮ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৫:১৫ ৮ আগস্ট ২০১৯

পানাম নগর

পানাম নগর

ঈদের ছুটিতে যদি ঐতিহ্যের কাছাকাছি একটা দিন কাটাতে চান তবে ঘুরে আসতে পারেন ‘হারানো নগরী’ হিসাবে খ্যাত পানাম নগর থেকে। এটি বাংলার প্রাচীনতম শহর। এক সময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বসবাস ছিল এখানে। ছিল মসলিনের জমজমাট ব্যবসা। প্রাচীন সেই নগরীর তেমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই। এখন আছে শুধু ঘুরে দেখার মতো ঐতিহাসিক পুরনো বাড়িগুলো।

প্রাচীনকালে সুবর্ণগ্রাম নামেই এর পরিচিতি ছিল। পরে নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় সোনারগাঁও। ঢাকার আগে সোনারগাঁ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার রাজধানী। ঈশা খাঁ ছিলেন এই অঞ্চলের শাসক। তার উদ্যোগে নির্মিত হয় প্রাচীন সোনারগাঁওয়ের তিন নগর—বড় নগর, খাস নগর ও পানাম নগর। এর মধ্যে পানাম ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে কয়েক শতাব্দী পুরনো অনেক ভবন রয়েছে, যা বাংলার বার ভূঁইয়াদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০০৬ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পানাম নগর ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় স্থান করে নেয়। জানা যায়, চতুর্দশ শতাব্দীতে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে পৃথিবীর নামি-দামি শিক্ষকরা পড়াতে আসতেন। এখানে একটি ভৃত্য বাজার ছিল বলে জানা যায়। পানাম নগরজুড়ে মোট ৫২টি স্থাপনা রয়েছে। সবক’টিই ঔপনিবেশিক আমলের। পানাম নগরী নিখুঁত নকশার মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কূপসহ আবাস উপযোগী নিদর্শন রয়েছে।

লাল ইট ও নানা কারুকার্যের এই নগরের দু’পাশে খাল ও পুকুর রয়েছে। এগুলো মূলত পানি সরবরাহের জন্যই। যায়। এখানে আবাসিক ভবন ছাড়াও উপাসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ ইত্যাদি রয়েছে। নগরের আশে পাশে আরো কিছু স্থাপনা আছে যেমন- ছোট সর্দার বাড়ি, ঈশা খাঁর তোরণ, নীলকুঠি, বণিক বসতি, ঠাকুর বাড়ি, পানাম নগর সেতু ইত্যাদি।

পানাম নগরজুড়ে মোট ৫২টি স্থাপনা রয়েছে

যাওয়ার আগে ভেবে রেখেছিলাম পানাম নগরের সবগুলো ভবনের ছবি তুলে রাখবো। কারণ প্রাচীন এই নগরের নাম গুগলে সার্চ দিলে খুবই অল্প সংখ্যক কিছু ছবি আসে। এরমধ্যে কয়েকটি ছবি খুব বেশি কমন। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় একটি ছবি, যেটাতে রাস্তা আর তার দুইধারের দালানগুলো দেখা যায়। ছবিটার মধ্যে এক ধরনের মায়া আছে। তবে সবগুলো ছবি না থাকার বিষয়টা ভালো লাগলো না। তবে আমার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া একজন বললো, ‘সবগুলো ভবনের ছবি তোলা সম্ভব না। কারণ সবগুলো পুরোপুরি অক্ষত নেই।’ গিয়ে দেখলাম, তার কথা সত্য। তাও যতটুকু পেরেছি, ততটুকু তুলেছি।

প্রাচীন এই নগরের একটা মাত্র রাস্তা। তার দুই পাশে সারি সারি প্রাচীন দালান। দালানগুলো খুব উঁচু নয়। বড়জোর তিন তলা। বেশিরভাগই একতলা কিংবা দোতলা। প্রায় একশ বছরেরও আগের তৈরি। এখানেই ধনী ব্যবসায়ীরা বসবাস করতেন। সোনারগাঁ তখন ছিল মসলিন কাপড় তৈরির প্রসিদ্ধ স্থান। এই মসলিনের বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। পরে সুতি কাপড়ের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে এটি। কিন্তু ইংরেজরা আসার পর দেশি কাপড়ের কদর কমে যায়। বিলেতি কাপড় চলে আসায় এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিটা ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রত্যেকটি বাড়ির সামনে লেখাও আছে, ‘উপরে ওঠা নিষেধ’। নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা অনেকেই করেন না। যা খুবই দুঃখজনক। কয়েকজন উঠতেও দেখেছি। সিঁড়িগুলো খুবই সংকীর্ণ আর ক্ষয়ে যাওয়া, যারা উঠেছে খুব সাবধানে উঠতে হয়েছে তাদের। কয়েক মিনিট পর নিচ থেকে সিকিউরিটি গার্ড চেঁচামেচি শুরু করে দিলো তাদের উদ্দেশ্যে। ‘এত লোক উঠলে তো এটা ভেঙে পড়বে। বাড়ির সামনে নিষেধাজ্ঞার সাইনবোর্ড দেখেন নাই?’ এছাড়া আরো কম কথা! ওরাও নেমে এসেছে।

প্রাচীনত্ব, এ যেন মায়ারই অন্যরূপ। কেন যেন এরকম জায়গায় এলে মনটা কেমন করে। বাড়িগুলোর নির্মাণকাজ দেখলে আপনা থেকেই আগেকার কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগে। এত নিখুঁত, এত সুন্দর কারুকাজ সেই সময়ে! কী চমৎকার আর্ট! খুব জানতে ইচ্ছে করে এই প্রাচীন নগরীর মানুষগুলো কীভাবে জীবনযাপন করতো। জানতে ইচ্ছে করে পানাম নগরীর এতগুলো বাড়িতে বসবাসরত মানুষ একসঙ্গে কোথায় চলে গেল? কেন চলে গেল? ব্যবসা পড়ে গেলে সবাই কেন চলে যাবে? কেউ না কেউ তো থেকে যাবার কথা। সেটা হয়তো আর কখনোই জানা যাবে না। আফসোস থেকে যাবে দিনের পর দিন, শতাব্দীর পর শতাব্দী।

মায়াদ্বীপ

না জানার আফসোস নিয়ে এবারের উদ্দেশ্য মায়া দ্বীপে।

নৌকাটা যতই তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়ের অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছি ততই। দৃষ্টিজুড়ে সবুজের গালিচা আর আকাশে ধূসর মেঘের খেলা। শান্ত মেঘনার সবুজাভ স্নিগ্ধ পানি আছড়ে পড়ছে কূলে। তীরের কাছে জমা হয়ে আছে একরাশ কচুরিপানা। যেন নৌকা থেকে নামা যাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাদন জানাবে তার বেগুনী ফুলগুলো দিয়ে।

স্থানীয়ভাবে ‘নুনের টেক’ নামের জায়গাটির আরেকটি নাম আছে, ‘মায়াদ্বীপ’। মজার বিষয় হলো জায়গাটি থেকে ঘুরে আসার পর আমি জানতে পারি এই চরের এত সুন্দর একটি নাম আছে। পানাম নগর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিয়ে বাসে চেপে বসেছিলাম। এই দুই স্থান দর্শনের পরেও হাতে ছিল অনেকটা সময়। মেঘনা নদী ও বৈদ্দ্যার বাজার ঘুরে দেখার ইচ্ছে ছিল। সেই ছোটবেলায় হাটে তাজা মাছ কেনাবেচার দৃশ্যর কথা মনে পড়ে গেল। সেই স্মৃতি রোমন্থনে পানাম থেকে ছুটে গেলাম মেঘনার তীরে। তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না আর কিছুক্ষণের মাঝেই আবিষ্কার করবো মায়ায় মোড়ানো মায়াদ্বীপকে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী ইউনিয়নে মায়াদ্বীপের অবস্থান। নদীপথে পানাম নগর থেকে এর দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রায় শত বছর আগে মেঘনার বুক চিরে জেগে ওঠা এই চরের নাম রেখেছিল স্থানীয়রা নুনের টেক। সেই নুনের টেকের কোল ঘেঁষেই প্রায় ৩৫-৩৬ বছর আগে জেগে ওঠে আরো একটি চর। যার তিনটি অংশ রয়েছে এবং সেগুলোর নাম হল গুচ্ছগ্রাম, সবুজবাগ ও রঘুনার চর। এ গুচ্ছ গ্রামের সামনে বিশাল অংশই হল মায়াদ্বীপ।

মায়াদ্বীপ পুরোটাই সবুজ!

অপরূপ সৌন্দর্যের একটি চর এই মায়াদ্বীপ। এই দ্বীপটা বেশি একটা বড় না হলেও চারিপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। এ যেন একটি সবুজ প্রান্তরের গ্রাম। মেঘনার বুকে বালুকাময় অনিন্দ্যসুন্দর রূপের এই দ্বীপটি একেক ঋতুকে একেক সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে হাজির হয়। বর্ষায় বিশাল জলরাশি যেন মেঘনার রূপকে সাগরের আকার ধরা দেয়, এসময় নৌকা নিয়ে হারাতে মন চায় মেঘনার বুকে। আবার শরতে সারি সারি কাশবনের সমাহারে যেন হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির মাঝে। কিংবা হালকা শীতে মিষ্টি রোদে বালুকাময় তটভূমির ওপর দিয়ে সকাল কিংবা অস্তগামী সূর্যের আলোয় নিজেকে রাঙাতে বড় ভালো লাগে। আর গ্রীষ্মের ধু ধু বালি যেন অন্যরূপে ধরা দেয় এ চরে।

চমৎকার একটি বিকেল অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারবেন দ্বীপটিতে বসে। মেঘনার ঠাণ্ডা বাতাস আর ঢেউ স্পর্শে মন হারাবে অজানার বুকে। মায়াদ্বীপ এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনার শাখা নদীর নীল জল দেখলে লাফিয়ে পরতে ইচ্ছে করবে। এই জলে মনের আনন্দে সাঁতার কাটতে পারবেন।

এই সবুজ দ্বীপের মাথায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চোখ বন্ধ করে দুই হাত মেলে দিয়ে পাখি হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে হবে। নদী থেকে উঠে আসা সতেজ-নির্মল বাতাস আর সবুজের অপার সৌন্দর্য আপনার প্রাণকে করে তুলবে নির্মল আর আনন্দময়। শহরের কংক্রিটের জঞ্জাল থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধ সান্নিধ্য পাওয়ার এর চেয়ে আর ভালো উপায় হয়না। একটানা বয়ে চলা বাতাসে নিজেকে সকল ক্লান্তি থেকে ভারমুক্ত মনে হবে। তাই ঈদের ছুটির যে কোনো এক দিন চলে যান পরিবারসহ কিছুটা সময় কাটিয়ে আসুন প্রকৃতির এই অপার মাধুর্যে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার গুলিস্তান থেকে দোয়েল, স্বদেশ কিংবা বোরাকের এসি বাসে করে মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা নামতে হবে। গুলিস্তান থেকে উপরোক্ত বাস গুলোর ভাড়ার পরিমান যথাক্রমে ৪৫, ৪০ এবং ৫০ টাকা। মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা থেকে ব্যাটারি চালিত অটোতে কিংবা রিকশায় করে দশ থেকে ত্রিশ টাকা ভাড়ায় পানাম নগরীতে যেতে পারবেন। এর পর সেখান থেকে মায়াদ্বীপ যেতে চাইলে সিএনজি করে বৈদ্দ্যোর বাজার যেতে হবে। সেখান থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর ট্রলার ছাড়ে। ভাড়া নেবে দশ টাকা। তবে নিরাপত্তার জন্য সবসময় সতর্ক থাকবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে

Best Electronics
Best Electronics