.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১০ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

ইলিশ গবেষনায় বাকৃবির যুগান্তকারী সাফল্য

বাকৃবি প্রতিনিধি

 প্রকাশিত: ২১:১২ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২২:২০ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিশ্বে প্রথমবারের মতো ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক ২ বছর গবেষণা করে নিজ উদ্যোগে ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স এবং অ্যাসেম্বিলিং করেছেন।

সম্প্রতি সারা দেশের বিজ্ঞানীদের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন ঘোষণা করেন বাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবর।

ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচনের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কথা বলেছেন প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম। সাক্ষাতকার নিয়েছেন ডেইলি বাংলাদেশের বাকৃবি প্রতিনিধি শাহীদুজ্জামান সাগর।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাকে অভিনন্দন। কী চিন্তাধারা থেকে ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স এবং অ্যাসেম্বিলিং করার কাজ শুরু করলেন।

সামছুল আলম: আপনি জানেন ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। স্বাদে ও পুষ্টিমানে ইলিশের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। সাগর ও নদী উভয় পরিবেশে ইলিশ জীবনযাপন করতে পারে। পৃথিবীর মোট ইলিশের ৬০ ভাগ উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। দেশের ৪ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণের সাথে সরাসরি জড়িত। আমরা যেহেতু মাছ নিয়ে গবেষণা করি এবং ইলিশ এ দেশের একটি মূল্যবান সম্পদ, এ জন্য ইলিশ নিয়ে মৌলিক গবেষণার চিন্তা মাথায় আসে।

ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণা দলে কারা কারা ছিলেন?

সামছুল আলম: ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের আমি ও অধ্যাপক ড. মুহা. গোলাম কাদের খান, পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা এবং বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম।

ডেইলি বাংলাদেশ: কিভাবে গবেষণা শুরু করলেন?

সামছুল আলম: ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ইলিশের জীবনরহস্য উদঘাটনের পরিকল্পনা হাতে নিই। ২০১৬ সালের মে মাসে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ওই বছরের জুনে আমরা নমুনাগুলো থেকে ডিএনএ প্রস্তুত করি। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে জিনোম সিকোয়েন্স ও অ্যাসেম্বিলিং শেষ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি জেনেটিক ল্যাব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সুপার কম্পিউটার ল্যাব এবং দেশে সুযোগ না থাকায় কিছু গবেষণা কাজ যুক্তরাষ্ট্রের জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: জিনোম সিকোয়েন্স বা জীবনরহস্য ব্যাপারটা কি?

সামছুল আলম: জিনোম হচ্ছে কোন জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াসহ সকল জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোম দ্বারা। ইলিশের জিনোমে ৭৬ লক্ষ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড (জিন গঠনের উপাদান) রয়েছে বলে আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক চতুর্থাংশ।

ডেইলি বাংলাদেশ: ২০১৭ সালে কাজ শেষ করার পর এ বিষয়ে আপনাদের কি কোনো স্বীকৃতি রয়েছে?

সামছুল আলম: জীবনরহস্য আবিষ্কার করলেই চলবে না, চাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিও পেতে হবে। ২০১৭ সালের আগস্টে জিনোম নিবন্ধনের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) তথ্যভান্ডারে গবেষণার ফল জমা দিয়েছি এবং সেখানে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বে প্রথমবারের মতো নিবন্ধিত হয়েছি। তাছাড়া এ বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ ও প্রাণীর জিনোম সম্মেলনে ইলিশের জীবনরহস্য উপস্থাপন করেছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের ফলে কি কি দ্বার উন্মোচন হলো?

সামছুল আলম: ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স জানার মাধ্যমে এই মাছটি নিয়ে গবেষণা যেমন- উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসইকরণ, জৈবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর রহস্য, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, প্রজনন ও টেকসই আহরণ প্রভৃতি নিয়ে অধিকতর গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হলো। তা ছাড়া ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের করণীয়, বিভিন্ন নদীতে ইলিশের বিস্তৃতি এবং জলসীমায় মাছটির মজুত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

সামছুল আলম: জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার বলতে গেলে এটা শুধু শুরু, আরো অনেক কাজ করার রয়েছে। সিকোয়েন্সের জিনগুলো সনাক্তের মাধ্যমে ইলিশ নিয়ে অধিকতর মৌলিক গবেষণা করতে হবে। আর সেটি করতে পারলে ইলিশকে সহজলভ্য ও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সে লক্ষ্যে গবেষণা করতে আমরা আগ্রহী।

 ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ