Alexa ‘আরসা’ বিদ্রোহের জন্ম কথা

ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৩ ১৪২৬,   ১৮ মুহররম ১৪৪১

Akash

‘আরসা’ বিদ্রোহের জন্ম কথা

 প্রকাশিত: ০৯:১৮ ২১ অক্টোবর ২০১৭  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) শীর্ষ কয়েকজন নেতাসহ সংগঠনটির ২০ জন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে আরসা’র ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব, অর্থায়ন ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তারিত তথ্য। ২৪ আগস্ট রাখাইনে সেনাচৌকিতে হামলার ঘটনাও জানা গেছে।

২০১২ সালের ২৮ মে রাখাইনের রামরি এলাকায় এক বৌদ্ধ নারীর বাড়িতে প্রথমে ডাকাতি এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় জড়িত ছিল তিন আততায়ী। তাদের মধ্যে দু’জন মুসলিম ও একজন বৌদ্ধ ছিল। ওই সময় গুজব ছড়ায়, হত্যা করার আগে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং তার কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরই জের ধরে একটি বাসে হামলার ঘটনায় প্রাণ হারায় ১০ মুসলিম।

বাসে হামলাকারীরা ছিল রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর। তাদের ধারণা ছিল, ওই বাসেই ছিল বৌদ্ধ নারীকে হত্যা করা তিন আততায়ী।

সরকারি হিসাব অনুযায়ীই, এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে প্রাণ হারায় ৮০ জন। উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন আরও এক লাখ মানুষ। তবে ওই সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন জানান, নিহতের সংখ্যা দেড়শ।

ওই সহিংসতার পর রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীরা দেখলো তাদের জন্য কোনও স্কুল-কলেজ নেই। কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের ভর্তি করতে রাজি হয়নি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বের করে দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের শেষ আশাও মুখ থুবড়ে পড়লো রোহিঙ্গাদের। শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত সেইসব তরুণরাই গড়ে তোলেন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)।

এর পরের পাঁচ বছরে একটি সামাজিক আন্দোলন থেকে তারা পূর্ণাঙ্গ একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে পরিণত হলো।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই আরসার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। অনেকে আবার আরসার সমর্থক। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন আরসার এই বিদ্রোহী হয়ে ওঠার সূচনালগ্নের কথা।

পুরনো গেরিলা, নতুন বাহিনী: নব্বইয়ের দশকে রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয় ছিল রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশন (আরএসও)। প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র থাকলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর সফল হামলা চালানোর মতো দুঃসাহস কিংবা সক্ষমতা— কোনোটাই ছিল না তাদের। আরএসও’র সদস্য ছিলেন, এমন অনেকেই পরে যোগ দেন আরসাতে। তারা গোটা এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েন, আরও আরও বেশি রোহিঙ্গাদের যুক্ত করতে থাকেন নিজেদের সঙ্গে।

আরএসও’র সঙ্গে যুক্ত মংডুর ৫৫ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ১৯৯৪ সালেই রাখাইনে সেনাবাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল প্রশিক্ষিত রোহিঙ্গাদের একটি দল। ওই মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, ‘মিয়ানমারের নিপীড়ক সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র ও অন্যান্য সক্ষমতা ওই দলের ছিল না। আরএসও ছিল অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত একটি সংগঠন। তা সত্ত্বেও দুইটি হামলার মাধ্যমে আরসা যে সাফল্য দেখিয়েছে, সেই সাফল্য দেখাতে পারেনি আরএসও।’

আরসার সদস্য বলে দাবি করা দুই রোহিঙ্গা জানান, তারা ২০০২ সালে আরএসও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তবে ওই প্রশিক্ষণকে তারা কোনও কাজে লাগাতে পারেননি। ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তারা যখন পরিবারের সদস্যদের হারান, তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্ম নেয়। তারা নিজেদের দীর্ঘদিনের জমানো হতাশা ও ক্ষোভ যেকোনও উপায়ে উগড়ে দেওয়ার জন্য কিছু একটা করার উপায় খুঁজছিলেন।

২০১২ সালে যখন সাম্প্রদায়িক ওই দাঙ্গা লাগে, ততদিনে আরএসও কেবলই একটি নামসর্বস্ব সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ওই সময় আরএসও’র অনেক সদস্যই পুনর্গঠিত হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা তাদের আর এক হতে দেয়নি।

আরএসও’র প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন প্রশিক্ষিত, যা ছিল রোহিঙ্গাদের আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। ওই সময় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো মূলত তরুণদের, তবে তা সব আরএসও সদস্যের জন্যই উন্মুক্ত ছিল। আরএসও’র যেকোনও সদস্যই যেকোনও সময় এই প্রশিক্ষণ নিতে পারতো।

২০১৩ সালে আরএসও সদস্যদের অনেকেই বেনামি একটি দল গড়ে উঠেছে বলে গুজব শুনতে পান। তারা জানতে পারেন, নামহীন এই দলটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ করছে। এই দলের কয়েকজন ছিল আরএসও সদস্য ও মংডুর ওই মাদ্রাসা শিক্ষকের ছাত্র। আরএসও সদস্যদের অনেকেই এই দলটির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

নামহীন একটি আন্দোলন: রোহিঙ্গাদের একটি ক্যাম্পে এক তরুণের কাছে জানতে চাই, ‘আপনি কি আরসার সক্রিয় সদস্য?’ প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। উত্তর দিতে রাজি হন না। এসময় তাকে আরসার একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে তার মুখটি স্পষ্টত দৃশ্যমান। তখন তিনি কথা বলতে শুরু করেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া এই তরুণ বলেন, ‘২০১২ সালের ঘটনায় আমাদের মধ্যে বয়স্ক অনেকেই বলেন, মগদের হয়রানি থেকে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমাদের কারাতে ও কুংফু শেখা দরকার। বৌদ্ধ মগরা আমাদের গ্রামগুলোতে দস্যুদের মতো এসে হামলা চালাতো। তারা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতো, লোকজনকে নির্যাতন করতো। বাধ্য হয়েই আমাদের আত্মরক্ষার কৌশল শিখতে হয়েছে। এটা শেখার জন্য আমাদের কোনও প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল না, আমরা নিজে নিজেই এটা শিখেছি। পরে আমরা জানতে পারলাম, আরও অনেক গ্রামেই রোহিঙ্গারা এমন আত্মরক্ষার কৌশল শিখতে শুরু করেছে। এমনকি অন্য অনেক টাউনশিপেও (জেলা) গ্রামগুলোতে সবাই আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ দিচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের কাছে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, পাঁচ বছর বয়সী শিশুরাও আত্মরক্ষার কৌশল শিখছে।

গত বছরের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) চৌকিতে হামলার ঘটনায় ৯ পুলিশ নিহত হন। ওই সময় থেকেই আলোচনায় আসে হারাকাহ-আল- ইয়াকিন। গত বছরের ওই হামলায় অংশ নেওয়ার কথা গত ২০ আগস্ট আলোচনা করছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া এক তরুণ।

ওই তরুণ ২০১৩ সালের ঘটনাগুলো স্মরণ করেন বলেন, ওই সময় অনেক রোহিঙ্গা তরুণই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তবে সেটা ছিল নিছক আত্মরক্ষার জন্যই। রোহিঙ্গাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠরা (অধিকাংশই মাদ্রাসা শিক্ষক) এসব বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা ওই তরুণ ক্যাম্পের অন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে উদ্দীপনামূলক কথাবার্তা বলতেন। তার আচার-আচরণে অনেকেই তাকে আরসার সদস্য সংগ্রাহক বলে চিহ্নিত করেন। যদিও তিনি নিজে এ অভিযোগ বেমালুম অস্বীকার করেন। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের কোনও এক সময় আমরা জানতে পারি, দুইটি জিনিস আমাদের ভাগ্য চিরতরে বদলে দিতে পারে— হারাকাহ-আল-ইয়াকিন ও আতা উল্লাহ।’

হারাকাহ আল-ইয়াকিন হলো আরএসও’র উত্তরসূরী শক্তিশালী সংগঠন। আর আতা উল্লাহ হলেন রোহিঙ্গাদের ত্রাতা হিসেবে প্রায় মিথে পরিণত হওয়া নেতা। ওই তরুণ বলেন, ‘এই দু’টি বিষয় আমাদের কাছে অন্ধকারে আলোর রেখা হিসেবে আবির্ভূত হয়। আমরা সবাই চিন্তা করতাম এমন কিছু একটার অংশ হতে যেটা আমাদের সুরক্ষায় সহায়ক হবে এবং আমাদের স্বার্থকে রক্ষা করবে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন রোহিঙ্গা বিয়ে করতে চাইলেও এর জন্য মিয়ানমার সরকারকে বিশাল অঙ্কের টাকা দিতে হয়। এমন একটি বিশ্বে আমাদের সবার একসঙ্গে দাঁড়ানোর মতো একটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আমরা সবাই মুখিয়ে ছিলাম।’

কিছুক্ষণ পরই ওই তরুণ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। এরপর তার আর দেখা পাওয়া যায়নি।

হারাকাহ আল ইয়াকিন: কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের নির্জন এক স্থানে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দু’জন রোহিঙ্গা। তাদের মুখে উত্তেজনা, উদ্বেগ আর শঙ্কার ছাপ স্পষ্ট। ইতস্তত তাকাচ্ছিলেন এদিক-ওদিক। কোনও ধরনের হুমকি, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থার কেউ আশপাশে আছে কিনা, বারবার সেটাই বোঝার চেষ্টা করছিলেন তারা।

ওই দুই রোহিঙ্গার একজন বললেন, ‘২০১২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নিপীড়ন চালায়। এর আগের বছরেও তারা নির্যাতন চালিয়েছিল। রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল করতে সেটা ছিল এক ধরনের নিরীক্ষা। একটি বিষয় ছিল স্পষ্ট, তারা আমাদের প্রত্যেককে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমরা জানতাম, এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় একটিই- সবাই এক হওয়া। এ কারণেই ২০১৩ সালের শেষের দিকে গড়ে হারাকাহ আল-ইয়াকিন আত্মপ্রকাশ করে।’

আরএসও ’র যে ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল, তার অনেকগুলোই ছিল না হারাকাহ আল-ইয়াকিনের। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন আর চমকিত করার মতো নেতৃত্বের দিক থেকে নতুন গড়ে ওঠা সংগঠনটি আরএস ও’র চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিল। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অর্থায়ন পাওয়া হারাকাহ খুব শিগগিরই রোহিঙ্গাদের একতাবদ্ধ হওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। জানা যায়, আরএসও ’র প্রায় ৭০০ শীর্ষ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয় এই সংগঠনে।

তবে সবকিছু ছাপিয়েও এই আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে মূল ভূমিকা রাখেন আতা উল্লাহ। তিনিই মূলত রোহিঙ্গাদের এক করে তোলেন। তিনি রোহিঙ্গাদের কাছে হয়ে ওঠেন ‘আমিরুল মুমিনিন’।

ওই রোহিঙ্গা তরুণ বলছিলেন, ‘আমরা তার অনেক গল্প শুনেছি। আমরা শুনেছি, অসামান্য এই ব্যক্তিত্বের অনুসারীরা বোমা-বন্দুক বানাতে জানে। আমাদের জ্যেষ্ঠরা সবসময় আমাদের নিজ দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন। আমাদের জনগণের সুরক্ষায় আমাদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব, করার কথা বলতেন। আমরাও আতা উল্লাহর সঙ্গে যোগ দিতে চেয়েছি, আমাদের জনগণের সুরক্ষায় তাকে সহায়তা করতে চেয়েছিল।’

নতুন এই দলের নেতৃত্বেও ছিলেন তরুণরা। ওই সময়ে বয়স্ক-তরুণ নির্বিচারে সবাই এবং আরএসও সদস্যরাও খুঁজে বেড়াতে থাকেন আতা উল্লাহকে। তার ‘আবির্ভাবে’র খবর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যুৎ চমকের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তিনি পরিণত হন রোহিঙ্গাদের অঘোষিত নেতাতে। আরও দুই বছর পর এসে তার প্রভাবটা পূর্ণ মাত্রায় বোঝা যাচ্ছে।

এ বছরের আগস্টে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর চৌকিতে দ্বিতীয় দফা হামলার ঠিক আগে আগে হারাকাহ আল-ইয়াকিন হাজির হয় নতুন পরিচয়ে। তারা নাম নেয় আরসা। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে সাক্ষাৎ করা দুই রোহিঙ্গা জানান, তারা কখনও আতা উল্লাহকে দেখেননি। কিন্তু তাকে নিয়ে যেসব গল্প প্রচলিত রয়েছে, সেগুলোই তাকে পরিণত করেছে রোহিঙ্গামুক্তির অদ্বিতীয় নেতাতে।

ডেইল বাংলাদেশ/এসআই