Alexa আবারো প্রাণ দিলো আবরার, প্রশ্ন অনেক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৬ ১৪২৬,   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

আবারো প্রাণ দিলো আবরার, প্রশ্ন অনেক

 প্রকাশিত: ১১:২০ ৪ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১১:২৭ ৪ নভেম্বর ২০১৯

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আবরার নামটি ঘুরে ফিরে আসছে। আবরাররা প্রাণ দিচ্ছে, বুয়েট পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভাল ফল করছে।

সবখানেই আবরার নামটি উচ্চারিত হচ্ছে। আর যতবার উচ্চারিত হচ্ছে ততবারই মনে পড়ছে আবরার ফাহাদের মুখটি। হ্যাঁ, গতকাল অবধি মৃতের কাতারে একজন আবরার ছিল। এখন দুজন। রেসডিন্সেয়াল স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরার রাহাত। কনসার্টের ডামাডোলে বিদ্যুৎ-এর সর্টসার্কিটে প্রাণ দিলো  ছেলেটি। তবু কনসার্ট থামলো না। চললো। 

আসলে এদেশে কিছুই থামে না। মৃত্যু এখন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু থেমে যাচ্ছে আমার কলম। বুকের মধ্যে হু হু করে উঠছে। ইচ্ছে করছে এক দৌড়ে চলে যেতে কুমারখালির সেই গ্রামে যেখানে বুয়েটের আবরার হামাগুড়ি দিয়েছে, হেসেছে,  খেলেছে, বাবার কাঁধে চড়ে মেলায় গিয়েছে, রঙবেরং-এর ঘুড়ি উড়িয়েছে, সাঁতার কেটেছে । আকুলি বিকুলি করছে অন্তর অপঘাতে মৃত নবম শ্রেণির ছাত্র আবরারের জন্য। তার মা-বাবা কি দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিল তাদের ছেলেটি লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে! 

আমি একজন মা। আমি এক মায়ের সন্তান, আমার দুটো সন্তান আছে। বড় কষ্টে, বড় যত্নে  ওদের মানুষ করেছি। ওদের বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেছি পথের দিকে চেয়ে। উৎকণ্ঠিত হয়ে বার বার ভেতর বার করেছি। কখন ওরা আসবে, দেরি হচ্ছে কেন, কোন অসুবিধা হলো কীনা, পথে কোনো দুর্ঘটনা! নিজের আয়ুুর বিনিময়ে সন্তানদের আয়ু কামনা করেছি। আজও করি। আমার মা- বাবাও একইভাবে উৎকণ্ঠিত থেকেছেন আমার জন্য, আমার ভাই বোনের জন্য। আবরারের মা-বাবারও উৎকণ্ঠা ছিল সন্তানকে নিয়ে, ছিল অন্তহীন স্বপ্ন। ছেলে পড়তে ঢাকা গেছে, অনেক লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়ে ফিরবে।

একটা সন্তান যখন ভ্রুণ আকারে মাতৃগর্ভে আসে তখন থেকেই স্বপ্ন বোনা শুরু হয় তার বাবা মায়ের। সন্তান যেন সুস্থভাবে জন্ম নেয়, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে, ও যেন পড়াশুনায় ভালো হয়, যেন মানুষের মতো মানুষ হয়। কোনো বাবা মা-ই চায় না তার সন্তান খারাপ মানুষ হোক। কাপুরুষ হোক বা অমানুষ হোক। পৃথিবীর সব চেয়ে খারাপ বাবা মাও তা চায় না। বরং খারাপ বাবা মা চায় তাদের খারাপ দিকটা যেন সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত না হয়। 

সাহসী হওয়া, সৎ হওয়া মানে সত্য কথা বলার, ভিন্নমত প্রকাশ করার সাহস অর্জন করা। যে সৎ তার সত্য কথা বলার সাহস থাকে। যে ন্যায়ের পথে চলে তার সত্য কথা বলার সাহস থাকে। আর স্বাধীন দেশে সত্য কথা বলার, ভিন্নমত পোষণ করার সাহস থাকবেই না কেন? সত্য কথা সোচ্চারে বলব, স্বাধীনভাবে বলব, নিজের মত নির্ভয়ে প্রকাশ করব বলেই তো অনেক রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা। 

আবরার ফাহাদ  পড়ত বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল সে। থাকতো শেরে বাংলা হলের নিচতলার ১০১১ নম্বর কক্ষে। সেই হলের সিঁড়ির নিচ থেকে উদ্ধার করা হলো পিটিয়ে মারা আবরারের মৃতদেহ। আবরার মাত্র ৮ ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে ফিরেছিল মায়ের আদর খেয়ে, বাপের  দোয়া নিয়ে। আবরারের অপরাধ সে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছিল। সে পোস্টে নাকী দেশবিরোধী কিছু লিখেছিল। যদি লিখেও থাকে দেশের প্রচলিত আইন আছে, তথ্য প্রযুক্তি আইন আছে। সরকার বা সরকারের তরফে যে কেউ মামলা করতে পারে। মামলা করতে পারে পুলিশ। কিন্তু কেউ কোনো পদক্ষেপ নিলো না। আইন নিজের হাতে তুলে নিলো বুয়েটের কতিপয় ছাত্র, যারা তার সহপাঠি। 

আবরার হত্যার পর সিসিফুটেজ দেখে সনাক্ত করে ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মারা যাবার পর তার জানাজায় হাজির হননি ভিসি। তিনি উপরের পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলায় এতই ব্যস্ত ছিলেন যে আবরারের জানাজায় যেতে পারলেন না। এমনকি উত্তাল ক্যাম্পাসে ছাত্রদের সামনেও আসতে পারলেন না কয়েক ঘণ্টা। যখন এলেন আবরারের জন্য কোনো দুঃখবোধ তার চেহারায় দেখলাম না। বরং তিনি বলে গেলেন ছাত্রদের দাবির প্রতি একমত হলেও তিনি একক সিদ্ধান্তে সব দাবি মানতে পারছেন না। কেন পারছেন না? এমন কোনো দাবি ছাত্ররা করেনি তিনি যা মানতে পারেন না। পারেনই না যখন পদত্যাগ করেন না কেন?

একটা কথা ভেবে অবাক হই। তরতাজা একটা  ছেলেকে দুই তিনঘন্টা ধরে পিটিয়ে পিটিয়ে  মেরে ফেলল। কেউ দেখল না, কেউ শুনলো না? ছেলেটা নিশ্চয়ই চিৎকার করেছিল, আর্তনাদ করেছিল! একজন মানুষও এগিয়ে এলো না। যদি ভয়ে এগিয়েও না আসে তারা কেউ প্রশাসনকে জানালো না, পুলিশকে খবর দিলো না!  আবরারের সারাটা পিঠ, সারাটা শরীর রক্তাক্ত হলো। মার খেতে খেতে সে মারা গেলো। 
এ দায় বুলেট প্রশাসন এড়াতে পারে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনি, রাজনীতিবিদ কেউ এড়াতে পারে না। কোনোভাবেই পারে না।

ছোট্ট নাইমুল আবরার কেবল জীবন শুরু করেছিল। কত স্বপ্ন ছিল তার, স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। সে গিয়েছিল ‘কিশোর আলো’র বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। আজকাল যে কোনো অনুষ্ঠানে কনসার্ট করা রেওয়াজ হয়ে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের অনুষ্ঠানে কনসার্ট করতে হবে কেন? আবরার নাকী জেনারেটরের উপর পড়ে গিয়েছিল। জেনারেটর কেন অরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল? কেন সেখানে লোক রাখা হয়নি? জেনারেটরের ওপর পড়ে কী করে? বেষ্টনি দিয়ে কেন জেনারেটর ঘেরা হয়নি? আবরারের সর্টসার্কিট হবার পর সামনেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থাকতে সেখানে না নিয়ে মহাখালীর আয়শা মেমোরিয়ালে নেয়া হলো কেন? কেন সঙ্গে সঙ্গে তার বাবা-মাকে জানানো হলো না? কেন শিক্ষার্থীদের জানানো হলো না? কেন কনসার্ট বন্ধ হলো না? এমন হাজার একটা প্রশ্ন আছে। আমি নিশ্চিত এসব প্রশ্নের সদুত্তর নেই। 

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়কেন্দ্রীক এমন অনেক অনুষ্ঠান থাকে। এ ঘটনার পর বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের এ জাতীয় অনুষ্ঠানে পাঠাবেন কোন ভরসায়!  

নাইমুল আবরারের দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যাবে না। কর্তৃপক্ষের/ আয়োজকদের যথেষ্ট গাফিলতি আছে। গাফিলতি আছে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কর্তৃপক্ষেরও। এ দায় তারা এড়াতে পারে না । ছেলেটি মারা যাবার পর খবর গোপন রেখে কনসার্ট চালিয়ে যাওয়া একান্তই অমানবিক।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও একজন মা। তিনি পুরো পরিবার হারিয়েছেন । তিনি জানেন স্বজন হারানোর বেদনা। তিনি জিরো টলারেন্সের কথা বলেন। আবরার ফাহাদের মৃত্যুর পর তিনি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন,  কেউ ছাড় পাবে না।  ধরাও পড়েছে অনেকগুলো আসামী। তাদের রিমান্ড হয়েছে। জেলে গেছে তারা। 

নাইমুল আবরারের মৃত্যু হত্যার চেয়ে কোন অংশে কম না। তাকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয় তখনও সে জীবিত ছিল। পাঁচ মিনিটি দূরত্বের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিলে সে বেঁচে যেতে পারত। তা না করে তাকে নেয়া হলো দূরবর্তী আয়শা মেমোরিয়ালে। কারণ তারা ছিল অনুষ্ঠানটির স্পন্সর। একজন মানুষ যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, যে কোনো মুহূর্তে তার প্রাণবায়ু নিভে যেতে পারে তখন তাকে দ্রুততম চিকিৎসা দেয়া জরুরি। এই অবস্থায় কোন বিবেচনায় তাকে দূরের হাসপাতালে নেয়া হলো? এ দায় কিশোর আলো আর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই দুই খুনের ব্যাপারেই আপনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে  আবরার ফাহাদের খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চাই আমরা। আর যাদের গাফিলতির জন্য নাইমুল আবরারের এই দুর্ঘটনা হল তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/টিআরএইচ