Alexa এই হ্রদের গভীরে ঘুমিয়ে আছে এক সুপ্রাচীন নগরী

ঢাকা, শুক্রবার   ১৫ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ৩০ ১৪২৬,   ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

এই হ্রদের গভীরে ঘুমিয়ে আছে এক সুপ্রাচীন নগরী

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৭ ৪ নভেম্বর ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আদিমকাল থেকেই মানুষ তাদের জীবনযাপন সহজ করতে তৈরি করেছে অনেক কিছুই। সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে এখনো অনেক কিছুই কালের সাক্ষী হয়ে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন জায়গায়। আবার আধুনিকতার পথে এগোতে গিয়ে চাপা পড়ে গেছে অনেক ইতিহাস। বিভিন্ন সময় নতুন কিছু গড়তে ভাঙ্গতে হয়েছে পুরোনো স্মৃতিকে।

তেমনই ১৭০০ বছরের প্রাচীন নগরী সভ্যতার বিবর্তনে তলিয়ে আছে বাঁধের নিচে। দাক্ষিণাত্যে সাতবাহন বংশের পতনের পরে ক্ষমতায় এসেছিল ইক্ষ্বাকু বংশ। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বশিষ্ঠপুত্র চামতামুলা। যদিও রামায়ণের ইক্ষ্বাকু বংশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ইক্ষ্বাকু বংশের লোকেরা রামচন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য এই উপাধি নিয়েছিল।

 নাগার্জুনসাগর বাঁধআজকের অন্ধ্র ও তেলঙ্গনার গুন্টুর, কৃষ্ণা ও নালগোণ্ডা অঞ্চলে ২২৫ থেকে ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে বিস্তৃত হয়েছিল ইক্ষ্বাকু বংশের শাসন। এখন যেখানে নাগার্জুনসাগর হ্রদ, সেখানেই ছিল তাদের রাজধানী। কৃষ্ণা নদীর ডান তীরে তাদের রাজধানীর প্রাচীন নাম ছিল বিজয়পুরী। সুপরিকল্পিত এই শহরে ছিল বিশাল রাজপ্রাসাদ। সাধারণ মানুষের বাড়ি, মন্দির, দোকান-বাজার, আস্তাবল, স্নানাগার-সহ নাগরিক সভ্যতার সব অংশ। রোমান সাম্রাজ্যের মতো অ্যাম্ফিথিয়েটারও ছিল এই নগরীতে।

সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে যে সোনার গয়না পাওয়া গিয়েছে তাতে একটি কণ্ঠহারও রয়েছে। যার লকেট হল রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রা। গ্রিক দেবতা দিয়োনিসাসের ভাস্কর্য খোদাই করা একটি স্তম্ভোও পাওয়া যায় সেখানে। ফলে ওই দুই সভ্যতার সঙ্গে বিজয়পুরীর যে যোগাযোগ ছিল, তা স্পষ্ট।

নাগার্জুনসাগর বাঁধইক্ষ্বাকু বংশ ছিল শৈব। বিজয়পুরীতে কার্তিকেয়-সহ অন্যান্য হিন্দু দেবতার মন্দির ছিল। পাশাপাশি পাওয়া গিয়েছে বৌদ্ধ চৈত্য ও স্তূপের নিদর্শনও। সবমিলিয়ে এই সাম্রাজ্যের রাজধানী বিজয়পুরী যে বর্ধিষ্ণু ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। তবে কোনো এক অজানা কারণে রহস্যজনক ভাবে এই নগরী ও ইক্ষ্বাকু বংশের শাসন ধ্বংস হয়ে যায়।   

ইতিহাসের অমূল্য এই সম্পদ নিয়ে কয়েকশো বছর ধরে বিজয়পুরী চলে গিয়েছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের আড়ালে কেউ তার খোঁজ রাখত না। এটি পুনরাবিষ্কার হয় ১৯২৬ সালে। তখন ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনে। ১৯২৭ থেকে ১৯৩১  পর্যন্ত সেখানে অল্পবিস্তর  খননকার্য হলেও তা বেশিদূর আগায়নি। পরে পঞ্চাশের দশকে এসে কেন্দ্রীয় সরকার আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটি-কে দিয়ে বিস্তারিত খনন কাজ চালায়। এর ফলে শুধু ইক্ষ্বাকু বংশই নয়, আদি প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত সেখানে থাকা জনপদের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেসব বাঁধের নিচে হারিয়ে গেলেও উদ্ধার হওয়া ঐতিহাসিক জিনিস সংরক্ষণ করে রাখা আছে নাগার্জুনকোণ্ডায়।

নাগার্জুনসাগর বাঁধনাগার্জুনসাগর হ্রদের উপর একফালি দ্বীপ হল নাগার্জুনকোণ্ডা। সেখানেই রাখা আছে ইক্ষ্বাকু বংশের কিছু স্থাপত্যের নিদর্শন। নাগার্জুনকোণ্ডায় হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের সামান্য কিছু নিদর্শনই সংরক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। সেখানে যা সংরক্ষিত হয়েছে, সেটা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। বাকি সব গ্রাস করেছে কৃষ্ণা নদীর জলরাশি। নাগার্জুনসাগরের গভীরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে যদি সন্ধান চালানো হয়, দেখা যাবে সেখানে অপেক্ষায় আছে অতীতের সমৃদ্ধ সভ্যতা। পরবর্তী গবেষণায় খুলে যেতে পারে ইতিহাসের গোপন অধ্যায়ের দরজা।

নাগার্জুনসাগর বাঁধসে রকমই একটি নিদর্শন নাগার্জুনসাগর বাঁধ। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর এবং তেলঙ্গনার নালগোণ্ডা জেলার মধ্যে এই বাঁধের তৈরি করতে লেগেছিল দীর্ঘ ১২ বছর। কৃষ্ণা নদীতে এই বাঁধ তৈরির জন্য সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯০৩ সালে। হায়দরাবাদের নিজামের নির্দেশে কাজ করেছিলেন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়  ১৯৫৫ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আমলে। শেষ হয় ১৯৬৭ সালে। ১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধের পানির ধারণক্ষমতা ১১৪৭ কোটি ২০ লক্ষ ঘনমিটার। সেচ, জলবিদ্যুত প্রকল্প-সহ বহুমুখী দিকে বিস্তৃত এই বাঁধ দেশের সবুজ বিপ্লবের প্রধান কারিগর।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ