Alexa ইসলামে শহরনীতি ও আজকের সমাজ 

ঢাকা, রোববার   ২১ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৭ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪০

ইসলামে শহরনীতি ও আজকের সমাজ 

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫০ ১৩ জুন ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

শহরনীতি এক মজবুত ও শৃঙ্খল নীতি। মানুষের কর্ম ও চরিত্র গঠনের স্থান। চিন্তা বিনির্মাণের ক্ষেত্র। শৃংখলা, দৃঢ়তা, উন্নত শিক্ষা ও সভ্যতার বিশেষ কেন্দ্র।

শহুরী সভ্যতাই শহরবাসীদের স্বাচ্ছন্দতা ও সুস্থ দেহ-মন তৈরিতে সহায়ক। শহরনীতি, নিরাপত্তা ঐক্যবদ্ধতার পরিবেশ গড়ে তোলে। সেখানের বাসিন্দাদের রাজনৈতিক সংগঠন এবং সামরিক শক্তিকে সুদৃঢ় করে। এই শহরনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সেখানের বাসিন্দাদের জীবন যাপনের সমগ্রী সহজলভ্য করে দেয়। চিকিৎসা কেন্দ্র এবং সফল প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য এক দৃঢ় কর্মধারা প্রস্তুত করে। অন্যায়ভাবে কারো সহায়-সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ বন্ধ করে। পুলিশ ও প্রসাশনের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদিদের মূলৎপাটন করে।

রাসূল (সা.) এর ইয়াসরিব হিজরতের পূর্বে সেখানের বাসিন্দারা রাজনৈতিকভাবে বিভিন্নভাবে বিভক্ত ছিলেন। এসব সংগঠন স্বাধীনভাবে নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত ছিলো। যা একদিকে গোত্রীয় স্বাধীনতার রূপ-রেখাকে তুলে ধরে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি এবং এর দরুণ হত্যা-লড়াই সংঘাত এবং রক্তপাতের সূত্র সৃষ্টি করে। শান্তি, নিরাপত্তা, ঐক্যবদ্ধতা অকল্পনীয় ছিলো। প্রতিটি গোত্র অন্য গোত্রের রক্তপিপাসু ছিলো। গোত্রপ্রীতি এবং গোত্রীয় দ্বন্দের কারণে পুরো ইয়াসরিব একটি রণক্ষেত্রের রুপ নিয়েছিলো। সদা গৃহযুদ্ধ এবং পারস্পরিক দ্বন্দ ও সংঘাত লেগেই থাকতো। এমন এক ভয়াবহ ও জটিল পরিবেশে রাসূল (সা.) মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং নিজের বিচক্ষণতা ও কর্মকূশলের মাধ্যমে মদিনাকে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বহিরাগত ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন তৈরি করেন। তার মূল দফা ছিল ৩ টি।

(১) মদীনায় শান্তি-নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা। 
(২)  ধর্ম পালনের স্বাধীন থাকা।
(৩) বহিরাগত আক্রমণকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করা। 

এই সংগঠনের বদৌলতে মদীনায় যেই গৃহযুদ্ধ এবং গোত্রসমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ-সংঘাত লেগে থাকতো এবং তাদের আত্মরক্ষা ও অর্থনৈতিক শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল, সেই দ্বন্দ হ্রাস পেতে থাকে। অন্যদিকে মদিনার গোত্রসমূহ একতাবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি  পারস্পরিক ঐক্যের কারণে বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষা পেল। যার অবশ্যম্ভাাবী ফল এই দাঁড়ালো যে, প্রতিটি গোত্র-ধর্ম জীবন যাপনে স্বাধীনতা লাভ করলো। শান্তি নিরাপত্তার মনলোভা পরিবেশ তৈরি করলো। নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত করার পথ সুগম হলো। ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে সভ্যতা গঠনে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলো। এটাই ছিলো রাসূলের (সা.) কর্মময় জীবন্ত অবদান। যা রাসূল (সা.) তার দূরদর্শিতা এবং অস্বাভাবিক বিচক্ষণতা দ্বারা আঞ্জাম দিয়েছেন। হিজরত অবশ্যক হওয়ার পর মুহাজিরদের একটি বড় জামাত মদিনায় একত্রিত হয়। এমনকি মদিনার স্থানীয় বাসিন্দাদের তুলনায় মুহাজিরদের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। (বুখারী, হাদীস: ২২৬১)।

স্বল্প জিনিস-পত্র নির্ভর জীবন থাকা-খাওয়া এবং প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা একটি অতি জটিল এবং বড় সঙ্কটময় পরিস্থিতি ছিলো। তদুপরি বিভিন্ন শ্রেণি, বংশ, গোত্র-বর্ণ এবং বিচিত্র সভ্যতা-সংস্কৃতির মানুষকে সামাজিক দিক থেকে এভাবে আপন করে নেয়া হয়েছিলো যে, তাদের মধ্যে ভীনদেশী হওয়া ও পরবাসী হওয়ার অনুভূতিও আসতো না। সঙ্কীর্ণ কলনীর ঘনবসতির ভিড়াভিড়িতে যেই বিশৃংখলা ও চারিত্রিক অধঃপতনের প্রবণতা থাকে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বাহ্যত কোনো সহজ কাজ ছিলো না। কিন্তু রাসূল (সা.) তার সীমাহীন অন্তর্দৃষ্টি এবং খোদাপ্রদত্ত বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা এমন এক সিটিপ্ল্যানিং (শহরনীতি) করেন যা সুদক্ষ সমাজবিদদের জন্যও বিশেষ মনযোগ ও অধ্যয়নের দাবি রাখে। উদাহরণ স্বরূপ রাসূল (সা.) সেই জটিল পরিস্থিতির সমাধানের জন্য নিম্নোক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

(১) মুহাজিরীন সাহাবাগণ মক্কা মুয়াযযমা থেকে নিঃস্ব অবস্থায় এসেছিলেন যাদের মধ্যে কয়েকজন ধনাঢ্য ও সচ্ছল ব্যক্তিও ছিলেন কিন্তু যেহেতু তারা মক্কার কাফেরদের থেকে লুকিয়ে হিজরত করেছিলেন তাই তারা নিজেদের সঙ্গে কোনো আসবাব-পত্র নিয়ে আসতে পারেননি। রাসূল (সা.) সামাজিকভাবে তাদের আকৃষ্ট করার জন্য এই পদক্ষেপ নেন যে, আনসার এবং মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে দেন। তাই যখন মসজিদে নববী নির্মাণ সমাপ্ত হয় তখন হুজুর (সা.) আনসারদের ডাকার পর হজরত আনাস (রা.) এর গৃহে সকল লোক একত্রিত হয়। মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল ৪৫জন। হুজুর (সা.) আনসারদের সম্বোধন করে বললেন এরা তোমাদের ভাই। অতঃপর মুহাজির ও আনসারদের মধ্য থেকে দুই দুইজনকে ডেকে বললেন- এ এবং তুমি ভাই ভাই। আনসার সাহাবী ঘরে গিয়ে তার প্রতিটি জিনিসের হিসাব নিলেন এবং মুহাজির ভাইকে বললেন এর অর্ধেক আপনার আর অর্ধেক আমাদের। সাদ ইবনে রবি (রা.) যিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ভাই নির্বাচিত হয়েছেন, তার দুইজন বিবি ছিলেন। আব্দুর রহমান (রা.) সাদ ইবনে রবি (রা.)-কে বললেন- আমি তাদের মধ্য হতে দুইজনের একজনকে তালাক দিয়ে দিচ্ছি আপনি তাকে বিবাহ করে নেন। কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে অসম্মতি প্রকাশ করলেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৫৭) 

(২) মুহাজির সাহাবাদের বসবাসের দ্বিতীয় এই ব্যবস্থা নেয়া হলো যে, আনসার সাহাবিদের কাছে যেই পতিত জমি-জমা ছিলো তা মুহাজিরদের দেয়া হলো। অথবা যার নিকট একাধিক বসবাসের গৃহ ছিলো তা মুহাজিরদের দিয়ে দেয়া হলো। সর্বপ্রথম হজরত হারেসা বিন নোমান (রা.) নিজের জমিন পেশ করলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) সেখানে একটি দুর্গ নির্মান করলেন। হজরত ওসমান (রা.), হজরত মেকদাদ (রা.), হজরত ওবায়েদ (রা.)-কে আনসার সাহাবীগণ নিজেদের গৃহের পাশে জমিন দিয়েছিলেন। (মু’জামুল বুলদান, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-২৮৯)

(৩) মুহাজির এবং আনসারদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে পারষ্পরিক স্বভাব ও রুচির মিলের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয় যা সামাজিক জীবনকে সুখময় এবং সফল করার গ্যারান্টি দেয়। যেমন হজরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবীর একজন। তার পিতা রাসূল (সা.) এর আগমনের পূর্বে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর ধর্মের অনুসারী ছিলেন। হজরত সাঈদ (রা.) তারই কোলে প্রতিপালিত হন। তাই ইসলামের জ্যোতি তার হৃদয়কে অতি দ্রুত আলোকিত করে তোলে। ইসলামের বসন্ত হাওয়া তার মৃত হৃদয়কে সবুজ-শ্যামল ও তরতাজা করে তোলে। কেবল এটুকুই নয়; বরং সে প্রদীপ থেকে আরো বহু প্রদীপ ইসলামের আলোয় আলোকিত হতে থাকে। এই প্রস্ফূটিত কলিকে দেখে অন্যান্য কলিও ইসলামের বাগিচায় উজ্জীবিত হওয়ার দীপ্ত বাসনা লালন করতে থাকে। তাই তার সম্মানিত আম্মাজানও ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করেন। তারই উৎসাহে হজরত ওমর (রা.)ও ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হন। জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্বের ময়দানে তাকে নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের মধ্যে গণ্য করা হয়ে থাকে। তার ভ্রাতৃত্ব হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) এর সঙ্গে কায়েম করা হয়। যাকে হজরত ওমর (রা.) মুসলমানদের নেতা বলতেন। নবুওয়াতি দরবারে সর্বপ্রথম লেখালেখির দায়িত্বে নিয়োজিত হন। কোরআন পাঠশাস্ত্রে তাকে ইমাম গণ্য করা হয়ে থাকে। (ইসাবায়ে জিকরে উবাই ইবনে কাব, খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৭৭)

হজরত আবু হুজাইফা (রা.) যিনি উতবা ইবনে রবিয়ার পুত্র ছিলেন। আর উতবা ছিলেন কুরাইশদের প্রধান নেতা। হজরত আবু হুজাইফা (রা.) এর সঙ্গে হজরত আব্বাদ ইবনে বিস্র (রা.) এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেয়া হয়, আর এই আব্বাদ ইবনে বিস্র (রা.) আসহাল গোত্রের নেতা ছিলেন। হজরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.) যাকে রাসূল (সা.) উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি উপাধিতে আখ্যায়িত করেছেন। যিনি একদিকে সিরিয়ার মতো অঞ্চলের বিজেতা ছিলেন, অন্যদিকে ইসলামের স্বার্থে এমন আড়ষ্ট ছিলেন যে পিতৃত্ব এবং পুত্রত্বের আকর্ষণ তাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারত না। যেমন বদরের যুদ্ধে যখন তার পিতা তার মোকাবেলায় সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তিনি নির্ধিদায় নিজ পিতাকে ইসলামের স্বার্থে কোরবান করে দেন। তার ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক হজরত সাদ ইবনে মুআজ (রা.) এর সঙ্গে করা হয়। যিনি আউস গোত্রের নেতা ছিলেন। ঈমানি সাহসিকতা এবং ইসলামের আকর্ষণে তিনি এতোটাই মুগ্ধ ও নিবেদিত প্রাণ ছিলেন যে, দীন তার কাছে জীবনের চেয়েও বেশি দামী ছিল, এ জন্য তিনি বনু কুরাইজার ৪০০ মিত্রকে ইসলামের স্বার্থে কোরবান করে দিয়েছিলেন।

শহর ব্যবস্থাপনার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শৃংখলা রক্ষা করা। বর্তমান যুগে ধন-দৌলতের লালসা এবং অর্থ-সম্পদের উচ্চাকাক্সক্ষা মানুষের উত্তম চরিত্রের বিনাশ ঘটিয়েছে এবং নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়া, সহমর্মিতা প্রদর্শন, ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের মতো মূল্যবান জিনিস থেকে মানুষ বঞ্ছিত হয়ে গেছে। যেমন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসকে গুদামজাত ও সিন্ডিকেট করে মার্কেটে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য এবং উৎপাদিত পণ্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া। অন্য দিকে ভালো-মন্দ জিনিসের সংমিশ্রণ এবং ত্রুটিযুক্ত পণ্যের সয়লাভের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থা কঠিন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খাঁটি এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার না জুটার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে চলে যাচ্ছে। এছাড়া জোর-জবরদস্তি, প্রতারণা ও ধোকা ব্যবসার এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে যে, সরলমনা মানুষ এবং ব্যবসার মারপেচ সম্পর্কে অনবিজ্ঞ ব্যক্তিদের পক্ষে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা জটিল হয়ে পড়েছে। রাসূল (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ঘটে থাকা বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। লোকদের ইসলামি নীতির আলোকে ব্যবসা করতে নির্দেশ প্রদান করতেন এবং ব্যবসায়ীদের সততা ও বিশ্বস্ততা এবং সহমর্মিতার সুউচ্চ আখলাকে সজ্জিত হতে তাগিদ দিতেন। ব্যবসায় খেয়ানত ধোকা, মিথ্যা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকাকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। সম্পদ গুদামজাত করে এবং ধোকা দিয়ে ত্রুটিযুক্ত মাল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ী লোক পাপী হিসেবে উঠবে। তারা ব্যতীত যারা আল্লাহকে ভয় করেছে, সততা অবলম্বন করেছে এবং সত্য কথা বলেছে। 

অন্য এক স্থানে বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ৩ শ্রেণীর লোকদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি দয়ার নজরেও তাকাবেন না। না তাদেরকে পাপ থেকে মুক্ত করবেন এবং তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্থি থাকবে। ১.  টাখনুর নিচে পোষাক পরিধানকারী। 
২. মিথ্যার শপথ করে জিনিস-পত্র বিক্রয়কারী। ৩. এবং কারো প্রতি অনুগ্রহ করে খোঁটা দানকারী। (তিরমিযি ৪৪৫৮)।

অন্য এক হাদিসে ইরশাদ করেন, সর্বোত্তম উপার্জন ব্যবসায়ীদের উপার্জন। শর্ত হলো-  ১. সে যখন বেচা-কেনা সম্পাদন করে, মিথ্যে বলে না। ২. যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তার খেয়ানত করে না। ৩.  প্রতিশ্রুতি দিয়ে, খেলাফ করে না।  ৪. যখন আসবাব ক্রয় করে তখন বিনা কারণে ত্রুটি বর্ণনা করে না। ৫. যখন জিনিস-পত্র বিক্রী করে তখন পণ্যের মাত্রাতিরিক্র প্রশংসা করে না। ৬. যখন তার ওপর কারো হক থাকে সেটা আদায়ের ক্ষেত্রে গড়িমসি করে না।  ৭. যখন অন্যের ওপর তার কোনো হক থাকে তখন সেটার ব্যাপারে কঠরতা করে না। (আল আদাব লিল বাইহাকী, হাদীস নং-৭৮৭) অপর একটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি মুসলমানদের থেকে সম্পদকে আটকিয়ে গুদামজাত করে আল্লাহ তায়ালা তাকে কুষ্ঠরোগ এবং দারিদ্র্যতায় লিপ্ত করেন। (ইবনে মাজাহ-২১৫৫)

বাণিজ্যিক লেনদেনে স্বচ্ছতা তৈরির জন্য রাসূল (সা.) দ্বিতীয় যেই কর্মপদ্বক্ষেপ নিয়েছিলেন তা হলো তিনি স্বয়ং বাজারে গিয়ে সেই লেনদেনের দেখা-শোনা করতেন এবং ইসলাম ব্যবসার ক্ষেত্রে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে তার ওপর লোকদের আমল করাতেন। যে ব্যক্তি বাধা-নিষেধ মানতো না তাকে শাস্তি প্রদান করতেন। যেমন- সহি বোখারির ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়ে রয়েছে। হজরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) এর যুগে আমি দেখেছি লোকেরা অনুমান আন্দাজ করে শস্য ক্রয় করতো। কিন্তু সেটিকে আপন গৃহে যারা স্থানান্তর করার পূর্বে বিক্রি করে দিত তাদের এই অপরাধে শাস্থি দেওয়া হতো। কখনো কখনো পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য রাসূল (সা.) নিজেই বাজারে আগমন করতেন। একবার হুজুর (সা.) বাজার দিয়ে গমন করছিলেন, দেখতে পেলেন খাদ্য শস্যের একটি স্তুপ। তিনি সেই স্তুপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আর্দ্রতা অনুভব করলেন। দোকানদার বললেন- এটা কী? সে বলল- বৃষ্টির কারণে ভিজে গিয়েছে। তিনি বললেন- সেই ভিজা অংশকে ওপরে কেন রাখলে না। যাকে সকলে দেখতে পায়। অতঃপর বললেন-من غشنا فليس منا  যে ধোকা দেয় সে আমাদের (আদর্শের) অন্তর্ভুক্ত নয়। (মুসলিম শরীফ, হাদিস: ১০২)

কিছু লোকের স্বভাবে অবাধ্যতা ও হটকারিতার প্রাবল্য থাকে। নিয়ম ভঙ্গ করা এবং শহরের আইন-কানূনের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীনতা তাদের স্বভাব হয়ে থাকে। যার দরুণ সভ্যতা ও নীতিতে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। অপরাধ এবং চারিত্রিক ত্রুটির পথ পেয়ে যায়। বাস্তবে অপরাধপ্রবণ লোকদের ওপর নজরদারির জন্য যেখানে সু-শৃংখল এবং দৃঢ়নীতির রূপায়ণ প্রয়োজন সেখানে অপরাধীদের সাজা প্রদানের জন্য দণ্ডবিধি ও ইনসাফের বাস্তবায়ন অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। যাতে নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ন্যায়সঙ্গত শাস্তির ভয়ে অবাধ্য ও অপরাধপ্রবণ লোকদের জন্য হাতকড়া এবং পায়ের বেড়ি সাব্যস্ত হয়। রাসূল (সা.) এর যুগে এই উভয় বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা হতো। তাই একদিকে যেমনিভাবে ব্যভিচার হত্যা চুরি এবং অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক ও সাহস ভেঙ্গে দেয়ার মতো শাস্তি নির্ধারিত ছিলো। অন্যদিকে সেই শাস্তি প্রয়োগের বেলায় নীতি ও ইনসাফের পূর্ণ লক্ষ্য রাখা হতো। ধনী-গরীব উঁচু নিচু শ্রেণির মাঝে শাস্তি প্রয়োগে পার্থক্য করা হতো না। এ কারণে যখন হজরত উসামা (রা.) মাখযুম গোত্রের এক মহিলা, যার জন্য চুরির অপরাধে হাত কাটার শাস্তি গৃহীত হয়েছিল, তার ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর দরবারে সুপারিশ করেছিলেন। তখন রাসূলের (সা.) চেহারা মোবারক রাগে লাল হয়ে গিয়েছিলো। ওই সময় তিনি ঐতিহাসিক বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতেমাও চুরি করতো আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম। (বোখারী, হাদিস: ১২৫৩)

অপরাধীদের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্য হুজুর (সা.) হজরত যোবায়ের (রা.), হজরত আলী (রা.), হজরত মেকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.), হজরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.), হজরত আসেম ইবনে সাবেত (রা.) এবং হজরত যাহহাক ইবনে সুফিয়ান কালবীকে নিয়োগ করেছিলেন। (যাদুল মাআদ, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-২৯৪)

এই সেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিলো যার মাধ্যমে রাসূল (সা.) পৃথিবীবাসীকে সজাগ করে দিয়েছিলেন যে, ইট পাথরের সুউচ্চ ভবনের মাঝে গলি ও বাজার বানিয়ে দেয়ার নামই শহরনীতি নয়; বরং এমন কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি করাও অপরিহার্য, যা দৈহিক শান্তি ও আত্মিক উন্নতি বয়ে আনে। এবং এক উন্নত নতুন প্রজন্ম তৈরির জিম্মাদার হয়। সর্বশেষ আল্লাহর কাছে দোয়া যে, আমাদের রাসূল (সা.) এর আদর্শ অনুপাতে জীবন গঠনের তৌফিক দান করুন এবং মুসলিম সমাজকে ইসলামি সভ্যতার যাত্রী বানিয়ে দেন। আমিন! ছুম্মা আমিন!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে