ইসমে আযম অনিঃশেষ শক্তির উৎস

ঢাকা, শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৭ ১৪২৭,   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ইসমে আযম অনিঃশেষ শক্তির উৎস

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৮ ৩০ মে ২০২০  

ইসমে আযম এমন নাম, যখন ওই নাম নেবে তখন সব দোয়া কবুল হয়ে যাবে।

ইসমে আযম এমন নাম, যখন ওই নাম নেবে তখন সব দোয়া কবুল হয়ে যাবে।

হাদিস শরিফে এসেছে আল্লাহ তায়ালার নামের মাঝে একটি নাম ইসমে আযম। এ নামের বরকতে যে দোয়া চাওয়া হয়; তা কবুল হয়। তবে আল্লাহর কোন গুণবাচক নামটি ইসমে আযম তা আমাদের কারোরই জানা নেই। তবে বিভিন্নজন বিভিন্ন নামের কথা বলে। চলুন আলোচনার মাধ্যমে তা জানার চেষ্টা করি। 

ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) অনুসন্ধান করার পর বলেন, আল্লাহ তায়ালার সত্তাগত নাম ‘আল্লাহ’ আর এটিই ইসমে আযম। কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রহ. তাফসিরে মাযহারীতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তিনিও এমন ফলাফল বের করেছেন যে, ইসমে জাত বা সত্তাগত নামই ইসমে আযম। আসিফ বিন বরখিয়ার নামে একজন বড় মাপের বুযুর্গ ছিলেন। তার ইসমে আযম জানা ছিল। যার ফলে তিনি রানী বিলকিসের সিংহাসন তুলে এনেছিল। 

এখন কথা হলো সবাই কি ইসমে আযমের আধিকারী হতে পারে? এর উত্তর হলো না, সবাইকে আল্লাহ ইসমে আযম জানার ও বুঝার তৌফিক দেয় না। ইসমে আযম এমন নাম, যখন ওই নাম নেবে তখন সব দোয়া কবুল হয়ে যাবে। অবশ্যই কিছু মুখ এমন হয়ে থাকে যে, তাতে সে পদোন্নতি পায় যে, যখন এই আল্লাহ শব্দ তার থেকে বের হয় তখন তার ইসমে আযমের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উদাহরণ হিসেবে হজরত ঈসা আ. মৃত ব্যক্তিকে বললেন- قم بإذن الله আল্লাহর নির্দেশে উঠে যাও। তখন মৃত লোকটি অল্প সময়ের জন্য জীবিত হয়ে যায়। আমরা যদি এখন قم باذن الله বলি তাহলে ঘুমন্ত মানুষও জাগ্রত হয় না। মৃত ব্যক্তি জীবিত হবে দূরের কথা। অথচ সেই একই শব্দ হজরত ঈসা আ. ব্যবহার করে মৃতকে জীবিত করে দিলেন। আমরা লক্ষবার বলি। তবুও মৃত জীবিত হবে না। শব্দ তো একই কিন্তু জবানের ব্যবধান। তা ছিল নবীর জবান। আমরা মুখ তো মিথ্যুকের জবান। তাই আমাদের প্রতিক্রিয়া নেই। 

আপনি ভাবেন গুলি দ্বারা বাঘ মরে যায়। কিন্তু ওই গুলিই যদি গুলতিতে রেখে মারা হয় চড়ুইও মরে না। যদি বন্দুকে রেখে ফের মারে তাহলে বাঘ মরবে, হাতি মরবে। এভাবে ইসমে আযম তো আল্লাহ-ই। এটি মিথ্যাবাদীর মুখ থেকে বের হলে তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। যে মুখে মানুষ কূটকৌশল আঁটে, যে মুখে মানুষ ষড়যন্ত্র পাকায়। অশ্লীল-অভদ্র গালাগালি করে এমন মুখ থেকে এ শব্দ বের হলে তাতে বরকত প্রকাশিত হয় না। বরকত প্রকাশ হওয়ার জন্য জবান সঠিক হওয়া চাই। ইসমে আযম আল্লাহ-ই । কিন্তু যখন কোনো সত্যবাদীর যবান থেকে বের হয় তখন তাতে প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। এর কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি ইতিহাস থেকে-

এক. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক গাছের ছায়া বিশ্রাম করতে তরবারি ঝুলিয়ে রেখে শুয়ে গেলেন। নিদ্রা এসে গেল। সুমামা ইবনে উছাল যিনি তখনও মুসলমান হয়নি বরং মুসলমানদের বিশাল শত্রু ছিল। সে রাসূলকে (সা.) ঘুমন্ত দেখে মনে মনে বলে এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো এবং তরবারি হাতে নিল। সে চাইল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আঘাত করার পূর্বে কিছু মজার কথা বলে নিই। তাই সে বললো হে মুহাম্মদ! আজকে আমার হাত থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তমনে বললেন- আল্লাহ! আল্লাহ বলার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতর এতো প্রভাব সৃষ্টি করলো যে, সে ভয়ের সঞ্চার হলো যে, সে কাঁপতে শুরু করল। এমনকি তার হাত থেকে তরবারি নিচে পড়ে গেল। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরবারি উঠিয়ে তুলে নিলেন এবং বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?

একথা শুনে সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খোশামোদ করতে লাগল, আপনি তো কুরাইশ বংশের লোক। উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, অভিজাত, উত্তম চরিত্রবান, শত্রুদের প্রতি দয়ার্দ্র, সৎসাহসী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও! আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষমা করে দিলেন, তখনও ছুমামা বিন উছাল দাঁড়িয়ে রইল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- ছুমামা! আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তুমি যাচ্ছ না কেন? সে আরজ করল, হে আল্লাহর প্রিয় নবী! আপনি তো ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন দাঁড়িয়ে আছি যেন আমাকে কালেমা পড়িয়ে দেন যেন আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহু আকবার!

দুই. সাতশত হিজরি সনে তাতারীদের অত্যাচার উৎপীড়ন এত বৃদ্ধি পেল যে, তারা মুসলমানদের রাজত্ব কেড়ে নিল। তৎকালে গোটা বিশ্বের কোথাও মুসলমানদের রাজত্ব ছিল না। তাতারীরা এত বেপরোয়া হয়ে গেল যে, বাগদাদে একদিনে দুই লাখ মুসলমানকে হত্যা করে ফেলল। মুসলমানদের ওপর তাদের এতো প্রভাব বিস্তৃত হলো যে, এক তাতারী নারী এক মুসলমান পুরুষকে দেখে বলতে লাগল, খবরদার! একটুও নড়বে না। সে মুসলমান ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। তাতারী নারী ঘরে গেল এবং তরবারী এনে ওই মুসলমানকে হত্যা করে ফেলল। তাতারীরা যে শহরে প্রবেশ করত সে শহরই মুসলিম শূন্য করে ফেলত। 
দরবন্দ এক শহরের নাম। এক তাতারী শাহজাদা তার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সেখানে গেলে মুসলমানরা ওই শহর খালি করে দিল। সে হাসতে হাসতে বলল, আমাদের বীরত্ব দেখ যে, মুসলমান আমাদের নাম শুনলেই শহর খালি করে পালিয়ে দেয়। এমন সময় তার সেনাপ্রধান জানাল, জনাব! শহরে এখনো দুই ব্যক্তি বাকি আছে। বের হয়নি হবে বলে আশাও করা যায় না। একজন সাধা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধলোক এবং একজন তার খাদেম। তারা দুইজন মসজিদে বসা। শাহজাদা রেগে গিয়ে বলল, তারা এখনো বের হয়নি? বলা হলো যে, বের হয়নি? না!

শাহজাদা বলল তাদেরকে শিকলে বেঁধে আমার কাছে নিয়ে এসো। শাহজাদার সামনে দাঁড় করাল। তার নাম শেখ আহমদ দরবন্দী (রহ.) যিনি নকশবন্দী সিলসিলার বড় বুযুর্গ ছিলেন। শাহজাদা বলল, তোমার কি জানা ছিল না আমি এ শহরে এসেছি। তিনি বললেন, জানা ছিল। বলল, তাহলে শহর থেকে বের হলে না কেন? তিনি বললেন, আমরা কেন বের হব। আমরা তো আল্লাহর ঘরে বসা ছিলাম। সে ক্রোধান্বিত হয়ে বলতে লাগল, এখন আমার শাস্তি থেকে তোমাকে কে বাঁচাবে। সে যখন একথা বলল, তখন হজরত দরবন্দী (রহ.) জোশে এসে বললেন, আল্লাহ! যখনই তিনি আল্লাহ শব্দ বললেন, তখনই তাদের হাত থেকে হাতকড়া ভেঙে নিচে পড়ে গেল। যখন শাহজাদা এ দৃশ্য দেখলো তখন শঙ্কিত হলো। এ তো অসাধারণ ব্যক্তি। তাই বলতে লাগল, ঠিক আছে। আমি আপনাকে এ শহরে অবস্থানের অনুমতি দিচ্ছি।

তিন. আমাদের এলাকার হজরত খাজা গোলাম হাসান সিওয়াগ নামে এক বুযুর্গ ছিলেন। তার একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। এর প্রত্যক্ষদর্শী হাজারো মানুষ সাক্ষ্যদাতা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এক এলাকায় হিন্দু মুসলমান একত্রে সহাবস্থান করছিল। একজন হিন্দুনেতা হজরতের তাওয়াজ্জুহতে মুসলমান হয়ে গেল। হিন্দুরা খাজা সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলো যে, খাজা সাহেব হিন্দুদের ওপর যাদু করে মুসলমান বানিয়েছে। বিচারকও হিন্দু ছিলেন। হজরতকে যেসব পুলিশ বন্দী করে এনেছিল, তারাও হিন্দুই ছিল। হজরত যখন বিচারকের সামনে গেলেন। পুলিশের সিপাহী ও থানার নির্বাহী কর্মকর্তা হজরতকে ঘিরে রেখেছিল। বিচারক হজরতকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এই হিন্দুকে কেন মুসলমান বানালেন? হজরত বললেন, না। আমি তাকে মুসলমান করিনি। সে তো নিজেই মুসলমান হয়েছে। বিচারক তাকে পীড়াপীড়ি করছিল যে, তাকে তুমিই মুসলমান বানিয়েছ। পরিশেষে হজরত হিন্দু থানার নির্বাহী কর্মকর্তার দিকে আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে বললেন, আমি কি তাকেও মুসলমান বানিয়েছি? সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ শব্দের আন্তরিক তাওয়াজ্জুহ দিলেন সে তৎক্ষণাৎ কালেমা পড়তে লাগল। এরপর অপরজনের প্রতি ইশারা করলো সেও কালেমা পড়তে লাগলো। তারপর এভাবে তিনি যে হিন্দুর দিকেই হাত তুলে ইশারা করতেন, সেই মুসলমান হয়ে যেত। সেখানে দাঁড়িয়ে পাঁচজন হিন্দু মুসলমান হয়ে গেল, কালেমা পড়ে নিল। এ অবস্থা দেখে বিচারক অন্য কক্ষে চলে গেলেন এবং বলতে লাগলেন আবার আমার দিকে আঙ্গুলের ইশারা না হয়। সেখানেই নির্দেশ দিলেন যে, খাজা সাহেবকে সসম্মানে খালাস দেয়া হলো, মুক্তি দেয়া হলো। আপনারা সবাই এখান থেকে চলে যান। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর নামে বড়ই বরকত। কিন্তু আফসোস! এ নামটি আমাদের নেয়া হয় না। 

প্রিয় পাঠক/ প্রিয় পাঠিকা! আসুন ইসমে আযম আয়ত্ব করার আগে নিজের জবানকে আয়ত্ব করি। নিজের জবানকে সুন্দর ও আল্লাহ নাম জপার উপযুক্ত করি। আল্লাহর নামের উপযুক্ত করতে হলে বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকতে হবে। প্রচুর জিকির করতে হবে। জিকিরের সঙ্গে জীবনকে কাটাতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে জিকিরের মধ্য দিয়ে ইসমে আযম আয়ত্ব করার তৌফিক দান করুন আমিন। 

খুতবাতে যুলফিকার থেকে সংগ্রহীত

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে