আমার মেলা, ছেলেবেলা

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

আমার মেলা, ছেলেবেলা

মুম রহমান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪২ ১৬ এপ্রিল ২০১৯  

মেলায় হারিয়ে যাওয়াটা খুব সিনেমায় আসে। বাণিজ্যমেলা আমার একটুও ভালো লাগে না। শেষ কবে গেছি জানি না। কারো না কারো চাপে পড়েই গেছি। আর গেছি তো বিরক্ত হয়েছি।

দুনিয়ার প্লাস্টিক, ঘটি-বাটি এইসব কিনতে কেন মানুষ উপচে পড়ে আমি আজও বুঝি না। আমাদের খিলগাঁও বাজার বাণিজ্য মেলার চেয়ে অনেক উত্তম। দামে এবং পণ্যের মানেও। আসলে এই ঢাকা শহরে মানুষের বেড়ানোর জায়গা নেই। যে কোনো অজুহাতে কোথাও যাওয়া দরকার। হয়তো সে কারণেই বাণিজ্য মেলায় এতো ভিড় হয়। বাণিজ্যমেলাকে আমার ভালো না লাগলে কার কি! এ যে পণ্য সভ্যতার একটা বড় প্রদর্শন কেন্দ্র তাতে তো কোন সন্দেহ নেই। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা অবশ্যই দেশের অর্থনীতির জন্যে স্বাস্থ্যকর। আমি নিজে গরীব মানুষ বিধায় বাণিজ্যমেলাকে এড়িয়ে চলি। অন্যদিকে, বাণিজ্যমেলা অপছন্দের অন্যতম কারণ হলো খাবারের দোকানগুলা। এতো বাজে খাবার এতো অস্বাভাবিক দামে বাংলাদেশে আর কোথাও বিক্রি হয় না। আমি খেতে পছন্দ করি। বিশেষ করে পথে-ঘাটে। রাস্তার খাবার খেতেই আমি এলোপাথারি ঘুরি ঢাকায়, কলকাতায়। কিন্তু বাণিজ্যমেলায় খাওয়ার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। আমার বিবেচনায়, বাণিজ্যমেলার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে খাবার দোকানগুলোর বিরাট ভ‚মিকা আছে। 

অতো ভিড় কিন্তু বইমেলায় হয় না। অবশ্য প্রকাশকরা বলেন, যতো ভিড় হয় ততো বিক্রি হয় না। কিন্তু বইমেলা কি কেবল বই বিক্রির জায়গা? বই অবশ্যই পণ্য, তবে বইমেলা শুধু একটা পণ্যমেলা নয়। এখানে ভাব বিনিময় হয়। বইমেলা শুধু বই ক্রেতা আর বিক্রেতার মেলা নয়। লেখক, পাঠক, প্রকাশকের মেলা। এমনি এমনি যারা আসেন তারাও বইমেলার সুবাদে অনেক লেখক আর বই দেখতে পান। গাইতে গাইতে গায়েন হওয়া যায়, দেখতে দেখতে পাঠকও হওয়া যায় বই কি! আমি তো দেখেছি, স্রেফ হাত ধরাধরি করে ঘুরতে এসেও, হুজুগে কিংবা চক্ষু লজ্জ্বায় একটা দুইটা বই কিনে ফেলেছেন কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার বিখ্যাত লেখকের সাথে ছবি তোলার সুযোগ নিতেই একটা বই কিনে ফেলেন। যে অজুহাতেই হোক, বইয়ের সঙ্গে একটা যোগাযোগের সূত্র তো বইমেলা। আমি একুশের বইমেলা তো বটেই, নাগালের মধ্যে যখনই যে বইমেলা পাই হাজির থাকি। নতুন বইয়ের গন্ধ, লেখক-পাঠকের যোগাযোগ আমাকে টানে খুব।  তেমনি সবুজের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া বৃক্ষমেলাও আমাকে খুব টানে। শুধু কি সবুজ? লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, সাদা কত না রঙের মেলা এই বৃক্ষমেলা। নগরবাসীর জন্যে একটু অক্সিজেন নিয়ে আসে এই বৃক্ষমেলা। ফুলের গাছ, ফলের গাছ, ক্যাকটাস, বনসাই, ওষুধি গাছ- কতো রকমের গাছই যে চেনা যায় বৃক্ষমেলায়। আমি একসময় খুব যেতাম বৃক্ষমেলায়।  তখন বনসাই ট্রেইনার হিসাবে কাজ করতাম। খুঁজে খুঁজে দেশি-বিদেশি গাছ সংগ্রহ করতাম। এখনও আমার কাছে হিজল তমাল গাছ আছে। আমাদের পরের প্রজন্ম এই গাছ চেনে না তেমন। প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার হিজল-তমাল। আমি কয়েকটা হিজল-তমালের বনসাই করেছিলাম। তারমধ্যে দুচারটা এখনো সংগ্রহে আছে। ফুকেন টি আর এজেলিয়ার চারা কিনেছিলাম বৃক্ষমেলা থেকেই। বই পড়ে জানতাম, নানা রঙের এজেলিয়া ঠন্ডার দেশে হয়। কিন্তু আমার ঘরেই এজেলিয়া ফুঁটেছিলো। কতো বিচিত্র ক্যাকটাস আর অর্কিড থাকে বৃক্ষমেলা। 

ছেউড়িয়ার মেলা আমারে খুব টানে। লোকে বলে সাধু সঙ্গ। মনের মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয় এই মেলায়। এতো সাধু, সন্নাসীরা এ মেলায় আসে যে চোখ আর মন সদাই ব্যস্ত থাকে। গান আর গাঁজায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে পুরো মেলা। লালনের মাজারকে কেন্দ্র করে বাউল-দরবেশদের এই মেলা ভাবের মেলা। আমি নিজে বাউলদের অনেক কাছ থেকে দেখতে পেরেছি একাধিকবার এই মেলায় গিয়ে। সুর আর ভাবের এমন ঈর্ষণীয় সংযোগ খুব মেলাতেই হয়।  

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশে মেলার মধ্যে সর্ব বৃহৎ আর সর্ব সেরা হলো বৈশাখী মেলা। আর কোনো মেলা এতোটা নান্দনিক কিংবা শৈল্পিক নয়। ঢাকা তো বটেই পুরো বাংলাদেশ জুড়েই বাংলা নতুন বর্ষঘিরে বৈশাখী মেলা চলতে থাকে। বৈশাখী মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ চারুকলার র‌্যালি। মেলার বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকরা বানাতে থাকে হরেক রকমের মুখোশ, শোভাযাত্রা নানা অনুসঙ্গ। চারুকলা ঘুরে ঘুরে সে সব দেখি আমি। আগেই বলেছি আমি খাদ্য রসিক। বৈশাখী মেলার পান্তা ভাত, ভর্তা, ইলিশ তো আছেই, সেই সাথে কদমা, বাতাসা, খুরমা, মুড়ি, মুড়কি, তিলেভাজা, খাঁজা আরো কতো কী! তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে আমার জিভ ছুঁটে যায় কাঁচের আমের শরবত কিংবা ভর্তার দিকে। ঝাল-টক-মিষ্টি আমভর্তা কিংবা শরবতের তুলনা আমি সারা বিশ্বের আর কোন আহারে বা পানিয়তে পাই না। 

বৈশাখী মেলা কিন্তু নেহাত মেলা থাকেনি। তা হয়ে গেছে জাতীয় উৎসব। বৈশাখকে কেন্দ্র করে নতুন পোশাক, সাজ-সজ্জার বাহার দেখা যায়। লাল-সাদা রঙের কাপড় না-পরলে বৈশাখী উৎসব যেন স্নান হয়ে থাকে। ঈদ-পূজা ছাড়া এই একটি উৎসবে নতুন পাঞ্জাবি-শাড়ি অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। যেহেতু বছরের প্রথম দিন, সেহেতু ঘরে ঘরে ভালো-মন্দ খাওয়াটা জমজমাট হয়ে ওঠে। বুদ্ধিজীবীরা বৈশাখী মেলাকে অসাম্প্রদায়িক উৎসব বলছেন। তাদের বলার জন্যে অবশ্য বাংলার মানুষ অপেক্ষা করেনি। বহু যুগ ধরেই ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে বৈশাখী মেলা নিরেট উৎসব হয়ে উঠেছে। 

আদতে শুধু বৈশাখী নয়, বইমেলা, বাণিজ্যমেলা, বৃক্ষমেলা, বাউল মেলা- সকল মেলাই অসাম্প্রদায়িক। ধনী-গরীব, হিন্দু-মুসলিম ইত্যাদি হিসাব নিকাশ করে তো আর উৎসব হয় না। মেলাকেন্দ্রিক বাংলার সকল উৎসবই তাই অসাম্প্রদায়িক। বলা হয়ে থাকে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন। আর মেলার হিসাব করলে আমার তো মনে হয় সারা বাংলা বছরে অন্তত তেরশ মেলার খোঁজ পাওয়া যাবে। শহরের উচ্চাঙ্গ সঙ্গিত, সুফি সঙ্গীত ইত্যাদি অভিজাত মেলা তো আছে আর গ্রামে নানা সংক্রান্তি আর ঋতুর মেলার তো তুলনাই নেই। শান্তি নিকেতনের পৌষমেলার যে সমারোহ বাংলার বহু মেলায় তা পাওয়া যায়। লালনকে ঘিরে যেমন ছেঁউড়িয়ারমেলা তেমনি নড়াইলে মেলা হয় সুলতানকে ঘিরে, সাগরদাড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ঘিরে হয় মধূমেলা, পল্লীকবি জসীমউদ্দিনকে ঘিরে ফরিদপুরে জসীমমেলা। এমনকি সম্প্রতি ঢাকায় হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে হিমুমেলাও হচ্ছে। ঢাকায় এবং বড় শহরগুলোতে কম্পিউটার মেলা, মোবাইল মেলা তো চলে প্রায় সারা বছরই। বাংলার নানা সাধক, পীরকে ঘিরে চট্টগ্রাম, সিলেট, শরীয়তপুর ইত্যাদি জায়গায় মেলা চলতেই থাকে। তাড়াইলের মাঘী পূর্ণিমার মেলা, ধামরাইয়ের রথযাত্রা মেলা, রাঙামাটির পানছড়ি বৌদ্ধমেলা, চড়ক মেলা, মহরম মেলা ইত্যাদিও চলে মহা সমারোহে। চট্টগ্রামের জব্বরের বলি খেলা তো আলাদা করে মেলারই সৃষ্টি করেছে। সুন্দরবনের রাস মেলা তো রীতিমতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি। ভ্রমণ, কারুশিল্প, শিক্ষা ইত্যাদি কতো বিষয়কে কেন্দ্র করেই না বাংলাদেশে মেলা হয়। আমার তো মনে হয় বাংলাদেশ আদতে মেলার দেশ। এই পর্যন্ত লেখার পর, বাংলাপেডিয়ার তথ্যে দেখলাম, বাংলাদেশে সারা বছরে পাঁচ হাজারের অধিক মেলা হয়। শিল্প, সংস্কৃতি আর বাণিজ্যের কী বিপুল সম্ভাবনাই না লুকিয়ে আছে এই সব মেলার মধ্যে। হস্তশিল্প, চারু ও কারুশিল্প, লোকজ সামগ্রির বিস্তারে মেলাগুলো বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। 

মেলার সঙ্গে গানের সম্পর্কটা গভীর। ছেঁওড়িয়ার মেলা তো বটেই সেই সঙ্গে মাইজভাণ্ডারি, বাবা সুরেশ্বর ইত্যাদি মেলা সরগরম হয় সুরের ধারায়। প্রায় সব মেলাতেই পুতুল নাচ আর নাগরদোলা বাড়তি আকর্ষণ হিসাবে থাকে। বড় মেলাগুলোতে যাত্রা কিংবা সার্কাস আবশ্যকীয়। কবি গান, বাউল গান, সং, বায়োস্কোপ, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচও হয় কোন কোন মেলাকে কেন্দ্র করে। 

তবে সকলই যে ভালো তা তো নয়। অনেক মানুষ, ভিড়, অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে। ফ‚র্তির টানে আলগা হয়ে যায় বিধি-নিষেধের কড়াকড়ি। মফস্বল বা গ্রামের মেলাকে কেন্দ্র করে হাউজি-জুয়াখেলা, এমনকি অশ্লীল নাচ কিংবা পতিতাবৃত্তির প্রবণতাও খেয়াল করা যায়। 

আঙুলে গোণা দুয়েকটা অনাচার বাদ দিলে বাংলাদেশের সব মেলাই সুন্দর আর আনন্দের জয়গানে পূর্ণ। আমার মনে হয়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে এইসব মেলাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো আমরা আরো বড় পরিসরে করতে পারি। আমাদের ছেলেমেয়েরা আবার ঘুড়ি, লাটিম নিয়ে খেলতে শিখুক, আমাদের ঘরে ঘরে আবার নকশি কাথা, তালের পাখা, শীতল পাটি যোগ হোক, শহরে বাজুক বাঁশির সুর, মেয়েদের হাত ভরে যাক কাচের চুড়িতে। নগর ও গ্রামের মিলন হোক, পৌত্তলিক আর একেশ্বরবাদী মিলিত হোক- মেলার কল্যাণে, এমন স্বপ্ন আমি দেখি।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর