Alexa এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজ কাম্য নয়

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজ কাম্য নয়

 প্রকাশিত: ১৮:১৭ ১৭ জুলাই ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে যেসব কাণ্ড প্রতিনিয়ত ঘটছে, সেসব কাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কি সত্যিই সভ্যতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি অসভ্যতা আর বর্বর আদিম যুগে ফিরে যাচ্ছি- এমন প্রশ্ন উঠে আসা অযৌক্তিক নয়। 

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। সেই ক্ষত শুকানোর আগে বরগুনায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হলো রিফাত শরীফকে। ৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ চাঁদ উদ্যানে এক যুবককে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় কিশোর-তরুণেরা। পরদিন বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ রেলস্টেশনে অজ্ঞাত যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১২ জুলাই শুক্রবার রাতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় সিরাজুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ঘটে চলেছে ধর্ষণের মতো পাশবিক ঘটনা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলতে গেলেই এ নিবন্ধ দীর্ঘতরই হবে। এখন প্রশ্ন, দেশে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? ধীরে ধীরে আমাদের সমাজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে; এই ক্রমক্ষয়িষ্ণু সমাজই কি আমরা প্রত্যাশা করেছি?
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে জুন এই ছয় মাসে শুধু বখাটেদের হাতে ১১০ নারী ও ৭ জন পুরুষ লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে খুন হয়েছেন ৩ নারী ও ২ পুরুষ। একই সময়ে ধর্ষণ ও গণধর্ষণে ২৮ জন নিহত, ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা, ১১টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

একই সময়ে ৬৯২টি শিশু নির্যাতন, ৩৯২ শিশু ধর্ষণ এবং ২০৩ শিশু হত্যা করা হয়েছে। এই ছয় মাসে বিচারবহিভর্‚ত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ/ আটক ও রহস্যজনক নিখোঁজ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, হত্যার মতো অনেপ্রণৃশংস ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে গত ৫ বছরে (২০১৪-২০১৮ সাল) নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ২৭৪ নারী ও কন্যাশিশু। এ সময় ধর্ষিত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮০ জন, গণধর্ষণের শিকার হন ৯৪৫ জন, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৪৯ জনের, আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৩০ নারী-শিশুকে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত ৫ বছরে যে সংখ্যক নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই সংখ্যার প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ২ হাজার ৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতিত হয়েছে গত ৬ মাসে (জানু-জুন)। এই সময়ে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। এ ছাড়া এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, পাচার, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তো ঘটছেই। দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান এসব নির্যাতনের ঘটনার বিচার হয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানে তারতম্য থাকা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু ঘটনাগুলো তো অস্বীকার করা যাবে না।  

অস্বীকার করবো না যে, আমাদের উন্নয়ন ঘটেনি। স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছরে এসে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই দৃশ্যমান উন্নয়ন রয়েছে। এই উন্নয়নের বিপরীতে দেশের নাগরিকরা যদি উৎকণ্ঠিতই থাকে তাদের সন্তানদের নিয়ে, তাহলে এই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কী- একজন অভিভাবক হিসেবে এমন প্রশ্ন অবান্তর হতে পারে কি? এটাও বলার সুযোগ নেই যে, সরকার তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ দমনে সোচ্চার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য আছে বলেই জঙ্গিবাদের হাত থেকে দেশ কিছুটা হলেও মুক্তি পেয়েছে। এটা সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবেও বিবেচিত। সরকার তৎপর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর, এরপরও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিনিয়ত যেসব পাশবিকতার চিত্র উঠে আসছে তা এই দেশে আগে কখনও দেখা যায়নি, আর এটাই উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর অবসানই প্রত্যাশিত। 

দেশে অপরাধ দমন নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা গণমাধ্যমে উঠে আসছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু অপরাধের খবর মানুষের নজরে আসছে। এতে অনেকে ভীত হচ্ছে, আবার অনেকেই নানা ধরনের ক্ষোভ ও হতাশায় নিমজ্জিত। তাদের কাছে এটাকে অনেকটা যেন নিয়তির বিষয় হিসেবে দেখে যেতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব অপরাধ মানুষকে বিচলিত বোধ করতেও ভ‚মিকা রাখছে। মনুষ্যসৃষ্ট অসংখ্য ঘটনা সাধারণ নিরীহ নিরপরাধ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত ভয়, আতঙ্ক, গ্রাস করে চলছে। ফলে শান্তিতে বসবাস করা, কাজ করা কিংবা জীবনযাপন করা, যেন এক প্রতিনিয়ত চোখে চোখ রেখে চলা জীবন। কোন দিক থেকে কখন কে কার দ্বারা আক্রান্ত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিংবা মারা যেতে পারে- এর যেন প‚র্বপ্রস্তুতি কারো জন্যই থাকে না। কথা হচ্ছে, এভাবে চলতে চলতে আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা পাশবিকতার কথা শুনে ক্ষুব্ধ হই। বিচারও চাওয়া হয়। কিন্তু কোথায় বিচার হয়, কোথায় দেরি হয়, জানা নেই। অতিস¤প্রতি নারায়ণগঞ্জে একজন স্কুলশিক্ষক ও একজন মাদরাসা অধ্যক্ষ যে প্রতারণার মাধ্যমে ছাত্রীদের ধর্ষণে বাধ্য করত- এমন বিষয়টি কি আমরা ধর্ষণের অভিজ্ঞতার ইতিহাসে কল্পনা করতে পেরেছি? পারিনি। তাহলে, কেন এমন লজ্জাজনক প্রবণতা কেন বাসা বাঁধছে মানুষের মনে- তার সুলুকসন্ধান কি জরুরি নয়? 

মনে রাখা দরকার, আমরা একটি সংকটকাল অতিক্রম করছি। অর্থাৎ সমাজ বিকাশের ইতিহাস যারা কমবেশি জানে, তারা এটি বুঝতে পারে যে একটি সমাজব্যবস্থা যখন উন্নয়নের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপের দিকে প্রবেশ করে, তখন তাকে বেশ কিছু অবিশ্বাস্য সমস্যার যন্ত্রণা অতিক্রম করতেই হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অনেকেই সমাজবিজ্ঞানের এই বাস্তবতার অভিজ্ঞতাকে মনে রাখতে চায় না কিংবা বিশ্বাসও করে না। সমাজ ও রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন, তারা যদি এই যন্ত্রণাগুলো সম্পর্কে কমবেশি অবহিত কিংবা জ্ঞাত থাকেন এবং এই সময় যেসব অস্বাভাবিক প্রবণতায় সমাজ আক্রান্ত হতে পারে, সেগুলোর প্রতিরোধম‚লক ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে রাখেন; তাহলে এই যন্ত্রণা প্রশমনের ব্যবস্থা কমবেশি কার্যকর হতে পারে। আমরা এখন উন্নয়নশীল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় চলছি। গত প্রায় চার-পাঁচ দশক ধরে আমাদের এই যাত্রা বেগবান হচ্ছে। রাষ্ট্রে আইন, বিধি-বিধানও আছে। তারপরও দেশে-সমাজে যখন নানামুখী অপরাধ বাড়ছে বলে প্রতিনিয়ত পরিসংখ্যানে উঠে আসছে, তখন বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া শ্রেয়।  

সুস্থ ও কল্যাণকর একটি জীবনব্যবস্থা, সমাজকাঠামো গড়ে তোলা না গেলে, সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা না গেলে; সহজভাবেই বলা যেতে পারে, দেশের এই উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসবে না। এ জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের মূল সংকট অনুধাবন, বিশ্লেষণ এবং শনাক্ত করেই তা থেকে উত্তরণে কার্যকর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, একজন মানুষ যখন বিধিবদ্ধ নিয়ম ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, তখন তার জীবন নিয়মবহির্ভ‚তভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে এখন যে বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আধুনিকতার নিয়মনীতি, আইন-কানুন, শৃঙ্খলা ইত্যাদিকে দৃঢ়ভাবে কার্যকর করা। আর এভাবেই আমাদের অপরাধপ্রবণ সমাজ একসময় কল্যাণমুখী হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর