আমরা বাংলার গর্বিত উত্তরাধিকার

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

আমরা বাংলার গর্বিত উত্তরাধিকার

 প্রকাশিত: ১৬:৩৬ ১ এপ্রিল ২০১৯  

চিত্রশিল্পী, কবি ও মৌলিক চিন্তক দ্রাবিড় সৈকত। পেশা: শিক্ষকতা। পুরস্কার ও সম্মাননা: ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ পুরস্কার, উদিচী সম্মাননা (জাককানইবি), অগ্নিবীণা সম্মাননা। প্রকাশিত গ্রন্থ ৩টি। একক চিত্র প্রদর্শনী৪টি। শিক্ষাগত যোগ্যতা: এমএফএ (অংকন ও চিত্রায়ন বিভাগ), চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাভাষী, বাঙালি ও বঙ্গভূমি অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আমাদের পরিতাপের শেষ নেই। কেননা যতদূর দৃষ্টি যায় এর কোথাও গৌরব করবার মতো এমন কিছু নেই, যাকে আঁকড়ে ধরে বলতে পারি আমরা এর গর্বিত উত্তরাধিকার বহন করছি।

আমাদের শিল্প নেই, আমাদের বিজ্ঞান নেই, আমাদের অর্থ নেই, সোনার খনি নেই, সাম্রাজ্য নেই, মনকে নাড়িয়ে দেয়ার মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ নেই, আমাদের দার্শনিক নেই, দর্শন নেই, ইতিহাস নেই, গণিত নেই, ভালো সঙ্গীত নেই, গীতিকার নেই, গায়ক নেই, ভাল বাসস্থান নেই, রুচি নেই,  সৌন্দর্যবোধ নেই, উন্নত খাবার নেই, প্রযুক্তি নেই, শিল্পী নেই, বুদ্ধিজীবী নেই, রাষ্ট্রনেতা নেই, রাজনীতি নেই, সততা নেই, আদর্শ নেই, চরিত্র নেই, ভাবনা-চিন্তার পরম্পরা নেই, নিরাপত্তা নেই, সত্য নেই, বিচার নেই, ক্ষমতা নেই,  প্রেম-ভালবাসার সংবেদনশীলতা নেই, ভদ্রতাবোধ নেই, শ্রদ্ধা-স্নেহ-মমতা নেই, মৌলিক তাত্ত্বিক-গবেষক নেই, মানুষের  শেকড় নেই, ভাষা মিশ্র, চরিত্র দুর্বল, জাতিতে শংকর, নির্বোধ আর ভীরু-ম্রীয়মানদের এই দেশে মানুষ বলতে যেসব প্রাণীকে বোঝানো হয় তারও কোনো হদিস নেই। লজ্জা-অপমানের বোঝা বহন করতে অপারগ হয়ে এখানকার মানী-জ্ঞানী-গুণী-সামর্থবান মানুষেরা পালিয়েছেন অথবা পালানোর প্রস্তুতি নিয়ে মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। নির্বুদ্ধি অথবা অসহায় কিছু প্রাণী যারা দৈবদুর্বিপাকে এই ভূখণ্ডে জন্মেছেন এবং এখানে থেকে যাওয়া ছাড়া অন্যকোনো উপায় যাদের জানা নেই তারাই এখানে আছেন এবং এই জন্ম-পাপ লাঘবের জন্য অহর্ণিশ বাঙালিকে গালাগালি করছেন, অন্তত এখানে জন্মের ক্ষোভটুকু উগরে দিতে পারছেন আশেপাশের মানুষের উপর। এই অশ্রাব্য গালাগাল, আর অভিশাপের বিষ্ঠায় বাঙালি এতোটাই হতভাগা যে তার পাশে দাঁড়ানোর মেরুদন্ডী কোনো প্রাণীর দেখা মেলে না বহুযুগ ধরে। 

কলিম খান; হ্যাঁ কলিম খান সেই ফিনিক্স পাখি, যিনি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলছেন থামো; তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে; তোমরা পাগল হয়ে গেছো। সুস্থির হয়ে বসো আমি তোমাদের বলছি সেইসব কথা যা তোমরা ভুলে গিয়েছো। তোমাদের আছে, কিন্তু চিনতে পারছো না। তোমাদের মেরুদন্ডের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভাষার দূরত্ব, ভাবের দূরত্ব, সময়ের দূরত্ব আর ইউরোপীয়ান চশমায় সটান হয়ে যা দেখছো তাতে সত্য নেই, আছে গ্লানি-ক্লান্তি-অবসাদ-অপমানের নিকৃষ্ট কলঙ্ক। কলিম খান বাংলা ভাষাকে খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনলেন সেইসব ধনরত্ন যা আমাদের ছিল বা আছে বলে আমরা ভাবতেও পারি না এবং সাধারণ যুক্তি ও ভাষায় তুলে ধরলেন বাঙালির সামনে। বাঙালির এমন অধঃপতনের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে কলিম খান একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক ও সহৃদয় শুশ্রুষাকারী। সমস্যার গোড়ার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন- ‘কীভাবে এই মহা-অনর্থ সম্ভব হল, সেটি বুঝতে গেলে নিশ্চয় দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। এখানে সংক্ষেপে এইমাত্র বলে রাখা চাই যে, শিল্পবিপ্লবের নামে বৃহৎশিল্প (যন্ত্ররাজ, ইন্ডাস্ট্রি) জাতির শাসক পরিচালকের কাছে দাবি করেছিল, তার তিনটি অনিবার্য প্রয়োজন রাষ্ট্র যেন পূর্ণ করে- ‘ক’) যন্ত্রের গ্রাসের জন্য খাদ্য (কাঁচামাল ইত্যাদি) সরবরাহে বাঁধা দেয়া যাবে না; ‘খ’) যন্ত্রজাত উৎপন্ন-ধারাকেও অবাধে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যেতে দিতে হবে; এবং ‘গ’) যন্ত্রের প্রয়োজন অনুসারে সমাজসদস্যগণকে শ্রমিক রূপে গ্রহণ ও বর্জন করতে দিতে হবে। কার্য্যত এ হল, জড়জগৎ ও জীবজগৎকে লণ্ডভণ্ড করে লুণ্ঠন করার অধিকার দাবি; সমাজদেহের প্রতিটি কোষের সঙ্গে সমাজ-পরিচালক মস্তিষ্ক (জ্ঞানযোগী) ও হৃদয়ের (কর্মযোগীর) সম্পর্ক ছেদ করার দাবি।’ শিল্প বিপ্লবের পর সমাজদেহের পেটের সেবায় নিয়োজিত হয়ে গেল সমাজদেহের মস্তিষ্ক ও হৃদয়। এতকাল আমরা দৈহিকভাবে পরাধীন ছিলাম, কিন্তু মানসিকভাবে স্বাধীন ছিলাম। এখন আমরা দৈহিকভাবে স্বাধীন ও মানসিকভাবে পরাধীন হয়ে গেলাম। লোকে বাহ্যিক মানসিক বাসভূমি ছেড়ে ঝাড়ে-বংশে পলায়ন করছে ইংরেজির মনোভূমিতে গিয়ে মানসিক উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। মহামূর্খরা তাকেই বাঙালির ‘উন্নতি’ বলে ঘোষণা করছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিদেশে ভৃত্য প্রেরণ করে তাদের উচ্ছিষ্টভোগ করতে পারার তৃপ্তিকে আমাদের স্বর্গসুখ বলে  বোঝানো হচ্ছে।

এমন একটি সর্বনাশ হয়ে যাওয়া ভাষায় এবং ভূমিতে আমাদের চিন্তা চেতনা ও শারিরীক কাঠামোর অবস্থান। এখানে সুস্থ চিন্তার সুযোগ এতটাই সংকুচিত হয়ে গেছে যে কলিম খানের মতো মহৎ সাধকদেরও কথিত পণ্ডিতমহল অবলীলায় উপেক্ষা করতে পারেন। কারণ তার জন্ম বাংলায়, তার ভাবনা-ভাষা ও ধ্যান-জ্ঞানের তীর্থভূমিও এই উপেক্ষিত অঞ্চল। এই মানুষটা কী বলছেন, কেন বলছেন, কিভাবে বলছেন ওসবের বিবেচনা নেই। কেননা আমাদের পণ্ডিত মহল মনে-মগজে ইউরোপীয়ান, পাণ্ডিত্যের গরিমা নিয়ে নিজ মাটি থেকে অনেক দূরে ইউরোপের বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে বিচরণ করেন, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খা, হতাশা-বিষাদ তাদের স্পর্শ করে না। ছিদ্রান্বেষণ এবং কূট সমালোচনায় মগ্ন থেকে নিজেদের বড়ত্বের প্রমাণ হাজির রাখেন।  ভূমিসন্তানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারাই তাদের পাণ্ডিত্যের প্রধান লক্ষণ, এই ভূমি তাদের যথাযথ সম্মান দিতে না পারায় তারা যেমন সদাই বিগড়ে থাকেন, অপরদিকে ভূমিসন্তানেরাও তাদের অপরাধের ভারে ন্যুব্জ হয়ে জ্বি জনাব- জ্বি জনাব করে কিছুটা মাশুল দেয়ার চেষ্টায় থাকেন।

বাংলা ভাষা, বাংলাভূমি, সর্বোপরি বাংলাকে বোঝার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল মনন। বাংলাকে বোঝার বিষয়ে এই বাঁধাটিকে যতই হালকা মনে হোক না কেন, এটিই প্রধান বাঁধা। পাশ্চাত্য একাডেমিক ঘরানায় শিক্ষিত মানুষের পক্ষে যেটি সবচেয়ে সহজ তা হলো বিনা বিচারে অথবা অল্প বিচারে বাংলাকে বাতিল করে দেয়া। এই বাতিল করে দেয়ার ধারায় গা ভাসিয়ে আমরা প্রত্যেক বাঙালি কবে থেকে নিজেরাই বাতিল হয়ে বসে আছি তার কোনো হিসেব আমাদের কারো কাছে-ই নেই। আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, জীবন-যাপনের সর্বত্র পাশ্চাত্য প্রভাব এতোটাই প্রকট যে এর থেকে উত্তরণের কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে গেলে ঘুম ভেঙ্গে শিউরে উঠি, কেননা আমাদের বিবেচনায় এটি কোনভাবেই সম্ভব নয়, অন্তত আমাদের পণ্ডিত ও শিক্ষিত মহলের মতে; অন্যদের কথা এই সমাজে কোনভাবেই গণনায় আসবে না। অথচ আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-লালন-আরজ আলী মাতুব্বর কিন্তু এই ধারার বাইরেই ছিলেন। কলিম খান কিছুটা এমনই প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরের লোক। প্রতিষ্ঠানের বাইরে যারা ভাবতে পারেন অথবা যারা প্রতিষ্ঠানকেই সর্বস্ব মনে করেননি তাদের পক্ষেই হয়তো বাংলাকে বোঝা এবং অনুধাবন করতে পারার সুযোগ থাকে। কেননা প্রতিষ্ঠান আমাদের মাথাটাই নষ্ট করে দেয়। মেক্লের শিক্ষা প্রস্তাবনায় যেমন প্রকাশ্যেই ছিল, তিনি ভারতবাসীকে ইংরেজি শিখিয়ে কিছু গায়ে গতরে ভারতীয় কিন্তু মনে-মগজে ইংরেজ এবং বাংলা বিদ্বেষী লোক তৈরি করবেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো ব্যক্তি মেক্লে গত হলেও তার প্রেতাত্মারা, তার পরিকল্পিত বাদামী চামড়ার সাদা মগজের মানুষেরা সদলবলে সদর্পে বাংলার সর্বত্র বিরাজিত আছেন। এ প্রসঙ্গে কলিম খান বলেন-‘কোনো মানুষের ধনসম্পদ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলেও যা ক্ষতি হয় না, মানুষটি পাগল হয়ে গেলে, অর্থাৎ তার মাথা খারাপ হয়ে গেলে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতি হয়; বলা ভাল, মানুষটির সর্বনাশ হয়ে যায়। তেমনই, একটি দেশ খরায় বন্যায় ডুবে গেলে, সুনামিতে তার বহু মানবসম্পদ ও ধনসম্পদ নষ্ট হয়ে গেলেও যে ক্ষতি হয় না, দেশটির মাথা খারাপ হয়ে গেলে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয়, দেশের সর্বনাশ হয়ে যায়।’

‘সমাজদেহকেও তার মস্তিস্ক ও হৃদয়ই চালায়, সাধ করে কেউ নিজের মাতৃভাষা ত্যাগ করে অন্য ভাষা গ্রহণ করে না; অনেক দুঃখে তাকে সেটা করতে হয়। কাজের দুনিয়ায় গিয়ে নিজের প্রিয় মাতৃভাষায় যদি কাজকর্ম চালানো না যায়, হেনস্তা হতে হয়; তাহলে মানুষ কী করতে পারে?’ বিশ্বের তথাকথিত স্বাধীন দেশের সরকারও জনসাধারণের ‘ভাষিক-উদ্বাস্তু’ হওয়া আটকাতে পারছে না। বাংলাদেশের কথাই ধরুন। নিজের ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করেই দেশটি স্বাধীন হয়েছে। দেশের প্রশাসনে তারা বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছেন। উপরন্তু বলতে গেলে সমগ্র দেশ বাংলায় কথা বলে। তা সত্তে¡ও, বাংলাদেশে শত শত ইংলিশ-মিডিয়াম স্কু রাতারাতি গজিয়েছে, গজাচ্ছে। বঙ্গভাষীর ইঙ্গীকরণ হচ্ছে দ্রæত গতিতে। তাতে নিশ্চয় অধঃপতিত জ্ঞানজীবীদের আশকারা আছে। আছে বলেই, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে দু-চারটে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরা এবং ইংরেজিতে কথা বলতে পারা জ্ঞানজীবীদের এত কদর! ঢাকার বাংলাভাষীরা বুঝে গেছেন, বঙ্গ হওয়ার চেয়ে ইঙ্গ হলে বাড়তি কদর, অর্থলাভ বেশি।

‘আসলে বাঙালির মর্মব্যথা তো অনেক গভীরে, বহুকালক্রমাগত অন্তর্বাহিত যন্ত্রণার প্রবাহ। ... পাষণ্ড থেকে তান্ত্রিক, নেড়ে বৌদ্ধ, মুসলমান, বৃটিশ-বিরোধী-‘বাঙালি’-জাতীয়তাবাদী হয়েও তো সে তার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। ..আর মর্যাদা-পুনরুদ্ধারের বৃথা চেষ্টায় কালক্ষেপ নয়। পাঁচ হাজার বছর তো এই করেই গেল, আর নয়। এবার উল্টো দিক দিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল বঙ্গদেশ; ... সিদ্ধান্ত নিল মর্যাদানাশের।’ তারা বাইরের দিকটাকেই প্রধান মনে করে তার দিকে ঝুঁকে গেলো।‘একালের ইতিহাসচর্চায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কথাটা প্রথমেই এসে পড়ে। কারণ, ইতিহাসচর্চা বলতে এখন যা বোঝায় তার প্রায় পুরোটাই পাশ্চাত্য থেকে শেখা। আর পাশ্চাত্য তো স্বভাবতই দেহবাদী। পৃথিবীর মাটিটা সে আগে দেখতে পায়, মনের মাটি তার চোখে কম। তার কাছ থেকে শিখে আমাদের রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার উত্তরসূরিরা ভারতের পার্থিবভূমি খনন করে ফেলেছেন, এখনও খনন করে চলেছেন। সেখানে ইতিহাস একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না তা নয়। কিন্তু সে প্রায় উঞ্ছবৃত্তির সামিল।’ এভাবে ভিক্ষুকের মতো হাত পেতে আমরা যতটুটু ইতিহাস, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্পর্শ লাভ করি তাতে পুরো বিষয়ের প্রতি অবজ্ঞা ও ঘৃণা জন্মে যাওয়া অতি স্বাভাবিক। আর কেউ স্বভাবতই ঘৃণিত পশুর জীবন ধারণের থেকে মুক্তি পেতে চাইবে। এই ভূমিকে ত্যাগ করে অন্যত্র অভিবাসির জীবন বেছে নিবে। সাধারণ মানুষের এতে কোনো অপরাধ নেই। কেননা তারা তাদের জানেনা। জানানোর কাজটি করে তার অপেক্ষাকৃত অগ্রসর অংশ তথা মস্তিস্ক। এই ব্যর্থতা পুরোটাই বাঙালির সৃজনশীল নীতি নির্ধারক অংশের। তারা এই জাতিকে তার প্রকৃত সত্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তার অতীতের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে ধাবিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এই ব্যর্থতার গ্লানি বহন করছে পুরো জাতি। অতীতকে জানার বিষয়ে কলিম খানের অভিমত হলো- ‘অতীত তো জানতেই হবে। নিজে এগিয়ে যেতে হলে, মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অতীতকে জানতেই হবে- কোথা থেকে কেন কী উদ্দেশ্যে কীভাবে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেখান থেকে এখন পর্যন্ত কোথায় এসে পৌঁছেছি, এরপর তাহলে কীভাবে কোনদিকে চলা শুরু করব, একথা বুঝতে হলে অতীতকে জানতেই হবে।’

‘আত্মানং বিদ্ধি’ বা নো দাইসেলফ অথবা ‘নিজেকে জানো’ মন্ত্রই সর্বকালের মূলমন্ত্র। যা আমরা ভুলে গিয়েছি, নিজেদের দিকে তাকানোর সময় ও অবসর আমরা হারিয়ে ফেলেছি, অপরকে অনুকরণ অনুসরণ করতে করতে নিজের দিকে মনোযোগ দেয়ার বিষয়টি যখন আমাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে উঠেছে তখনই কলিম খান আমাদের দৃষ্টিকে আবার নিজেদের দিকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গভীরভাবে প্রলুব্ধ করছেন, অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে নিজেদের কতখানি ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে কলিম খান তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

‘ভাষাসম্পদ বা অন্যকথায় ভাবসম্পদের জোরে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের সবচেয়ে অগ্রণী অংশ। বাংলা ভাষার প্রকৃত সম্পদ সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। বাংলা ভাষাকে যদি শেষমেষ আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমরা যে কী মাপের সম্পদ হারাব, তা নিয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।’ আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি-ভূমিতে সর্বব্যাপী সংস্কার সাধনে কলিম খান হতে পারেন আকাক্সক্ষার নতুন বাতিঘর। নতুন দৃষ্টির নির্মাণ ও ভবিষ্যত বাংলার একজন অগ্রণী চিন্তক হিসেবেকলিম খান আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাবেন বহুকাল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর