ঢাকা, রোববার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ১১ ১৪২৫,   ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪০

একটি ফোঁটা’র গল্প

খুবি প্রতিনিধি

 প্রকাশিত: ২১:০৩ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২২:৪৯ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

২৭ জুন ২০১৭। একটি তারিখ, একটি দিন। যেটি সারা বাংলাদেশ মনে না রাখলেও বাগেরহাটের কচুয়া গ্রামের বাসিন্দারা ঠিকই মনে রেখেছে। কেনই বা মনে রাখবেনা? এলাকার বিপদে আপদে তো তারাই ছুটে এসেছে বারবার।

“হ্যালো, সেতু ভাইয়া বলছেন? জ্বি বলছি...ভাইয়া আমার বিবি প্রেগন্যান্ট, জরুরী তিন ব্যাগ এবি পজেটিভ রক্ত লাগবে ভাইয়া। আপনাদের তো একটি সংগঠন আছে দয়াকরে একটু জোগাড় করে দেন না ভাইয়া”।

যে সংগঠনের প্রতি এলাকাবাসীর এত বিশ্বাস এবং ভালোবাসা তার নাম “ফোঁটা” এবং যিনি এর স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজেদুল ইসলাম সেতু। এক বছর বয়সী ফোঁটা’র কার্য্যক্রম শুধু রক্তদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নেও অবদান রেখেছে চোখে পড়ার মত।

টিনশেড ছাউনি দিয়ে দুটি রুম। রুমে দুইটা হোয়াইট বোর্ড। বাইরে সাঁটাই করা ‘ফোঁটা শিক্ষালয়’। সেখানে কথা হয় ফোঁটা’র স্বপ্নদ্রষ্টা সাজেদুল ইসলাম সেতুর সাথে, ‘আমরা শুধুমাত্র রক্তদানে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এলাকার উন্নয়নেও একটু একটু করে অংশ নিচ্ছি। এই যে দুটি রুম দেখছেন এটা স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের ক্লাসরুম। আমরা প্রতি সকালে ফোঁটা’র ক্লাস এখানে নিয়ে থাকি। এখানে প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের খুব কম খরচে পাঠ দান দেওয়া হয়। এটা শুধু নামেমাত্র নেয়া হয় যাতে শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে না বলতে পারেন যে তারা ফ্রি পড়ে মানুষ হয়েছেন।

এখানে মোট ৩২ জন শিক্ষার্থী আছে এবং কোচিং কাম অফিসটা দেখভাল করার জন্য সার্বক্ষণিক দায়িত্বে আছে এলাকার ৫ কলেজ শিক্ষার্থী।

শুধু কি এলাকার মানুষের রক্ত জোগাড় করে... প্রশ্ন শেষ না হতেই পাশের থেকে ফোঁটা’র সদস্য বাবুল বলেন- “কি বলেন ভাইয়া? আমরা এ পর্যন্ত ৪৪ জনকে রক্ত দিয়েছি। খুলনা শহরে দিয়েছি ৬ ব্যাগ এবং জেলা শহর ও স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে দিয়েছি ৩৮ ব্যাগ। আমি নিজেই দিয়েছি দুইবার। আমরা কখনো গরীব, ধনী বিচার করে রক্ত দেই না, মানুষের রক্ত লাগবে এই ভেবে আমরা রক্ত দিয়ে দেয়”।

এই পর্যন্ত কি কি কাজ করেছেন জানতে চাইলে ফোঁটা’র সদস্য রবি বলেন, “গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সাহায্য, বিভিন্ন বই যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বই কিনতে পারছে না তার বই কিনে দেওয়া, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি কাজ ইতোমধ্যে কাজ করেছি এবং আগামীতে একটি লাইব্রেরী করার ইচ্ছা আছে। আমাদের নিজস্ব জায়গা পেলেই সেখানে লাইব্রেরীর কাজটা আগে শেষ করবো”।

এত টাকা তাহলে কোথার থেকে পান প্রশ্ন করতেই সেতু নিজেই উত্তর দিলেন, “ফোঁটা’র জন্য আমরা নিজেদেরকে উৎসর্গ করে দিয়েছি, প্রতি মাসে আমাদের নির্দিষ্ট একটা চাঁদা ধার্য্য করা আছে সেখান থেকেই আসে সব টাকা আর কোচিং থেকে যে টাকা আসে তা আমরা শিক্ষার্থীদের চকলেট কিনে দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেই। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করতে আসে এবং ভালো রেজাল্টও করে”।

এলাকায় নতুন করে জাগরণ সৃষ্টি করা এই সংগঠন অভিভাবকদেরও প্রশংসা কুঁড়িয়েছে।  স্থানীয় জয়নাল আবেদীন বলেন, এলাকার শিক্ষিত ছেলেরা যে কাজ করছে তা অবশ্যই ভালো কাজ। আমাদের এলাকার সুনাম অনেক ছড়িয়েছে। এর জন্য আমরা নিজেদের গর্বিত মনে করি। আমরা যা পারিনি তা তারা আজ বাস্তবে করে দেখিয়েছে। তাদের জন্য শুভ কামনা রইলো।

শুভদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, এলাকার উন্নয়নে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। আমি চেষ্টা করবো আগামী বাজেটে তাদের কিছু সহযোগিতা করা যায় কিনা। তাদের একটা স্থায়ী অফিসের জন্যও আমরা একটা জায়গা দেখেছি খুব শিগ্রই জায়গাটা হস্তান্তর করবো।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ