Alexa আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬,   ১৬ মুহররম ১৪৪১

Akash

আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়

পর্ব-১

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৬ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

আল্লাহু (ছবি: সংগৃহীত)

আল্লাহু (ছবি: সংগৃহীত)

আল্লাহ তায়ালা ও বান্দার মাঝে আশেক মা’শুকের সম্পর্ক। প্রকৃত ও শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা তো তা-ই। সবার ওপরে আল্লাহকে ভালোবাসতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন সফল।

অতএব, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে আমাদের নিম্নলিখিত কর্তব্যসমূহ পালন করতে হবে : ১. ইকামতে দীন, (দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা) ২. তাবলিগে দীন, (দ্বীনের প্রচার) ৩. জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ, (আল্লাহর পথে জিহাদ করা) ৪. ইতিসাম বি হাবলিল্লাহ, (আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরা) ৫. ইতাআতে উলিল আমর, (জ্ঞানীদের আনুগত্য) ৬. তাহসিলে ইলমে দ্বীন (দ্বীনের জ্ঞান শিখা) এবং ৭. সোহবতে সালেহীন (সৎ লোকদের সংস্পর্শ)।

ইকামতে দ্বীনের অর্থ সম্পূর্ণ জীবন ইসলামের আদর্শে গড়ে তোলা এবং সামগ্রীকভাবে ইসলামের বিধানসমূহ মেনে চলা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামের গণ্ডির মধ্যে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং তোমরা শয়তানের তাবেদারি করো না। কেননা শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’

এই আয়াত শরিফের শানে নুজুল এই যে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পরে ইসলামে উটের গোশত হালাল হওয়া সত্তেও তা ভক্ষণ করতেন না। কেননা তিনি পূর্বে ইয়াহুদি ছিলেন এবং ইয়াহুদি ধর্মে উটের গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। এখানে চিন্তার বিষয় এই যে, ইসলামে উটের গোশত ভক্ষণ করা ফরজ বা ওয়াজিব নয় বরং মোবাহ। এই মোবাহ কাজকে তিনি নিজের খেয়াল-খুশি মোতাবেক না পছন্দ করায় আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আয়াত নাজিল করেছেন।

সুতরাং এই আয়াতের মর্মানুযায়ী স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, শয়তান ও নফসে আম্মারার তাবেদারি করে ইসলামের হুকম-আহকাম যাচ্ছেতাই করা চলবে না, বরং ঈমান, আখলাক, মোয়ামালাত, মুআশারাত ও আদব এক কথায় জীবনের প্রত্যেক ব্যাপারে ইসলামের হুকুম আহকাম মেনে চলা।

ঈমান:
ইকামতে দ্বীনের আগে ঈমান অর্জন করতে হবে। ঈমানের অর্থ কোনো বিষয়ের ওপর সন্দেহাতীতভাবে অটল-অবিচল এবং দৃঢ় ও আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করা। ইসলামি জিন্দেগির ভিত্তি ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভিত্তি ছাড়া শুন্যের ওপর যেমন কোনো ইমারত কায়েম থাকতে পারে না, তদ্রুপ ঈমানের ভিত্তি ব্যতিত ইসলামি জিন্দেগির সৌধও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। যার ঈমান যত মজবুত সে ততখানি ইসলামি জীবন যাপন করতে সমর্থ হয়। আর যার ঈমান নাই, তার কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। এ জন্যই গ্রহণযোগ্য হয় না। এই জন্যই ইসলামে ঈমানের গুরুত্ব সবচে বেশি। অতএব, কী কী জিনিসের ওপর ঈমান আনতে হবে তা অবগত হয়ে তদনুযায়ী ঈমান ও আকিদা শুদ্ধ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য। যে সকল জিনিসের ওপর ঈমান আনা দরকার, নিম্নে তার মোটামুটি আভাস দেয়া হলো- 

(১) ঈমান আনতে হবে যে, আল্লাহ এক। তার জাত ও সিফাতে কেউ শরিক নেই। তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, জীবনদাতা ও সংহারকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশক্তিমান। কাউকে ধনী করা বা নির্ধন করা, কাউকে ইজ্জত দেয়া বা বেইজ্জত করা, কারো উপকার করা বা অনিষ্ট করা প্রভৃতি একমাত্র তারই ইচ্ছাধীন। সুতরাং তিনিই একমাত্র মাবুদ, (উপাস্য) ও মালেক (কর্তা)। সুতরাং আমাদের একমাত্র তারই ইবাদত করতে হবে এবং জীবনভর একমাত্র তারই বশ্যতা স্বীকার করে তারই বিধান মেনে চলতে হবে। 

(২) ঈমান আনতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা তার মাখলুকি নূর দ্বারা অসংখ্য ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। তারা সকলই আল্লাহর অনুগত বান্দা। তারা আল্লাহর হুকুমের বিন্দুমাত্রও খেলাফ করতে পারে না । 

(৩) ঈমান আনতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিদায়েতের লক্ষ্যে তার আদেশ নিষেধ সম্বলিত যে সকল আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, সেগুলো সব সত্য ও নির্ভুল । তন্মধ্যে কোরআন মাজিদ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব । কোরআন মাজিদ নাজিল হওয়ার পর পূর্ববর্তী অন্যান্য সকল আসমানি কিতাব মানসূখ হয়ে গিয়েছে। সুতরাং কোরআন মাজিদ নাজিল হওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামি জিন্দেগি যাপন করার লক্ষ্যে একমাত্র কোরআন মাজিদকেই অনুসরণ করে চলতে হবে। তার বিপরীত আমল করা হলে আল্লাহ তায়াল তায়ালার  নাফরমানি করা হবে। 

(৪) ঈমান আনতে হবে যে , আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিদায়াতের লক্ষ্যে মানুষের মধ্য থেকে মনোনীত করে যুগে যুগে অনেক পয়গম্বর প্রেরণ করেছেন। পয়গম্বরগণ সকলই সত্যবাদী এবং আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দা। তারা মানুষের হেদায়াতের লক্ষ্যে যা কিছু বলেছেন তা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই বলেছেন। নিজেদের পক্ষ থেকে কিছুই বলেননি। তাদের মধ্যে হজরত মুহাম্মাদ (সা.) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বর। সুতরাং তিনি প্রেরিত হওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামি জিন্দেগি যাপনের লক্ষ্যে একমাত্র তারই অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলতে হবে। তার তাবেদারি করলে আল্লাহ তায়ালারই তাবেদারি করা হবে এবং তার নাফরমানি করা হলে আল্লাহ তায়ালারই নাফরমানি করা হবে । 

(৫) ঈমান আনতে হবে যে, এই পার্থিব জীবনেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না। এই কয়েক দিনের পার্থিব জীবনের পরে আমাদের সামনে অন্তহীন আখেরাত বা পরকাল রয়েছে। পরকালের তুলনায় ইহকাল কিছুই নয়। ইহকালের উন্নতি বা অবনতির বিশেষ কোনো মূল্য নেই। প্রকৃত উন্নতি বা অবনতি হলো পরকালের উন্নতি বা অবনতি। যারা ইসলামি জিন্দেগি যাপন করবে তারা পরকালে পুরস্কৃত ও কৃতকার্য হবে এবং অফুরন্ত নেয়ামতের স্থান বেহেশত হবে তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান। পক্ষান্তরে যারা কাফেরি জিন্দেগি যাপন করবে তারা পরকালে ভীষণ শাস্তিপ্রাপ্ত ও দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অসহনীয় দুঃখ যাতনার স্থান জাহান্নাম হবে তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থান। 

(৬) ঈমান আনতে হবে যে, যা কিছু ঘটেছে তা আল্লাহর হুকুমেই ঘটছে। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ব্যতিত ভালো-মন্দ কিছুই হতে পারে না । সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার কাজে রাজি থেকে শক্তি অনুযায়ী নেক আমল করে যেতে হবে। 

(৭) ঈমান আনতে হবে যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ তায়ালা সকলকে পুনর্জীবিত করবেন এবং সকলকে পুনর্জীবিত করবেন এবং নেকি বদির তুল্যাংশে বিচার করবেন। 

ইবাদত: 
ইকামতে দ্বীনের দ্বিতীয় কাজ ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মাবুদ বা উপাস্য আর আমরা কেবলমাত্র তারই বান্দা। কাজেই বান্দা হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো মাবুদের ইবাদত করা অর্থাৎ তার উপাসনা ও আরাধনা করা। নিম্নলিখিত কাজেই বান্দা হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো মাবুদের ইবাদত করা অর্থাৎ তার উপাসনা ও আরাধনা করা। নিম্নলিখিত উপায়ে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত হয়ে থাকে। 

১.আল্লাহ তায়ালার জিকির করা। 
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাক।’ 

২. আল্লাহ পাকের তাসবিহ পাঠ করা। 
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ পাকের তাসবিহ পাঠ করো।’ 

৩. আল্লাহ তায়ালার তাজিমের উদ্দেশ্যে রুকু ও সিজদা করো। 
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর তাজিমের উদ্দেশ্যে রুকু করো ও সিজদাহ করো এবং তারই ইবাদত করো।’ 

৪. আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। 
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা আমার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো এবং আমার না শুকরিয়া না।’ এইভাবে আল্লাহ তায়ালার আদেশ নিষেধ যথাযথভাবে পালন করা, আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা। ভুলবশত: গুনাহ হয়ে পড়লে আল্লাহ তায়ালার নিকট তওবা করা আল্লাহর ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কতিপয় প্রধান প্রধান ইবাদতের নাম হলো নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, সদকা, কোরবানি, জিকির, মোরাকাবা, দোয়া, মোনাজাত, তওবা-ইস্তেগফার প্রভৃতি।

আখলাক:
ইবাদতের পরে আখলাকের স্থান। ইসলামি তাহজিবে আখলাক অর্থাৎ চরিত্র সংশোধনের গুরুত্ব খুব বেশি। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র ভালো সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ অন্য এক হাদিসে আছে হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতে নেকি-বদির ভিত্তিতে নেক আখলাক অর্থাৎ সচ্চরিত্রের জন্যই হবে সবচেয়ে বেশি।’

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে চরিত্র সংশোধনের অর্থ এই যে, ইসলাম যে সকল চরিত্রকে নেক আখলাক অর্থাৎ সচ্চরিত্র বলে আখ্যা দিয়েছে ওই সকল  অর্জন  করতে হবে এবং যে সকল চরিত্রকে বদ আখলাক অর্থাৎ অসচ্চরিত্র বলে ঘোষণা দিয়েছে ওই সকলকে বিষবৎ বর্জন করতে হবে। এখানে নেক আখলাক ও বদ আখলাকের একটি মোটামুটি তালিকা পেশ করা হলো।

নেক আখলাক যা আমাদের অর্জন করতে হবে:
১। তাকওয়া আল্লাহভীতি। ২। খওফ ও রাজা আল্লাহর আজাবের ভয় ও রহমতের আশা। ৩। তাওয়াক্কাল আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা। ৪। ইখলাস সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের নিয়তে করা। ৫। তাসলিম আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা । ৬। রেজা সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাজে রাজি থাকা। ৭। শোকর আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞ হওয়া। ৮। আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসা । ৯। মুমিনদের নসিহত বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা। ১০। গুনাহ করে অনুতপ্ত হওয়া। ১১। সর্বদা আল্লাহর দিকে রুজু থাকা। ১২। পার্থিব জীবনের প্রতি আসক্ত না হওয়া। ১৩। বিপদে ধৈর্য ধারণ করা। ১৪। অপরাধ ক্ষমা করা। ১৫। বিনয়ী হওয়া। ১৬। সত্যনিষ্ঠ হওয়া। ১৭। দয়া পরবশ হওয়া। ১৮। আমানতদার হওয়া। ১৯। ন্যায়পরায়ণ হওয়া। ২০। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা করা। ২১। আদর্শেরর ওপর অচল থাকা। ২২। নিজের অবস্থায় পরিতুষ্ট থাকা ইত্যাদি। 

বদ আখলাক যা আমাদের বিষবৎ বর্জন করতে হবে: 
নফসে আম্মারা বা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করা । ২। অহঙ্কারী হওয়া । ৩। গর্ব করা । ৪। রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানোর জন্য কোনো কাজ করা । ৫। কৃপণ  হওয়া। ৬। অপব্যয়  করা। ৭. পার্থিব জীবনের প্রতি আসক্ত হওয়া। ৮। আল্লাহর আজাব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া। ৯। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। ১০। পরকাল সম্পর্কে উদাসীন হওয়া। ১১। নিজকে নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক মনে করা। ১২। মিথ্যাবাদী হওয়া। ১৩। হিংসা বিদ্বেষ করা। ১৪। বিশ্বাসঘাতকতা করা । ১৫। অকৃতজ্ঞ  হওয়া ইত্যাদি। চলবে..

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে