ঈদ-আনন্দ উৎসবে আনন্দের সীমা-পরিসীমা 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ঈদ-আনন্দ উৎসবে আনন্দের সীমা-পরিসীমা 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৯ ২৩ মে ২০২০  

ঈদ একটি ইবাদত। আনন্দ ও ফূর্তির মাঝেই এ ইবাদত করা যায়।

ঈদ একটি ইবাদত। আনন্দ ও ফূর্তির মাঝেই এ ইবাদত করা যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের দান করেছেন ঈদ। সারা মাস রোজা রাখার পর পুরস্কার দেয়ার জন্য একটা দিবসকে নির্ধারণ করেছেন। সে দিবসটা হলো ঈদের দিন।

ঈদ আরবি শব্দ। যার অর্থ ফিরে আসা। এমন একটি দিবসকে ঈদ বলা হয়, যেদিন মানুষ একত্রিত হয়। মিলিত হয়। এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে। আর দিবসটি ঘুরে ঘুরে আসে। রাব্বে কারিম বান্দাকে রহমত, নিয়ামত ও অনুগ্রহ দিয়ে বারবার ধন্য করেন। মাওলার দয়া ও ভালোবাসা পেয়ে বান্দারাও আনন্দ-ফূর্তি করে। আত্মীয়-স্বজনের নতুন উদ্যমে খবর নেয়। পাশে দাঁড়ায়।

রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় গেলেন, তখন মদিনাবাসীরা দু’টি দিবসে আনন্দ করতো। খেলাধুলা করতো। রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দু’টি দিনের কোনো তাৎপর্য আছে? মদিনাবাসীরা উত্তর করলেন, ‘আমরা জাহেলী যুগে এ দু’টি দিনে খেলা করতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ দু’দিনের পরিবর্তে এর  চেয়ে শ্রেষ্ঠ দু’টি দিন দিয়েছেন। তাহলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪)।

শুধু খেলাধুলা ও আমোদ-ফূর্তির যে দু’টি দিবস ছিলো, তা আল্লাহ তায়ালা নেয়ামতের মাধ্যমে পরিবর্তন করেছেন। বান্দার নেয়ামত হলো মাওলায়ে কারিমের কাছে থেকে কিছু অর্জন করা। তার নেয়ামত ও দানে সিক্ত হওয়া। তাই এ দিবসটিতে বান্দা তার স্রষ্টার শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে শালীন আমোদ-ফূর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করবে। তবেই মাওলায়ে কারিমের দেয়া ঈদ সার্থক হবে।

ঈদকে কেউ নেয়ামত হিসেবে নিয়েছেন। কেউ বা নিছক আমোদ-ফূর্তি হিসেবে নিয়েছেন। যারা তাকে নেয়ামত হিসেবে নিয়েছেন, তারা কতো ভাগ্যবান। ঈদের রাতে আমরা আমোদ-ফূর্তিতে কাটিয়ে দিই। অথচ হাদিসে এসেছে, এ ঈদের রাতে কেউ যদি জাগ্রত থাকে অর্থাৎ জেগে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত করবে, ওই দিন তার দিল জিন্দা থাকবে, যেদিন সমস্ত দিল মারা যাবে।’ এত গুরুত্ব ঈদের রাত! অথচ আমরা এ রাতে নানা পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ি। কেউ যদি রাত জেগে না থাকতে পারে, তাহলে এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করলেই সারারাত জেগে থেকে ইবাদত করার একটা সওয়াব পাবে। তাই জামাতের কদর করা। মূল্যায়ন করা। এ ব্যাপারে রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি তারা এশা ও ফজর নামাজের মধ্যে কী আছে তা জানতে পারতো, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দ ‘টি নামাজের জামায়াতে শামিল হতো। (বুখারি : ৬১৫)।

ফজরের নামাজ পড়ে আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে প্রস্তুতি নেবো ঈদের নামাজের। এ দিনের সুন্নতগুলো আদায় করবো। মেসওয়াক করবো। গোসল করবো। আলী রাযি. বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।’ নতুন জামা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামা পরবো। সুগন্ধি লাগাবো। মিষ্টি জাতীয় কিছু খাবো। ঈদুল ফিতরে মিষ্টি জাতীয় খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত। আর ঈদুল আজহাতে কিছু না খেয়ে যাওয়া সুন্নত। বুরাইদা রাযি. বলেন, ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহারের দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না। (সুনানে তিরমিযী- ৫৪৫)। তারপর ঈদগাহের দিকে যাত্রা করবো। তাকবীর বলে বলে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন (মুসতাদরাক: ১১০৬)।

পায়ে হেঁটে যাবো। এক পথ দিয়ে যাবো অন্য পথ ধরে আসবো। হাদিসে এসেছে, ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে পথ বিপরীত করতেন। (বুখারি-৯৮৬)। অর্থাৎ এক পথ দিয়ে যেতেন অন্যপথে ফিরে আসতেন। কোনো কারণ ছাড়া আরোহণে চড়বো না। রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন।

ঈদের নামাজের আগে কোনো নফল নামাজ নেই। রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিনে বের হয়ে দু’রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। এর পূর্বে ও পরে অন্য কোনো নামাজ আদায় করেননি। (বুখারি-৯৮৯)। তবে, নামাজের পূর্বে ফিতরা দেবো। আর ফিতরা বলা হয়, রমজান মাসের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে এবং অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদানের উদ্দেশ্যে ঈদের নামাজের পূর্বে নির্ধারিত পরিমাণ যে খাদ্য সামগ্রী বা টাকা দান করা হয়ে থাকে, তাকেই ফিতরা বলা হয়। অভাবীদের খোঁজ-খবর নেবো। তাদের খাবার খাওয়াবো। সম্ভব হলে তাদের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করবো। এটাই ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট। এটাই হওয়া ঈদের আনন্দ।

ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করবো। খুৎবা শুনবো। খুৎবা পড়া সুন্নত। শুনা ওয়াজিব। তাই খুৎবা শুনবো। পরস্পরে শুভেচ্ছা বিনিময় করবো। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালী রহ. বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিনে সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন, ‘তাকাব্বাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা” অর্থ : আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও আপনাদের ভালো কাজগুলো কবুল করুন। 

নামাজ শেষে দোয়া ও ইস্তিগফার পড়বো। নিজের অতীতের সমস্ত গোনাহ থেকে মুক্তি চাইবো। হৃদয়ের সমস্ত আকুতি দিয়ে মাওলায়ে কারীমকে ডাকবো। এ দিনে আল্লাহ তায়ালা এক দল বান্দাদের এমনভাবে মাফ করে দেন, যেমনি তাদের মা তাদের নিষ্পাপ জন্ম দিয়েছিলো। 

এ সমস্ত পালনীয় বিষয়ের সঙ্গে বর্জনীয় কিছু বিষয় রয়েছে। সেগুলোকে আমরা বর্জন করবো। যেমন ঈদের দিনে রোজা রাখবো না। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজাহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। আমরা ঈদের দিনে শালীন পোশাক পরবো। এমন পোশাক পরবো না, যা বিধর্মীদের সঙ্গে মিলে যায়। আমরা মুসলমান। আমাদের সংস্কৃতি আছে। আমাদের কৃষ্টি-কালচার আছে। আমরা যেন আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে নষ্ট না করি। রাসীলে আরাবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্যতা রাখবে, সে তাদের দলভূক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ: ৪০৩৩)। আমরা যেমন অপসংস্কৃতি থেকে বাঁচবো আমাদের মা-বোনদের বাঁচাবো। রাস্তা-ঘাটে সাজ্জ-সজ্জা হয়ে পর্দাহীনভাবে বের হতে দেবো না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন মূর্খতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না। (সূরা আহযাব: ৩৩)।

আমাদের সমাজে এমন পবিত্র দিনে নানা আনন্দ-ফূর্তির ব্যবস্থা করা হয়। চতুর্দিকে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। নানা নাটক, সিনেমা আয়োজন করা হয়। গানবাদ্য ও নানা সংস্কৃতির নামে পাপাচারের ব্যবস্থা থাকে। এগুলো বর্জন করবো। রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা দল পাওয়া যাবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) মনে করবে। (বুখারি: ৫৫৯০)।

ঈদ একটি ইবাদত। আনন্দ ও ফূর্তির মাঝেই এ ইবাদত করা যায়। এ ব্যাপারে কোরআনে এসেছে, ‘বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত, সুতরাং এ নিয়ে যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। (সূরা: ইউসুফ: ৫৮)। অতএব, আল্লাহ তায়ালা যে ঈদ নামক নেয়ামত দান করেছেন, আমরা তার যথার্থ মূল্যায়ন করবো। ইবাদত ও শুকরিয়ার মাধ্যমে তা আদায় করবো ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আমাদের ঈদের পালনীয় বিষয়গুলো পালন ও বর্জনীয় বিষয়গুলো বর্জন করে চলার তাওফিত দান করুন। আমিন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে