আমার নজরুলসংগীত কিংবা নজরুলসংগীতের আমি

ঢাকা, বুধবার   ১৫ জুলাই ২০২০,   শ্রাবণ ১ ১৪২৭,   ২৪ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

আমার নজরুলসংগীত কিংবা নজরুলসংগীতের আমি

অণিমা মুক্তি গমেজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৫ ২৫ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:১৩ ২৫ মে ২০২০

কাজী নজরুল ইসলাম (ফাইল ছবি)

কাজী নজরুল ইসলাম (ফাইল ছবি)

আমি ঢাকা জেলার একটি সুন্দর গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। সে গ্রামের নাম হাসনাবাদ। থানার নাম নবাবগঞ্জ। আামদের গ্রামে সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল বেশ উন্নত। শুদ্ধ সংগীতের চর্চাটা বেশ ভালো ছিল। রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীতের চর্চাটা বেশি হতো। তবে উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিষয়টি কম ছিল। তাই আমাদে হাতেখড়ি হয় রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে।

বাড়িতে সব সময়েই গানের চর্চা ছিল। মামারা গান গাইতেন। আমার মা-ও গান গাইতেন। বাবাও ছিলেন গানের সমঝদার। ছোট মামার কণ্ঠে গান শুনেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রেমে পড়া। তাছাড়া গ্রামে যার কাছে আমার গানের হাতেখড়ি, তিনিও এলাকার নামকরা সংগীতশিল্পী। অসাধারণ রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, নাম মায়া গাঙ্গুলি। 

তবে বাবা পিটার কিরণ গমেজ চাইতেন আমি নজরুলসংগীতের শিল্পী হই। গ্রামের অগ্রদূত নামের একটি ছাত্র সংগঠন প্রতি বছর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেখানে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি নজরুলসংগীত গেয়ে প্রথম পুরস্কার পাই। নজলের বাণী ও সুর আমাকে আকর্ষণ করে ফেলে। তাই তখন ক্যাসেট শুনে শুনে নজরুলসংগীত শিখতে শুরু করি। বাবা গান সংগ্রহ করতেন। অসাধারণ ছিল সেইসব গান। আর গ্রামে যারা নজরুলসংগীত ভালো গাইতেন, তারা থাকতেন ঢাকা শহরে। তাই কোনো শিল্পীর কাছে নজরুলসংগীত শেখার সুযোগ শুরুতে আমি পাইনি। সে সময় নজরুলসংগীত শেখাটাই আামর জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়াল। অদ্ভুত একটা জেদ তখন কাজ করতো। 

নজরুলের সব ধরনের গান আমাকে তখন টানতো। কিন্তু শিখে নেয়ার বিষয়টি ছিল খুবই কষ্টকর। টেপ রেকর্ডারে গান শুনে বাণী বোঝা ছিল দুরূহ। মনে পড়ে একটি গান বুঝে লিখে নিতেই তখন দিনের পর দিন পার হয়ে যেত। সুর তোলা তো আরো সময়ের ব্যাপার। কিন্তু হাল ছাড়িনি। স্কুলে, ক্লাবে, গ্রামে, উপজেলায় যখনই কোনো প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো কিংবা গানের অনুষ্ঠান হতো, ‘শ্রেষ্ঠ হতে হবে’ এমন একটা তাগিদ কাজ করতো মনের ভেতরে। তাই গভীর মনোযোগ দিয়ে গান তুলতাম আর নিজে নিজে শিখতাম। ‘যত ফুল তত ফুল-কণ্টক জাগে’ আর কাব্যগতি ‘দাঁড়ালে দুয়ারে মোর-কে তুমি ভিখারিণী’-এ দুটো গান দিয়ে মঞ্চে আমার নজরুলসংগীত গাওয়া শুরু এবং প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে নেয়া। 

মায়া গাঙ্গুলীর কাছে বেশি দিন আর গান শেখা হলো না। বিয়ে করে তিনি ঢাকা শহরে চলে যান। গান নিয়ে শুরু হলো আমার একার সংগ্রাম।  একা একা তো নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা খুব কঠিন। গান আর পড়াশোনা-দুটোকেই ছোটবেলা থেকে এক সঙ্গেই রেখেছি। তাই পড়াশোনাতেও চলতো শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। 

কারো কণ্ঠে নজরুলের কোনো সংগীত ভালো লাগলে, সঙ্গে সঙ্গে আমার কণ্ঠে তুলে নিতাম। তখন তো মোবাইল ফোন কিংবা ছোট রেকর্ডার ছিল না। শুনে শুনে মনে মনে তুলতাম আর দৌড়ে এসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে ঠিক করে নিতাম।। ব্যাস এভাবেই নজরুলের গান আয়ত্ত করা।
 
একবার গাজীপুরে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে যাই। অনেকে মিলে আড্ডা হচ্ছে। সবাই গল্পগুজব করছে। কিন্তু আমার মন এবং কান আটকে গেল নজরুল ইসলামের একটি গানে, ‘আজি এ শ্রাবণে মিশি কাটে কেমনে’। সময়টা দেখে নিলাম। পরের দিন অপেক্ষায় থাকলাম ওই মেয়ে কখন গান গাইতে বসে। মেয়েটি ওইদিন বিকেলে কেবল পাল্টা প্রাকটিস করল। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ভেতরটা অস্থির হয়ে রইল নজরুলের ওই গানটির জন্য। বিষয়টি ওই গ্রামে আমার এক বোনকে জানালাম। ভাগ্য খুব প্রসন্ন যে দিদি গানটি জানত। তবে পারফেকশন নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিল। তবে আমি সেদিন গানটি তুলে নিলাম যে আনন্দে, সে আনন্দ লিখে বোঝাই এমন সাধ্য আমার নেই। সোনার অলঙ্কার নয়, লাখ টাকা কিংবা দামি পোষাক নয়, ওই বয়সে ওই গানটি এত সহজে শিখতে মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মেয়েটি আমি।
 
আমাদের গ্রামে তথন শ্রোতাও ছিল বেশ ভালো। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতেন সবাই। নানা পার্বণে যেমন মঞ্চ সেজে উঠত, তেমনি গ্রামে বসতো মেলা রকমারি বাহার নিয়ে। একবার এক মেলায় গিয়েছি। কাজী নজরুল ইসলাম যেন ইশারায় আমকে ডাকল। মায়ের কাছে নজরুলের মাটির মূর্তি কেনার আবদার করি। মা আমাকে কিনে দেন। আমার পড়ার ঘরে তখন থেকে কাজী নজরুল তার স্থায়ী আসন করে নিলেন। শুরু হলো নজরুলের গান আর কবিতা নিয়ে আামর নতুন মাতামাতি। 

স্কুলের সব কিছু তখন আামর প্রাণের থেকেও প্রিয়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভালোবাসা-শাসন আর যত্নে আমি যেন আরো উৎসাহী হয়ে উঠলাম গানের পড়াশোনায়, গার্লসগাইড আর সেবামূলক কাজে। আমাদের সময়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষিক থেকে শুরু করে প্রায় সব শিক্ষকই নাচ-গান-আবৃত্তি-চারুকলা বিষয়ে বেশ জ্ঞান রাখতেন। ৭ম শ্রেণি থেকেই শিক্ষিকা বীণা কোড়াইয়া দিদি আমাকে বোঝাতেন অনুষ্ঠান বুঝে গান বাছাই করতে হয়। এই বীণা দিদিই গ্রামের যুবসমাজকে গানের ভুবনে টেনে রাখতেন। তার মতো শিক্ষিকার ভালবাসা পেয়ে আমি সব সময় নিজেকে ধন্য মনে করি। দিদি তেমনভাবে কারো কাছে তালিম পাননি। কিন্তু অনেক গান গাইতে জানতেন। স্কুলে সব সময় কোন না কোনো কারণে তখন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত। নজরুলের গানের প্রতি আমার আগ্রহ ও কিছুটা দখল দেখে বীণাদি আমাকে নজরুলসংগীতের একটি ছোট্ট তালিকা করে দিয়ে বলেছিলেন ‘গানগুলো কষ্ট করে শিখে রাখ। প্রয়োজনে গাইবে। – গানগুলো হলো-
১.    চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল
২.    দুর্গম গিরি কান্তার মরু
৩.    কারার ওই লৌহ কপাট
৪.    এই শিকল পরা ছল
৫.    জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা
৬.    নয়নভরা জল গো তোমার
৭.    আমি চিরতরে দূর চলে যাব
৮.    অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে
৯.    আমার যাবার সময় হলো- দাও বিদায়

উল্লেখ্য যে, সে সময় স্কুলের অনুষ্ঠানে গান শুরু হতো আমার কণ্ঠেই। সমবেত কণ্ঠের গান হলে আমাকেই নেতৃত্ব দিতে হতো। আবার গির্জায়ও গান পরিচালনার দায়িত্ব আমাকেই দিয়ে বসতেন বীণাদি। খুবই টেনশন হতো তখন। অনেকটা বিরক্তি বলা যায়। কিন্তু আজ তা ভাবলে দুচোখ জলে ভরে যায়। আমাদের গানের 
দলে বীণাদি পাশে বসে বাসে আমাকে গান বাছাই করে দিতেন। আমি লিড দিতাম। সবাই মিলে গাইতাম। স্কুলেও দিদি তাই করতেন। অনুষ্ঠানের ৭ দিন আগেই দিদি টিফিন পিরিয়ডের ফাঁকে ডাকতেন। জানতে চাইতেন কী গাইব? তারপর গান শুনে-শুনে বলে দিতেন কোনটা সেদিন গাইতে হবে। স্কুলের সময়টা এভাবেই সংগীতময় কেটেছে। আনন্দের সেই দিনগুলো এক সময় ফুরিয়ে গেল। প্রিয় স্কুল, প্রিয় গ্রাম ছেড়ে শহরে এলাম। ভর্তি হলাম কলেজে। বীণাদিদি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু সেসব সময়ে তাকে আমি পাই গানে গানে। 

কলেজে পড়ার সময় মনোবল কিছুটা ভেঙে পড়েছিল। আমরা গ্রামের যারা ছিলাম তারা সব সময়েই ভাবতাম শহরে গান শেখার সুযাগ বেশি, তাই সবাই ভালো গান করে, আমি হয়তো ততো ভালো গাইতে পারি না। তাই গানের চেয়ে পড়াতেই বেশি মন দিলাম। বলা যায়, গানের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমে এলো। এরমধ্যে ঢাকাস্থ খ্রিস্টান ছাত্র সংগঠনের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় মামির আগ্রহে নাম দিলাম। রবীন্দ্র-নজরুল-আধুনিক তিন বিভাগেই নাম দিলাম। যথাসময়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে গাইলাম তিন ধরনের গান। কিন্তু সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে দখল করে নিলাম প্রথম স্থান। তিন বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করব, এমনটি হয়তো আমি নিজেও কল্পনা করিনি। গ্রাম থেকে আসা এবং তেমন গুরুর কাছে শিখতে না পারার দুর্বলতা তো মনের ভেতর ছিলই। তো আমিই হয়ে গেলাম চ্যাম্পিয়ান। নজরুলের ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি গানটি তখন শ্রোতারা বারবার শুনতে চাইলেন। মনোবল ফিরে পেলাম। আমিও গাইলাম নজরুলের গান।
 
এরপর নজরুলের গান শেখার বাসনা তৈরি হলো তীব্রভাবে। নজরুল ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়ে গেলাম। অসাধারণ অনূভূতি। যেন হাতে চাঁদ পাওয়া! আর যাদের সংস্পর্শে এসে জীবন ধন্য হলো তারা এদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ও নজরুল সংগীত বিশারদ পরম শ্রদ্ধেয় ওস্তাত সুধীন দাশ এবং সোহরাব হোসেন। ধানমণ্ডির কবিভবনে নজরুলের গান শেখার সময়গুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। তাদের মুখে নজরুলের কথা শুনে আর নজরুলের গান শুনতে শুনতে যেন চোখের নামনে নজরুলকে দেখতে পেতাম। কবিভবনের সবটুকু যেন হয়ে ওঠে নজরুলময়।
 
নজরুল ইন্সটিটিউট-এ আমরা মূলত আদি রেকর্ডভিত্তিক গানগুলোর তালিম পেয়েছি। যেমন,
১* বলে বধূঁয়ারে নিরজনে (সখি), 
২* বন্ধু পথ চেয়ে চেয়ে, 
৩* নাচের নেশায় ঘোর লেগেছে, 
৪* সুন্দর অতিথি এসো এসো, 
৫* ঝুমার নাচ নেচে কে এলো গো। 

অসাধারণ আনন্দ নিয়ে, শ্রদ্ধেয় প্রশিক্ষকদের ক্লাস করতাম। আজো সে স্মৃতি চোখে ভাসে। সুন্দর দিনগুলো সত্যি যেন উড়ে গিয়েছিল কর্পূরের মত। কলেজে সাংস্কৃতিক সপ্তাহ শুরু হয়ে গেলে, আমার স্কুলের বান্ধবীরা না জানিয়ে, তাতে আমার নাম দিয়ে দেয়। আমার জানা গানই গাইলাম এবং যথারীতি সবগুলো গানে প্রথম স্থান পেয়ে কলেজে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাই। জীবনের গায়ে লাগে নতুন হাওয়া, কলেজে কদর বাড়ে। রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল সংগীতের পাশাপাশি এ সময় আমি আধুনিক গানেও ঝুঁকে পরেছিলাম। কলেজে শিক্ষকদের স্নেহ পেয়েছিলাম প্রত্যাশাতীত। কারণ অবশ্যই ‘সংগীত’। স্কুলের মতো এ সময়ও কলেজ পর্যায়ের সব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হতো শিক্ষিকাদের অনুপ্রেরণায়। প্রথম হওয়ার একটা নেশা আছে, সেটা আমার উপর চেপে বসেছিল বোধহয়। সত্যি বলতে কী, এসব প্রতিযোগিতা নিজেকে চিনতে সাহায্য করেছিল। আজো মনে পড়ে, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার কিছুদিন আগে , ‘ঢাকা খ্রিস্টান ছাত্রকল্যাণ সংঘ’ আয়োজিত প্রতিযোগিতায় চারটি গান গেয়ে প্রথম স্থান পেলেও, জনপ্রিয়তা পেয়েছিল নজরুলসংগীত ‘অরুন কান্তি কে গো, যোগী ভিখারি’। কারণ, ওই অনুষ্ঠানের শেষদিনে দর্শকদের অনুরোধে এই গানটি আমায় গাইতে হয়েছিল। এভাবেই সময়টা কাটছিল। এক সময় কলেজ থেকে জাতীয়পর্যায়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, এবার প্রতিযোগিতার জন্য লোকগান কণ্ঠে তুলে নিলাম। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে লোকগানে নাম দিলাম। জীবনের প্রত্যেক বাঁকে কার জন্য কী অপেক্ষা করে তা কেউ জানে না। আমার বেলায়ও তাই হয়েছিল।
 
আমি সংগীত ভালোবাসি। হৃদয় ছোঁয়া সব ধরনের গানই আমার ভালো লাগত, কোন গানে স্থায়ী হবো তা কোনো সময় ভাবিনি। কিন্তু এ প্রতিযোগিতার ফলাফল আমার জীবনের হিসাব পাল্টে দিলো। সব ছাপিয়ে লোকগানে প্রথম স্থান পেয়ে গেলাম। সেই থেকে লোকগানের সঙ্গে চলা শুরু। যেখানেই গাইতে গিয়েছি শ্রোতা আমার কন্ঠে লোকগানে শুনতে চাইত। লোকগানের সংগ্রহ তখনও কম ছিল, তাই মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলেও প্রকাশ করতাম না। তখনও নজরুল সংগীত গাইতে আমার বেশ লাগত। কিন্তু দর্শকরা যেহেতু প্রাণ, তাই তাদের জন্য গানের সংগ্রহ বাড়াতে হলো। স্থির হলো লোকগানেই স্থায়ী হবো, এ জন্য বাংলা লোকগানের কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী শ্রদ্ধেয় নীনা হামিদের কাছে গান শিখতে চাইলে তিনি আগে আমার কণ্ঠ পরীক্ষা নিলেন এবং শুরু হলো শেখা। জীবনের সব ক্ষেত্রেই শিক্ষকভাগ্য আমার প্রসন্ন। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নীনা আন্টি খুব ভালোবাসতেন আমায়। কিন্তু তিনি কিছুদিন পরে আমেরিকায় চলে যান এবং আমার লোকগান শেখায় ছেদ পরে। তবে হ্যাঁ, আমি রেকর্ড থেকে ততদিনই প্রচুর লোকগান তুলে নিয়ে প্র্যাকটিস করতে থাকলাম। কিছুদিন বিরতির পর আমি গান শিখলাম শ্রদ্ধেয় কৃষ্ণচন্দ্র আচার্য্যর কাছে। তিনি পরম স্নেহে শেখাতেন ক্ল্যাসিকাল ও নজরুলসংগীত। আবার নজরুল সংগীতে ডুবে যাওয়া। তবে ‘মৃদঙ্গ’ সংগঠনে জড়িত থাকায় প্রতি সপ্তাহ সেখানে লোকগানই চলতে থাকত। তখন তো এখনকার মত এত সুবিধা ছিল না। তাই ক্যাসেট কিনে লোকগান তুলতাম, শুনে শুনে গান তোলায় খুব কষ্ট। বাণী বুঝতে সময় লাগত ঢের। তবু, অসাধারণ এক আনন্দ ছিল সে কষ্টের ভেতর। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কৃষ্ণচন্দ্র স্যার শিখালেন বেশ কিছু নজরুল সংগীত। তার মধ্যে আমি এখনো যেগুলো গেয়ে থাকি সেগুলো হলো-
১* তুমি বেনুকা বাজাও কার নাম লয়ে শ্যাম 
২* শ্যাম তুমি যদি রাধা হতে। 

ভালোলাগার গানগুলো গাইতে গাইতে বেড়ে উঠছিলাম, হঠাৎ ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’ থেকে ডেকে পাঠানো হলো আমায়। বাংলার জনপ্রিয় লোককাহিনী “রূপবান” নিয়ে নৃত্যনাট্য তৈরি হবে। সে জন্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে মূল চরিত্রে কণ্ঠ দিতে আমার তলব। রূপবান নৃত্যনাট্যের সংগীত পরিচালনায় ছিলেন এদেশের বিশিষ্ট সংগীত-পরিচালক আলী আসগর খোকন এবং নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী দীপা খন্দকার। যেহেতু এটি লাইভ নৃত্যনাট্য ছিল তাই, দীর্ঘ ছয়মাস শুধু প্রাকটিস হয়েছে। সুতরাং কৃষ্ণকান্ত স্যারের কাছে শেখা গান বন্ধ হয়ে গেল। রূপবান নৃত্যনাট্যে রূপবানের কণ্ঠের মোট ১২টি গান আমায় গাইতে হতো। যে দিন অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ হয়, সেদিনই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আমি লোকসংগীতের জগতে পাকা বসত পেয়ে যাই।
 
সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা, তাই আমি আবার শিক্ষার জন্য ছুটলাম বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী ও ওস্তাদ সালাহউদ্দীন আহমেদের কাছে। অত্যন্ত স্নেহভরে তিনি গান শেখাতেন। মূলত তার কাছেই আমি নজরুলের লোকঅঙ্গের কিছু গান শিখেছি বিশেষ করে ভাটিয়ালী ও ঝুমুর গান। যেমন,
১* একূল ভাঙে ওকূল গড়ে 
২* পদ্মার ঢেউ রে 
৩* ঝুমার নাচ নেচে কে এলো গো 
৪* কে দিল খোঁপাতে ধুতরো ফুল 
৫* আমি বাউল হলাম ধূলির পথে। 

এ রকম আরো কিছু গান তিনি আমাকে তুলে দিয়েছেন যা এখনো আমি গেয়ে থাকি। সত্যি বলতে কী, নজরুলের গানে সুরের বৈচিত্র্য আমায় খুব স্পর্শ করে, সে ক্লাসিক্যাল হোক বা লোকগান, সবখানে তিনি ভেঙেচুরে নতুন কিছু তৈরি করতে চেয়েছেন, তৈরি করেছেন। এ ক্ষেত্রে ভাওয়াইয়া গান যা তিনি প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের জন্য তৈরি করেছিলেন, সে গানের সুর ভাওয়াইয়াগানের নিজস্ব সুর, কবি কেবল কথা সাজিয়ে সেই সুরের উপর বসিয়ে দিয়েছেন কিন্তু, তারপরও সে গান যেন তার ছোঁয়ায় অনবদ্য। তাইতো, এ-গান গাইতে গিয়ে হৃদয় শীতল হয়ে যায়। 

নজরুলের লোকধারার গান শেখানোর পাশাপাশি ওস্তাদ সালাহউদ্দীন আহমদ বেশ কিছু শ্যামাসংগীত তুলে দিয়েছিলেন। প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া শ্যামাসংগীত গাইতে গিয়ে এখনো দু-চোখ জলে ভিজ যায়। আর ততবারই ভাবি, নজরুল এখানে কাব্যকে জয় করে হয়ে উঠেছিলেন বাংলার আবেগী মানুষদের অন্তর্যামী। তা না হলে, মা শ্যামাকে যা বলতে চেয়েছি, পূর্বেই তিনি বললেন কীভাবে? এখনো শ্যামাপূজায় যে গান আমি পরিবেশন 
করতে ভালবাসি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো- 
১* আমার হাতে কালি, মুখে কালি। 
২* শ্যামা মা কি আমার কালো। 
৩* আমায় যারা দুঃখ দিল। 
৪* আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে। 
৫* থির হয়ে তুই বোস দেখি মা।

ভক্তিরসে পূর্ণ শ্যামাসংগীতের যে বাণী গেঁথেছেন আর সুর তিনি বেধেছেন তা যে কোনো অন্তরকে স্পর্শ করবেই। রামপ্রসাদের পর, শ্যামাসংগীত নিয়ে যত বাণী ও সুর রচিত, চর্চিত এবং গীত হয়েছে আজ পর্যন্ত তা নজরুল ইসলামের লেখাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

লোকসংগীত নিয়ে চলতে চলতে, লোকসুরেই সব মনোযোগ আজকাল কাজ করে। এক সময় গান শেখা এবং গাওয়াতে আনন্দ পেতাম খুব। সময়ের রথে পা দিয়ে বয়স বাড়ছে, এখন সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি লোকগান নিয়ে ভাবতে, সংগ্রহ করতে, গবেষণা করতে ভালো লাগে। আর এ জন্যই, কাজী নজরুল ইসলামের লোকসুর আমায় আপ্লুত করে, বাউল গান ভাবিয়ে তুলে। বাউল গানে লালন সাঁইজির গান, হাছন রাজার গান, রাধারমনের গান এ সব যেমন লোকগানের সম্পদ, তেমনি নজরুল ইসলামের লোকধারার গান ও বাংলা লোকসংগীতের বিশাল সম্পদ বলে আমি মনে করি। এক সময় লোকগান সমাজের চোখে হেয় হলেও সময়ের পরিক্রমায় সেখানে বিপুল পরিবর্তন এসেছে। এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা লোকগানের প্রতি যেভাবে ঝুঁকেছে, তাতে আমরা আশার আলো দেখতে পাই। তবে প্রচারের এ যুগে অনেকে স্টার হতে চায়। তারপরও বলবো, তারা তবু চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে নজরুলের লোকসুর, বাউলগান, ঝুমুর গানেও ওদের মনোযোগ লক্ষ্যণীয়। সঠিকভাবে যদি তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় তবে উভয় ক্ষেত্রেই বিশাল লাভ। বাংলাদেশে অবশ্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ উদ্দেশ্যে কাজ চলছে তবে শুধু লোকসুরের নয়, সব ধারার গানের প্রশিক্ষণ হচ্ছে। লোকধারার কাজ কম হচ্ছে বলে শুনেছি।
 
বতর্মানে আমি ‘ঢাকা ক্রেডিট কালচারাল একাডেমিতে’ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। নজরুল সংগীত গাইতে গিয়ে এ সংগীত যেভাবে ভালোবেসে ফেলেছি, তাতে অনেক স্বপ্ন বাকি রয়ে গেছে। আমি চাই, লোকসংগীতের শিল্পীরা ৫টি পল্লীগীত গাইলে একটি নজরুলের বাউলঅঙ্গের গান গাইবে। সে কারণেই, কিছু প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করার প্রক্রিয়া চলছে। তাতে পাঠদান করা যেতে পারে,

১* নজরুলের লোকগান ২* শ্যামাসংগীত ৩* কাব্যগীতি ৪* রাগাশ্রয়ী গান। কারণ, সব শিল্পী সব অঙ্গের গানে সমান পারদর্শী হয় না। এভাবে, আলাদাভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব ধারার শিল্পীদের যেমন নজরুলের গান সহজভাবে শেখানো যাবে, তেমনি নজরুলসংগীত নিয়ে যারা ভীত তাদের ভয় দূর করে পরিশীলিতভাবে নজরুলসংগীত পরিবেশন করতে পারবে। একজন লোকগানের শিল্পী হিসেবে, আমি চাই নজরুলের লোকধারার অসাধারণ গানগুলো যুগ থেকে যুগে কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ুক সবার হৃদয়ে।

অণিমা মুক্তি গমেজ: সংগীতশিল্পী ও গবেষক। অধ্যক্ষ, ঢাকা ক্রেডিট কালচারাল একাডেমি, ফার্মগেট, ঢাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম