Alexa ইন্দিরা ।। রঞ্জনা বিশ্বাস

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬,   ১৬ মুহররম ১৪৪১

Akash

ইন্দিরা ।। রঞ্জনা বিশ্বাস

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩২ ৩০ আগস্ট ২০১৯  

প্রচ্ছদ: শিব কুমার মেননের আঁকা প্রতিকৃতি ব্যবহার করে

প্রচ্ছদ: শিব কুমার মেননের আঁকা প্রতিকৃতি ব্যবহার করে


নিজের ঘরে ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন ইন্দিরা। চেয়ার দোলাচ্ছেন।  কপালের মাঝখানে চিন্তার ভাঁজ। শীতের রাত তবু মাথার ওপর ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। বাহাতের চশমাটা নাকের ওপর বসিয়ে উঠতে যাবেন এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। চেয়ারে বসেই রিসিভারটা তুললেন-

‘পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করেছে। ওদের প্রায় লাখ খানেক সৈন্য এখন আমাদের কাছে বন্দি। কিন্তু তারা এখনো অস্ত্র সমর্পন করেনি।’ 

রিসিভার নামিয়ে রাখলেন ইন্দিরা। চেয়ার থেকে উঠে অস্থির পায়চারী করছেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। তাহলে ওদিকে মুজিবের কী হচ্ছে? এখনো তার কোনো খরবই তিনি জানতে পারলেন না। এরকম অস্থিরতা আর দুঃশ্চিন্তার দিন ইন্দিরার জীবনে কখনোই আসেনি। টিপাইয়ের ওপরে রাখা গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক ঢোক জল খেলেন তিনি। এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরের মধ্যখানে দাঁড়ালেন। মুষ্ঠিবদ্ধ ডান হাতটা বামহাতের তালুর মধ্যে নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন-‘তবে কি আমার সব স্বপ্নই শেষ হয়ে যাবে? কোনো উপায় তো দেখি না। মানুষটাকে কি তবে হত্যা করবে ওরা?’ পরক্ষণেই সম্পূর্ণ দৃঢতার সাথে উচ্চারন করলেন- ‘না, ও রকম একজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব নয়। কখনোই না।’ এই সময় ফোনটা আবার বেজে উঠলো। বুকের ভেতরে হৃদয়কম্পনটা স্পষ্ট হচ্ছে নিজের কাছেই। তবে কি কোনো দুঃসংবাদ? উৎকণ্ঠা নিয়ে রিসিভারটা তুললেন। ‘র’ এর প্রধান রাম নাথ রাও এর গলা ভেসে এলো। ‘মি. রাও, বলুন কী খবর? 
‘ইয়াহিয়া পদত্যাগ করেছেন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে তিনি শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি চেয়েছেন ভুট্টোর কাছে। আর শেখ মুজিব এখনো মিয়ানওয়ালী কারাগারেই বন্দি আছেন’। 

ওহ্, ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম আমি। ভুট্টোর কোনো খবর জানেন? মি. রাও?  জানতে চান ইন্দিরা। রাও বললেন-‘তিনি এখন আমেরিকায় আছেন। খুব শীঘ্রই দেশে ফিরবেন।’ 

‘মুজিব সম্পর্কে তার মনোভাব কী ?  কিছু কি আঁচ করতে পেরেছেন? ’
 : না।

এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন ইন্দিরা। কিন্তু সংযত হয়ে বললেন,‘মি. রাও, জেনে রাখুন, ওর কিছু হোক আমি সেটা চাই না। যে কোনো মূল্য দিতে আমি রাজি আছি ওর জন্য।’ রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন ইন্দিরা। এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা শতাব্দীর মত লাগছে। 

‘মুজিব এখনো মিয়ানওয়ালী কারাগারে আছেন। তার মানে  তিনি এখন ঝুঁকির মধ্যে আছেন। যে কোনো সময় কমান্ডো সেখানে যেতে পারে। ইন্দিরার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিয়ানওয়ালী কারাগারের ছবি। এই কারাগারের একটি কক্ষে বসে আছেন আসক্তিহীন, মোহমুক্ত, ইস্পাত কঠিন জ্যোতির্ময় মানুষ! ইন্দিরা আঁচল দিয়ে মুখটা মুছলেন। মনে পড়ে গেল সেই দিনের লোকসভার অধিবেশনের বিশেষ দিনটির কথা।এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশত সত্তর বর্গকিলোমিটারের ভূখণ্ডকে সেই দিন তিনি স্বীকৃতি দিয়ে যেই বললেন, ‘বাংলাদেশ’ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে সকল সদস্য দাঁড়িয়ে গেলেন। তুমূল হর্ষধ্বনির মধ্যে সেইদিন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন কেবল একজনের মুখ। আজ সেই মানুষটির জন্য তিনি অস্থির; দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ। তিনি হেঁটে জানালার কাছে গেলেন। পর্দাটা সরিয়ে জানালার এক পাট খুলে দিলেন। অন্ধকারে নিয়নের ক্ষিণআলো এসে ঘরে ঢুকলো। ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, ‘তবে কি তুমি আকাশ ভ্রষ্ট প্রবাসী আলোক!’ তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে আওড়ালেন- ‘দেবতার হয়ে হেতা তাহার সন্ধানে আমি দুবাহু বাড়ালেম।’ ইন্দিরা শান্ত ভাবে জানালা বন্ধ করে টেলিফোনের পাশে এসে দাঁড়ালেন। একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। 


১৯ ডিসেম্বর। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গলফ মাঠে অস্ত্র সমর্পণ করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ফরমান আলীর মুখখানা তখন প্রাচীন যুগের অন্ধকার গুহার মতোই লাগছিল। সূর্যোদয়ের নব আলোতেও সেই অন্ধকার তার জট খুলছিল না। 

রামনাথ রাও ফোন করলেন। ‘আজ থেকে প্রায় লক্ষাধিক সৈন্যের দায়-দায়িত্ব নিতে হচ্ছে আমাদের। ওরা এখন জেনেভা কনভেনশনের আওতায় চলে গেছে।’ ইন্দিরা বললেন, ‘ঠিক আছে মি. রাও। মুজিব সম্পর্কে বলেন।’ ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। এপাশে গলার স্বর আর একধাপ নিচে নামিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে ইন্দিরা বলতে লাগলেন-‘আমার অন্তরের সবটুকু সত্য যদি আপনি ধরতে চান-তবে তা হলো শেখ মুজিব। একটা মানুষ সম্পর্কে শত বছর ধরে মানুষ যতটা জানবে, তার চেয়ে বেশি আমি জেনেছি। মিয়নওয়ালী কারাগারে তিনি নিরাপদ নন। বুঝতে পারছেন মি. রাও? ইমাজেন্সি মিটিং কল করুন। ইন্দিরা হারতে পারে না।’ উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি ফোন রেখে দিলেন। 

একি হচ্ছে তার? কোন কুগ্রহের ফের তাকে সাধারণ্যক করে তুলছে। জীবনে কত ঝড় ঝাপটা এসেছে কই সেই দিনগুলোতে তো এমন হয়নি। কোনো সংকটই তো তার জীবনের প্রধান সংকট হয়ে ওঠেনি! কিন্তু আজ কেন সেই ইন্দিরা অন্তরে বিধ্বস্ত! 

মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে না সরানো হচ্ছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই। মুহূর্তে মুখটা ভেসে ওঠে ইন্দিরার সামনে। মিয়ানওয়ালীর একটা কক্ষে মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনছে একটা মানুষ। তার জন্য কারা কক্ষের সামনে খোঁড়া হয়েছিল কবর। সেই দিকে তাকিয়ে তিনি রক্ষীর কাছে জানতে চাইলেন-‘এটা কী’ রক্ষী বলেন-‘যুদ্ধ চলছে। এটা বাংকার। শেল্টারের জন্য।’ এক কয়েদি তখন কানের কাছে ফিস ফিস করে জানালো ‘ওটা আসলে কবর। তোমার জন্য খোঁড়া হয়েছে।’

সেইদিন কি এতটুকুও কেঁপে ওঠেনি মানুষটার বুক? ইন্দিরা ভেবে পান না কেমন করে তিনি সেই মরন মরুর পারে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন ‘মরনে আমার ভয় নাই। কবরকে আমি পরোযা করি না। আমি জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু জেনে রাখো, আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই। যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসি মুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। তবে একটাই অনুরোধ, হত্যা করার পর আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। আমি বাংলার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চাই।’ এই রকম এক মানুষকে কিছুতেই মরতে দেয়া যায় না। টেলিফোনটা বেজে উঠলো। ইন্দিরা টেলিফোন তুললেন। 

বলুন মি. রাও।

: আপনার পরিকল্পনা মতো সব ব্যবস্থা করে রেখেছি । রিফুয়েলিং এর জন্য ভুট্টোর বিমান যখন হিথরো বিমান বন্দরে পৌঁছবে তখন লায়লা যাবে ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে। আপনি নিশ্চিত থাকুন। ফোন রেখেদিলেন ইন্দিরা। 


 অত সহজেই কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়!ফিরোজ গান্ধিকে নিয়েও কোনোদিন তিনি এমন সংকট ময় রাত পার করেন নি। এরকম উৎকণ্ঠার রাতও তার জীবনে আসেনি। আজ কেন উদ্বেল বুকে করুন আর্তনাদ আছাড় খেয়ে পড়তে লাগল। কেউ জানুক ছাই না জানুক তিনি নিজে তো জানেন ভারত কেবল পাকিস্তানের শক্তিকে খর্ব করার জন্য বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি। এক কোটি শরণার্থীর খরচ, যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের খরচ, আর এখন প্রায় লাখখানেক যুদ্ধবন্দিদের খরচ শুধু কি পাকিস্তানকে শায়েস্তা করার জন্য? মোটেও না। শেষ রক্ষা যদি না হয় এই বয়সে পাঁজর ভাঙার যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারব না। কোনো রকম ভুল করা চলবে না। তাই খুব কৌশলে যুদ্ধ বন্দি পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি মুজাফ্ফর হোসেনের স্ত্রী লায়লাকে পাঠানো হচ্ছে ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে ।লায়লা ভুট্টোর বান্ধবী। থাকেন লন্ডনে। সেই সুযোগটাই নিচ্ছেন ইন্দিরা। 

লন্ডন হিথরো বিমান বন্দরে ভুট্টোর বিমান রিফুয়েলিং এর জন্য ল্যান্ড করলো। লায়লা গেলেন এয়ার পোর্ট লাউঞ্জে। দেখা হলো ভুট্টোর সঙ্গে। কুশল বিনিময়ের পর তিনি তার স্বামীকে ভারত থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। ভুট্টোর অন্তদৃষ্টি সরুলম্বা একখানা চোখ বর্শার মতো। তিনি বান্ধবীকে কাছে টেনে নেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন ‘তুমি কী জানতে এসেছ তা আমি জানি। ফিরে গিয়ে ইন্দিরাজীকে বলো, আমি মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদেব। কিন্তু বদলে কী চাইব সেটা পরে জানাব।’ 

রাও খবর জানালেন। কিন্তু কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। একি মিথ্যা আশ্বাস! তাকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে না তো ভুট্টো! ঘর ভর্তি এত আলো তবু অন্ধকার কাটছে না। এক অচেনা অস্পষ্ট কুয়াশা যেনো তাকে ঘিরে ধরেছে। ইন্দিরা খাঁচায় পোরা এক বন্দি পাখির মতো ছটফট করছেন। এমন সময় রাও এর ফোন এলা ‘ভুট্টোর নির্দেশে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে শেখ মুজিবকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’ একটু হাফ ছাড়লেন ইন্দিরা। তবু স্বস্তি পাচ্ছেন না। যা-ই হোক খড়ার দেশের মানুষকে বিশ্বাস নেই। ওরা ওদের দেশের  পাথুরে মাটির মতোই নিষ্ফল হৃদয়হীন বনস্পতি। 


এদিকে ভুট্টোর নির্দেশ পেয়ে মিয়ানওয়ালী কারাগারের প্রিজনগভর্নর হাবীব আলী একটা ট্রাক নিয়ে রওনা হলেন কারাগারের দিকে। কারাগারের সামনে থামলো তার ট্রাক। তখন নিজের ছোট্ট বিছানায় কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঢুলছেন শেখ মুজিব। লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্য কয়েদিরা তার কাছে এসে ফিস ফিস করে বলল ‘ওরা এসছে’। মুজিব গায়ের কম্বল সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাবীব আলীকে বাঁধা দিয়ে বললেন-‘শেষ পর্যন্ত আমি কারো কাছে মাথা নত করবো না।’ 

হাবীব আলী বললেন ‘শেখ আমি আপনার একজন বন্ধু, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি অপনাকে এখান থেকে নিরাপদস্থনে নিয়ে যেতে এসেছি। এখানে যে কোনো সময় কমান্ডো চলে আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে । আমার উপর আপনি আস্থা রাখুন।’ এবার শেখ মুজিব আসস্ত হলেন। তবে সন্দেহ দূর হলো না। তবু তিনি হাবীব আলীর পায়ের সাথে পা মিলিয়ে ট্রাকে উঠলেন। তাকে ট্রাকে লুকিয়ে রাখা হল। ট্রাক এসে থামলো হাবীব আলীর বাড়ি ‘চশমাব্যারাজ’ এ। বাড়িতে ঢুকেই মুজিব স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চান। 

: আমি কি আমার স্ত্রীকে একটা ফোন করতে পারি?

 জবাব আসে ‘না’। 

: আমি কি খবরের কাগজটা পড়তে পারি?

জবাব আসে ‘না’।

হতাশ শেখ মুজিব এককাপ চা চাইলেন। এবার তাকে এককাপ চা দেয়া হলো। নীরবে এককাপ চা পান শেষ করে ঠায় বসে রইলেন হাবীব আলীর ড্রইং রুমে। কেউ কোনো কথা বলছে না। কয়েক জোড়া চোখ তাকে দেখছে। ভীষণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এটা। এখানে দুইদিন কাটানোর পর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো পিন্ডি থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে শাহুল্যায়। বৃটিশ আমলের বৃটিশ সেনাবাহিনীর রেষ্টহাউজে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হলো। একজন কর্নেল এসে তাকে বললেন-‘প্রেসিডেন্ট আসছেন’। সারাটা পথে একটাও কথা বলেননি শেখ মুজিব। এখনো চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর ভুট্টো এলেন। মুখখানা যেনো সেদ্ধ বেগুনের মতো মনে হলো তার। তিনি কুশল বিনিময় করলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘নাউ আই অ্যাম দি প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান এন্ড চিফ মার্শল.ল অ্যাডমিনিসেট্রটর’। 

মুজিব দাঁড়িয়ে হাত মেলালেন। বললেন-‘টেল মি র্ফাস্ট, হোয়েদার আই অ্যাম এ ফ্রিম্যান অর প্রিজনার।’ ভুট্টোর চোখে যেন আগুনের শিখা খেলা করছিল জাত সাপের বাচ্চার মত। মুজিবের চোখে চোখ রেখে বললেন-‘নাইদার ইউ আর এ প্রিজনার নর এ ফ্রিম্যান।’ 

মুজিবের মুখ থমথমে হয়ে গেল। সংযত এবং দৃপ্ত কন্ঠে বললেন-‘ইন দ্যাট কেইস আই ইউল নট টক টু ইউ’। এবার যেন ধাক্কা খেলেন ভুট্টো। খানিকটা অপ্রস্তুত ভুট্টো গলাখাকাড়ি দিলেন। তার মনে হচ্ছে গলা দিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে কি একটা উপরের দিকে ঠেলে উঠছে। ঢোক গিলে সেটাকে পেটে চালান করে বললেন-‘ওকে। ইউ আর এ ফ্রিম্যান।’ এসময় তিনি একটা ইশতেহার দেন তাতে স্বাক্ষর করার জন্য। মুজিব সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। ভুট্টো চলে গেলেন।  

ঠিক এই ফোনটার অপেক্ষায় ছিলেন ইন্দিরা। ক্রিং ক্রিং করে ফোনটা বেজে উঠতেই প্রায় ছুটে এসে ফোনটা তোলেন। ওপাশ থেকে রাও বললেন-‘ভালো খবর আছে। শেখ মুজিবকে ভূট্টো মুক্তি দিতে রাজি আছে তবে একটা শর্ত আছে।’ 
-কী শর্ত?

বিনিময়ে ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দিতে হবে। 

-ওকে। বলো, আমি রাজি। 

কিন্তু অফিসাররা তো বন্দিদের হাতের তাস করে কাশ্মীরের ঝামেলা মেটাতে চাইছে! 

-ঠিক আছে কাশ্মীর নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন যা বলছি তাই করুন। ওদরে জানিয়ে দিন আমরা যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে দিতে রাজী আছি। বিনিময়ে অক্ষত মুজিবকে ফেরৎ চাই। 

: ইয়েস ম্যাডাম। 

ফোন রাখলেন ইন্দিরা। বুকের ভেতরে তার গোলাপ ফুটে উঠলো। তিনি আপন মনে বলে উঠলেন-

‘আছ আর নাই মিলে অসম্পূর্ণ তব সত্তাখানি
আপন গদ্ গদ্ বানী
পারে না  করিতে ব্যক্ত, আশক্তির নিষ্ঠুর বিদ্রোহে’

তারপর ছোট্ট বিরতী দিয়ে দির্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

সব ঠিক ঠাকই ছিল। ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে নিয়ে পিআই এর একটি বিশেষ বিমান লন্ডন যাচ্ছে। কেননা পিআইএ ভারতের উপর দিয়ে যায় না। এদিকে ইন্দিরা অপেক্ষা করে আছেন কবে মুজিব নামবেন ভারতের মাটিতে। ভিতরে ভিতরে এক ধরনের ছেলে মানুষি পেয়ে বসেছে তাকে। কিছুটা ভাবনীয় দুঃসাহস। হ্যাঁ দুঃসাহসই তো নইলে তার ভিতরে অত্যাশ্চর্য যুগ্মসত্তার অস্তিত্ব কেমন করে টের টের পেলেন তিনি? 

অসীম রহস্য নিয়ে মুহুর্তের নিরর্থকতায়
লুপ্ত হবে নানা রঙা জল বিম্বপ্রায়
অসমাপ্ত রেখে যাবে তার শেষ কথা
আত্মার বারতা।

হঠাৎ যেন রুক্ষ শব্দে বেজে উঠলো টেলিফোন। কপালে তিনটি ভাঁজ ফেলে টেলিফোন রিসিভারটা তুললেন।

: খবর পাওয়া গেছে মুজিবের বিশেষ বিমানে পাকিস্তানের জাতীয় হকি খেলোয়াড়দের দলও যাচ্ছে লন্ডন।’

-সমস্যা কী?

: কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে সেই দলে কিছু লোককে পাঠানো হচ্ছে যারা খেলোয়ার নয়।

-আই সী। তারমানে শেখ এখনো নিরাপদ নয়? ঠিক আছে লন্ডন বিমান বন্দরে সুরক্ষার ব্যবস্থা করুণ। যাত্রাপথে কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। তবু সতর্ক থাকতে হবে।
ফোন রাখলেন ইন্দিরা। সহজ সরল এই মানুষটাকে নিয়ে এত চক্রান্ত! ঋাবতে পারছেন না তিনি। অপেক্ষা করতে হচ্ছে কেবল তার ফিরে আসার। আর কিই বা করতে পারেন তিনি। যতটা সাধ্যে কুলায় করছেন।

 ৬

লন্ডন থেকে মুজিবকে নিয়ে বিশেষ বিমানটি নামলো দিল্লী বিমান বন্দরে। সেখানে অপেক্ষা করে আছেন ইন্দিরা। অপেক্ষা করে আছে ঢাকাগামী একটি বিশেষ বিমানও। মুখোমুখী হলেন ইন্দিরা আর মুজিব। ইন্দিরার বুকের ভিতর চিরচঞ্চলগতি যেখানে জ্যোতির্ময় এক মানুষ অনন্তকালের মর্যদা লাভ করে বসে আছেন। মুজিব কি সেকথা টের পেলেন? ইন্দিরা মনে মনে বললেন-‘ÔI will show you fear in handful of dust’ তারপর ঢাকা গামী বিমানের দিকে হাটতে লাগলেন দুজন। পাশাপাশি। হৃদয়ের এক মহচ্চোস্তরে যেখানে প্রচ্ছন্ন থাকে প্রকাশের আকুলতা তা কখনো ইন্দিরা বাইরে আনেন না। তবু কি পূর্ণবৈভবে ও মহিমায় তার প্রকাশ ঘটে না কখনো? হঠাৎ ইন্দিরা হাঁটার গতি শ্লথ করে দাঁড়িয়ে যান। মুখে তার স্বল্প জ্যেস্নার স্নিদ্ধতা। ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করেন-‘তোমার দেশ তো স্বাধীন হলো, এবার তোমার অনুভূতি কী?’ 

মুজিব ডান হাত দিয়ে মুখের পাইপটা বিশেষ কায়দায় সরালেন। বামহাতটা পিছনে। তারপর একটু ঝুকে ইন্দিরার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘তার আগে বলো, তোমার সৈন্যরা আমার দেশ থেকে কবে আসবে?’ 

পরম বিস্ময়ে ইন্দিরা উপর নিচে মাথা দোলালেন।  হেসে বললেন “যেদিন তুমি চাও। সম্ভব হলে আজই।’

তারপর মুজিবকে বহনকারী বিমানটা আকাশে উঠে না যাওয়া পর্যন্ত ইন্দিরা সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন, একা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর