Alexa এই কোম্পানি সর্বোচ্চ বেতন দিয়ে কর্মীকে রাখতো রাজার হালে

ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

এই কোম্পানি সর্বোচ্চ বেতন দিয়ে কর্মীকে রাখতো রাজার হালে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৯ ২ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিকাশের ইতিহাস একটি বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। একটানা দুইশত বছর ধরে তারা বাংলায় ছড়ি ঘুরিয়েছে। চরম অনিয়ম ও দুর্নীতি করে লোক ঠকানো এমনকি স্বার্থের জন্য অনেককে হত্যা পর্যন্ত করেছেন তারা।

ইংরেজ বেনিয়ারা সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক সম্ভার নিয়ে ভারতবর্ষে আগমন করেন। পরবর্তীতে বাণিজ্য রাজনীতির লোভে তারা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন। ১৬০০ সালে ২১৮ জন ইংরেজ বণিক নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের নিকট থেকে ১৫ বছরের সনদ নিয়ে ভারতে বাণিজ্য করতে আসে ইংরেজরা। অতঃপর এ কোম্পানি সুমাত্রা, মালাক্কা প্রভৃতি অঞ্চলে মসলার ব্যাবসা শুরু করে। 

কর্মক্ষেত্র হিসেবে যেমন ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী বহুজাতিক কর্পোরেশন কোম্পানি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। ১৬০০ সালের ৩১ জুলাই ব্রিটেনের রানি প্রথম এলিজাবেথ এটিকে রয়্যাল চার্টার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এছাড়া ভারতের বর্তমান মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতার উন্নয়নে এ কোম্পানির বড় ভূমিকা ছিল।

জানা যায়, তৎকালীন সময়ে কর্মী সংখ্যার দিক থেকে ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল সবার উপরে। দেশীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি তারা হাজারো বিদেশি কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিল। কর্মক্ষেত্র হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুবিধা নিয়ে এ আয়োজন-

ঘুমানোর সুযোগ: বর্তমানে বিশ্বের অনেক কোম্পানি কর্মীদের অফিসে ঘুমানোর সুযোগ দিচ্ছে। এই ‘অফার’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক আগেই দিয়েছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিখাবারের ব্যবস্থা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান কার্যালয়সহ অন্যান্য অফিস ও কারখানায় কর্মীদের খাবার অত্যন্ত যত্নসহকারে রান্না করা হতো।কর্মীদের নিজ দেশীয় খাবারের স্বাদ দিতে ইংরেজ, পর্তুগিজ ও ভারতীয় তিন রাঁধুনি রান্না করতেন। খাবার হিসেবে থাকতো পোলাও, পাখির মাংস, গরুর মাংসের রোস্ট। ছুটির দিনে থাকতো ময়ূরের মাংস, খরগোশের মাংস, হরিণের মাংস। যা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

ওপেন বারের ব্যবস্থা: কর্মীদের দুপুর ও রাতের খাবারে মদ পরিবেশন করতো। যারা ব্রিটেনের বাইরে কাজ করতেন, তারা প্রচুর পরিমাণ মদ সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারতেন। এছাড়া লন্ডনে অফিসের পাশাপাশি কর্মীদের জন্য বারের ব্যবস্থা ছিল।

কোম্পানি কর্তৃক কার্ডের ব্যবস্থা: বর্তমানে অনেক কোম্পানি তাদের কর্মীদের কার্ড দিয়ে থাকে যা দিয়ে কর্মীরা ভালো রেস্তোরাঁয় ডিনার করার সুযোগসহ আরো বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে থাকে৷ তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতেও এই কার্ডের সুবিধা ছিল। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের উপহারও দেয়া হতো।

বেতন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক কর্মকর্তার বেতন ছিল ব্রিটেনের সর্বোচ্চ বেতনভুক্তদের তালিকায়। কোম্পানিতে যে যত বছর চাকরি করতেন, সে অনুপাতে বেতন বাড়ানো হতো। ১০ বছরের বেশি সময় চাকরি করলে পেনশনের ব্যবস্থাও ছিল। ৪০ বছর চাকরি করলে চাকরি জীবনের বেতনের চারভাগের তিনভাগ পরিমাণ এককালীন অর্থ নিয়ে অবসরে যেতে পারতেন।

ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিকাশের ইতিহাস

বাংলায় ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর ক্ষমতা লাভের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। প্রথমে বাণিজ্যিক সূত্র ধরে আগমন এবং ধীরে ধীরে আর্থ- সামাজিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করণ। সর্বশেষ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। ১৬০৮ খ্রিঃ ভারতে কুঠি স্থাপনের লক্ষ্যে ক্যাপ্টেন হকিন্স রাজা প্রথম জেমসের একটি সুপারিশপত্র নিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর এর সঙ্গে দেখা করে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে ভারতীয় বণিক সম্প্রদায় ও পর্তুগীজদের বিরোধিতার কারণে তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। 

হাজারো বিদেশি কর্মী নিযুক্ত ছিলো ইংরেজদের এই কোম্পানিতেফলশ্রুতিতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দু’টি জাহাজ ক্যাপ্টেন বেস্টের নের্তৃতে পর্তুগীজ নৌবহর বিদ্ধস্থ করে সুরাট বন্দরে অবস্থান করে। ক্যাপ্টেন বেষ্টের সাফল্যে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৩ সালে এক ফরমান দ্বারা সুরাটে ইংরেজদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি প্রদান করেন। ১৬৫১ সালে বঙ্গদেশের সুবেদার শাহ সুজা বাৎসরিক তিন হাজার টাকা শুল্ক প্রদানের বিনিময়ে ইংরেজদের এদেশে অবাধ বাণিজ্য করার সুযোগ প্রদান করেন। ১৬৭২ সালে আওরঙ্গজেব কর্তৃক নিযুক্ত বাংলার গভর্নর শায়েস্তা খান ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। এরপর থেকেই একেক এলাকা দখল করে ইংরেজদের ব্যবসা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য

সুবাদার আজিমুশশানের সময়ে কোম্পানি পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র কলকাতা হতে কোম্পানি স্থানীয় সরকারের উপর কখনো চাপ সৃষ্টি করে, বল প্রয়োগ করে এবং কখনো ঘুষ ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে বাণিজ্য করা শুরু করে। সক্ষম হয়। তাদের এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখে মুর্শিদকুলী খানের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এরপর আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার পূত্র বাহাদুর শাহ্‌ এবং পরবর্তীতে ফররুখ সীয়ার দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। 

এ সময় ইংরেজরা ফররুখ শিয়ার কাছ থেকে একটি ফরমান ও দুটি হুকুম আদায় করে বাণিজ্য বিষয়ে বিশেষ সুবিধা ও সনদ লাভ করে। এটি বাংলাদেশের ইংরেজ বাণিজ্যর সূত্রপাত হিসেবে বিবেচিত। এ ফরমান বলেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতার পার্শ্ববর্তী ৩৮টি গ্রাম ক্রয়ের অনুমতি লাভ করে। মুর্শিদকুলী খানের পর আলীবর্দী খানের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ বাঁধে। তিনি ইংরেজদের অবাধ বাণিজ্য ও দূর্গ নির্মাণের ঘোর বিরধীতায় ছিলেন। পরে এক সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে তিনি ইংরেজদের দমিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। আলীবর্দীর উত্তরাধিকার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার শাসন আমলে ইংরেজরা শুধু সংঘর্ষেই লিপ্ত হননি ক্ষমতাও কেড়ে নেন। 

সিরাজের শাসনামলে ইংরেজরা ঔদ্ধত্বের সীমা ছাড়িয়ে যায়। বাংলার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়। বেনীয়া হিন্দু গোষ্ঠী ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মীরজাফরের সাহায্যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। মাদ্রাজ থেকে ক্লাইভ ও ওয়াটসন কলকাতা পুনরুদ্ধার করেন। অন্যদিকে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেন উর্মিচাদ, জগতশেঠি, রায়দুর্লভ, রাজবল্লব। এ ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ-উদ-দৌলা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন। পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।

১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্ধ্মান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জেলার জমিদারি লাভ করে। এভাবে চার বছর কোম্পানি দেশের সম্পদ সম্বন্ধে ধারণা লাভ করার পর ১৭৬৫ সালে ক্লাইভ সমগ্র বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সনদ লাভ করে। বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশেমকে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশের সার্বভৌম ক্ষমতার নিরুংকুশ অধিকারী হয়। এভাবেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে দুইশত বছরের জন্য আধিপত্য বিস্তার করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস