Alexa ইয়ারসাগুম্বা: বিশ্বের সবচেয়ে দামী ঔষধি ছত্রাক

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

ইয়ারসাগুম্বা: বিশ্বের সবচেয়ে দামী ঔষধি ছত্রাক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৩ ২২ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৮:৪৫ ২২ আগস্ট ২০১৯

ছবি: ইয়ারসাগুম্বা

ছবি: ইয়ারসাগুম্বা

বিশ্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও দামী ঔষধি ছত্রাক হলো ইয়ারসাগুম্বা। হিমালয়ের তিন থেকে পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই ছত্রাকটিকে ‘হিমালয়ের ভায়াগ্রা’ও বলা হয়ে থাকে। সনাতনী চিকিৎসকদের মতে এর মাধ্যমে পুরুষত্বহীনতা, অ্যাজমা এবং ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়। 

 

ইয়ারসাগুম্বা কি?

ইয়ারসাগুম্বার বৈজ্ঞানিক নাম হলো ‘অফিওকর্ডিসেপ্স সিনেসিস’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি ‘ইয়ার্টসা গুনবু’ নামেও পরিচিত। এটি মূলত শুয়োপোকা ও ছত্রাকের একটি সংমিশ্রন। মাশরুমের বীজ যখন মথের লার্ভাকে সংক্রমিত করে, তখনই এর সৃষ্টি হয়। এটি দুই থেকে ছয় সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। মানুষের হাতের আঙ্গুলের সমান দীর্ঘ এই ছত্রাকটি বিশ্বের সবচেয়ে দামী ভেষজ সম্পদ। 

ইয়ারসাগুম্বা মানবদেহের বিভিন্ন জটিল রোগ সারাতে পারে। চীনা ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ঔষুধ তৈরিতে এটি হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুরুষের যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি সহ কিডনির সমস্যা, শ্বাসকষ্ট এমনকি ক্যান্সার রোধেও এটি কার্যকরী ভূমিকা রাখে। 

 

এর ইতিহাসঃ

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতে সর্বপ্রথম ইয়ারসাগুম্বা আবিষ্কৃত হয়। তিব্বত এবং নেপালের রাখালরা তাদের গবাদিপশু চড়ানোর সময় খেয়াল করে যে এক ধরনের ছত্রাক জাতীয় জিনিস খেয়ে তাদের গবাদিপশুগুলো অদ্ভুদ আচরন করছে। সেগুলো আকস্মিকই যৌনকামনা নিয়ে একে অপরের দিকে তেড়ে আসছে।

এ ঘটনার পর স্থানীয় লোকজনও এটি খেয়ে একই ধরনের অনুভুতি বোধ করে। এরপরই এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে সবখানে। 

ইয়ারসাগুম্বা সম্পর্কে প্রথম লিখিত তথ্য পাওয়া যায় তিব্বতীয় চিকিৎসক নিয়ামনায়ি দর্জি’র লেখা বই ‘অ্যান ওশেন অব অ্যাফ্রোডিসিক্যাল কোয়ালিটিস’ থেকে। নিয়ামনায়ি দর্জি আনুমানিক ১৪৩৯ থেকে ১৪৭৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তিনি তার বইয়ে ইয়ারসাগুম্বাকে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধির ‘টনিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এর প্রায় একহাজার বছর পর চীনের তৎকালীন মিং সাম্রাজ্যের রাজার নিজস্ব চিকিৎসকেরা তিব্বতের এই বিস্ময় সম্পর্কে জানতে পারেন। তারা তাদের চিকিৎসা জ্ঞান দিয়ে ইয়ারসাগুম্বা থেকে বিভিন্ন শক্তিশালী ও কার্যকরী ঔষুধ তৈরি করতে সমর্থ হন। 

তবে আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী চীনের কিং সাম্রাজ্যের সময় ১৭৫৭ সাল থেকে এটি ব্যবহার করে ঔষুধ বানানো শুরু হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার সৃষ্টি হয়েছে একদমই সম্প্রতি, ১৯৯৩ সালে। সে সময় চীনের বেশ কয়েকজন দৌড়বিদ দীর্ঘ পরিসরের দৌড়ে অতিতের সব বিশ্ব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়ার পর ইয়ারসাগুম্বা সম্পর্কে সবাই জানতে পারে। 

ইয়ারসাগুম্বাকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ‘কর্ডিসেপ্স সিনেসিস’ নামে ডাকা হতো। তবে এটি নিয়ে সবিস্তরে আরো গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এর নাম পরিবর্তন করে ‘অফিওকর্ডিসেপ্স সিনেসিস’ রাখেন। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সাড়ে তিনশতাধিক প্রজাতির অফিওকর্ডিসেপ্স সিনেসিস এর সন্ধাণ পেয়েছেন। এর প্রত্যেকটি বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রে মহাষৌধদের কাজ করে। 

 

কোথায় এটি পাওয়া যায়?

তিব্বতের মালভূমি ও হিমালয়ের দক্ষিণ পাদদেশ ছাড়াও চীনের গানসু, কিংহাই, সিচুয়ান ও ইউনান প্রদেশ সহ নেপাল, ভূটান ও ভারতের কিছু দূর্গম অঞ্চলে এটি পাওয়া যায়। 

 

বর্ণঃ

ইয়ারসাগুম্বা কিছুটা হলদে ধূসর বর্ণের। 

 

সংগ্রহঃ

হিমালয়ের বরফ যখন গলা শুরু করে তখন নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহ শুরু করে দেয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজারো মিটার উচ্চতায় পর্বত শৃঙ্গের কাছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা এটি সংগ্রহ করে। 

অসুস্থ ও বৃদ্ধরা ছাড়া যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর সবাই এটি সংগ্রহে অংশ নেয়। ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহের পর সেগুলো টুথব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করে ঝুড়িতে রাখা হয়। একজন দক্ষ সংগ্রাহক ইয়ারসাগুম্বা সংগ্রহ করে এক মৌসুমে প্রায় আড়াই হাজার ডলারের মত উপার্জন করতে পারেন, যা নেপালি জনগণের গড় আয়ের প্রায় পাচঁগুন। 

চীন ও কোরিয়া এই ছত্রাক চাষের জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইয়ারসাগুম্বা বেশিরভাগ সময় পরিপূর্ণতা পাওয়ার আগেই সংগ্রহ করে ফেলা হয়। কারণ এটি বিক্রি ওজনের ভিত্তিতে এবং এর ওজন সবচেয়ে বেশি থাকে পরিপূর্ণতা পাওয়ার ঠিক আগ দিয়ে।

হিমাঙ্কের নীচে মাইনাস ৬৯ থেকে ৭৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে এটি জন্মে থাকে। এটি সংগ্রহ করার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে মে-জুন মাস। এ সময়ে দেড় লাখেরও বেশি লোক এটি সংগ্রহে কাজ করে। 

 

উপকারীতাঃ

যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে ইয়ারসাগুম্বা হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী ও পরিপূরক ঔষধ বিষয়ক এক জার্নালে বলা হয়েছে, এই ছত্রাক রাতে ঘাম হওয়া, হাইপারগ্লাইসেমিয়া, হাইপারলেপিডিমিয়া, অ্যাসথেনিয়া, অ্যারহেথমিয়াস সহ হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অসুখ, রেস্পিরেটরি, রেনাল, কিডনি ও লিভার সমস্যায় ব্যাপক কার্যকরী। 

বিভিন্ন বায়োঅ্যাক্টিভিটিসে দেখা গেছে দুশ্চিন্তা কমানো ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করা সহ এতে অ্যান্টি-আর্টেরিওসক্লেরোসিস, অ্যান্টি-অস্টিওপোরোসিস এর উপাদান রয়েছে। 

এছাড়া শ্বাস কষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, জন্ডিস, সর্দি-কাশি, টিউমার, এমনকি ক্যান্সারের সেল ধ্বংসেও এটি কার্যকর ভূমিকা রেখে থাকে। 

 

কিভাবে এটি কাজ করে?

ইয়ারসাগুম্বা মানব দেহের কোষকে শক্তিশালী ও আরো কার্যকর করার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে থাকে। এটি শরীরের টিউমারকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে ফেলে ক্যান্সার সেলকে নির্মূল করে দেয়। বিশেষ করে ত্বক ও ফুসফসের ক্যান্সারে এটি বেশি কার্যকর। 

এছাড়া কিডনি অপারেশনের পরও ডাক্তাররা এটির ব্যবহার করে থাকে। দৌড়বিদ সহ বিভিন্ন ক্রীড়াবিদরা শক্তিবর্ধনের জন্য ইয়ারসাগুম্বা খেয়ে থাকে। 

 

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ

এত এত গুনাগুণ থাকা স্বত্তেও এটির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রয়েছে। এটি শরীরে উত্তেজনা সৃষ্টির কারণে রক্ত সঞ্চালন বেশ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অনেক সময় শরীরে কোথাও কেঁটে গেলে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয়না। 

এছাড়া অস্ত্রপচারের সময়ও এটির প্রয়োগের ফলে রোগীর দেহে অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। 

 

এটির কেনো এত দাম?

ইয়ারসাগুম্বা বিশ্বের সবচেয়ে দামি ঔষধি ছত্রাক। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে এটি ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মহাঔষধি গুণ ও দুষ্প্রাপ্যতার জন্য মূলত আগেরকার দিনের রাজা-বাদশাহরাই এটি ব্যবহার করতেন। 

চীনা প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রে বলা হয়েছে ইয়ারসাগুম্বা দূর করতে পারেনা এমন কোনো রোগই নেই। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য সোনার চেয়ে তিনগুণ বেশি। এটি এক কেজি ১০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়ে থাকে। চীনের বাজারে ইয়ারসাগুম্বা প্রতি গ্রাম ১০০ ডলার মূল্যে বিক্রি হয়। প্রতিবছর প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যবসা হয় এই ইয়ারসাগুমবা থেকে।

 

ইয়ারসাগুম্বা নিয়ে যুদ্ধঃ

ইতিহাস থেকে জানা যায় মহাষৌধি ক্ষমতাসম্পন্ন এই ইয়ারসাগুম্বা নিয়ে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ ও প্রাণহানীর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। 

সর্বশেষ ২০১৪ সালে তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের দোল্পা জেলায় ইয়ারসাগুম্বা নিয়ে সৃষ্ট সংঘর্ষে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী