Alexa ইতিহাসের সাক্ষী ‌‘জগতি’ রেলস্টেশন

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ২৭ ১৪২৬,   ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ইতিহাসের সাক্ষী ‌‘জগতি’ রেলস্টেশন

এস রাকিব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৮ ১৯ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২০:২৭ ১৯ অক্টোবর ২০১৯

সংগৃহীত

সংগৃহীত

বাংলাদেশে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন স্থাপনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় রেল যুগের। সে সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ববঙ্গের প্রথম রেলস্টেশন জগতি। এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে এ স্টেশনটি।

জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ সেকশন চালু করতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাতায়াতে ৫৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন স্থাপন করে।

প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জগতি স্টেশন। তখন জ্বালানি কয়লা পুড়িয়ে কালো-সাদা ধোয়া ছড়িয়ে ঝিক ঝিক শব্দে স্টিম ইঞ্জিনের রেলগাড়ি এসে থামতো এই স্টেশনে। রেলগাড়ি দেখতে আশপাশের কৌতূহলি মানুষজনের ভিড়ও লেগে থাকতো স্টেশনে। পণ্য পরিবহনসহ যাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই রেলস্টেশন।

জগতি রেলস্টেশন

এরপর ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে জগতি থেকে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পদ্মানদী তীরবর্তী গোয়ালন্দঘাট পর্যন্ত রেললাইন চালু করা হয়। সে সময় মানুষ কলকাতা থেকে ট্রেনে করে জগতি স্টেশন হয়ে গোয়ালন্দঘাটে যেতেন। সেখান থেকে স্টিমারে পদ্মানদী পেরিয়ে ঢাকায় যেতেন।

এর কয়েক বছর পর ১৮৭৯ সালে ঈশ্বরদীর সাড়া থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত মিটার গেজ এবং পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়। অন্যদিকে, ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে আসে এবং ১৮৮৭ সালে তা নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের সাথে একীভূত হয়।

এরপর ১৮৮৪ সালে দমদম জংশন থেকে খুলনা পর্যন্ত প্রায় ২০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রডগেজ, ১৯০০ সালে সান্তাহার জংশন থেকে ফুলছড়ি পর্যন্ত মিটার গেজ লাইন স্থাপন করা হয়। এছাড়া ১৮৯৫ সালে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৬০ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ লাইন চালু হয়।

১৯১৪ সালে আখাউড়া থেকে টঙ্গী, ১৯১২ সালে কুলাউড়া থেকে সিলেট, ১৯২৮ সালে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জ ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী, ১৯৩০ সালে হাটহাজারী থেকে নাজিরহাট এবং ১৯৩৭ সালে আশুগঞ্জ ও ভৈরববাজারের মধ্যে প্রথম রেলপথ সংযোগ গঠিত হয়। এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেল লাইন নেটওয়ার্ক দেশের ৪৪টি জেলায় সংযুক্ত। এরমধ্যে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশে রেলপথ নির্মিত হয় ২ হাজার ৮৫৮ দশমিক ২৩ কিলোমিটার। আর স্বাধীনতার পর নির্মাণ করা হয় ৯৭ দশমিক তিন কিলোমিটার।

১৯৪৭ সালের আগে অবিভক্ত ভারতবর্ষে রেলওয়ে বোর্ডের মাধ্যমে তৎকালীন রেলওয়ে পরিচালিত হতো। ১৯৭৩ সালে বোর্ডের কার্যক্রম বিলুপ্ত করে রেলকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়।

জগতি রেলস্টেশন

পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে রেলপথ বিভাগ গঠন করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটি (বিআরএ) গঠন করা হয়। তবে গঠিত বিআরএ’র কার্যক্রম পরবর্তীতে অব্যাহত থাকেনি। ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সময়কালে এডিবি'র অর্থায়নে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও রেলপথ বিভাগ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হতো।

তবে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ভেঙে নতুন রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। এরপর শুরু হয় রেলওয়ের উন্নয়ন যাত্রা। এরই মধ্যে রেলওয়ের বহরে যুক্ত হয়েছে বিলাসবহুল লাল-সবুজ কোচ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ডাবল লাইনসহ বিভিন্ন রুটে রেলপথের উন্নয়ন করা হয়েছে। কমিয়ে আনা হয়েছে ট্রেনের রানিং টাইম। সবমিলিয়ে আগের চাইতে বেড়েছে যাত্রীসেবার মান।

জিয়া উদ্দীন নামে কুষ্টিয়ার জগতি গ্রামের এক বৃদ্ধ বলেন, এক সময় স্টেশনে ফুলের বাগান ছিল। ছিল স্টাফ কোয়ার্টার। সব সময় ১৩ থেকে ১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী থাকতেন। একসময় এই স্টেশনে প্রচুর মাল ওঠা-নামা হতো। পান থেকে শুরু করে ধান, সার—সব মালামাল ট্রেনে করে আসত। রেলস্টেশনের পাশেই দুটি সুউচ্চ পানির টাওয়ার ট্যাংক রয়েছে। তৎকালীন সময়ে কয়লার ইঞ্জিনে এখান থেকে পানি দেয়া হতো। এগুলোও নষ্ট হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। দুই থেকে পাঁচ পয়সা ভাড়া দিয়ে ট্রেনে চলাচল করতেন তিনি।

ফরজ আলী নামে স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানদার বলেন, এই স্টেশনের অনেক সম্পদ আছে, যা হারিয়ে যাচ্ছে। এ স্টেশনের ইতিহাস ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, মানুষের রুচির পরির্বতন হচ্ছে। তাই রেল সেবা বিশ্বমানে উন্নিত করতে কাজ করছে সরকার। এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস