ঈদের ছুটিতে রাঙামাটি

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ঈদ ভ্রমণ (রাঙামাটি পর্ব)

ঈদের ছুটিতে রাঙামাটি

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৪৮ ১৭ মে ২০১৯   আপডেট: ১১:৩০ ১৮ মে ২০১৯

সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত

সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত

শহুরে জীবনের ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে একটু নির্মল শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চায় না এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়া দায়। প্রতিদিনের যান্ত্রিক রুটিনের চাপে চাইলেও যেন মেলে না সেই অবকাশযাপনের সময়। জীবনের একঘেঁয়েমি কাটাতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ছোট একটা ছুটির। আর বেশিরভাগ সময় তা মেলে কোন না কোন উৎসব-পার্বণে। আবার কাজের ছুটি মিললেও অনেক সময় কোথায় যাব, কিভাবে যাবো ভাবতেই সময় পার হয়ে যায়। তবে আমরা চাইলেই একটু ভেবেই যান্ত্রিকতার বাইরে গিয়ে মনকে করে নিতে পারি সতেজ, প্রাণবন্ত। ক’দিন পরই ঈদ, আর এই ঈদের ছুটির সাথে বাড়তি আনন্দ যোগ করতে পারেন প্রকৃতির সাথে। ঘুরে আসতে পারেন আপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙামাটি জেলা থেকে। এখানে একইসঙ্গে উপভোগ করতে পারেন কাপ্তাই লেক, বৌদ্ধ বিহার, চাকমা রাজবাড়ি, জাদুঘর, ঝরনা, চা-বাগানসহ প্রকৃতির বেশকিছু নয়নাভিরাম দৃশ্য। এখানে যারা একবার পা রাখেন তারা আবার আসার ইচ্ছে পোষণ করবেন এ কথা বলা অপেক্ষা রাখে না।

সাজেক ভ্যালি

পাহাড় সবুজ আর মেঘের রাজত্ব সাজেক ভ্যালি। তবে এ কি শুধুই পাহাড়, বান্দরবানের মতো? এখানে পাহাড় নতুন রূপে ধরা দেয় চোখে। চলে আলোর রোশনাই। মেঘেরা দল বেঁধে এসে ছুঁয়ে দিতে চায় জনপদ। কখনো কখনো মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায় পাহাড় চূড়া। দূরে দৃষ্টি ফেললেই দেখা যায় ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পাহাড়। এ যেন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে দেখা। এটি রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে।

কাপ্তাই লেক

কাপ্তাই লেক

বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় লেক কাপ্তাই লেক। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কর্ণফুলি নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ফলে এই লেকের জন্ম হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণের নাম এই কাপ্তাই লেক। অথৈ জলরাশি, উঁচু-নিচু পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনাধারা আর উপজাতিদের জীবনপ্রবাহ যেকোনো পর্যটককে আকৃষ্ট করতে বাধ্য করে।

ঝুলন্ত সেতু ও হলিডে কমপ্লেক্স

এই লেকে এলেই চোখে পড়বে ছবিতে দেখা সেই চোখজুড়ানো ঝুলন্ত সেতু। ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘ্যে সেতুটি সিম্বল অব রাঙ্গামাটি উপাধি পেলেও আপনার কাছে স্পেশাল মেমোরি হয়ে থাকবে। লেকের একেবারে কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে হলিডে কমপ্লেক্স। আর এই সেতুটি লেক-কমপ্লেক্সেকে নৈসর্গিক রূপ দিয়েছে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পাহাড় আর লেকে সৌন্দর্য যেন অপরূপ মায়া সৃষ্টি করে। 

ভাসমান পাহাড়ে রেস্টুরেন্ট

কাপ্তাই লেকের ভেতর চলতে আপনাকে সবচেয়ে যে বিষয়টি আকৃষ্ট করবে তা হলো চলতি পথে কোনো একটি টিলার ওপর লেখা পেদা টিং টিং এবং চাং পাং। লেকের মাঝে ভাসমান এই রেস্টুরেন্ট দুটি আপনার জন্য চা, কফি আর চিকেন ফ্রাই নিয়ে অপেক্ষা করছে। এছাড়াও এখানে পাওয়া যায় স্থানীয় খাবার বিগল বিচি, কচি বাঁশের তরকারি, কেবাং ইত্যাদি। পেদা টিং টিং একটা চাকমা শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ হচ্ছে পেট টান টান। অর্থাৎ মারাত্মকভাবে খাওয়ার পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে, সেটাকেই বলা হয় পেদা টিং টিং।

শুভলং ঝরনা

শুভলং ঝরনা

এখানেই দেখা মিলবে আরেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শুভলং ঝরনার। উঁচু পাহাড়ের বুক চিঁড়ে ঝরে পড়ছে  পানি। পাহাড়ি এই ঝরনাটি এরইমধ্যে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে নিচে আঁছড়ে পড়া এই জলরাশি অপূর্ব সুরের মূর্ছনায় নিমিষেই আপনাকে দেবে শান্তির পরশ। চাইলেই ঝরনার শীতল পানিতে নিজেকে এলিয়ে দিতে পারেন যেকোনো পর্যটক। এখানে প্রায় ৮টি ঝরনা রয়েছে।

আরণ্যক রিসোর্ট ও হ্যাপি আইল্যান্ড

সোনানিবাস এলাকায় লেক প্রকৃতিক ছাঁয়ায় ঘেরা আরণ্যক রিসোর্টটি দেখে যে কারো মনে হবে শিল্পীর  রঙ-তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। ছিমছাম পরিবেশে লেকের নীল জলরাশিতে পেডেল বোটে ঘুরে বেড়াতে পারবেন মনের সুখে। এছাড়া লেকের কোলঘেঁষে নির্মাণ করা হ্যাপি আইল্যান্ডে শিশু-কিশোরদের জন্য অত্যাধুনিক সুইমিংপুল সহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে। যা ঢাকার ওয়াটার ল্যান্ডের মতোই মনে হবে।

রাজবাড়ি ও রাজবন বিহার

কাপ্তাই লেকের ভেতর দিয়ে নৌপথে গিয়ে দেখা মিলবে চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী বাজবাড়ির। এই বাড়িতেই দেখা যাবে তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বেশকিছু চিহ্ন। এখানেই বাংলা নববর্ষের শুরুতে ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হয়। চাকমাদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানও এসময় চলতে থাকে। 
এই রাজবাড়ির ঠিক অপরদিকেই রয়েছে আরেক স্থাপনা রাজবন বিহার। ইচ্ছে করলে অনুমতি নিয়ে এখানে ওঠাও যায়। এখানে রয়েছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধ্যানের বিশাল গর্ত আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় মূর্তি। এখানেই বৌদ্ধ ধর্মগুরু সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে)'র মৃতদেহ ভক্তদের দেখার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া কাচালং নদীর পাশে রয়েছে প্রাকৃতিক নয়াভিরাম যগচুক পাহাড়। এখানের সবচেয়ে উচ্চ আর  অনন্য সুন্দর একটি পাহাড়। যা দেখলেই চোখের ক্লান্তি দূও হবে নিমিষেই।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান

কাপ্তাই যাবেন আর উদ্যানের সাথে নিজেকে পরিচিত করবেন না তা আবার হয় নাকি! নদী, পাহাড় আর সবুজের সহাবস্থান নিয়ে প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান। বিস্তৃত পাহাড়রাশি আর চিত্তাকর্ষক উদার প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় যেন এ জাতীয় উদ্যান। উদ্যানে  রয়েছে সেগুন, পারুল, গামারি, কড়ইসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছের সারি পর্যটকদের অফুরন্ত আনন্দের উৎস।

উপজাতীয় জাদুঘর

এছাড়া রাঙ্গামাটি শহরের প্রবেশদ্বারে সহজেই দৃষ্টি কাড়ে যে স্থাপত্যটি সেটিই উপজাতীয় জাদুঘর। ১৯৭৮ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠালগ্নে বিভিন্ন জাতিসত্তার নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন সামগ্রী নিয়ে সীমিত পরিসরে এ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। এখানে এলে আপনি খুব সহজেই উপজাতিদের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে নিজেকে পরিচিত কওে তুলতে পারবেন। এই জাদুঘরটিতে প্রবেশের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

চা এস্টেট

চা-বাগান দেখতে  যে সিলেট যেতেই হবে তা নয়। কাপ্তাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি নিতে পারবেন সিলেটের ছোঁয়া। মুহূর্তেও জন্য হলেও মনে হবে আপনি সিলেটের কোনো চা বাগানে আছেন। পাহাড়ি এলাকায় কর্ণফুলি নদীর তীরে এ চা বাগানটি অবস্থিত। এই চা বাগান পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত মনোরম ও উপভোগ্য। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মন জুড়িয়ে দিতে যেন কার্পণ্য করে না। 

এছাড়া সেনাবাহিনী পরিচালিত লেকশোর রিসোর্ট পর্যটকদের জন্য আরেকটি অন্যতম আকর্ষনীয় বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে হেলিপ্যাড, মাটির ঘর, শনের ঘর, বাঁশের ঘর এবং কাঁচের ঘর। কাপ্তাই লেকের বিশালতা দেখতে হলে এখানে আসতেই হবে। এখানে মিনি চিড়িয়াখানাসহ রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। পর্যটকদের থাকার এখানে রয়েছে আধুনিক সু-ব্যবস্থা।

রংরাং পাহাড়

এছাড়াও রাঙামাটিতে দেখা মিলবে রংরাং পাহাড়, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ে, রাইংখ্যং পুকুর, উপজাতীয় টেকমটাইল মার্কেট, ফুরমোন পাহাড়, রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সংযোগ সড়ক, কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, ন-কাবা ছড়া ঝরনাসহ বেশকিছু দৃষ্টিকাড়া প্রাকৃতিক নৈসর্গ। 

নির্দেশনা

রাজধানী ঢাকা থেকে বেশকিছু বাস ছাড়ে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। ভাড়া  পড়বে জনপ্রতি ৬৫০  টাকা এবং রাঙ্গামাটি থেকে কাপ্তাই যেতে খরচ পড়বে ৮০ থেকে ১০০ টাকা । এরপর কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে বোট ভাড়া করে অনায়াসে ভ্রমণ করা যাবে কাপ্তাই লেক। একটি বোটে ৫০ জন পর্যন্ত যাত্রী উঠতে পারে। বোট ভাড়া নেবে ঘণ্টায় ৩০০ টাকা। কাপ্তাই বেড়াতে এসে কর্ণফুলী পেপারস মিল, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রও অনায়াসে ঘুরে দেখা যায়। থাকার জন্যও কোনো ঝামেল পোহাতে হবে না। হলিডে কমপ্লেক্স ছাড়াও এখানে রয়েছে বেশকিছু উন্নতমানের হোটেল ও রিসার্ট। ভাড়াও সাধ্যের মধ্যেই আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে