ইকবাল হলের পেছনে ছিল লাশের স্তুপ

ঢাকা, সোমবার   ২৭ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৬,   ২১ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

ইকবাল হলের পেছনে ছিল লাশের স্তুপ

রিয়াজ হোসেন, রূপগঞ্জ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৫৭ ১১ মার্চ ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আমি যখন ইউনির্ভাসিটিতে পড়ি তখন থেকেই দেশকে ক্ষুধা মুক্ত স্বদেশ গড়ার আত্ম শপথে বলিয়ান হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আমরা কয়েকজন মেয়ে আর্মস ট্রেনিং নিয়েছিলাম।

২৫ মার্চের কালো রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় ছিলাম। সে সময় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ চলছিল। ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) পেছনে ছিল লাশের স্তুপ। ২৬ মার্চ কারফিউ ছিল। 

২৭ মার্চ গোড়ান মন্টু মামার বাসায় পান্তা ভাত খেয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া হয়ে মাঝিপাড়া কয়েকদিন ছিলাম। তার পর দাউদপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে আমি ও ফোরকান বেগম দু’জনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার কাজ শুরু করি। এক পর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। তখন মনি ভাই টিউরির নাছির মামার কাছে চিঠি পাঠান ফোরকান এবং আমি যেন ওখান থেকে সরে যাই। সে অনুযায়ী আমরা যাত্রা শুরু করি। পথে আমার খালা নুর জাহান বেগম আমাদেরকে নরসিংদী পর্যন্ত এগিয়ে দেন। 

নরসিংদীতে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে মেঘনার ওপারে গিয়ে আশ্রয় নেই মোক্তার মামার শ্বশুর বাড়িতে। ওখান থেকে আমরা ইব্রাহিমপুরে একটা খন্ডযুদ্ধে অংশ নেই। এরপর হিন্দু পাড়ায় নিখিলদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। এখানে ছিল সিএন্ডবি রোড। সিএন্ড বি রোডে তখন পাক আর্মি চলাফেরা করত। মুক্তিযোদ্ধারা যাতে ওপারে যেতে না পারে এবং এপারে না আসতে পারে তার দিকে ছিল তাদের তীব্র নজর। সঙ্গে ছিল আলবদর, আল শামসের নরাধমরা। আমি ও ফোরকান গভীর রাতে পাকবাহিনীর জিপ লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ে তাদেরকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা ছিল তখনকার প্রতি রাতের কাজ। অপারেশন শেষে আমরা গভীর রাতে পানিতে, না হয় গাছে কাটাতাম। সকাল হলে ওঠে পরতাম। জোঁক পায়ে লেগে থাকত। 

একদিন ঘটে গেল মজার ঘটনা। গাছ থেকে যখন নেমে পড়লাম মাথার গামছাটা পড়ে গেল। লম্বা চুল বেরিয়ে গেল। এলাকার একজন চিৎকার করে উঠল-এ দেহি মাইয়া মানুষগো। এখান থেকে যুদ্ধ শেষে আমরা গেলাম ওপার বাংলায়। ওখানে আমরা আওয়ামী সেচ্ছাসেবিকা বাহিনী গড়ে তুলি। একদিন জেবি হসপিটালে আমরা আহতদের তত্ত্বাবধানে গিয়েছি। এমন সময় এডওয়ার্ড কেনেডি এলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে। সে সময় আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের দুরাবস্থার কথা তুলে ধরি। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের ৮ জন মেয়ের জন্য লেম্বুচড়া ট্রেনিং ক্যাম্পে ট্রেনিং ব্যবস্থা করা হয়। সার্জেন্ট জহুরুল হক সাহেবের ছোট ভাই আমিনুল হক সাহেব ছিলেন তার ট্রেনিং ম্যানেজার। ট্রেনিং দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান আর্মি মেজর আর সি শর্মা ও মেজর কে বি সিং। 

আমার সঙ্গে যারা ট্রেনিং নিয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে ফোরকান বেগম, ফরিদা খানম সাকি, মমতাজ বেগম, আলেয়া বেগম, বকুল মোস্তফা, স্বপ্ন চৌধুরী, শামসুননাহার ইকু। এখানে আমাদের উচ্চতর গেরিলা ব্যবস্থায় যুদ্ধ পরিচালনা ও আর্মস ট্রেনিং দেয়া হয়। এমনিভাবে আমি মিনারা বেগম ঝুনু কখনো সংগঠক, কখনো সৈনিক আবার কখনো গেরিলা হিসাবে মুক্তিযোদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের পরিবারের কমপক্ষে ১০ জন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে। আমার ভাই আলম, আলতাফ, হানিফ, রতন ও ৫ মামা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। আমার স্বামী মরহুম আলতাফ আলী হাসুও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমি জীবিত থাকতেই একাত্তরের নরঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যেতে চাই। 

মিনারা বেগম ঝুনু রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউপির খাসদাউদপুর এলাকার নিজ বাড়িতে বসে এ কথাগুলো। তিনি দীর্ঘদিন তিতাস গ্যাসের পরিচালক (অর্থ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বর্তমানে এক ছেলে ও এক মেয়ের মা। মিনারা বেগম ঝুনুর বাড়ি রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউপির খাসদাউদপুর এলাকায়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর গুলশান এভিনিউ এলাকায় বসবাস করছেন। রূপগঞ্জে একটি বৃদ্ধা আশ্রম করার স্বপ্ন রয়েছে তার।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ

Best Electronics