ইসলামের দৃষ্টিতে নারী  (শেষ পর্ব)

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী  (শেষ পর্ব)

ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২৪ ১০ মার্চ ২০২০  

যদি প্রকৃতই ইসলাম মেনে চলা হয় তাহলে নারীর নির্যাতিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই

যদি প্রকৃতই ইসলাম মেনে চলা হয় তাহলে নারীর নির্যাতিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই

ইসলাম ব্যভিচার, দেহব্যবসা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও দেহপ্রদর্শনীকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَسَآءَ سَبِيلٗا

‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা ও খারাপ পথ।’ (সূরা: আল-ইসরা, আয়াত: ৩২)।

আরো ইরশাদ হয়েছে,

وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ [الانعام

‘আর তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতার কাছাকাছি যেয়ো না।’ (সূরা: আল-আনআম, আয়াত: ১৫১)।

অতএব, ইসলামে বেশ্যাবৃত্তির কোনো স্থান নেই এবং নারীদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারেরও কোনো বিধান নেই। বরং এ সবই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। ইসলামের এ অনুশাসন মেনে চললে এগুলোর কারণে নারী যে নির্যাতন ও অবমাননার মুখোমুখি হয় সে পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।  (২য় পর্বের অংশবিশেষ)

আরো পড়ুন>>> ইসলামের দৃষ্টিতে নারী (পর্ব-২)

(৩) ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে ইতঃপূর্বে তার কিছু বিবরণ দেয়া হয়েছে, সেসব অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করার কোনো বৈধতা ইসলামে নেই। ইসলাম নর-নারী উভয়কে উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করে বলেছে,

فَرِيضَةً مِّنَ اللّهِ إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيما حَكِيمًا

‘এটা আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ।’ (সূরা: আন-নিসা, আয়াত: ১১)। 

ইসলাম নারীদেরকে দায়িত্বভার অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি দিলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের পার্থক্য না থাকায় সমান সম্পত্তি দিয়েছে। যেমন পূর্বের আয়াতটিরই একাংশে বলা হয়েছে,

وَلِأَبَوَيۡهِ لِكُلِّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا ٱلسُّدُسُ

‘বাবা-মা প্রত্যেকের জন্য রয়েছে এক ষষ্ঠাংশ।’ (সূরা: আন-নিসা, আয়াত : ১১)।

নারীর মোহরানার অধিকার সম্পর্কে ইসলাম বলেছে,

قَدۡ عَلِمۡنَا مَا فَرَضۡنَا عَلَيۡهِمۡ فِيٓ أَزۡوَٰجِهِمۡ [الاحزاب

‘আমি জানি আমি তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কী (মোহরানা) ফরজ করেছি।’ (সূরা: আল-আহযাব, আয়াত: ৫০)।

নারীদেরকে যত অধিকার আল্লাহ দিয়েছেন তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে তাদেরকে নির্যাতন করার এখতিয়ার কারো নেই।

এছাড়া নারীর গৃহাস্থলী কাজের স্বীকৃতি আমরা দেখতে পাই আমীরুল মুমেনিন উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনে। এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর দৌরাত্মপনা সম্পর্কে অভিযোগ করার জন্য তার কাছে এসে দেখল যে, স্বয়ং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী চেঁচামেচি করছে আর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু ধৈর্য ধরে চুপ করে আছেন। সে ব্যক্তি ভাবল উমারের অবস্থা তো দেখি আমার চেয়ে খারাপ। তাই কিছুটা বিফল মনোরথ হয়ে সে চলে যেতে থাকলে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার আগমন ও প্রস্থান টের পেয়ে তাকে ডাকলেন এবং সবকিছু শুনে বললেন, দেখ আমাদের স্ত্রীদের অবদান আমাদের প্রতি অনেক বেশি। সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের যথেষ্ট সহনশীল হওয়া উচিত।

(৪) বাসা-বাড়ীতে কর্মরত কাজের মেয়ে এবং বুয়া ক্রীতদাসী নয়। ক্রীতদাস প্রথা আজ আর নেই। অথচ বিদায় হজের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কি ক্রীতদাস-দাসীদের প্রতিও সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন,

أَرِقَّاءَكُمْ أَرِقَّاءَكُمْ أَرِقَّاءَكُمْ أَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ وَاكْسُوهُمْ مِمَّا تَلْبَسُون

‘তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমাদের দাসদাসীদের ব্যাপারে সাবধান! তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে এবং তোমরা যা পরবে তাদেরকে তা পরতে দেবে।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নম্বর: ১৬৪০৯, ২১৪৮৩, ২১৫১৫, আত-তাবাকাত আল-কুবরা ২/১৮৫)। সুতরাং তাদের প্রতি দূর্ব্যবহার করার কোনো স্থান ইসলামে নেই।

(৫) নারীকে যে কোনো ছুতোয় দৈহিকভাবে কিংবা মানসিকভাবে নির্যাতন করা শরীয়তে বৈধ নয়। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবনে তার কোনো স্ত্রী কিংবা কন্যার গায়ে হাত তোলেননি।

(৬) নারীকে অপবাদ দিয়ে মানসিক নির্যাতন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন,

وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ ٱلۡمُحۡصَنَٰتِ ثُمَّ لَمۡ يَأۡتُواْ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَ فَٱجۡلِدُوهُمۡ ثَمَٰنِينَ جَلۡدَةٗ وَلَا تَقۡبَلُواْ لَهُمۡ شَهَٰدَةً أَبَدٗاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ

‘আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।’ (সূরা: আন-নূর, আযাত: ৪)।

(৭) স্বামী-স্ত্রীর অস্বস্তিকর জীবনের সুন্দর সমাধানের জন্য ইসলাম তালাকের বিধান রেখেছে। স্বামীর হাতে যদিও তালাকে প্রাথমিক অধিকার ন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু সে অধিকার অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করাও শরীয়তে আরেকটি অন্যায় ও গোনাহরূপে বিবেচিত। মূলত বিবাহ যেমন- পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে তেমনি তালাকও সেরকম বোঝাপড়ার মধ্যে সম্পন্ন হওয়াই ইসলামের নির্দেশ। এজন্যই সাংসারিক অশান্তি দেখা দিলে উভয়ের মধ্যে দুপক্ষের সালিস বসিয়ে একটি সমাধানে পৌছার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,

وَإِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَيۡنِهِمَا فَٱبۡعَثُواْ حَكَمٗا مِّنۡ أَهۡلِهِۦ وَحَكَمٗا مِّنۡ أَهۡلِهَآ إِن يُرِيدَآ إِصۡلَٰحٗا يُوَفِّقِ ٱللَّهُ بَيۡنَهُمَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرٗا 

‘আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত।’ (সূরা: আন-নিসা, আয়াত: ৩৫)।

দু’পক্ষ ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতেই একমত হয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নেবে। সালিসের পর করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 

فَإِمۡسَاكُۢ بِمَعۡرُوفٍ أَوۡ تَسۡرِيحُۢ بِإِحۡسَٰنٖۗ

‘অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে।’ (সূরা: আল-বাকারাহ, আয়াত: ২২৯)।

রাগের মাথায় তালাকের বিধান মূলত ইসলামে সমর্থিত নয়। এজন্যই প্রায় সব মুসলিম আলেম একমত যে, প্রচণ্ড রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানহারা হয়ে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। এছাড়া তিন তালাক একসঙ্গে দিলে ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ ও ইবনুল কাইয়েমসহ আরো অনেক মুসলিম স্কলারের মতে এক তালাকই পতিত হবে। এসব তথ্য জানা থাকলে তালাকের অপব্যবহার বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব।

(৮) আখেরাতের জবাবদিহিতা: যদি কেউ নারী নির্যাতন করে থাকে তাহলে আখেরাতে তাকে এজন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যাপারে আয়াত ও হাদিসের সংখ্যা অত্যন্ত ব্যাপক। মূলত জবাবদিহিতা একজন মুসলিমকে উত্তম চরিত্রের মুসলিমে পরিণত করে।

উপসংহার

বস্তুত ইসলামই যেমন নারীকে দিয়েছে সব ন্যায্য অধিকার, তেমনি তাকে হেফজতের ব্যবস্থা করেছে সব প্রকার নির্যাতন থেকে। কেননা ইসলামী বিধান তো সে মহান সত্ত্বার কাছ থেকে অবতারিত যিনি নারীর স্রষ্টা। সুতরাং নারী-নির্যাতন মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের জন্য ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। যদি প্রকৃতই ইসলাম মেনে চলা হয় তাহলে নারীর নির্যাতিত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে