Exim Bank Ltd.
ঢাকা, মঙ্গলবার ২০ নভেম্বর, ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বিশেষ সাক্ষাৎকার

আসাদুজ্জামান নূর ৭২, আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

অমিত গোস্বামীডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
আসাদুজ্জামান নূর ৭২, আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি
ছবি: ইন্টারনেট

নব্বই দশকের শুরু। তখনও পশ্চিমবঙ্গে কেবল টিভি আসে নি। সবার বাড়ির মাথায় অ্যান্টেনা টাঙানো। দুটো অ্যান্টেনা। একটা কলকাতা টেলিভিশনের জন্যে। অন্যটায় বাংলাদেশ টিভি। দুটোর অভিমুখ দুদিকে।

বাংলাদেশ টিভি চুড়ান্ত জনপ্রিয় তাদের নাটকের জন্যে। খালামনি অর্থাৎ আব্বাসউদ্দিন কন্যা ফেরদৌসী রহমানের ‘এসো গান শিখি’ দেখার জন্যে বাংলাদেশ টিভির সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়া। সেই সময়ে বাংলাদেশ টিভিতে শুরু হল হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘কেউ কোথাও নেই’ যার একটি চরিত্র বাকের ভাই। বাকের ভাই গুন্ডা প্রকৃতির লোক এবং তার সঙ্গী ছিল ‘বদি’ আর ‘মজনু’, তারা তিনজনই মোটর সাইকেলে করে চলাফেরা করতো। বাকের ভাই এলাকার মাস্তান হলেও অধিকাংশ মানুষ তাকে ভালোবাসতো, কারণ নিপীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে কুন্ঠিত হতো না। ঘটনাপ্রবাহে বাকের ভাই রেবেকা হক নামের এলাকার প্রভাবশালী এক নারীর বাড়িতে অবৈধ কার্যকলাপের প্রতিবাদ করে। এই প্রভাবশালী নারীর দারোয়ান তার বাড়িতে খুন হয়। ফাঁসানোর জন্য এই খুনের দায় দেয়া হয় বাকের ভাইকে। আদালত, ঐ খুনের দায়ে নির্দোষ বাকের ভাইকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হবে। নিতান্তই একটি ধারাবাহিক নাটকের গল্প।

কিন্তু তখনই ভোজবাজির মতো কিছু ঘটনা ঘটলো। সেই নায়কের ফাঁসির রায় বাতিলের দাবীতে রাজপথে নামলো জনতা, ঢাকার রাস্তায় মিছিল বেরুলো, ‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রায়, মানি না মানবো না!’ ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে!’ নাটকের পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে ঢিল পড়লো। নাটকে বাকেরের বিরুদ্ধে যিনি সাক্ষী দিয়েছিলেন, বদি চরিত্রে অভিনয় করা সেই আবদুল কাদেরকে বেনামী চিঠি দেওয়া হল।

অবস্থা বেগতিক দেখে নাটকের প্রযোজক নওয়াজেশ আলী খান হুমায়ূন আহমেদকে বললেন, কোনোভাবে বাকেরের ফাঁসির ব্যপারটা না রাখলেই ভালো হয়। হ‍ুমায়ূন আহমেদ মানলেন না। মূল স্ক্রীপ্টেই নাটক প্রচারিত হলো বিটিভিতে। নাটক শেষ হবার পরে অদ্ভুত একটা দৃশ্যের অবতারণা হলো ঘরে ঘরে। বাড়ির মহিলারা কাঁদছেন, পুরুষেরা কেউ কান্না লুকনোর চেষ্টা করছেন, কেউবা পরিচালকের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেন। পরদিন দেশের বেশকিছু অঞ্চলে ‘বাকের ভাই’য়ের জানাজা হয়েছিল, গরু জবাই করে কুলখানি অনুষ্ঠান পালনের খবরও শোনা গিয়েছিল।

এই বাকের ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যে মানুষটি তার নাম আসাদুজ্জামান নূর। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। আসাদুজ্জামান নূর ১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবু নাজেম মোহাম্মদ আলী ও মাতার নাম আমিনা বেগম। স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে তার পরিবার। তার স্ত্রী ড. শাহীন আখতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

তিনি থাকেন ঢাকার নিউ বেইলী রোডের নওরতোন কলোনির একটি হাইরাইজ ভবনের সুপরিসর ফ্ল্যাটে। সেখানেই তিনি সাজিয়ে নিয়েছেন আপন ভুবন। আসাদুজ্জামান নূরের লিভিংরুমে পা রাখতেই মনে ভর করে অন্যরকম অনুভূতি হবে। এটা কী কোনো আর্ট গ্যালারি, নাকি মিউজিয়াম! দেয়ালে মাটির রঙ। ঝুলছে সারি সারি পেইন্টিংস। সবই নামী-দামি শিল্পীর আঁকা। জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, শফিউদ্দিন আহমেদ, মূর্তজা বশির, পরিতোষ সেন, গোলাম কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবীসহ দেশ-বিদেশের আরো অনেক শিল্পীর আঁকা ছবি। লিভিং রুমের তিনটি খোলা শোকেসে আছে ব্রোঞ্জ-তামা-দস্তার হরেক রকম পটারি আর পোড়ামাটি-সিরামিকে তৈরি নানা আকৃতির মূর্তি। হাতির দাঁতে তৈরি ধ্যানরত বুদ্ধ, পাথরে গড়া বিষ্ণু মূর্তি আর কিমানো পরনে জাপানির গ্রানাইট প্রতিকৃতি- এসব কিছু শুধু জাদুঘরেই শোভা পেতে দেখা যায়।

এমন মানুষের সাথে আমার আলাপ ২০১৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তারপর থেকে কতবার কলকাতায় ও ঢাকায় দেখা হয়েছে বহুবার। আড্ডা হয়েছে। আড্ডা দিতে দিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গল্প হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজের সম্পর্কে যখন যা বলেছেন সেগুলি লিখে রেখেছি। এই লিখে রাখা কথামালা আজ সাজিয়ে দিলাম সাক্ষাৎকারের আঙ্গিকে।

কারন আজ ৩১ অক্টোবর তার জন্মদিন। শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা সহ আমাদের এই নিবেদন।

লিখে রাখা কথা মালা...

অমিতঃ আপনার ছোটবেলা নিয়ে জানতে চাই...

নূর ভাইঃ আমার জন্ম জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে নীলফামারীতে আসি। তখন আমার বাবা জমির মালিকানা বদলে এখানে এসেছিলেন। বাবার এখানে একটি চাকরিও হয়ে গিয়েছিল। কাজেই আমরা চলে এলাম এপারে। আমার বাবা-মা দুজনেই গার্লস স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমার মা ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা আর বাবা ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক। আমার বাবা আরো স্কুল করেছেন। এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে তারা অনেক কাজ করেছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার বিষয়ে তাদের অবদান অনেক বেশি। এই অঞ্চলের যেকোনো বাড়িতে গেলে দেখবেন সেখানকার দাদী-নানী বা বাড়ির বৌ আমার বাবা-মায়ের ছাত্রী।

অমিতঃ ছোটবেলা থেকেই কি আপনি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত?

নূর ভাইঃ আমার বাবা এই ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। আর মা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা থাকায় স্কুলের নানান অনুষ্ঠান দেখতাম। তিনিও খুব উৎসাহী ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই আমার আবৃত্তি শেখা। আমার স্কুলে কোনো অনুষ্ঠান হলে বাবাই বলতেন যাও অভিনয় কর। হাই স্কুলে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন সুনীল ব্যানার্জী, সবাই তাকে খোকনদা বলে ডাকত। তিনি ছিলেন ক্রীড়া শিক্ষক। ক্রীড়া শিক্ষক, কিন্তু স্কুলের সব সাংস্কৃতিক বিষয় তিনিই দেখতেন। আমার ভেতরে সাংস্কৃতিক মানসিকতা বেড়ে ওঠার পেছনে তাঁরও বিপুল অবদান আছে।

অমিতঃ আপনার ছাত্রজীবন...

নূর ভাইঃ আমি এখানে হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি। পাস করার পর নীলফামারী কলেজেই ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই নীলফামারী কলেজ ছেড়ে দিয়ে ভর্তি হই কারমাইকেল কলেজে। সেখানে একটি হোস্টেলে উঠে পড়াশোনা শুরু। কিন্তু বাবা-মার থেকে দূরে থেকে কোনো শাসন-বারণ ছাড়া অবস্থায় পড়াশোনা আর কী হয়? মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতাম। হোস্টেলের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে আমরা সবাই আড্ডা দিতাম। একসময় রেডিওতে কাজ করত আবৃত্তিকার আশরাফুল আলম ছিল আমার সহপাঠী। সে তখনই বেশ ভালো আবৃত্তি করত। এই নিয়ে ছিল আড্ডা। পরীক্ষার ফল প্রত্যাশা মতোই খারাপ হলো। আর্টস বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে টেনেটুনে পাস করলাম। এরপর বাবা আবার ধরে নিয়ে এলেন এখানে। নীলফামারীতে এসে বিএ ভর্তি হলাম আর জড়িয়ে গেলাম ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে। তখন আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। কলেজে জিএস নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিতলাম। আর এসবের পাশাপাশি কোথাও নাটক বা আবৃত্তি হলে সেখানে তো আমার অংশগ্রহণ থাকত নিশ্চিত। বিএ পাস করার পর আমি চলে আসি ঢাকা। ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’তে ভর্তি হই। দিনে এবং রাতে দুই সময়েই ক্লাস ছিল। রাজনীতির নেশার কারণে দিনে ভর্তি না হয়ে আমি ভর্তি হলাম রাতের সেশনে। সারাদিন মিটিং-মিছিলে সময় দিতাম আর রাতে গিয়ে ক্লাস করতাম। আমার উদ্দেশ্যই ছিল ঢাকায় আসা। ঢাকা আসতে চাওয়ার দুটো কারণ ছিল, একটি তো রাজনীতি ছিল আর সেই সঙ্গে পত্রপত্রিকায় পড়তাম ছায়ানটের বা অন্যান্য সংগঠনের অনুষ্ঠান এখানে নিয়মিতই হচ্ছে।

অমিতঃ ঢাকায় এসে রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?

নূর ভাইঃ আমার বাবা বাম ঘরানার মানুষ ছিলেন। সে প্রভাব পড়েছিল আমার ওপর। সে ভাবেই ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান। ঢাকা এসে ছাত্র ইউনিয়নে কাজে যুক্ত হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উঠেছিলাম ইকবাল হলে। এখন জহুরুল হক হল। ইকবাল হল তো তখন রাজনীতির আখড়া। তখন বাম বল আর ডান বল সব ছাত্রনেতা সেখানেই। এরমধ্যে আমি ল’ শেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথম পর্ব পরীক্ষা দেয়ার পর দ্বিতীয় পর্ব আর দেয়া হয়নি। এর মধ্যে তো স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

অমিতঃ আপনি তো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন?

নূর ভাইঃ আমি সীমান্ত পার করেছিলাম ৮ এপ্রিল। আমি ওই দিন চলে যাই কুচবিহার, হলদিবাড়ি। প্রথম দিকে এলোমেলো থাকলেও ধীরে ধীরে গুছিয়ে উঠে আমাদের নিজস্ব ক্যাম্প হয়। আমি যুদ্ধ করেছি ৬ নং সেক্টরে।

অমিতঃ যুদ্ধের পরে…

নূর ভাইঃ যুদ্ধ শেষে আমি কী করব এবং কোথায় চাকরি করব তা খোঁজা শুরু করি। খুঁজতে খুঁজতে রেজা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বললেন আমি একটা ছাপাখানা করছি আপনি এখানকার ম্যানেজার। একটি ছাপাখানা থেকে পুরনো মেশিন কিনে এনে বসালাম। তখন অফিসটা ছিল তোপখানার মোড়ে। সেখানে আমার বেতন ধরা হলো আড়াইশ’ টাকা। সেখানে খাটনিও ছিল প্রচুর। একসময় রামেন্দুদা আমাকে বললেন, আমি একটা পত্রিকা বের করছি থিয়েটার, তুমি এটার সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ কর। প্রথমদিকে কয়েকটি সংখ্যায় আমি কাজ করেছিলাম, পরে আমি রাশিয়ান এম্বাসিতে চাকরি পেলাম।

অমিতঃ অভিনয় জগতে আসলেন কি করে?

নূর ভাইঃ একদিন আলী যাকেরের সাক্ষাৎকার নিতে গেছি। তিনি আমাকে বললেন, সন্ধ্যাবেলা আপনি আমাদের রিহার্সালে আসেন দেখে যাবেন। ওখানে গিয়ে আমি দেখি, স্বাধীনতার আগে যাদের নিয়ে নাটক করেছি তাদের অনেকেই সেখানে আছে। আতাউর রহমান, আবুল হায়াত, তামান্না সবাই ছিলেন সেখানে। এভাবে আমি নাগরিকে যোগ দিলাম এবং এখনো এই দলের সঙ্গেই আছি। আমি এখনো নাগরিকের কোষাধ্যক্ষ।

অমিতঃ টেলিভিশনে আপনার শুরুটা কীভাবে?

নূর ভাইঃ ’৭৪-এ টেলিভিশনের একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করি। রামেন্দুদাকে আমি একসময় বলেছিলাম, টেলিভিশনে অভিনয় করার সুযোগ থাকলে আমি করতে চাই। উনি মামুন ভাইকে বলে রেখেছিলেন। প্রথম কাজের জন্য মামুন ভাই ডাকলেন, সেটা ছিল একদম ছোট একটা চরিত্রে। দুই বা আড়াই মিনিটের উপস্থিতি ছিল পর্দায়। ওই নাটকে নায়ক ছিলেন হায়দার রিজভি। কিন্তু অভিনয় করার সময় একদম ঠিকঠাকভাবেই বলতেন। আর নায়িকা ছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার। এই নাটক দিয়েই আমার টেলিভিশন নাটকে যাত্রা শুরু। সম্ভবত বড় কোনো চরিত্রে আমার প্রথম কাজ বরফ গলা নদী-তে। এই নাটকেই প্রথম সুবর্ণার অভিনয় করা।

অমিতঃ যোগ্য হয়েও আপনি সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করেন নি কেন?

নূর ভাইঃ সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহ একটু কম ছিল দুটি কারণে। প্রথমত ভালো সিনেমা খুব বেশি হতো না। আর দ্বিতীয়ত আমার কেন জানি মনে হতো অত বড় একটি পর্দায় আমাকে খুব একটা মানাবে না। আমি ছোটখাটো মানুষ তো তাই। তবে ইচ্ছা আছে, আমি যদি কোনো মূল চরিত্রে বয়স্ক ভূমিকায় কাজের সুযোগ পাই তবে করব। এখন এমন অনেক সিনেমাই হচ্ছে। সব সিনেমাই যে শুধু নায়ক-নায়িকা নিয়ে হতে হবে তার তো কোনো মানে নেই।

অমিতঃ আপনি কখন সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলেন?

নূর ভাই : মূলত যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন তো শিল্পীরাও এর সঙ্গে আন্দোলন গড়ে তুলল। ওই আন্দোলনের সময়ই জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার একটা যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ’৯৬-এর নির্বাচনের আগে তিনি আমাকে বললেন, আপনি নির্বাচন করেন। প্রথমে আমি রাজি হইনি। রাজি না হওয়ার কারণ ছিল আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। নির্বাচন করতে গেলে তো মানুষের সঙ্গে একটা যোগাযোগ দরকার, সেটা আমার তেমন ছিল না। নীলফামারীর বাড়িতেও তখন থাকি না। সেটা ভাড়া দেয়া ছিল। আমি এসব কারণেই জানালাম, এবার থাক পরেরবার নির্বাচনে যাব। এরপর নীলফামারীতে যাওয়া-আসা শুরু করলাম এবং তাঁকে জানালাম, আমি কাজ শুরু করেছি। এরপর আমি ’৯৮ থেকে ’০১ পর্যন্ত জনহিতকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। ’০১-এর নির্বাচনে তো দল হেরে গেল নির্বাচনে কিন্তু আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে আমি জিতেছিলাম। ’৫৯ জনের মধ্যে আমি একজন ছিলাম।

অমিতঃ হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বটা কেমন ছিল?

নূর ভাইঃ হুমায়ূন আমার অভিনয় পছন্দ করে নওয়াজেশ ভাইকে বলেছিল, তার পরের নাটকে আমাকে নিয়ে কাজ করতে চায়। এভাবেই ওর সঙ্গে কাজ শুরু। ওর সিরিয়ালগুলো আমাকে দিয়েই শুরু। এই সব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, নক্ষত্রের রাত এগুলোতে আমি কাজ করেছি। এছাড়াও শিক্ষামূলক একটা ধারাবাহিক ছিল ‘সবুজ-ছায়া’। একটা সময় ছিল যখন হুমায়ূন আমার কথা চিন্তা করেই নাটক লিখত। সেও আমাকে বুঝে নাটক লিখত আর আমিও ওকে বুঝতাম যে ও কী চায়? একটা ঘটনাও ঘটেছিল একবার। হুমায়ূন সরকারের একটা শিক্ষামূলক কাজ করেছিল। সেখানে শিক্ষকের একটা চরিত্র ছিল। পুরো শ্যুটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওর মনে হলো শিক্ষকের চরিত্রটা ঠিক মনঃপূত হচ্ছে না। সে আবার পুরো শ্যুটিংটা নতুনভাবে করে আমাকে নিয়ে। তখন আমি রাজনীতিতে ঢুকে গেছি, নাটকে তেমন সময় দিতে পারি না। কিন্তু ও বলল, আপনাকে এটা করতেই হবে। সেই সময় আমার সময় বের করতে অনেক কষ্ট হলেও কাজটা করেছিলাম। হুমায়ূন এমন একজন ছিল, যে কাজের মান নিয়ে কখনো আপস করত না। হুমায়ূনের পরের দিকের নাটকগুলো অবশ্য প্রথমদিকের

নাটকের মতো আলোচিত হয়নি। এর একটা কারণ হতে পারে সিনেমার দিকে বেশি ঝুঁকে যাওয়া। এই কারণে নাটকের প্রতি হয়তো মনোযোগ একটু কম হয়ে গিয়েছিল।

অমিতঃ আপনার পারিবারিক জীবন?

নূর ভাইঃ আমার স্ত্রী ডাক্তার। বিয়ে পারিবারিকভাবেই হয়েছে। ও তো নিজে গান করে, আর সংস্কৃতির দিকেও একটু ঝোঁক আছে। যার কারণে সেদিক থেকে কোনো আপত্তি বা অসুবিধা হয়নি। তবে নাটকের জন্য দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বাইরে থাকতে হয়েছে। এটা করতে না হলে আমি আমার বাচ্চাদের আরো একটু বেশি সময় দিতে পারতাম, যেটা উচিত ছিল।

অমিতঃ দেশের বাইরে কাদের অভিনয় বেশি পছন্দ?

নূর ভাইঃ কলকাতার মঞ্চে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, বিভাস চক্রবর্তী তাদের অভিনয় ছিল খুবই চমৎকার। লন্ডনে আমি মঞ্চে অনেক নাটক দেখেছি। পল স্কোফিল্ড, মাইকেল গ্যামবট এদের অভিনয় অসাধারণ। এখন ব্রাত্য, দেবশঙ্কররা খুব ভাল করছে।

অমিতঃ আপনার সাথে ঋতুপর্ণ ঘোষের ভাল বন্ধুত্ব ছিল শুনেছি…

নূর ভাইঃ আমার এখন আফসোস হয় যে ঋতুপর্ণর সিনেমার কাজ আমি করিনি। ও আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আমাকে অনুরোধ করেছিল ওর অন্তত একটা সিনেমা করতে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে আর হয়ে ওঠেনি। ও মারা যাওয়ার একমাস আগেও আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম তখনও ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল বিজ্ঞাপন তৈরি করতে গিয়ে। লাক্সের বিজ্ঞাপন যেটাতে সুবর্ণা মডেল হয়েছিল, সেটা ঋতুপর্ণর করা। তার আগেও দুটো বিজ্ঞাপন করা হয়েছিল।

অমিতঃ এখনও স্বপ্ন দেখেন?

নূর ভাইঃ জীবনের অনেকগুলো বছর পেছনে ফেলে এসেছি। পেছনে তাকালে মনে হয় সময়টা ঠিকমত কাজে লাগাইনি। হয়ত আরও অনেক কিছু করার ছিল। আবার এটাও মনে হয় যা পেয়েছি, সেটাও কি আমার পাওয়ার কথা ছিল? এই দেশ, আমার বাংলাদেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। এই ঋণ শোধ করি কী করে?

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
পুলিশের গাড়ি ভাঙায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার
পুলিশের গাড়ি ভাঙায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার
আবারো মা হচ্ছেন কারিনা!
আবারো মা হচ্ছেন কারিনা!
ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম
ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম
নির্বাচন একমাস পেছানোর আশ্বাস দিয়েছে ইসি: ড. কামাল
নির্বাচন একমাস পেছানোর আশ্বাস দিয়েছে ইসি: ড. কামাল
কাজলকে ‘জোর করে’ চুমু, ছিল অশ্লীল আচরণ!
কাজলকে ‘জোর করে’ চুমু, ছিল অশ্লীল আচরণ!
বিএনপিতে যোগ দিলেন সৈয়দ আলী
বিএনপিতে যোগ দিলেন সৈয়দ আলী
বিএনপির কার্যালয়ে ছিনতাইয়ের কবলে ফটোসাংবাদিক
বিএনপির কার্যালয়ে ছিনতাইয়ের কবলে ফটোসাংবাদিক
প্রধানমন্ত্রীর আসনে প্রার্থী দেবে না ড. কামাল
প্রধানমন্ত্রীর আসনে প্রার্থী দেবে না ড. কামাল
ভাবীর শরীরে দেবরের ‘আপত্তিকর’ স্পর্শ
ভাবীর শরীরে দেবরের ‘আপত্তিকর’ স্পর্শ
তাহলে কি এখনো তারা স্বামী-স্ত্রী?
তাহলে কি এখনো তারা স্বামী-স্ত্রী?
ফারহানার স্বপ্নের মৃত্যু
ফারহানার স্বপ্নের মৃত্যু
বাড়িতে বাবার লাশ, ছেলে পরীক্ষার হলে
বাড়িতে বাবার লাশ, ছেলে পরীক্ষার হলে
মুম্বাইতে ‘তারা’
মুম্বাইতে ‘তারা’
স্বপ্ন পূরণ হলো গোপালগঞ্জবাসীর
স্বপ্ন পূরণ হলো গোপালগঞ্জবাসীর
মির্জা ফখরুলকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ছাত্রলীগের
মির্জা ফখরুলকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ছাত্রলীগের
লাল শাড়িতে চীনে ঐশী!
লাল শাড়িতে চীনে ঐশী!
মেয়ের সামনেই বেডরুম ‘সিক্রেট’ ফাঁস করলেন সাইফ
মেয়ের সামনেই বেডরুম ‘সিক্রেট’ ফাঁস করলেন সাইফ
যে তারকারা কিনেছেন বিএনপির মনোনয়ন ফরম
যে তারকারা কিনেছেন বিএনপির মনোনয়ন ফরম
‘নৌকার মনোনয়ন পাবে জরিপে অগ্রগামীরা’
‘নৌকার মনোনয়ন পাবে জরিপে অগ্রগামীরা’
কে হবেন প্রধানমন্ত্রী? জানালেন ড. কামাল
কে হবেন প্রধানমন্ত্রী? জানালেন ড. কামাল
শিরোনাম:
মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক নীতিমালা ২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক নীতিমালা ২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টের দেয়া ১০ বছরের সাজার রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন খালেদা জিয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্টের দেয়া ১০ বছরের সাজার রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন খালেদা জিয়া চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব: যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ অ্যাপেক সম্মেলন চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব: যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ অ্যাপেক সম্মেলন দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার; বিএনপির ইশতেহারে থাকবে দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা: আমির খসরু দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার; বিএনপির ইশতেহারে থাকবে দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা: আমির খসরু