আশ্বাসে আটকে আছে নৌবন্দর

.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১০ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

আশ্বাসে আটকে আছে নৌবন্দর

 প্রকাশিত: ১৯:১৮ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৯:১৮ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

[পাবনা শহর থেকে ৫১ কিমি দূরে নগরবাড়ী ঘাট। এর ২০ কিমি ভাটিতে আরিচা ঘাট। নগরবাড়ী থেকে আরিচা, দৌলতদিয়া প্রভৃতি নৌ-রুটে, লঞ্চ, মালামাল বহনকারী কার্গো ইত্যাদি চলাচল করে। এক সময় বড় বড় স্টিমার, রো-রো ফেরি চলত। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু চালুর আগ পর্যন্ত নগরবাড়ী ঘাট হয়েই উত্তরাঞ্চল থেকে মানুষজন রাজধানীতে আসা-যাওয়া করত। হাজারও কর্মচাঞ্চল্যে নগরবাড়ি ছিল মহাব্যস্ত এক ঘাট। এখন নগরবাড়ী ঘাটে নেই আর যাত্রীর ব্যস্ততা, কুলি হাঁকাহাঁকি ..।  বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হবার পর থেকে সব থমকে গেছে। এখন কেমন আছে সেই নগরবাড়ী ঘাট? নগরবাড়ী ঘাটের সমস্যা- সম্ভাবনা নিয়েই ডেইলি বাংলাদেশের ৮ পর্বের ধারাবাহিক। আজ ৭ম পর্ব।]

বার বার আশ্বাস পেয়েও ঘাট ও নৌবন্দর চালু না হওয়ায় এলাকাবাসী, ব্যবসায়ি ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এখন হতাশ। ফেরিঘাট চালু দূরের কথা দখলদারদের কবলে পড়ে দেড়শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী নগরবাড়ী ঘাটের অস্তিত্ত্বই বিপন্নপ্রায় বলে স্থানীয়রা জানান। তবে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ জানায় নগরবাড়ী নৌবন্দর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান নগরবাড়ী ঘাটকে নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ওইদিন বলেছিলেন, আরিচা- নগরবাড়ী (কোজীরহাট) নৌরুটে এখন থেকে নিয়মিত ফেরি চলবে। কিন্তু তাও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নৌপথে যোগাযোগ বাড়াতে দেশে আরও তিনটি আন্তর্জাতিক নৌবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাবনার নগরবাড়ী, শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী ও চিলমারী এই তিনটি ঘাটে নদীবন্দরগুলো হবে। এর মধ্যে নগরবাড়ীতে আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর স্থাপনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

সূত্র জানায়, নগরবাড়ীতে প্রকল্পটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৪৭ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নদী থেকে ২৫ মিটার দূরে আরসিসি জেটি নির্মাণ করা হবে। একসঙ্গে ছয়টি জাহাজ মালামাল লোড-আনলোড করতে পারবে। এ ছাড়া দুটি ক্রেন, তিনটি ফ্লোটিং জেটি, পাইলট হাউসওয়ে ব্রিজ ও বন্দর ভবনসহ বেশ কিছু সুবিধা থাকবে প্রস্তাবিত নদীবন্দরে। এটি বাস্তবায়নে ৮ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে একাধিক সভা হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী ও পাবনার নগরবাড়ী ঘাটকে নৌবন্দর ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে এ দুটি বন্দর দিয়ে উত্তরবঙ্গে পেট্রোলিয়াম, সারসহ বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। তবে সংস্কারের অভাবে ঘাট দুটির কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বাঘাবাড়ী বন্দরে বর্তমানে কোনো ক্রেন নেই। এর অবকাঠামো সুবিধাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর সূত্র জানায়, দেশে অভ্যন্তরীণ নৌপথে মোট ২৯টি নৌবন্দর রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো নৌবন্দর সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রথম পর্বে নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী ও চিলমারী এই তিনটি নৌঘাটকে আন্তর্জাতিক নৌবন্দরে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

(বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো.ফরিদুল ইসলাম জানান, এরই মধ্যে নগরবাড়ী নৌবন্দর নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নৌবন্দরগুলোতে একসঙ্গে আটটি জাহাজ ঢুকতে পারবে। পৃথক কার্গো ঘাট থাকবে। বন্দর কমপ্লেক্স, রাস্তাঘাটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকবে। ঘাটের সঙ্গে সংযুক্ত রাস্তা থাকবে রেললাইন পর্যন্ত, যাতে করে জাহাজের মালামাল ঘাট থেকে ট্রাকে করে নিয়ে সরাসরি ট্রেনে ওঠানো যায়।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, আরিচা থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দর পর্যন্ত দূরত্ব ৫০ কিমি-এর কিছু বেশি। বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ী নৌরুটে প্রধানত চট্টগ্রাম থেকে সার বোঝাই জাহাজ চলাচল করে। সারসহ বিভিন্ন পণ্য পাবনার বেড়া উপজেলার নগরবাড়ী ও সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে খালাস করা হয়। পরে ট্রাকে করে দেশের উত্তরাঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এই নৌরুটে জাহাজ চলাচলের জন্য নদীতে ১৫ ফুট গভীরতা থাকা দরকার। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগরবাড়ী থেকে দৌলতদিয়া পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার এই নৌ চ্যানেলের ৮ থেকে ১০টি পয়েন্টে পানির গভীরতা কমে ৫ থেকে ৬ ফুটে দাড়িয়েছে। এতে বিভিন্ন ডুবোচরে প্রায়ই আটকা পড়ে পণ্যবাহী জাহাজ।

আরিচা থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত এ দীর্ঘ নৌ পথ ড্রেজিংয়ের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ড্রেজার। ফলে প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমে দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। নাব্যতা সংকটের কারণে প্রতি বছরের ৪ মাস অনেক জাহাজ এই রুটে আটকা পড়ে থাকে। ড্রেজিংয়ের অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে নৌ-চ্যানেল স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টার ত্রুটি নেই বলে জানান, বিআইডব্লিউটিএ সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম।

বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানান, নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী ও চিলমারী পর্যন্ত যে নৌপথ রয়েছে সেটি বাংলাদেশ-ভারতের প্রটোকল রুট হিসেবে চিহ্নিত। নৌপথে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনে এই নৌরুটটি ব্যবহার করা হবে। ফলে নগরবাড়ীসহ এ তিনটি ঘাটকে প্রথম পর্যায়ে আন্তর্জাতিক নৌবন্দরে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। 

পুরানভারেঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও নগরবাড়ী ঘাট বণিক সমিতির সভাপতি এএম রফিকুল্লাহ মিয়া জানান, উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় সরবরাহের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নদী পথে তেল, সার ও বিভিন্ন পণ্য আসে নগরবাড়ি ঘাটে। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ডুবোচরে আটকা পড়ে পণ্যবাহী জাহাজ। সময়মত পণ্য খালাস না হওয়ায় ব্রি-বোরো মৌসুমে সার সংকট দেখা দেয়। নগরবাড়ী ঘাটে পরিপূর্ণ নৌবন্দর করা গেলেই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর