Alexa ইউএফও ইন কুশিরো

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৯ ১৪২৬,   ২৪ মুহররম ১৪৪১

Akash

ইউএফও ইন কুশিরো

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৯ ৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৩:০১ ২৪ জুলাই ২০১৯

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

(গল্পটি হারুকি মুরাকামির ‘After the Quake’ নামক গল্পগ্রন্থের ছয়টি গল্পের একটি। ১৯৯৫ সনে জাপানের ‘কোবে’ এলাকায় সংঘটিত ভূমিকম্পের সময়ে লেখা। এই ভূমিকম্পের প্রভাব মুরাকামির গল্পের চরিত্রগুলোর উপরেও লক্ষণীয়। গভীর ও রহস্যময় ধরণের প্রভাব। যেগুলোর উন্মেষ ভিন্ন কোন জগতে । যেখানে মানবদের সাক্ষাৎ অ-মানবদের সাথে।)

টানা পাঁচদিন যাবত সে টেলিভিশনের সামনে বসে ছিল। টেলিভিশনের দৃশ্যপটে ভাসছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতাল ও ব্যাংক, বহ্নিমান শিখার ভেতরে প্রজ্বলন্ত আসবাবপত্রের বাক্স, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া রেললাইনের অংশ এবং একটা প্রশস্ত রাজপথ। সে কোন কথা বলছিল না। সোফার কুশনের গভীরে ডুবে থেকে নিঃশব্দে শুধুমাত্র টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনকি কমরো যখন তার সাথে কথা বলছিল, তখনও সে কোন জবাব দিচ্ছিল না। এমনকি তার মাথা বা শরীরও নড়ছিল না।  ফলে কমরো নিজেই বুঝতে পারছিল না যে, তার কণ্ঠস্বর মেয়েটির ভেতরে আদৌ প্রবেশ করছিল কিনা।  

কমরো’র স্ত্রীর জন্মস্থান উত্তরে। ইয়ামাগাটা অঞ্চলে। জানামতে তার কোন বন্ধু বা আত্মীয় ছিল না যারা কোবে’তে দুর্ঘটনা কবলিত হতে পারে। তারপরেও সকাল থেকে রাত্রি অবধি বিনিদ্রভাবে সে টেলিভিশনের সামনে অবস্থান করছিল। শিকড় গেঁড়ে। অন্তত কমরো’র উপস্থিতিতে এক বারও সে  কিছু খায়নি, পান করেনি, এমনকি টয়লেটেও যায়নি। কিছু কিছু সময়ে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করার সময়ে ছাড়া খুবই কদাচিৎই তার মাংশপেশী নড়ছিল। 

কমরো নিজের টোস্ট ও কফি নিজে তৈরী করে কাজে যোগ দিতে চলে গিয়েছিল। বিকেলে ফিরে আসার পর ফ্রিজে যা কিছু পেয়েছিল তাই দিয়ে নিজের জন্যে স্ন্যাক তৈরি করে খেয়েছিল। তারপর  ঘুমাতে গিয়েছিল। তখনও তার স্ত্রী টেলিভিশনের শেষ প্রাপ্ত খবরগুলোর দিকে নির্বাকভাবে তাকিয়ে ছিল। নীরবতার তৈরি একটা পাথরের দেয়াল তাকে ঘিরে ছিল। কমরো সেটা ভাঙার চেষ্টা করতে যেয়েও হাল ছেড়ে দিয়েছিল।  

ষষ্ঠ দিন ছিল রবিবার। কমরো সেদিন কাজ থেকে ফেরার পর আবিষ্কার করেছিল যে, তার স্ত্রী অদৃশ্য হয়ে গেছে। 
কমরো টোকিও’র আকিহাবারা ‘ইলেকট্রনিক্স শহর’ এর একটা পুরাতন হাই-ফাই-ইকুইপমেন্ট স্টোরের সেলসম্যান ছিল। সে মূল্যবান স্টোর সমূহের দায়িত্বে ছিল এবং যখনই কোন সেল দেয়া হত, তখন সে বড় ধরণের একটা কমিশন পেত। তার বেশীর ভাগ ক্রেতারাই চিকিৎসক, ধনী ব্যবসায়ী এবং উচ্চ পদবীর সরকারী কর্মকর্তা ছিল। গত আট বছর যাবৎ সে এই কাজটি করছিল এবং শুরু থেকেই তার বেশ ভাল একটা উপার্জন হচ্ছিল। তখন জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল। রিয়েল এস্টেটের মূল্য বাড়ছিল এবং জাপান টাকার প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল। লোকজনের ওয়ালেটগুলো দশ হাজার ইয়েনের অর্থ দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠছিল। এবং সবাই মরিয়া হয়ে তাদের অর্থ খরচ করার চেষ্টা করছিল। সবচেয়ে বেশী মুল্যবান জিনিসগুলোই সবার আগে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল।   

কমরো লম্বা, ক্ষীণ-দেহী এবং ফ্যাশন দুরস্ত একজন মানুষ ছিল। মানুষজনের সাথে তার আচরণ ছিল ভাল। ব্যাচেলর থাকাবস্থায় অনেক নারীর সাথেই ডেট করার অভিজ্ঞতা থাকলেও বিয়ের পর, ঠিক ২৬ বছর বয়সে সে আবিস্কার করেছিল যে, তার বিবাহপূর্ব যৌন এডভেঞ্চার সম্পর্কিত   আকাঙ্ক্ষাগুলো রহস্যজনকভাবে বিলীন হয়ে গেছে। একেবারেই। পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে সে স্ত্রী ছাড়া আর কারও সাথেই ঘুমায়নি। এমন নয় যে, কোন সুযোগই তার ছিল না। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই সে সাময়িক সম্পর্কগুলোর বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল সম্পুর্ণভাবে। কর্মস্থল থেকে  তাড়াতাড়ি ফিরে এসে স্ত্রীর সাথে সুস্থিরভাবে বসে খেতে, দুদণ্ড কথা বলতে এবং শেষে বিছানায় যেতেই পছন্দ করত সে। এর বাইরে তার চাওয়ার কিছুই ছিল না।   

কমরো’র বন্ধু ও সহকর্মীরাও তার বিয়ের পর তার পরিবর্তন লক্ষ্য করে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। কমরো’র পরিচ্ছন্ন, ক্লাসিক চেহারার পাশে তার স্ত্রীকে যথেষ্টই বেমানান লাগত। সে ছিল বেঁটে ও মোটা বাহুর অধিকারিণী। চেহারাও ছিল নিস্প্রভ ও ভাবলেশহীন। শুধুমাত্র শারীরিকভাবে নয়, তার ব্যক্তিত্বও আকর্ষনীয় ছিল না। সে খুব কমই কথা বলত। এবং একটা বিরুপ ভাব সকল সময়ে তার চেহারায় ফুটে থাকত।  

কিন্তু তারপরেও কমরো তার স্ত্রীর প্রতি খুবই অনুরক্ত ছিল। স্ত্রীকে ছাড়া কিছুক্ষণ থাকলেই তার টেনশন হত। বাইরে থাকার সকল সময়েই তার ভেতরে অস্থিরতা কাজ করত। শুধুমাত্র স্ত্রীর পাশে ঘুমানোর সময়েই সে সুস্থির জীবন যাপন করত। অতীতের অদ্ভুত দুঃস্বপ্নগুলো তাকে তাড়িত করত না। সাংসারিক জীবনও থাকত উষ্ণ। মৃত্যু, যৌনরোগ, বিশ্বের অসীম ব্যাপ্তি - কোন কিছুই তার ভেতরে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারত না।

পক্ষান্তরে তার স্ত্রীর স্বভাব ছিল ভিন্ন ধরণের। সে টোকিও শহর এবং এখানে মানুষজনের ভিড় পছন্দ করত না। সর্বক্ষণ ইয়ামাগাতা শহরে চলে যাবার ইচ্ছে পোষণ করত। নিজের বাবা–মা ও বড় দুই বোনের অনুপস্থিতি ভীষণভাবে  অনুভব করত। এবং যখন খুশী তাদেরকে দেখতে চলে যেত। তার পিতামাতা একটা সরাইখানা চালাতেন এবং অর্থনৈতিকভাবে খুবই স্বচ্ছল ছিলেন। তার পিতাও তাদের এই ছোট মেয়েকে নিয়ে পাগল ছিলেন। তিনি তাকে সকল সময়েই আসা-যাওয়ার  ভাড়া দিয়ে দিতেন।

অনেক দিনই কমরো কাজ থেকে ফিরে এসে দেখেছে যে, তার স্ত্রী চলে গেছে। কিচেন টেবিলের উপরে নোট লিখে রেখে। লেখা থাকত যে, সে তার পিতামাতাকে দেখতে গিয়েছে। কয়েকদিনের জন্যে। কমরো কখনই এর প্রতিবাদ করেনি। শুধু অপেক্ষা করেছে তার ফিরে আসার। এবং প্রতিবারেই সে ফিরে এসেছিল। এক সপ্তাহ বা দশ দিন পর। আনন্দিতভাবে।  

কিন্তু যে চিঠিটা কমরো’র স্ত্রী ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পূর্বে রেখে গিয়েছিল তা ছিল  ভিন্ন ধরণের। তাতে লেখা ছিল, আমি আর কখনই ফিরে আসব না। সেখানে সে আরও  ব্যাখ্যা করেছিল সরল কিন্তু স্পষ্টভাবে যে, কেন সে কমরো’র সাথে আর বাস করতে চায় না।   

সমস্যা হল যে, তুমি কখনই আমাকে কিছু দাও না, সে লিখেছিল। অথবা আরও যথাযথভাবে  বলতে গেলে তোমার ভেতরে এমন কিছুই নেই, যা তুমি আমাকে দিতে পার। মানুষ হিসেবে তুমি যথেষ্টই ভাল এবং হ্যান্ডসাম। কিন্তু তোমার সাথে বাস করা বাতাসের সাথে বাস করার মত। যদিও সম্পূর্ণভাবে এটা তোমার দোষ নয়। পৃথিবীতে অনেক মেয়েই আছে যারা তোমাকে ভালবাসবে। কিন্তু আমাকে ডেক না। আমার যে জিনিসগুলো আমি রেখে এসেছি, সেগুলো ফেলে দিও।  

বাস্তবে, তেমন কিছুই সে ফেলে যায়নি। তার জামাকাপড়, জুতা, ছাতা, কফি মগ, হেয়ার ড্রায়ারঃ সবকিছুই সে নিয়ে গিয়েছিল। নিশ্চয়ই সে জিনিসগুলোকে পূর্বেই প্যাকেট করে রেখেছিল এবং সেদিন সকালে আমি কাজে চলে যাবার পরেই সেগুলোকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

একমাত্র জিনিস যেটা সে ফেলে গিয়েছিল বলে ধরা যেতে পারে তা হল তার বাইসাইকেল। এটা দিয়ে সে বাজারে যেত এবং কয়েকটা বই বহন করত। কমরো খেয়াল করেছিল যে, বিটলস ও বিল ইভান্সের যে সিডিগুলো সে ব্যাচেলর সময় থেকে সংগ্রহ করেছিল, সে গুলোও তার স্ত্রীর সাথে   উধাও হয়ে গেছে।   

পরেরদিন কমরো ইয়ামাগাতা’তে তার স্ত্রীর পিতামাতার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল। তার শাশুড়ি ফোনের জবাব দিয়েছিলেন। তাকে জানিয়েছিলেন যে, কমরো’র  স্ত্রী তার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না। তার কণ্ঠস্বর থেকে মনে হচ্ছিল তিনি কৈফিয়ত দিচ্ছেন। তিনি এটাও বলেছিলেন যে, খুব সত্বরই তারা ডিভোর্সের কাগজপত্র পাঠাবেন। কমরো যেন সেগুলোতে দস্তখত করে সাথেসাথেই পাঠিয়ে দেয়।   
কমরো উত্তর দিয়েছিল যে, সে সম্ভবত সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হবে না। কারণ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, যা নিয়ে তার চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। 

‘তুমি চাইলে চিন্তা করতে পার, কিন্তু আমি জানি যে, তাতে কোনই পরিবর্তন হবে না,” তার শাশুড়ি তাকে বলেছিল। 

সম্ভবত তিনি ঠিকই বলেছিলেন, কমরো নিজেকে বলেছিল। যত অপেক্ষাই সে করুক না কেন স্ত্রীর জন্যে, কোনকিছুই আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে হবে না। এ বিষয়ে সে নিশ্চিতভাবে অনুভব করেছিল।  

ডিভোর্সের কাগজপত্র ফেরত পাঠানোর অব্যবহিত পরেই কমরো এক সপ্তাহের ছুটির আবেদন করল। ফেব্রুয়ারি মাসে এমনিতেই কাজ কম থাকে। তাছাড়াও কমরো তার বসকে নিজের জীবনে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে ইতিমধ্যেই জানিয়েছিল। সুতরাং কাজ থেকে অব্যাহতি পেতে তার কোন অসুবিধাই হল না। 

দুপুরের লাঞ্চের সময়ে সাসাকি নামের কমরো’র একজন সহকর্মী এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, “শুনলাম তুমি ছুটি নিয়েছ। কিছু কি করার পরিকল্পনা করেছ?”

“আমি জানি না,” কমরো বলল। “কি করা উচিৎ আমার?”

সাসাকি একজন ব্যাচেলর। কমরো থেকে বয়সে তিন বছরের ছোট হবে। দেহের গড়ন খুবই নমনীয় এবং মাথায় ছোট করে ছাঁটা।  সে সব সময়েই গোলাকার সোনালী রঙের রিম দেয়া চশমা পড়ত। খুবই বেশি কথা বলত এবং তার ভেতরে একটা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ভাব ছিল। যার কারণে অনেকেই তাকে পছন্দ করত না। কিন্তু নিরুদ্বিগ্ন স্বভাবের কমরো’র কাছে তাকে কখনই খারাপ লাগত না।  

“ছুটি যখন তুমি নিয়েছই, সুন্দর কোন জায়গায় বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা করছ না কেন?

“আইডিয়াটা মন্দ নয়,” কমরো বলল। 

রুমাল দিয়ে চশমা মুছতে মুছতে সাসাকি তীর্যকভাবে কমরো’র দিকে তাকাল। ভাবখানা এই যে,  সে কমরো’র  ভেতরে কোন রহস্যের সূত্র খুঁজছে। 

“তুমি কি কখনও হোকাইডো’তে  গিয়েছ?” সে জিজ্ঞেস করল।

“কখনোই না,” কমরো বলল। 
“তুমি কি যেতে চাও?” 
“এটা জিজ্ঞেস করছ কেন?”

সাসাকি চোখ সংকুচিত করল এবং খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল। “সত্যি বলতে কি, আমার কাছে একটা ছোট প্যাকেট আছে যেটা আমি কুশিরো’তে পাঠাতে চাই। আমি আশা করছি যে, তুমি সেটা ওখানে নিয়ে যাবে। আমার পক্ষ হয়ে। এটা আমার জন্যে খুবই বড় উপকার হবে। এবং এ কারণে আমি তোমাকে বিমানের টিকেটের দামটা দিতেও প্রস্তুত আছি। শুধুমাত্র তাই নয়,   কুশিরো’তে আমি তোমার হোটেল ভাড়ার খরচও বহন করতে চাই।   

“একটা ছোট্ট প্যাকেট?”

“এই ধরণের,” বলে সাসাকি তার হাত দিয়ে চার ইঞ্চি আয়তনের একটা কিউব তৈরি করল। “ তেমন ভারী নয়।“ 

“ওটা কি কোন গৃহস্থালীর গ্যাজেট?” 

সাসাকি মাথা নাড়ল। “একেবারেই না,” সে বলল। “ব্যক্তিগত জিনিস। আমি চাই না যে, পথিমধ্যে ওটা ধাক্কাধাক্কিতে নষ্ট হোক। একারণেই কোন ডাকের মাধ্যমে পাঠাতে পারছি না। আমি চাই যে, সম্ভব হলে তুমি  নিজ হাতে ওটা আমার হয়ে হস্তান্তর করবে। আমি নিজেই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার হাতে হোকাইড’তে উড়োজাহাজে করে উড়ে যাবার জন্যে সময় নেই।“     

“ওটা কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কোন জিনিস?”

সে তার ঠোঁটকে সামান্য বাঁকাল এবং মাথা নাড়ল। “ওটা ভঙ্গুর নয়, এবং ভেতরে কোন  বিপদজনক বস্তু নেই। এই ধরণের ব্যাপার নিয়ে তোমার একেবারেই চিন্তা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বিমানবন্দরে এক্সরে করার সময়ে এটার জন্যে তোমাকে থামতে হবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, আমি তোমাকে এটা দিয়ে কোন সমস্যার ভেতরে ফেলব না। একমাত্র কারণ যার কারণে আমি ওটাকে ডাকের মাধ্যমে পাঠাচ্ছি না, তা হল আমার ইচ্ছেই  করছে না ডাকে পাঠাতে।“    

ফেব্রুয়ারি মাসে হোকাইডো’তে বরফ জমা ঠাণ্ডা থাকে। কমরো এটা জানত। কিন্তু ঠান্ডা বা উষ্ণ – কোন কিছুই এখন তার কাছে কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। 

“সুতরাং, প্যাকেটটা আমি কাকে হস্তান্তর করব?”
“আমার ছোট বোনের কাছে। সে সেখানে বাস করে।“ 
কমরো সাসাকি’র প্রস্তাব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বিষয়টা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা করাও তার জন্যে যন্ত্রনার। এছাড়া কোন কারণই নেই তার প্রস্তাবটা গ্রহণ না করার। বিশেষ করে যখন তার কিছুই করার নেই। সাসাকি সাথে সাথেই এয়ার লাইনে যোগাযোগ করে দুইদিন পরের একটা টিকেট বুক করল।   

পরেরদিন কাজের সময়ে সে কমরো’কে বাক্সের মত একটা প্যাকেট হস্তান্তর করল। আকারে অনেকটা ছাইদানির মত। ম্যানিলা পেপার দিয়ে জড়ানো। হাতে নেবার পর অনুভূতি থেকে সে বুঝল জিনিসটা কাঠের তৈরি। ওজন নেই বললেই চলে। প্যাকেটের চারিদিকে স্বচ্ছ প্রশস্ত ধরণের টেপ জড়ানো ছিল।  ম্যানিলা পেপারের উপরে। কমরো  ওটাকে কিছুক্ষণ হাতে ধরে থাকল। একটু নাড়া দিল। কিন্তু ভেতরে কোঙ কিছু নড়ছে বলে শুনতে বা বুঝতে পারল না। 

“আমার বোন তোমাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করবে,  সাসাকি বলল। সে তোমার জন্যে হোটেল কক্ষেরও ব্যবস্থা করবে। তোমাকে শুধু প্রবেশ গেইটে যেয়ে তার সাথে দেখা করতে হবে।“

কমরো স্যুটকেসের ভেতরে বক্সটা ভরে বিমানবন্দরে গেল। একটা জামা দিয়ে বক্সটাকে আবৃত করা ছিল। প্লেনের ভেতরে ভিড় ছিল অনেক বেশী। এতটা ভিড় হবে বলে সে কখনই চিন্তা করেনি। এই মধ্য শীতে সবাই টোকিও ছেড়ে কেন কুশিরো’তে যাচ্ছে, তা সে ভেবে পেল না।   
 সকালের খবরের কাগজ ভূমিকম্পের রিপোর্টে পূর্ণ ছিল। প্লেনে বসে সে পত্রিকার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ল। মৃতদের সংখ্যা বাড়ছিল। অনেক এলাকাতেই পানি ও বিদ্যুৎ ছিল না। এবং অসংখ্য মানুষ গৃহহীন হয়ে হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটা প্রতিবেদনেই কোন না কোন নতুন ট্রাজেডির কথা ছিল। কিন্তু কমরো অনুভব করল যে, অদ্ভুত কোন কারণে ট্রাজেডিগুলোর কাহিনীগুলোর ভেতরে  কোন গভীরতা নেই। ভূমিকম্পের পরের সময়টা তার কাছে দূর একঘেয়ে প্রতিধ্বনির মত মনে হচ্ছিল। শুধুমাত্র একটা বিষয়ে সে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারছিল। সেটা হল যে, তার স্ত্রী ক্রমশই তার থেকে  দূরে কোথাও চলে যাচ্ছিল।  

স্ত্রীর কথা চিন্তা করতে যখন সে ক্লান্ত হয়ে এক সময়ে সে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে জাগার পর সে পুনরায় স্ত্রীর কথা চিন্তা করল। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম বাদ দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে কেন ভূমিকম্পের খবরগুলো এত মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করছিল? সে কি দেখেছিল, যা কমরো দেখতে পায়নি?

বিমানবন্দরে দুইজন যুবতী একই ডিজাইন ও রঙের ওভারকোট পরে কমরো’র দিকে এগিয়ে এল। একজন খুবই ফর্সা, উচ্চতা সম্ভবত ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি হবে। তার মাথার চুলগুলো ছোট ছোট করে কাটা।  তার নাকের উপরিভাগটা কুৎসিতভাবে তার উপরের ওষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত। তাকে দেখে কমরো’র মনে হল ক্ষুদ্র লোমের কোন ক্ষুরওয়ালা প্রাণী। অন্য মেয়েটির উচ্চতা পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির কাছাকাছি। তাকে যথেষ্টই সুন্দরী বলা যেত যদি তার নাকটা অতি ক্ষুদ্র না হত। তার লম্বা চুলগুলো সোজাসুজি ঘাড়ের উপরে এসে পড়ছিল। তার কানগুলো ঢাকা ছিল না। তার ডান কানের লতির উপরে দুটো তিল ছিল। কানের দুলের কারণে তিল দুটোকে আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। দুইজন যুবতীকে দেখতেই মধ্য কুড়ি বয়সের মনে হচ্ছিল। তারা কমরো’কে বিমানবন্দরের একটা একটা ক্যাফেতে নিয়ে গেল।        

“আমি কেইকো সাসাকি,  লম্বা মেয়েটা বলল। “আমার ভাই আমাকে বলেছে যে, তুমি কতটা সাহায্যশীল ছিলে তার প্রতি। এটা আমার বান্ধবী  শিমাও।“

“দেখা করতে পেরে খুশী হলাম।“ কমরো বলল। 
“হাই,” শিমাও বলল। 
“আমার ভাই আমাকে বলেছে যে, সাম্প্রতিক অতীতে তোমার স্ত্রী মারা গেছে,” কেইকো সাসাকি বলল। সশ্রদ্ধভাবে।  
কমরো জবাব দেয়ার আগে একটু অপেক্ষা করল এবং বলল,” না, সে মারা যায়নি।“

“আমি গত পরশুদিন আমার ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। আমি নিশ্চিত যে, সে স্পষ্টভাবে আমাকে বলেছিল তোমার স্ত্রী হারানোর কথা।“   
“স্ত্রী হারিয়েছি এটা সত্য। তবে আমার জানামতে সে এখনও জীবন্ত এবং ভাল আছে।“ 

“অদ্ভুত। এই ধরণের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমার ভুল শোনার কথা না।“ সে কমরো’র দিকে বেদনার্ত দৃষ্টিতে তাকাল। কমরো তার কফিতে একটু চিনি নিয়ে তা আস্তে আস্তে নাড়া দিল। চুমুক দেয়ার পূর্বে। তরলটা হালকা ছিল এবং বলতে গেলে সেটার কোন স্বাদই ছিল না। কি করছি আমি এখানে? সে নিজেই বিস্মিত হল।   

“ ঠিক আছে। আমিই সম্ভবত ভুল শুনেছিলাম। আমি বুঝতে পারছি না আমার এই ভুলকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়,” কেইকো সাসাকি বলল। আপাতভাবে তাকে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছিল। সে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে নিজের নীচের ঠোঁটকে কামড়াল।“ অনুগ্রহ করে আমাকে মাফ কর। তোমার অনুভূতির  প্রতি আমি খারাপ আচরণ করেছি।“ 

“চিন্তা কর না। যে কোন ভাবেই হোক না কেন, আমার স্ত্রী চলে গেছে।“ 

শিমাও কোন কথা বলছিল না। শুধুমাত্র কমরো ও কেইকো কথা বলছিল। কিন্তু সে মৃদু হাসছিল এবং কমরো’র দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে কমরো’কে পছন্দ করেছে। এটা তার প্রকাশ এবং শরীরের সূক্ষ্ম ভাষা থেকে বোঝা যাচ্ছিল। একটা ছোট্ট নীরবতা নেমে আসল তাদের তিনজনেরই উপরে। 

“যাই হোক, আমি তোমাকে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেটটা দিতে চাই, যেটা আমি এনেছি,” কমরো বলল। সে স্যুটকেইসটা খুলল এবং জামার ভাঁজের ভেতর থেকে বক্সটা বের করল। যেটা দিয়ে বক্সটা জড়ানো ছিল।    

কেইকো টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে হাত বাড়িয়ে দিল। তার ভাবলেশহীন চোখ দুটো প্যাকেজটার উপরে নিবদ্ধ ছিল। ওজন দেখার পর কমরো যা করেছিল, সেও সেটাই করল। কানের কাছে এনে সেটাকে কয়েকবার নাড়াল। তারপর কমরোর দিকে তাকিয়ে হাসল। বোঝাতে যে সবকিছুই ঠিক আছে। অতঃপর বক্সটাকে তার বড় সোল্ডার ব্যাগের ভেতরে ঢুকাল। 

“আমাকে একটা কল করতে হবে, “ সে বলল। “তুমি কি আমাকে একটু সময় দেবে?”

“অসুবিধা নেই। স্বচ্ছন্দে যেতে পার,” কমরো বলল। 

কেইকো ব্যাগটা কাঁধের উপরে ঝুলিয়ে দূরের একটা টেলফোন বুথের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল। কমরো তার চলে যাবার ভঙ্গিটাকে নিরীক্ষা করল। মেয়েটির শরীরের উপরের অংশটা ছিল নিশ্চল। কিন্তু তার কোমর থেকে নীচের অংশগুলো ছিল খুবই সচল। বড় বড়, মসৃণ এবং যান্ত্রিকভাবে পদক্ষেপ ফেলে সে এগিয়ে যাচ্ছিল।  

কমরো’র মনে হল অতীত কোন মূহুর্তকে সে অবলোকন করছে। যে অতীত হঠাৎ হঠাৎ করে বর্তমানের সাথে মিশে যাচ্ছে।

“তুমি কি আগে কখনও হোকাইডো’তে এসেছ?” শিমাও জিজ্ঞেস করল।

কমরো মাথা নেড়ে না বলল। 

“আমি জানি। অনেক দূরের একটা জায়গা এটা।“ 

কমরো মাথা নেড়ে সম্মতি জ্ঞাপন করল। তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশের দিকে তাকাল। “আসলেই অবাক করা ব্যাপার,” সে বলল, “ এখানে বসে মনেই হয় না যে আমি এতদূর চলে এসেছি।“

“কারণ, তুমি প্লেনে করে এসেছ। প্লেনগুলো খুবই দ্রুত চলে। এত দ্রুত যে, তোমার মনের গতি শরীরের গতির সাথে পেরে উঠে না।“
“সম্ভবত তুমি ঠিক বলেছ।“
“তুমি কি এই ধরণের একটা দীর্ঘ যাত্রা করতে চেয়েছিলে?”   
“মনে হয় চেয়েছিলাম,” কমরো বলল। 
“সেটা কি তোমার স্ত্রী তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে বলে?”
কমরো মাথা নাড়ল।
“যতদূরেই তুমি যাও না কেন, কখনই তুমি নিজের থেকে দূরে চলে যেতে পারবে না,” শিমাও বলল।
কমরো টেবিলের উপরে রাখা চিনির বাটিটার দিকে তাকিয়েছিল, যখন মেয়েটি কথা বলছিল। কিন্তু এবারে সে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। 

“সত্য,” সে বলল। “যতদূরেই তুমি যাও না কেন, কখনই তুমি নিজের থেকে দূরে চলে যেতে পারবে না। ছায়ার মত তোমার সত্ত্বা অনুসরণ করতে থাকবে। যেখানে যাবে, সেখানেই।” 

শিমাও কঠিন দৃষ্টিতে কমরো’র দিকে তাকাল। “আমি বাজি ধরতে পারি যে, তুমি তোমার স্ত্রীকে খুবই ভালবাসতে। ঠিক বলিনি?”
কমরো প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেল। “তুমি কেইকো সাসাকি’র বন্ধু, তাই নয় কি?”
“ঠিক, আমরা একসাথে কাজ করি।“
“কি ধরণের কাজ কর তোমরা?”
উত্তর দেয়ার পরিবর্তে শিমাও তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ক্ষুধার্ত?” 
“বুঝতে পারছি না,” কমরো বলল।“ আমার ক্ষিধে পাচ্ছে, আবার পাচ্ছেও না।“
“চল যাই এবং গরম ধরণের কিছু খাই। আমরা তিনজনেই। গরম খাবার তোমাকে আরাম করতে সাহায্য করবে।“
শিমাও একটা ছোট্ট চার চাকার সুবারো চালাচ্ছিল। কেইকো সাসাকি তার পাশের সীটে বসে ছিল। কমরো পেছনের সীটে হেলান দিয়ে ছিল। যদিও শিমাও’র গাড়ি চালানোর ভেতরে কোন ভুল ছিল না, তবুও গাড়ির পেছনে ভয়ানক রকমের শব্দ হচ্ছিল। মনে হয় সাসপেনশনটা ফেটে গেছে। এবং এই অবস্থাতেই গাড়িটাকে অন্তত এক সহস্র মাইল চালানো হয়েছে। গিয়ার পরিবর্ত্ন করার সময়ে  গাড়ির অটোম্যাটিক ট্রান্সমিশন গিয়ারের ভেতরে ধাক্কা দিচ্ছিল। ফলে হিটার গরম হয়ে যাচ্ছিল। কমরো’র কাছে মনে হচ্ছিল যে সে একটা ওয়াশিং মেশিনের ভেতরে বন্দী হয়ে আছে।     

কুশিরো’র রাস্তার উপরে কোন বরফ জমে ছিল না। তবে কিছুদূর পর পরই রাস্তার দুইপাশে ময়লা বরফ স্তূপীকৃত হয়ে ছিল। ঘন মেঘ খুব নীচ দিয়ে ভাসছিল। যদিও সেটা সূর্যাস্তের সময় ছিল না, তবুও সবকিছুই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও জনহীন বলে মনে হচ্ছিল। শহরের ভেতর দিয়ে তীব্র বেগে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় কোন লোকজন হাঁটছিল না। এমনকি ট্রাফিক লাইটগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল ওগুলো শীতে জমে আছে।  
“হোকাইডো’র এই অংশে তেমন বরফ পড়ে না,” কেইকো উচ্চস্বরে ব্যাখ্যা করল, কমরো’র দিকে তাকিয়ে। “আমরা উপকূলের কাছে এবং এখানে বায়ুপ্রবাহ খুবই শক্তিশালী হয়ে থাকে। কোন কিছু স্তুপ হয়ে ঊঠার  আগেই  বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। কোন কোন সময়ে মনে হবে তোমার কান ছিঁড়ে যাচ্ছে। শীত এতটাই প্রকট এখানে।“

“অনেক সময়ে তুমি শুনতে পাবে যে, মাতালেরা রাস্তার উপরে ঘুমানোর সময়ে শীতে বরফ হয়ে মরে গেছে,“ শিমাও বলল। 
“এখানে কি কোথাও বিয়ার পাওয়া যায়?” কমরো জিজ্ঞেস করল।
কেইকো মুখ চেপে হেসে শিমাও এর দিকে ফিরল। “বিয়ার?” 
শিমাও নিজেও একইভাবে হাসল। 
“আমি হোকাইডো সম্পর্কে খুব বেশী জানি না,” কমরো ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গীতে বলল।
“আমি বিয়ার সম্পর্কে একটা ভাল গল্প জানি, “কেইকো বলল। “ঠিক বলেছি, শিমাও?”
“একটা অসাধারণ গল্প!” শিমাও বলল। 

কিন্তু কথোপকথন এক সময়ে থেমে গেল এবং দু’জনের কেউই বিয়ারের গল্পটা বলল না। কমরোও তাদেরকে বলার জন্যে অনুরোধ করল না। একটু পরেই তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেল।   মহাসড়কের পাশে অবস্থিত একটা নুডুলস এর দোকানে। গাড়ি পার্ক করে তারা ভেতরে গেল। কমরো একটা বিয়ার পান করল এবং এক বাটি গরম র্যামেন নুডুলস খেল। জায়গাটা অপরিচ্ছন্ন ও খালি এবং চেয়ার টেবিলগুলোর অবস্থা খুবই জীর্ণশীর্ণ ছিল। তবে র‍্যামেন নুডুলস খুবই সুস্বাদু ছিল। খাওয়ার পর কমরো যথেষ্টই স্বস্তি অনুভব করতে লাগল।        

“মিঃ কমরো, হোকাইডোতে তোমার পরিকল্পনা কি? আমার ভাই বলেছে যে, তুমি এখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করবে,“ কেইকো বলল।  
কমরো বিষয়টা নিয়ে মূহূর্তের জন্যে চিন্তা করল, কিন্তু কি করতে পারে সে তা ভেবে পেল না। 
“একটা উষ্ণ-প্রস্রবণে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পার। এখান থেকে কাছেই একটা আছে।“ 

“চিন্তাটা মন্দ নয়,” কমরো বলল।   
“আমি নিশ্চিত যে তুমি পছন্দ করবে। ওটা আসলেই খুব সুন্দর। তবে ওখানে কোন বিয়ার বা সে ধরণের কিছু নেই। 
দু’জনেই তারা পরস্পরের দিকে পুনরায় তাকাল এবং হাসল। 
“আমি যদি তোমাকে তোমার স্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তাহলে কি তুমি মন খারাপ করবে?”
“না। মন খারাপ করার কিছু নেই এতে।“
“সে কখন তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে?”
“ভুমিকম্পের পাঁচ দিন পরে, অর্থাৎ এখন থেকে দুই সপ্তাহেরও আগে।“ 
“ভূমিকম্পের সাথে তার চলে যাওয়ার কি কোন সম্পর্ক ছিল বলে তুমি মনে কর?” 
কমরো মাথা নাড়ল। “সম্ভবত নেই। অন্তত আমি মনে করি না।“ 
“তারপরেও আমার মনে হচ্ছে যে তার চলে যাওয়া ভূমিকম্পের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে,” শিমাও একটু মাথা হেলিয়ে বলল।
“ঠিক,” কেইকো বলল, “তবে মিঃ কমরো বুঝত পারছে না, কিভাবে।”
“এই ধরণের ঘটনা অনেক সময়েই ঘটে থাকে।“ 
“কি ধরণের?” কমরো জিজ্ঞেস করল। 

“যেমন, ধর, এই ধরণের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিল, এমন একজনকে আমি চিনি,” কেইকো বলল।
“তুমি কি মিঃ সায়েকি’র কথা বলছ?” শিমাও বলল।  

“ঠিক,” কেইকো বলল।“ সায়েকি নামের একজন আছে কুশিরো’তে। বয়স প্রায় চল্লিশ বছর। একজন হেয়ার স্টাইলিস্ট। তার স্ত্রী গত বছর একটা ইউ এফ ও দেখেছিল। শহরতলীর রাস্তা দিয়ে সে মধ্যরাতে গাড়ি চালানোর সময়ে। বিশাল এক ইউ এফ ও। একটা মাঠের ভেতরে। খুব কাছ থেকে। তার এক সপ্তাহ পরেই সে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। চলে যাবার পর আর কখনই ফিরে আসেনি। মিঃ সায়েকির সাথে তার পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ বা সে ধরণের কিছুই ছিল না বলে আমরা জানি।“    

“তার চলে যাবার কারন কি ইউএফও ছিল বলে তুমি মনে কর?” কমরো জিজ্ঞেস করল।   

“আমি জানি না। তবে সে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, কোন চিঠিপত্র না লিখেই। প্রাইমারি স্কুলে তার দুই সন্তান পড়ত। তাদেরকেও ফেলে রেখে। বর্তমান পর্যন্ত তার কোন খবর পাওয়া যায়নি,” কেইকো বলল। “ শুনেছি, যাবার সপ্তাহ খানেক পূর্ব হতে সে মানুষজনের সাথে ইউএফও নিয়ে গল্প করত। সারাক্ষণ। চেষ্টা করেও তাকে থামানো যায়নি। ইউএফও’টির বিশালতা এবং সৌন্দর্য নিয়ে সে অবিরত গল্প করত।“    
সে একটু থামল।

“আমার স্ত্রী যাওয়ার পূর্বে একটা নোট রেখে গিয়েছিল,” কমরো বলল। “এবং আমাদের কোন সন্তানও নেই।“ 

“সুতরাং তোমার পরিস্থিতি সায়েকি’র চেয়ে ভাল,” কেইকো বলল।

“ঠিক, বাচ্চা-কাচ্চা সংসারে একটা বিশাল পার্থক্যের সৃষ্টি করে থাকে,” শিমাও মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।  

“শিমাও এর পিতা যখন তার বয়স সাত বছর, তখন বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল,” কেইকো রাগান্বিতভাবে বলল। স্ত্রীর ছোট বোনের সাথে পালিয়ে চলে গিয়েছিল।“ 

একটা নীরবতা এসে তাদের আলোচনার উপরে ভর করল।

“এমনও হতে পারে যে, সায়েকির স্ত্রী পালিয়ে যায়নি। তাকে ইউ এফ ও থেকে আগত এলিয়েনরা ধরে নিয়ে গেছে,” কমরো বলল। বিষয়ান্তরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।“

“এটাও সম্ভব,” শিমাও বিষন্নভাবে বলল। “এই ধরণের গল্পও আমরা প্রায় সময়েই শুনে থাকি।“

“তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছ যে, তুমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ এবং একটা ভালুক হঠাৎ কোথাও থেকে এসে তোমাকে খেয়ে ফেলল?’ কেইকো বলল। 
অতঃপর দুই নারীই হাসতে লাগল।       

নুডুলস শপ থেকে তিনজনে কাছের একটা হোটেলে গেল। হোটেলটা শিমাও নির্বাচন করেছে।    নবদম্পত্তি বা যুগল প্রেমিক-প্রেমিকাদের হোটেল। শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে। কয়েকটা বিশাল সমাধিস্তম্ভের পাশে। অদ্ভুত ধরণের স্থাপত্য দিয়ে তৈরী। ইউরোপীয় রাজপ্রাসাদের মত।  হোটেলের চূড়া থেকে একটা ত্রিকোণাকৃতির পতাকা উড়ছিল।    

কেইকো ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে কক্ষের চাবি নিল। তিনজনে একসাথে এলিভেটরে করে উপরে উঠল। রুমের দরজাটি খুবই ছোট। এবং সেই তুলনায় বিছানাটি যথেষ্টই বড়। কমরো হ্যাঙ্গারে জ্যাকেট রেখে প্রথমেই টয়লেটে গেল। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে দেখল, তার অনুপস্থিতির সময়ে দুই নারী মিলে কক্ষের ডিমলাইট জ্বালানো, হিটার অন করা, টেলিভিশন চালানো, পার্শ্ববর্তী রেস্টুরেন্টের খাবারের মেন্যু নিরীক্ষা করা, লাইটের সুইচগুলো পরীক্ষা করা, মিনিবারটিতে কি কি রাখা হয়েছে তা দেখা– সবকিছুই সম্পন্ন করে ফেলেছে।  

“এই হোটেলের মালিকরা আমার বন্ধু,” কেইকো বলল। “আমি তাদেরকে একটা বড় কক্ষ রাখতে বলেছিলাম। এটা নব দম্পত্তি বা প্রেমিক-প্রেমিকাদের হোটেল হলেও বিষয়টা নিয়ে তোমার ভাবার দরকার নেই। নাকি তুমি ভাবছ, মিঃ কমরো?”

“একেবারেই না,” কমরো বলল।

“আমি ভেবেছিলাম যে, স্টেশন সন্নিকটের কমদামের কোন বিজনেস হোটেলের চেয়ে এটাই তোমার জন্যে ভাল হবে।“
“আমিও নিশ্চিত যে, তুমি ঠিকই ভেবেছিলে,” কমরো বলল।    

“তুমি স্নান করে আস না কেন? আমি বাথ টাবটায় জল ভরে দিয়েছি।“

সে যেভাবে বলল, কমরো সেভাবেই করল। বাথটাবটা বিশাল বড়। কমরো ওটার ভেতরে একাকী ভিজতে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। যে দম্পত্তিরা এই হোটেলে আসে তারা সম্ভবত একসাথেই এতে স্নান করে থাকে।  

বাথরুম থেকে ফিরে আসার পর কমরো কেইকো সাসাকিকে না দেখে অবাক হল। সে চলে গেছে। শিমাও তখনও কক্ষের ভেতরেই ছিল। বিয়ার পান করছিল ও টিভি দেখছিল। 

“কেইকো বাড়িতে চলে গেছে,” শিমাও বলল। “সে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং তোমাকে জানাতে বলেছে যে, আগামীকাল সকালে সে আসবে। তোমার কি অসুবিধা হবে, যদি আমি কিছু সময় এখানে থাকি এবং বিয়ার পান করি?”  

“না,” কমরো বলল। 

“আসলেই কি সমস্যা হবে না? যেমন তুমি হয়ত একা থাকতে চাচ্ছ, কিন্তু অন্য কেউ পাশে থাকার জন্যে স্বস্তি পাচ্ছ না?”  

কমরো তাকে জানাল যে, তার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বিয়ার পান করতে করতে এবং টাওয়েল দিয়ে মাথার চুল শুকাতে শুকাতে সে শিমাও’র সাথে বসে টিভি দেখতে লাগল। কোবে’র ভূমিকম্প সম্পর্কে একটা বিশেষ খবর প্রচারিত হচ্ছিল। একই ছবিগুলো বার বার ঘুরে-ফিরে আসছিল – হেলে যাওয়া বিল্ডিং, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া রাস্তাঘাট, কান্নারত বৃদ্ধা রমণী, একটা দিশাহারা ভাব, এবং অনির্দেশ্য কোন ক্রোধ। একটা কমার্শিয়াল আসতেই শিমাও রিমোট দিয়ে টিভিটা অফ করে দিল।      

“চল, আমরা গল্প করি, “সে বলল, “ যতক্ষণ এখানে আছি।“

“ঠিক আছে,” কমরো বলল।
“কি বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে?” 
“গাড়িতে আসার সময়ে তুমি আর কেইকো বিয়ার সম্পর্কে কিছু একটা বলছিলে। মনে আছে? তুমি বলেছিলে যে, ওটা একটা মজার গল্প।“
“হ্যা, মনে আছে,” সে মাথা নেড়ে বলল। “ভালুকের গল্প।“  
“ গল্পটা আমাকে শোনাতে চাও?” 
“অবশ্যই।“

শিমাও ফ্রিজ থেকে একটা নতুন বিয়ার বের করে দুজনের গ্লাসই ভর্তি করল। 
“গল্পটা কিছুটা ভালগার ধরণের,” সে বলল। “ নিশ্চয়ই তুমি কিছু মনে করবে না?”
কমরো মাথা নাড়ল। “না, তুমি শুরু করতে পার।“ 
“আমি বলতে চাচ্ছি যে, অনেক পুরুষেরাই মেয়েদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ধরণের কিছু গল্প শুনতে স্বস্তি বোধ করে না।“  
“আমি সেই ধরণের মানুষ নই।“
“এটা এমন একটা ঘটনা যা আমার ক্ষেত্রেই ঘটেছিল। সুতরাং বিষয়টা আমার জন্যেও বিব্রতকর।“
“তোমার যদি অসুবিধা না থাকলে আমি গল্পটা শুনতে চাই।“ 
“আমার অসুবিধা নাই,” শিমাও বলল।
“তিন বছর আগের কথা। আমি কলেজে সবে ভর্তি হয়েছি। আমার এক বন্ধুর সাথে ডেট করতাম। আমার চেয়ে এক বছর বেশী বয়সের। একদিন দুজনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। উত্তরের পাহাড়ের দিকে।“

শিমাও বিয়ারে একটা চুমুক দিল।“ তখন শীতের সময়। পাহাড় ভর্তি ভালুক। বছরের এই সময়ে ভালুকেরা শীতনিদ্রার জন্যে প্রস্তুত হয়। সুতরাং তখন তারা খাবার খুঁজতে থাকে। এবং এই সময়েই তারা সবচেয়ে বিপদজনক। কোন কোন সময়ে তারা মানুষদেরকেও আক্রমণ করে বসে। আমাদের সেই বেড়াতে যাওয়ার মাত্র তিনদিন পূর্বে তারা ভ্রমণকারীদের উপরে আক্রমণ করেছিল। সুতরাং পরিচিত একজন আমাদেরকে একটা ঘণ্টা (bell) দিয়ে সেটা সাথে বহন করতে বলেছিল। হাঁটার সময়ে বেলটি নেড়ে নেড়ে শব্দ করে ভালুকদেরকে সতর্ক করার উপদেশও দিয়েছিল। যাতে তারা আশেপাশে মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে। ভালুকেরা ইচ্ছে করে কখনও মানুষেদের  আক্রমণ করে না। আমি বলতে চাচ্ছি যে, তারা তৃণভোজী, মাংসাশী নয়। তবে ক্ষেত্র বিশেষে যা হয়ে থাকে তা হল, অনেক সময়েই তারা জনপদের ভেতরে চলে আসে। তখন তারা হতবুদ্ধি বা রাগান্বিত হয়ে কোন কোন সময়ে মানুষের উপরে আক্রমণ করে থাকে। রিফ্লেক্স বা প্রতিবর্ত ক্রিয়া হিসেবে। তবে তুমি যদি বেল বাজাতে বাজাতে হেঁটে যাও, তাহলে তারা তোমার থেকে নিজ থেকেই দূরে সরে যাবে। বুঝতে পেরেছ?”

“বুঝতে পেরেছি।“ 

“সুতরাং আমরা হাঁটতে হাঁটতে বেল বাজাচ্ছিলাম। অবশেষে আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিলাম, যেখানে আমাদের আশেপাশে কেউই ছিল না। এই সময়েই আমাকে সে প্রস্তাবটা দিয়েছিল। আমরা রাস্তা থেকে দূরের একটা জঙ্গলাকীর্ন জায়গায় গিয়েছিলাম। যেখানে আমাদেরকে কেউ দেখার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু সমস্যা হয়েছিল আমাকে নিয়ে। আমি ভালুককে খুবই ভয় পাচ্ছিলাম। বিশেষ করে আমাদের একটা বিশেষ মূহুর্তে একটা ভল্লুক এসে আমাকে হত্যা করুক এমন মৃত্যু কখনই আমার গ্রহণযোগ্যতার ভেতরে ছিল না। আমার ধারণা তুমিও কখনই এভাবে মৃত্যু চাও না।“ 

কমরো একমত হল যে, সেও এভাবে মরতে ইচ্ছুক নয়।        

“সুতরাং পরস্পরের সাথে মিলিত হবার সমান্তরালে দুজনেই পালাক্রমে এক হাত ব্যবহার করে বেল বাজাচ্ছিলাম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ডিং-ডং, ডিং-ডং ! বিষয়টা এখনও আমার মনে পড়ে কিছু কিছু সময়ে। তখন আমি হাসতে শুরু করি। 
কমরো নিজেও হাসল। 
কমরো হাততালি দিল। “দারুণ,” সে বলল। “তাহলে তুমিও হাসতে জান!“
“অবশ্যই আমি হাসতে জানি,” কমরো বলল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে অনেক দিন পরই সে হাসল। শেষ কবে সে হেসেছিল? চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না কমরো।       

শিমাও বাথরুমে গেল। স্নান করার জন্যে। 
এই সময়ে কমরো টিভিতে একটা ভ্যারাইটি শো দেখল। একজন কমেডিয়ান উচ্চস্বরে কৌতুক করছিল। কমরো কৌতুকের কিছুই পেল না তাতে। তবে তার এরকম মনে হওয়ার পিছনে সে দায়ী, না কৌতুক  দায়ী সেটাও সে বুঝতে পারল না। একটা বিয়ার পান করল এবং মিনিবার থেকে এক প্যাকেট বাদাম বের করল। শিমাও অনেক্ষণ ধরে স্নান করল এবং বিছানায় এসে চাদরের নীচে ঢুকল। 
“তোমার স্ত্রীর সাথে শেষ কখন তুমি মিলিত হয়েছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ডিসেম্বরের শেষের দিকে, আমার মনে হয়।“
“অন্য কারও সাথে থাকনি ?” 

কমরো চোখ বন্ধ করল এবং মাথা নাড়ল। 
“আমার মনে হয় তোমার হালকা হওয়া এবং জীবনকে আরেকটু বেশী উপভোগ করতে শেখা উচিৎ। কারণ, ভবিষ্যতে কী হবে তা আমরা জানি না। আগামীকালই একটা ভূমিকম্প হতে পারে। এলিয়েনরা তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি কোন ভালুকও তোমাকে খেয়ে ফেলতে পারে। আমরা কেউই জানি না ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে।“  
“আমরা কেউই জানি না ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে,” কমরো প্রতিধ্বনি করল। 

শিমাও এবং কমরো কয়েকবার পরস্পরের সাথে মিলিত হবার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিল। এই ধরণের অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বে তার জীবনে ঘটেনি।

“মনে হয় তুমি তোমার স্ত্রীর সম্পর্কে চিন্তা করছিলে,” শিমাও বলল। 
“হ্যা,” কমরো বলল। কিন্তু আসলে সে ভূমিকম্প সম্পর্কে চিন্তা করছিল। দৃশ্যপটগুলো তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। বায়োস্কোপের মত। পর্দায় উপরে মূহুর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। পরক্ষণেই মিলিয়ে যাচ্ছিল। একের পর এক। মহাসড়ক, আগুণের শিখা, ধূয়া, আবর্জনার স্তুপ। কোনভাবেই এই নীরব দৃশ্যগুলোকে সে থামাতে পারছিল না।    
“মানুষের জীবনে এই ধরণের ঘটনা ঘটেই থাকে,” শিমাও বলল। 
“ঠিক।“
“এগুলো নিয়ে খুব বেশী ভাবা উচিৎ নয়।“
“আমি চেষ্টা করছি না ভাবতে,” কমরো বলল। 
“অবশ্য পুরুষ মানুষেরা এগুলো চিন্তা করতেই বেশী অভ্যস্ত।“
কমরো নিরুত্তর থাকল। 
“তুমি বলেছিলে তোমার স্ত্রী একটা চিঠি লিখে গিয়েছিল। বলেছিলে না?“ 
“হ্যা, বলেছিলাম।“
“কি লেখা ছিল সেখানে?”
“লেখা ছিল, আমার সাথে আর বাতাসের সাথে বসবাস করা একই কথা।“
“বাতাসের সাথে? শিমাও মাথা ঘুরিয়ে কমরো’র দিকে তাকাল। “ঐ কথাটির অর্থ কি?”
“সম্ভবত, আমার ভেতরে কিছুই নাই, বলে সে বুঝাতে চেয়েছে।“ 
“সেটা কি সত্যি?”
 
“ সম্ভবত,” কমরো বলল। “যদিও আমি নিশ্চিত না। আমার ভেতরে যদি কিছুই না তাকে, তাহলে  ‘কিছু একটাই’ কি?” 
“ঠিক বলেছ। ‘কিছু একটা কি?’ আমার মা স্যামন মাছ খুব পছন্দ করতেন। তিনি সব সময়েই চাইতেন যে, স্যামন মাছ শুধুমাত্র চামড়া দিয়ে তৈরী হবে। সুতরাং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভেতরে কিছু না থাকাও ভাল। তুমি কি তাই মনে কর না?”
কমরো একটা স্যাম মাছের কথা চিন্তা করতে চেষ্টা করল, যার চামড়া ব্যতীত কিছুই নাই। যদি ধরে নেয়া হয় যে, এই ধরণের বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব, তাহলেও কি চামড়ার ভেতরে চামড়া থাকবে না? কমরো একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল।  
“একটা কথা বলি তোমাকে,” শিমাও বলল। “আমি জানি না যে, তোমার ভেতরে কোনকিছু আছে বা নেই। তবে আমার ধারণা তুমি একজন অসাধারণ মানুষ। এবং আমি বাজী ধরে বলতে পারি পৃথিবীতে অজস্র নারী আছে যারা তোমাকে বুঝবে এবং তোমার প্রেমে পড়বে।“ 
“ওটাও লেখা ছিল।“ 
“কোথায়? তোমার স্ত্রীর চিঠিতে?”
“হ্যা।“ 
“সত্যিই!”
“এবারে বল,” কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর কমরো বলল, “আমি বাক্সে করে যে জিনিসটা এখানে  এনেছি, সেটা কি ছিল?”
“ওটা কি তোমাকে ভাবাচ্ছে?”
“আগে ভাবিনি, কিন্তু ভাবনা শুরু হচ্ছে। জানি না কী কারণে।“
“কখন থেকে?’
“এই মূহুর্ত থেকে।“  
“হঠাৎ করে?” 

“ঠিক। হঠাৎ করেই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছি।”
“অবাক হচ্ছি বিষয়টা তোমাকে  হঠাৎ করে ভাবাচ্ছে কেন।‘ 
কমরো এক মিনিটের জন্যে ছাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকল এবং বলল, “আমিও।“ 

অতঃপর তারা দু’জনে বাতাসের বিলাপ শুনতে লাগল। অজানা কোন জায়গা থেকে বাতাস প্রবাহিত হয়ে আসছিল। সেই জায়গা সম্পর্কে কমরো’র বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। সেই বায়ুপ্রবাহ  অন্য কোন স্থানে চলে যাচ্ছিল। সেই জায়গাটাও  কমরো’র অজানা। 

“তোমার ভাবনার কারণ আমি জানি,” শিমাও খুব নীচু স্বরে বলল। “কারণ হল বাক্সটার ভেতরে এমনকিছু ছিল, যা আসলে তোমার ভেতরে ছিল। তুমি যখন ওটা বহন করে নিয়ে এসেছিলে এবং কেইকো’কে নিজের হাতে দিয়েছিলে তখনও তুমি তা জানতে না। তুমি আর কখনই সেটা ফিরে পাবে না।“   

কমরো বিছানা থেকে নিজেকে তুলল এবং মেয়েটির দিকে তাকাল। ক্ষুদ্র নাক এবং কানের লতির উপরে বড় একটা তিল। রুমের নির্জনতার ভেতরে কমরো কাঁপছিল। সামনের দিকে হেলতেই তার হাড় কড়মড় করে উঠল। মূহূর্তের জন্যে কমরো’র মনে হল সে একটা অবিশ্বাস্য ধরণের হিংসাত্মক কোনকিছু করতে যাচ্ছে।

“তোমার সাথে কৌতুক করছিলাম,” শিমাও বলল কমরো’র মুখের দৃষ্টি অবলোকন করার পর। “আমার মাথায় যা এসেছে, আমি তাই বলেছি। আসলে হালকা ধরণের মজা করছিলাম। বিষয়টাকে ব্যক্তিগতভাবে নিও না। আমি তোমাকে আঘাত করতে চাইনি।’

কমরো নিজেকে শান্ত করল। এবং মাথাটাকে পুনরায় বালিশের উপরে স্থাপন করল। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। কক্ষের বিশাল বিছানাটি রাতের সাগরের মত চারদিকে ছড়িয়ে গেল। তখনও কমরো’র হৃদপিণ্ডের কম্পন থামছিল না। 

“তুমি কি একটু একটু করে অনুভব করছ যে, তুমি অনেক দূর চলে এসেছ?’ একটু পর শিমাও জিজ্ঞেস করল। 

“হ্যা। আমি অনুভব করছি যে, আমি অনেক দূরে চলে এসেছি,” কমরো জবাব দিল। সততার সাথে।  

শিমাও কমরো’র বুকের উপরে একটা জটিল ধরণের নকশা আঁকল। নখের আঁচড় দিয়ে।  যাদু দিয়ে তাকে সম্মোহন করার মত করে। 

“কিন্তু আসলে,” সে বলল, “ তোমার যাত্রা শুরু হয়েছে সবে।’

সমাপ্ত 
মূল কাহিনীঃ হারুকি মুরাকামি
ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাষান্তর/ভাবানুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ (ওরফে ছবিঘর) 
অনুবাদের স্বত্ব সংরক্ষিত রাখা হল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর