Alexa উগ্রতা নয়, বিনয়-নম্রতা ও মধ্যপন্থাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য (শেষ পর্ব)

ঢাকা, শুক্রবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১৫ ১৪২৬,   ০৪ রজব ১৪৪১

Akash

উগ্রতা নয়, বিনয়-নম্রতা ও মধ্যপন্থাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য (শেষ পর্ব)

মুহম্মদ রফিকুর রহমান  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৩৯ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ (সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬) -ছবি: সংগৃহীত

‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ (সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬) -ছবি: সংগৃহীত

নবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তিই মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (সহিহ মুসলিম)।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজে বিনয় অবলম্বনকারী, তিনি বিনয়কে পছন্দ করেন। তিনি বিনয় অবলম্বনকারীকে এত বেশি দান করেন যা কোনো লোককে দান করেন না। (সহিহ মুসলিম)।

সর্বোপরি একজন মানুষের গুণ হলো তার ঈমান খাঁটি ও শির্কমুক্ত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,খাঁটি মুসলমান (মুমিন) ওই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। মুমিন বান্দার চলন, বলন, আচার-আচরণ এবং তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট সবাইকে তার প্রতি শ্রদ্ধার আসনে বসায়। মুমিন কটু কথা বলতে জানে না, কুদৃশ্য দেখে না, মিথ্যা বলে না। অসততা, দুর্নীতিমুক্ত থেকে অবনত মস্তকে সরল মনে এবং নিরহকারী হয়ে জীবন কাটায় ও পথ চলে।

অহংকার, রাগ, কলহ-বিবাদ পরিহার করে চলাটাই মুমিনের গুণ হওয়া উচিৎ। অহংকারীকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। রাগকে হারাম বলা হয়েছে। অহংকারীদে জন্য মহান আল্লাহর সাবধান বাণী,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

‘নিশ্চয়ই যারা অহংকার করে আমার ইবাদত হতে বিরত থাকে, শীঘ্রই তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সূরা: আল মুমিন, আয়াত: ৬০)।

কোনো অহংকারীকে আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন না। সূরা লুকমান এ অহংকার সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা লুকমান (আ.) এর বয়ানে তার পুত্রের প্রতি উপদেশ দিয়েছেন এভাবে,

وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

‘এবং মানুষের প্রতি অহংকারভরে তোমার গাল ফিরাবে না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহংকারীকে ভালবাসেন না।’ (সূরা: লুকমান, আয়াত: ১৮)।

‘আব্দুল্লাহ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে বিন্দু পরিমান অহংকার রয়েছে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে না। জনৈক ব্যক্তি বললেন, (হে আল্লাহর রাসূল(সা.)!) প্রত্যেক ব্যক্তিই পছন্দ করে যে, তার পোশাক ও জুতা  সুন্দর হোক। রাসূল (সা.) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বাধিক সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। অহংকার হলো, সত্য বলার ক্ষেত্রে অহমিকা পোষণ করা এবং মানুষকে অবজ্ঞা করা। (সহিহ মুসলিম)।

রাগ বা ক্রোধ মানুষকে বর্বর করে ফেলে। রাগের কারণে মারা-মারি, কলহ-বিবাদ এমনকি খুনা-খুনি পর্যন্ত সঙ্ঘটিত হয়ে যেতে পারে, এ কারণে রাগকে আল্লাহ তায়ালা মমিনের জন্য হারাম করেছেন। ক্রোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও ধৈর্য মানুষের জন্য সাফল্য বয়ে আনে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনেই উত্তম জীবন। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা বীরত্বের লক্ষণ।

রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রকৃত শক্তিধর সে নয় যে অন্যকে কুস্তিতে ধরাশায়ী করে বরং প্রকৃত শক্তিধর সে ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহিহ বোখারী ও সহিহ মুসলিম)।

কলহ-বিবাদ, মারামারি, ক্রোধ, খুনাখুনি- এগুলো সংঘটিত হয় কখন? যখন স্বার্থের প্রশ্ন এসে যায়। লোভ-লালসা,হিংসা-বিদ্বেস মানুষকে একে অন্যের সঙ্গে হানাহানির পর্যায়ে নিয়ে যায়। স্বার্থ ত্যাগ করে লোভ সম্বরণ করে চলতে পারলেই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অজৃজন সম্ভব।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে জনমণ্ডলী! তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, এই জুলুম কেয়ামতের দিন জুলুম বা অন্ধকারের কারণ হবে। হে লোক সকল! তোমরা কার্পণ্য ও লোভ-লালসাকে ভয় করো, এটা এমন একটা জিনিস যা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এরই কারণে তারা পরস্পরে খুনা-খুনি করেছে এবং হারামকে হালাল করে নিয়েছে। (সহিহ মুসলিম)।

দ্বীন পালনে আজীবন একমাত্র রাসূল (সা.) এর নির্দেশিত পন্থায় সব আমল চালিয়ে যেতে পারলেই ইহকাল ও পরকাল- উভয়কালেই মুমিন বান্দার জন্য প্রশান্তি রয়েছে এবং পরকালের প্রশান্তি তো অনন্তকাল ধরে চলবে, যেখানে আর কখনো মরতে হবে না।

সুতরাং যথাযথভাবে সহিহ-সুন্নাহ অনুসরণে একনিষ্ঠাভাবে কোনোরকম তারতম্য না করে দ্বীন পালনে ব্রতী হতে
হবে। মহান আল্লাহর হুকুম পালনে যারা গাফেল, যারা মুশরিক, অলস নির্বোধ তাদের কাছে ইবাদত-বন্দেগী নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে পালন করা খুবই কঠিন মনে হতে পারে। মহান আল্লাহকে যারা আন্তরিকভাবে ভয় করে, কেয়ামতের কঠিন ময়দানে বিচারের দিনের ফয়সালার প্রতি যারা বিশ্বাস রাখে তাদের কাছে এ সব আমল-ইবাদত একটুও কঠিন মনে হয় না। মুমিনের অন্তর মসজিদের দিকে সজাগ থাকে, সর্বদা মনের মধ্যে জাগরুক থাকে যে, আল্লাহ তায়ালা তার সব ধরনের কার্যকলাপ সর্বক্ষণ অবলোকন করেছেন। ফলে গর্হীত কাজ, ফাহেশা‘আমল ‘ইবাদত থেকে বিরত থাকে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَاسْتَعِينُواْ بِالصَّبْرِ وَالصَّلاَةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلاَّ عَلَى الْخَاشِعِينَ

‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর নিশ্চয়ই তা অবশ্যই কঠিন- বিনীতদের ছাড়া।’(সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ৪৫)।

নিজের কাজকে,‘আমল-ইবাদতকে অনাবশ্যক সুন্নাহ বহির্ভূত অতিরঞ্জন করে আরো কঠিন না করে সহজ সঠিকভাবে কোরআন ও সুন্নাহ মুতাবেক পালন করতে পারলে প্রকৃত মুমিনের কাছে কিছুই কঠিন মনে হবার কথা নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُواْ شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلاَّ لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلاَّ عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللّهُ وَمَا كَانَ اللّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ إِنَّ اللّهَ بِالنَّاسِ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

‘আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানব জাতির ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারো তোমাদের ওপর সাক্ষী। এবং আমি সেটিকে কিবলা বানিয়েছিলাম- যার ওপর তুমি ছিলে, কেবল যাতে আমি জেনে নিতে পারি (স্পষ্ট করতে পারি), কে রাসূলের অনুসরণ করে, (আর)
কে পেছনের দিকে (পূর্বাবস্থায়) ফিরে যায় এবং তা ছিল অবশ্যই কঠিন তাদের জন্য ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। আর আল্লাহ এমন নন যে তিনি তোমাদের ঈমানকে নষ্ট করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের জন্য অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু।’(সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩)।

মহামহিম আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার প্রতি অতীব করুনাময় বলেই কোনো ইবাদতকে কঠিন বা ভারী করেননি। পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সাওয়াব পাঁচ ওয়াক্ত আদায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ তিনি দেবেন। সফরের সময় সালাত কসর করা যায়, অন্য সময়ে সিয়াম পালনের সুযোগ দিয়ে সফরে তা না রাখলেও চলে।

নারীদের নাপাকী-সময়ের সালাত মওকুফ করে দিয়েছেন তিনি। সব ধরনের ইবাদতকে পালনকারীর নিজের জন্যই কল্যাণকর করেছেন আল্লাহত তায়ালা। শুধু তাঁর কাছে আন্তরিকভাবে কায়মনোবাক্যে চাইতে হবে এবং প্রতিজ্ঞা করতে হবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তাওবাহ করতে পারলে পাহাড় পরিমাণ পাপ-রাশি দয়াময় আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেবেন বলে তিনি ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সাধ্যতীত ভারী কোনো কিছু চাপিয়ে দেবার নন।

সুতরাং আসুন! আমরা সবাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে শপথ করি-উগ্রতা, সন্ত্রাস, জুলুম এর মতো উদ্ধত পথ, অন্ধকারের পথ থেকে ফিরে আসি। অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসি। অসীম দয়াময় মহান আল্লাহর কাছে প্রাণভরে তাঁরই প্রেরিত বাণী আউড়িয়ে বলি,

 وَقَالُواْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

‘এবং তারা বলে আমরা শুনলাম এবং আমরা আনুগত্য করলাম, আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের প্রতিপালক! এবং গন্তব্যস্থল আপনারই দিকে।’ (সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫)

আরো বলি,

لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لاَ تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلاَ تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلاَ تُحَمِّلْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلاَنَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, আপনি (সে জন্য) আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেভাবে আপনি আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হে আমাদের প্রতিপালক! যার সামর্থ্য আমাদের নেই, তা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না এবং আমাদেরকে মার্জনা করুন, আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনি আমাদের প্রভু (রক্ষক)। অতএব, কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আপনি আমাদেরকে সাহায্য করুন।’ (সূরা: আল বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬)। আমিন।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে