Alexa ইসলামে প্রতিবেশীর হক

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

ইসলামে প্রতিবেশীর হক

 প্রকাশিত: ১৮:০১ ৩১ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৮:১৩ ৩১ আগস্ট ২০১৮

ইসলাম একটি শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা। ইসলামে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে ব্যাখ্যা দেয়া আছে, দেয়া আছে সঠিক এবং শুদ্ধ দিক নির্দেশনা। তেমনি পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে প্রতিবেশীর হক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া আছে। প্রতিবেশীর হক আদায় করা ঈমানের অংশ। কোন প্রকৃত মুসলমান বা মুমিন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে পারে না। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৮৩)। তাই প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে একজন মুমিন মুসলমানের সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিবেশী কারা?
প্রতিবেশী হচ্ছে আশেপাশের মুসলিম, অমুসলিম যে কোন ধর্মাবলীর অনুসারী, নেক বান্দা, ফাসেক, বন্ধু, শত্রু, ভিনদেশি, স্বদেশী, উপকারী, অনিষ্ঠকারী, আত্মীয়, অনাত্মীয়, কাছের বা দূরের সবাই প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত। শুধু মাত্র পাশের ঘরের লোকেরাই প্রতিবেশী তা নয়। প্রতিবেশী বিভিন্নভাবে হতে পারে। একজনের জমির পাশে আরেকজনের জমি থাকলে তারা একে অপরের প্রতিবেশী। একজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশে আরেকজনের প্রতিষ্ঠান থাকলে তারাও পরস্পর প্রতিবেশী। কোন বাহনে কোথায় যাওয়ার সময়ে যাত্রীরাও কিছু সময়ের জন্য একে অপরের প্রতিবেশী। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, "তোমার ঘরের চারপাশে ৪০ ঘরের অধিবাসীরা তোমার প্রতিবেশী। "

প্রতিবেশী তিন শ্রেণীর
 ১. অনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশী: এ শ্রেণীর প্রতিবেশী ,প্রতিবেশী হওয়ার হক পাবেন।
 ২. মুসলিম প্রতিবেশী: মুসলিম প্রতিবেশী একজন মুসলিম হিসেবে ও একজন প্রতিবেশী হিসেবে দুই দিক থেকে তার হক পাবেন।
 ৩. মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী: একজন প্রতিবেশি,একজন মুসলিম ও একজন আত্নীয় হিসেবে তার হক পাবে। ইসলামে আত্নীয় স্বজনের জন্য বিশেষ হক রয়েছে। যে ব্যাক্তি আত্নীয় স্বজনের হক আদায় করে না এবং তাদের বঞ্চিত করে সে ব্যাক্তি রাসুল (সাঃ) এর উম্মত নয়। এখানে তিনটি শ্রেনিই এক প্রতিবেশী হিসেবে তার হক পাবেন। প্রতিবেশীর বিপদে পড়লে সহায়তা করা, অসুখ হলে প্রয়োজনে সেবা করা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়া, মারা গেলে একে অন্যের দাফন ও জানাজায় অংশ নেয়া, প্রতিবেশীর কষ্ট হয় এমন কোন কাজ না করা ইত্যাদি বিষয়গুলো একজন উত্তম প্রতিবেশী হিসেবে খেয়াল রাখা জরুরি।

একজন প্রতিবেশীর আর একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকার আছে। একবার সাহাবা কেরামগন (রাঃ) মহানবীর কাছে জানতে চাইলেন, প্রতিবেশীর হক কি? প্রিয়নবী বললেন, "যদি সে তোমার কাছে কিছু চাই তাহলে তাকে সাহায্য কর, যদি সে নিজের প্রয়োজনে ধার চাই তাকে ধার দাও, যদি সে তোমাকে দাওয়াত করে তা কবুল কর, সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখতে যাও, যদি তার ইন্তেকাল হয়ে যায় তাহলে তার জানাযায় শামিল হও, যদি সে কোন মুসিবতে পড়ে তাকে শান্তনা দাও, নিজের পাতিলে গোশত রান্নার খুশবু দিয়ে তাকে কষ্ট দিয় না (কেননা হতে পারে অভাবের কারণে সে গোশত রান্না করতে পারে না) বরং কিছু মাংস তার ঘরে পৌছে দাও, আপন বাড়ীর ইমারত তার বাড়ীর ইমারত হতে এতটা উচু কর না যাতে তার ঘরে বাতাস বন্ধ হইয়ে যায় অবশ্য তার অনুমতিক্রমে হলে ভিন্ন কথা" (তারগিব)।

রাসুল (সাঃ) হাদিসে উল্লেখ করেছেন, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। এমনকি অমুসলিম প্রতিবেশীর বেলায় হজরত আলী (রাঃ) হক আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন। একবার এক ব্যাক্তি ছাগল জবেহ করে ছাগলের চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তখন হজরত আলী প্রতিবেশীদের মাংস বণ্টনের কথা বলেন এবং বণ্টন কাজ এক ইহুদির বাড়ি হতে ক্রমানুসারে শুরু করা জন্য বলেন। কাজেই, ইসলামে প্রতিবেশী যে ধর্মের হোক না কেন, কোন প্রতিবেশী যেন অভুক্ত না থাকে সে ব্যাপারে সজাগ থাকার নির্দেশনা দেয়।

হাদীস শরীফে এসেছে, “যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরা করেন” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮০)। মুসনাদে আহমাদ শরীফে এসেছে, একবার এক লোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস বলেন,"হে আল্লাহর নবী অমুক এক মহিলা অধিক পরিমানে নামায, রোজা ও দান-খয়রাত করে কিন্তু সে আপন প্রতিবেশীদেরকে নিজের জবানের দ্বারা কষ্ট দেয় অর্থাৎ গালিগালাজ করে।" রাসুল (সাঃ) বললেন, "সে দোজখে যাবে।"
এরপর সে লোক আবার বললেন, হে আল্লাহর নবী "অমুক মহিলা নফল নামায, নফল রোজা ও দান-খয়রাত কম করে, বরং তার দান-খয়রাত পনীরের একটি টুকরোর চেয়ে বেশি নয়, কিন্তু নিজের প্রতিবেশীদের জবান দ্বারা কষ্ট দেয় না।" রাসুল (সাঃ) বললেন, "সে জান্নাতে যাবে"। তাহলে এ হাদিস দ্বারা বোঝা যাচ্ছে, কোন ব্যাক্তি ইবাদত বন্দেগী করে যদি প্রতিবেশীর হক আদায় না করে এবং প্রতিবেশীর সাথে বাজে ব্যবহার এবং প্রতিবেশীর ক্ষতি করে তাহলে তার ইবাদত কোন কাজে আসবে না।

হজরত আয়েশা (রাঃ) তাহাজ্জুদের নামাজের সময় প্রতিবেশীদের জন্য সবার আগে দুআ করতেন। মা আয়েশা (রাঃ) যখন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন তখন প্রতিদিন ইমাম হাসানের (রাঃ) ঘুম ভেঙ্গে যেত। ইমাম হাসান বিছানা ছেড়ে উজু সেরে নামাজে মায়ের সঙ্গে শামিল হতেন। তিনি দেখতেন মা আয়েশা (রাঃ) কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দুআ করছেন প্রতিবেশীদের জন্য। শিশু ইমাম হাসান কয়েকদিন দেখে একদিন মাকে কৌতুহল মন নিয়ে প্রশ্ন করেন, "মা, মোনাজাতের সময় আপনি কেবল পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য মঙ্গল কামনা করেন। আপনার নিজের জন্য বা আমাদের কারও জন্য তো দোয়া করেন না কেন!" মা আয়েশা (রাঃ) বললেন, "জেনে রেখো, প্রতিবেশীর হক আগে। প্রতিবেশীর মঙ্গল কামনা করলে, তাদের খোঁজখবর নিলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন খুব খুশী হন। তাই আমি ওদের জন্য দোয়া করি। আমি তোমাদের জন্যও দোয়া করি। তবে প্রতিবেশীর অধিকার আগে, এটা মনে রাখবে।"  

রাসুল (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যাক্তি আল্লাহ্‌ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে , সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।" প্রতিবেশীর পরস্পর ঝগড়া বিবাদ ,বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। এতে নৈতিক অবক্ষয় হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন,"কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ঝগড়াটে দুই প্রতিবেশীর মোকদ্দমা উপস্থাপন করা হবে।"

ইসলামে সচ্চরিত্র, সৎ, আদর্শ, ন্যায়পরায়ণ প্রতিবেশীকে জীবনের জন্য সৌভাগ্যের নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়। রাসুল (সাঃ) তিনটি জিনিসকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলেছেন, তা হলো প্রশস্ত বাসস্থান, সৎ প্রতিবেশী ও রুচিসম্মস্ত বাহন। একজন প্রতিবেশীর সম্পর্কে তার প্রতিবেশীই সবচেয়ে ভালো জানেন। হযরত ইবন মাসঊদ (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি মহানবীকে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে জানবো, ভালো কাজ করছি নাকি মন্দ কাজ করছি? মহানবী বললেন, যখন প্রতিবেশীদের বলতে শুনবে যে, ভালো কাজ করছো তখন মূলতই ভালোকাজ করছো। আর যখন তাদের বলতে শুনবে, খারাপ কাজ করছো তখন মূলতই খারাপ কাজ করছো।

কোন প্রতিবেশীর মৃত্যু হলে তার পরিবার পরিজনের কাছে খাবার সরবারহ করা দায়িত্ব। এটা একজন প্রতিবেশীর প্রাপ্ত হক। রাসুল (সাঃ) এমন নির্দেশ দিয়েছেন। একজন প্রকৃত মুমিন বা মুসলিম হতে হলে ইসলামের সকল নির্দেশনা মেনে চলা অতীব প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশীর উপর দায়িত্ব ও কর্তব্য মেনে চলা ও একান্ত জরুরী।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসজেড