ইসলামের দৃষ্টিতে নারী (পর্ব-১)

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী (পর্ব-১)

ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:২২ ৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৪:৪৯ ১০ মার্চ ২০২০

জীবনের সবরকমের তৎপরতা ও উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে সর্বদাই নারী ও পুরুষ পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে-ছবি: সংগৃহীত

জীবনের সবরকমের তৎপরতা ও উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে সর্বদাই নারী ও পুরুষ পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে-ছবি: সংগৃহীত

নারী ও পুরুষ অখণ্ড মানব সমাজের দু’টি অপরিহার্য অঙ্গ। পুরুষ মানব সমাজের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করলে আরেকটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। নারীকে উপেক্ষা করে মানবতার জন্য যে কর্মসূচী তৈরী হবে তা হবে অসম্পূর্ণ। 

আমরা এমন কোনো সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারি না যা কেবল পুরুষ নিয়ে গঠিত, যেখানে নারীর প্রয়োজন অনুভূত হয় না। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি সমাজেই নারী ও পুরুষ সমানভাবে পরস্পরের মুখাপেক্ষী। তাই এর কোনোটাকে বাদ দিয়ে মানব সমাজ কোনোক্রমেই পূর্ণত্ব অর্জন করতে পারে না। এ কারণেই নারী-পুরুষের সুষম উন্নয়ন সমাজ প্রগতির একটি অনিবার্য পূর্বশর্ত। 

আরো পড়ুন>>> ইসলামের দৃষ্টিতে নারী (পর্ব-২)

নারী সুদীর্ঘকাল ধরে নানাভাবে নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হয়েছে এবং আজকের সভ্য সমাজেও হচ্ছে। ইসলাম একেবারে শুরু থেকেই সর্বতোভাবে নারী-নির্যাতনের বিপক্ষে সোচ্চার। তারপরও মুসলিম অধ্যুষিত আমাদের এ জনপদে নারীরা নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত কেন তা রীতিমত বিস্ময়কর।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী

সমাজে নারীর অবস্থান যখন ছিল অমানবিক এবং অতি করুণ তখন থেকেই ইসলাম নারীর অধিকার ও মর্যাদা উন্নয়নের জন্য নজীরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। সে সব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :

(ক) নারী সম্মানিত সৃষ্টি : ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ অতীব সম্মানিত ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। ইসলাম জন্মগতভাবে মানুষকে এ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدۡ كَرَّمۡنَا بَنِيٓ ءَادَمَ 

‘আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি।’ (সূরা: বনী ইসরাইল: ৭০)।

বস্তুত মানুষ সম্পর্কে ইসলামের এ ঘোষণা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই সমানভাবে শাশ্বত ও চিরন্তন। মানবিক সম্মান ও মর্যাদার বিচারে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনোই পার্থক্য নেই। নারীকে শুধু নারী হয়ে জন্মাবার কারণে পুরুষের তুলনায় হীন ও নীচ মনে করা সম্পূর্ণ জাহেলী ধ্যান-ধারণা, এরূপ চিন্তাভাবনা ইসলাম স্বীকার করে না। অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী হচ্ছে মহান স্রষ্টা আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি।

(খ) ঈমান ও আমলই নারী-পুরুষের মর্যাদা নির্ণয়ের সঠিক মাপকাঠি : ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতা সুস্থ চিন্তা ও সঠিক কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে আদর্শ ও মতবাদ নারীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে নীচু ও লাঞ্ছনার যোগ্য মনে করে, মানবতার উচ্চ আসন থেকে দূরে নিক্ষেপ করে এবং পুরুষকে শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে উচ্চতর আসনের উপযুক্ত মনে করে, ইসলাম তাকে জাহেলিয়াত বলে আখ্যায়িত করেছে। ইসলাম পরিস্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, মর্যাদা লাঞ্ছনা এবং মহত্ত্ব ও নীচতার মাপকাঠি হলো তাকওয়া-পরহেযগারী এবং চরিত্র ও নৈতিকতা। এ মাপকাঠিতে যে যতটা খাঁটি প্রমাণিত হবে মহান আল্লাহর কাছে সে ততটাই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবে।

আল্লাহ বলেন,

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ

‘পুরুষ বা নারীর মধ্য থেকে যে-ই ভালো কাজ করলো সে ঈমানদার হলে আমি তাকে একটি পবিত্র জীবন যাপন করার সুযোগ দেব এবং তারা যে কাজ করছিল আমি তাদেরকে তার উত্তর পারিশ্রমিক দান করব।’ (সূরা: আন-নাহল, আয়াত: ৯৭)।

আল্লাহ আরো বলেন,

‘তাদের রব তাদের দোয়া কবুল করলেন এ মর্মে যে, পুরুষ হোক বা নারী হোক তোমাদের কোনো আমলকারীর আমল আমি নষ্ট করব না।’ (সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ১৯৫)।

অর্থাৎ: মানব জাতির দু’টো শাখার মধ্য হতে যে-ই কর্মের পবিত্রতার দ্বারা তারা আমলনামা উজ্জ্বল করবে, আল্লাহর কাছে মর্যাদা ও সফলতার প্রাপ্তি ঘটবে তারই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বহু নারী ঈমান ও আমলে বহু পুরুষকে ছাড়িয়ে গেলে নিঃসন্দেহে তারা সে সব পুরুষের চেয়ে মর্যাদাবান বিবেচিত হবেন।

(গ) নারী ও পুরুষ উভয়ই সভ্যতার নির্মাতা : আল-কোরানের বক্তব্য থেকে এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত যে, জীবনের সবরকমের তৎপরতা ও উত্থান-পতনের ক্ষেত্রে সর্বদাই নারী ও পুরুষ পরস্পরকে সহযোগিতা করেছে। উভয়ে মিলে জীবনের কঠিন ভার বহন করেছে এবং উভয়ের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সভ্যতা ও তামাদ্দুনের ক্রমবিকাশ ঘটেছে।

আল্লাহ বলেন,

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللّهَ وَرَسُولَهُ 

‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের আদেশ দেয়, মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে।’ (সূরা: আত-তাওবাহ, আয়াত : ৭১)।

(ঘ) নারী সম্পর্কে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির অপনোদন : ইসলাম আগমনের পূর্বে গোটা দুনিয়া নারী জাতিকে একটি অকল্যাণকর তথা সভ্যতা ও তামাদ্দুনের জন্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান মনে করে কর্মক্ষেত্র থেকে অপসারিত করেছিল। তাকে অধঃপতনের এমন এক অন্ধকার গুহায় নিক্ষেপ করেছিল যেখান থেকে তার উন্নতি ও ক্রমবিকাশের আশা করা ছিল বাতুলতা মাত্র। দুনিয়ার এ আচরণের বিরুদ্ধে ইসলাম উচ্চ কন্ঠে প্রতিবাদ করে বললো যে, গতিশীল জীবন নারী ও পুরুষের উভয়ের মুখাপেক্ষী। নারীকে এ জন্য সৃষ্টি করা হয়নি যে, সে ধাক্কা খেতে থাকবে এবং তাকে জীবনের রাজপথ থেকে তুলে কাঁটার মতো দূরে নিক্ষেপ করা হবে। কারণ পুরুষকে সৃষ্টি করার যেমন একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে তেমনি নারীকে সৃষ্টিরও একটা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে। মানুষের এ দু’টো শ্রেণী দিয়ে আল্লাহ অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করেছেন,

لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاء يَهَبُ لِمَنْ يَشَاء إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاء الذُّكُورَ

أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَن يَشَاء عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ

‘আসমানসমূহ ও জমিনের মালিকানা আল্লাহরই, তিনি যা চান তা-ই সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা তাকে কন্যা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা পুত্র-কন্যা উভয় প্রকার সন্তান দান করেন, আবার যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।’ (সূরা : আশ-শুরা আয়াত : ৪৯–৫০)।

ইসলাম নারী জাতিকে লাঞ্ছনা ও অমর্যাদাকর অবস্থান থেকে দ্রুততার সঙ্গে উঠিয়ে এনে এমনই অধিকার ও মর্যাদা দান করেছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«كُنَّا نَتَّقِي الْكَلَامَ وَالِانْبِسَاطَ إِلَى نِسَائِنَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَيْبَةَ أَنْ يَنْزِلَ فِينَا شَيْءٌ فَلَمَّا تُوُفِّيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَكَلَّمْنَا وَانْبَسَطْنَا»

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমরা আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে এবং প্রাণ খুলে মেলামেশা করতেও ভয় পেতাম, এ ভেবে যে, আমাদের সম্পর্কে কোনো আয়াত যেন নাজিল না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর আমরা প্রাণ খুলে তাদের সঙ্গে মিশতে শুরু করলাম।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস নম্বর: ৫১৮৭)।

এ নির্যাতিত শ্রেণীটির বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত ছিল না। আল-কোরান বললো যে, না, তারাও জীবিত থাকবে এবং যে ব্যক্তিই তার অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে, মহান আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ

بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ

‘আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সূরা: আত-তাকভীর, আয়াত: ৮, ৯)।

আব্দুল্লাহ ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ كَانَتْ لَهُ أُنْثَى فَلَمْ يَئِدْهَا وَلَمْ يُهِنْهَا وَلَمْ يُؤْثِرْ وَلَدَهُ عَلَيْهَا - قَالَ يَعْنِى الذُّكُورَ - أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّة

যে ব্যক্তির কন্যা সন্তান আছে, আর যে তাকে জ্যান্ত কবরস্থ করেনি কিংবা তার সঙ্গে লাঞ্ছনাকর আচরণ করেনি এবং পুত্র সন্তানকে তার ওপর অগ্রাধিকার দেয়নি, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৫১৪৮)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

مَنْ عَالَ ثَلاَثَ بَنَاتٍ فَأَدَّبَهُنَّ وَزَوَّجَهُنَّ وَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ فَلَهُ الْجَنَّة

‘যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তান লালন পালন করেছে, তাদেরকে উত্তম আচরণ শিখিয়েছে, বিয়ে দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করেছে সে জান্নাত লাভ করবে।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৫১৪৯)।

নারীদের প্রতি কোমল ব্যবহারের গুরুত্ব প্রকাশ করছে কোরানের নিম্নোক্ত নির্দেশ,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ 

‘আর নারীদের সঙ্গে সদয় আচরণ কর।’ (সূরা: আন-নিসা, আয়া: ১৯)।

এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীরা উটের পিঠে সফর করছিলেন। স্ত্রীদের কাঁচের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বললেন,

رُوَيْدًا سَوْقَكَ بِالْقَوَارِير

‘কাঁচগুলোকে (স্ত্রীদেরকে) একটু দেখে শুনে যত্নের সঙ্গে নিয়ে যাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ৬১৮২)।

এসব হাদিস থেকে আমরা নারী জাতি সম্পর্কে ইসলাম মানুষের মধ্যে যে মেজাজ, আবেগ ও সহানুভূতি সঞ্চার করতে চেয়েছে তা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি।

(ঙ) মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা : ইসলাম সুবিচার ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কেবলমাত্র উৎসাহব্যঞ্জক উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার আইনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রতিষ্ঠিত করেছে। সে আইন সর্বদিক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ।

ইসলাম নারীর শিক্ষা অর্জনের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদির নিশ্চয়তা বিধান করেছে। ইসলামী শরীয়াতের সীমার মধ্যে থেকে অর্থনৈতিক ব্যাপারে শ্রম-সাধনা করার অনুমতি রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে