Alexa ইসলামে মদ, জুয়া, বেদী, ভাগ্য নির্ধারক শর নিষিদ্ধ (পর্ব-৪)

ঢাকা, রোববার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২৩ ১৪২৬,   ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

ইসলামে মদ, জুয়া, বেদী, ভাগ্য নির্ধারক শর নিষিদ্ধ (পর্ব-৪)

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৩০ ২১ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২০:৪৫ ২১ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

‘মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ধারক শর সমূহ শয়তানের নাপাক কর্ম বৈ কিছুই নয়।’ (সূরা: মায়েদাহ, আয়াত: ৯০)।

আরো পড়ুন>>> ইসলামে মদ, জুয়া, বেদী, ভাগ্য নির্ধারক শর নিষিদ্ধ (পর্ব-৩)

তৃতীয় পর্বের পর থেকে...

ধূমপানে বিষপান। কেননা বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় নিকোটিনসহ ৪০০০-এর মত রাসায়নিক ও বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে। যারা এগুলো খায় তারা টাকা দিয়ে স্রেফ বিষ কিনে খায়। এজন্য নিকোটিনকে ‘খুনী’ বলা হয়। কেননা সে প্রথমে ধূমপায়ীর স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। অতঃপর তাকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে যে, শতকরা ৯৮ জন মাদকাসক্ত শুরুতে ধূমপানের মাধ্যমেই নেশার জগতে প্রবেশ করেছে। অনেকে সখের বশে, কেউ বন্ধু-বান্ধবের চাপে, কেউ হতাশায় ভুগে। মদ ও জুয়ার মধ্যে কিছু উপকারিতা থাকার পরেও আল্লাহ তা হারাম করেছেন। অথচ তামাক ও ধূমপানে কোনোই উপকার নেই। বরং শতকরা একশ ভাগই ক্ষতি এবং সবটাই অপচয়। ধূমপায়ীরা বছরে কোটি কোটি টাকা স্রেফ ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এরা শয়তানের গোলাম। 

আল্লাহ বলেন, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সূরা: বনু ইস্রাঈল, আয়াত:২৭)। 

ফলে তামাক ও ধূমপান মদ ও জুয়ার চেয়েও নিকৃষ্ট। আর যারা এগুলো খায়, তারা কতদূর জঘন্য, সহজে অনুমেয়। তামাক গাছ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই গাছ মাটির এমন কিছু উপাদানকে নষ্ট করে দেয়, যা অন্যান্য ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। সকলেই জানেন যে, তামাক গাছ ছাগল, কুকুর এমনকি শূকরেও খায় না। অথচ মানুষে খায়। তামাক ও ধূমপান এমন এক খাদ্য, যা ক্ষুধা মেটায় না, পুষ্টিও যোগায় না। যা কেবল জাহান্নামীদের খাদ্যের সঙ্গেই তুলনীয়। যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

لاَ يُسْمِنُ وَلاَ يُغْنِيْ مِنْ جُوْعٍ 

‘যা তাদের পুষ্ট করবে না, ক্ষুধাও মিটাবে না’ (সূরা: গাশিয়াহ, আয়াত: ৭)।

আরো পড়ুন>>> ‘মাদিনা’ হজে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু

মাদকের কুফল শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সবদিকেই রয়েছে।

(১) শারীরিক (Physical):

শারীরিক কুফলের মধ্যে প্রধান হলো-
(ক) ফুসফুস আক্রান্ত হওয়া। ব্রঙ্কাইটিস, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, হৃৎপিন্ড বড় হওয়া, হার্ট ব্লক, হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণের ফলে ফুসফুস ও মুখগহবরের ক্যান্সারসহ ২৫ প্রকার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়াও ধূমপায়ীদের আশপাশের অধূমপায়ীগণ ওইসব রোগ হওয়ার ৩০ শতাংশ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। 

(খ) পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্র আক্রান্ত হওয়া। ফলে অরুচি, এ্যাসিডিটি, আমাশয়, আলসার, কোষ্ঠকাঠিন্য, কোলন ক্যান্সার ইত্যাদি রোগ হয় 

(গ) প্রজননতন্ত্র আক্রান্ত হওয়া। ফলে যৌনক্ষমতা হরাস, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী বা খুঁৎওয়ালা   সন্তান জন্মদান, সিফিলিস, গণোরিয়া, এইডস প্রভৃতি দূরারোগ্য ব্যাধির সম্ভাবনা দেখা দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন চর্মরোগ হতে পারে। সর্বোপরি শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের জীবাণু দ্বারা সহজেই একজন মাদকসেবী আক্রান্ত হয়। অনেক মাদকদ্রব্য আছে, যা সেবনে কিডনী বিনষ্ট হয়। মস্তিষ্কের লক্ষ লক্ষ সেল ধ্বংস হয়ে যায়। কোনো চিকিৎসার মাধ্যমে যা সারানো সম্ভব হয় না। এর ফলে লিভার সিরোসিস রোগের সৃষ্টি হয়, যার চিকিৎসা দুরূহ।

বিশেষজ্ঞদের মতে মাদক ও ভেজাল খাদ্যের কারণেই মরণব্যাধি লিভার ও ব্লাড ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত বেগে। ফলে এখুনি বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি লোক ক্যান্সারের আক্রান্ত। অতএব সাবধান!

(২) মানসিক (Mental):

মাদকের প্রভাবে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তার মধ্যে পাগলামি, অমনোযোগিতা, দায়িত্বহীনতা, অলসতা, উদ্যমহীনতা, স্মরণশক্তি হ্রাস, অস্থিরতা, খিটখিটে মেযাজ, আপনজনের প্রতি অনাগ্রহ এবং স্নেহ-ভালোবাসা কমে যাওয়া ইত্যাদি আচরণ প্রতিভাত হয়।

(৩) সামাজিক (Social):

প্রাথমিকভাবে তার বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ছোটদের প্রতি স্নেহ কমে আসে। অতঃপর সে ক্রমে নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। সে যেকোনো সুযোগে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তার দ্বারা সাধিত হয় না। দুষ্ট লোকেরা টাকার বিনিময়ে সর্বদা এদেরকেই ব্যবহার করে থাকে। এরা সর্বদা মানুষের ঘৃণা কুড়ায় ও সমাজে নিগৃহীত হয়।

(৪) অর্থনৈতিক (Economic):

বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে প্রতি বছর কেবল তামাকের কারণে বিশ্বব্যাপী ২০০ বিলিয়ন ডলার (১৬২০০ বিলিয়ন টাকা) ক্ষতি হয়। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে তামাক ও তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপনে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর হিসাব মতে বিশ্বে প্রতিদিন ৪৪ হাজার লোক তামাকজনিত কারণে এবং বছরে ৫০ লাখ লোক ধূমপানের কারণে মারা যায়। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, প্রতি বছর মাদকদ্রব্য, খুন, রাহাযানি, আত্মহত্যা, সড়ক ও বিমান দুর্ঘটনা ও অন্যান্য কারণে মৃত্যু সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মৃত্যু হয় ধূমপানের কারণে।

আরো পড়ুন>>> জমজম কুপ সৃষ্টির রহস্য ও অজানা কিছু তথ্য

উপরে বর্ণিত শুধুমাত্র তামাক জনিত মাদকের ক্ষতির হিসাবের সঙ্গে অন্যান্য মাদক দ্রব্য ও জুয়ার হিসাব যোগ করলে দেখা যাবে যে, বিশ্বের সকল আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সিংহভাগ ক্ষতি হয় মদ ও জুয়ার কারণে। বর্তমান যুগে ক্রিকেট জুয়া যার শীর্ষে অবস্থান করছে। অথচ মানুষ যদি আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা মানত, তাহলে তারা এই চূড়ান্ত ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যেত।

মাদক ও ধূমপান বিষয়ে শারঈ নির্দেশ:

আল্লাহ বলেন, وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ ‘(নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ) মানুষের জন্য সকল পবিত্র বস্ত্ত হালাল করেন এবং সকল নোংরা বস্ত্ত হারাম করেন’ (সূরা: আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭)।

মাদক ও ধূমপান নিঃসন্দেহে খবীস ও ক্ষতিকর বস্ত্ত। অতএব তা হারাম। যারা বলেন, তামাক, জর্দা, গুল, বিড়ি, সিগারেট হারাম হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে কোরআনে নেই। অতএব তা হালাল কিংবা খুব বেশি হলে মাকরূহ, যা খেতে বাধা নেই। এদের উদাহরণ ওই ডায়াবেটিস রোগীর মতো, যে ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞার ভয়ে চিনি খায় না। কিন্তু রসগোল্লা ছাড়ে না। আসলে বিড়ি-সিগারেট ও তামাক-জর্দা এইসব লোকদের বুদ্ধি বিভ্রম ঘটিয়ে দিয়েছে। সেকারণ এরা জ্ঞান থাকতেও জ্ঞানহীন।

আল্লাহ বলেন, وَلاَ تُلْقُوْا بِأَيْدِيْكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’ (বাক্বারাহ ২/১৯৫)। 

মাদক ও তামাকজাত দ্রব্যের চাইতে মানুষকে ধ্বংসে নিক্ষেপকারী আর কোনো বস্ত্ত আছে? অতএব হে মানুষ! তোমার পালনকর্তার কঠোর নির্দেশ মেনে চলো। মাদক ও তামাক ছেড়ে দাও। আল্লাহর নিকট তওবা করো। সুস্থ জীবনে ফিরে এসো।

(১) রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তোমাদের তিনটি ব্যাপারে ক্রুদ্ধ হন। (ক) অনর্থক কথা-বার্তা (খ) অধিক হারে প্রশ্ন করা (গ) মাল-সম্পদ নষ্ট করা’। (মুসলিম হা/৪৫৭৮; আহমাদ হা/৯০৩৪)। তামাক সেবন ও ধূমপানে স্রেফ মাল বিনষ্ট হয়। অতএব তা হারাম। 

(২) তিনি (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (বুখারী হা/৬০১৮)।  ধূমপায়ী তার স্ত্রী-সন্তান, সহযাত্রী, বন্ধু-বান্ধব ও আশ-পাশের লোকদের কষ্ট দেয় ও তাদের ক্ষতি করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে ধূমপায়ী নিজে এবং তার অধূমপায়ী সাথী (Second hand Smoker) সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

(৩) তিনি (সা.) বলেন, لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ ‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না এবং অন্যের ক্ষতি করো না’। (ইবনু মাজাহ হা/২৩৪০; ছহীহাহ হা/২৫০)। ধূমপায়ীরা সর্বদা নিজের ও অন্যের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। অতএব তা নিঃসন্দেহে হারাম। 

(৪) রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হালাল স্পষ্ট ও হারাম স্পষ্ট। এ দুইয়ের মধ্যে রয়েছে সন্দেহপূর্ণ বিষয়াবলী। যা অনেক মানুষ জানে না। অতএব যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ বিষয় সমূহ পরিহার করল, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করল। আর যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ বিষয়ে লিপ্ত হলো, সে হারামে লিপ্ত হলো’। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৭৬২ ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়)। 

(৫) তিনি (সা.) বলেন, دَعْ مَا يَرِيْبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيْبُكَ ‘তুমি সন্দিগ্ধ বিষয় ছেড়ে নিঃসন্দেহ বিষয়ের দিকে ধাবিত হও’। (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ; মিশকাত হা/২৭৭৩)। অতএব হে অজুহাত দানকারী তামাকসেবী ও অতি যুক্তিবাদী ধূমপায়ী! ফিরে এসো আল্লাহর পথে। তওবা কর খালেছ ভাবে। চলবে...

সূত্র: মাসিক আত-তাহরীক

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে