আলোর সন্ধানে চন্দন আনোয়ারের ‘অর্পিত জীবন’

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৫ ১৪২৬,   ১৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

গ্রন্থ আলোচনা

আলোর সন্ধানে চন্দন আনোয়ারের ‘অর্পিত জীবন’

শুচিস্মিতা দেব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৬ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৭ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক আনোয়ারের পশ্চিমবাংলায় বিদগ্ধ-মহলে বিশেষ পরিচিতি সুলেখক ও ‘গল্পকথা’র সম্পাদক হিসাবে। তার ছোটগল্পের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। বেশ একটু ভিন্ন স্টাইল বলে মনে দাগও কেটেছিল। ধারালো ভাষা ও রহস্যময়তার মিশেলে বাস্তবের স্পর্শকাতর উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

পশ্চিমবাংলার বিশিষ্ট চিন্তাশীল সাহিত্যপত্রিকা ‘সৃষ্টির একুশশতক’-এর উত্সব সংখ্যায় প্রকাশিত ‘অর্পিত জীবন’ আমাকে তার উপন্যাসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করায়। উপন্যাসটি কলকাতার বইমেলায় ‘একুশ শতক’ প্রকাশনী থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বইটি বাংলাদেশের একুশের বইমেলায় ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে বেরিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বইয়ের ফ্লপে লেখাটি নিম্নরূপ:

রাষ্ট্র নিজেই যদি তার নাগরিককে ‘শত্রু’ এবং নাগরিকের জীবন, বাস্তুভিটা, সম্পদ-সম্পত্তিকে ‘শত্রুর সম্পত্তি’ বলে আইন করে এবং দেশত্যাগের পথ তৈরি করে দেয়, সেই দেশের সেই আইনের ফাঁদে পড়া নাগরিকের জীবন-যন্ত্রণার প্রকৃতচিত্র কী কোন ভাষায় ব্যাখা করা সম্ভব? ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের পরে অদ্যবধি এই আইনের ফাঁদে পড়া বাস্তুভিটা হারা, দেশহারা, শেকড়চ্যুত মানুষের জীবন-বাস্তবতার এক করুণ আখ্যান চন্দন আনোয়ারের ‘অর্পিত জীবন’। শত্রু সম্পত্তি আইনের (স্বাধীনতার পরে যার নাম অর্পিত সম্পতি আইন) অভিঘাতে দেশত্যাগে বাধ্য কোটির উর্ধ্বে হিন্দুগোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতা নিয়ে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক গবেষণা-ব্যাখ্যা যথেষ্ট থাকলেও এই আইনের ফাঁদের পড়া মানুষের ব্যক্তিজীবনের সংকট বা অন্তর্বেদনার গভীরতর তদন্ত শুধুমাত্র উপন্যাসেই উঠে আসা সম্ভব এবং ঔপন্যাসিক সেই চেষ্টাই করেছেন।

স্বভাবতই উপন্যাসটি আমাকে নিয়ে গেল দেশভাগোত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়ে, বাংলাদেশের মাটিতে এবং একটি মুসলমান মেয়ের অন্তরে, নাম যার শ্যামলি। গরিব স্কুলমাস্টারের মেয়ের বিয়ে হল শহরের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রথিত বিখ্যাত তিন পুরুষের খানদানী খান পরিবারে। স্বামী তার বাইরের জগতের মানুষ। শাশুড়ি পাকিস্তানি ঐতিহ্যের গরিমায় এখনো মূহ্যমান। বিশাল জমিজমা পুকুর নিয়ে প্রাচীন এক জমিদারের বাড়িতে তিনটি পঙ্গু সন্তান ও অসুস্থ শাশুড়ি নিয়ে শ্যামলির আলোআঁধারি জীবন। তার বাপের ঘরে ফেলে আসা রবীন্দ্রনাথের গান, বান্ধবীরা, অরুণ স্যারের স্মৃতি তাকে আনমনা করে। স্বামী সাকিবের নির্লিপ্ত উদাসিনতা তাকে নিঃসঙ্গ করে। ভেতরে  ভেতরে ক্ষয় হয় শ্যামলি। হিন্দু প্রতিবেশীদের বাড়ি-জমি-সম্মান ধূলায় মিশতে দেখে, দেখে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে আজন্ম চেনা মানুষদের সম্পত্তি ‘শত্রুর সম্পত্তি’ নামে চিহ্নিত হতে। বান্ধবী জমিদার তনয়া আদরিণী চন্দনাকে পথে নামায় আশ্রিত মুনিষ গফুর। দখল নেয় বিশাল সম্পত্তির। শ্যামলি সাকিবের উপর আস্থা রেখেছিল। সাকিব উদীয়মান নেতা । চল্লিশ বছরেই টেক্কা দিচ্ছে পার্টির বর্ষীয়ান নেতাদের। সাকিব হয়ত বদল আনতে চাইবে। গল্পের গভীর বুনট জমাট হতে থাকে, চিত্রপটে ফুটে ওঠে রহস্যময় চরিত্ররা। আসে সুশান্ত, আসে সূর্যাস্তপ্রেমী ভিখারিণী বুড়ি। ঘূর্ণীঝড়ের মতন দাপুটে ঘটনাস্রোত দ্রুত পাঠককে টেনে নিয়ে আছড়ে ফেলে বিচিত্র বিস্ময়কর পরিসমাপ্তির দিকে যখন আসলে আদৌ গল্প শেষ হয় না বরং দেখি এক নূতন স্বপ্নের জয়যাত্রার সূত্রপাত।

শ্যামলি তার নামের মতনই নরম নমনীয় মেয়েটির কী অভাবনীয় বিবর্তন। বৈপ্লবিক বলতে সাধ জাগে। সমাজের মুখোশ ছিঁড়ে ধর্মের সংকীর্ণতা ফুঁড়ে সাহসিকতার অভূতপূর্ব নিদর্শনই হয়ে ওঠে সে। মানবিতার মুক্তির সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে। বাস্তবে আজ শ্যামলিদের এমন উত্তরণই বাঁচাতে পারে পচাগলা স্বার্থপর সমাজকে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই পারে সমাজের হারানো সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে উপন্যাসটি আমাকে এক অচেনা দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতির সুযোগ করে দিল। গল্পের কিছু অনুসঙ্গ অনুমান করতে পারলেও ঘটনার নাটকীয় মিশ্রণ ও উপস্থিতি ভালো লাগল।সব মিলিয়ে বেশ একটা পরিতৃপ্তির রেশ রয়ে গেল উপন্যাসটি পড়ে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর