আপনার পারিবারিক জীবনে সুখ এনে দেবে এ পরামর্শগুলো

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৫ ১৪২৭,   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

আপনার পারিবারিক জীবনে সুখ এনে দেবে এ পরামর্শগুলো

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:৪৭ ২৯ জুন ২০২০   আপডেট: ১৪:৩৬ ৩০ জুন ২০২০

দাম্পত্য জীবনে সুখের জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মান দিয়ে চলা জরুরি।

দাম্পত্য জীবনে সুখের জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মান দিয়ে চলা জরুরি।

মানুষের পরস্পরের মাঝে রয়েছে বিচিত্রতা। চালচলন, আচার-ব্যবহার, চাওয়া-পাওয়া ও আশা-আকাঙক্ষায় প্রত্যেকে আলাদা। দু’জন মানুষের মাঝে এসবে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই এক সঙ্গে চলতে গেলে দেখা দেয় মতবিরোধ। 

মানুষের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘকাল বিস্তৃত থাকে। পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্যের কারণে দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতবিরোধ ও মনোমালিন্য হওয়া স্বাভাবিক। কখনো তা রূপ নিতে পারে দ্বন্দ্ব-কলহে। তবে স্বভাব, প্রকৃতিতে ভিন্নতা থাকা সত্তেও শান্তিতে বসবাস করা সম্ভব; যদি আমাদের মাঝে মনুষ্যত্ব থাকে। আল্লাহ তায়ালার ভয় ও আখেরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী হলে। আর এ জন্য প্রয়োজন কোরআনের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া। জীবনকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করা। 

আল কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের পারিবারিক জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরিবারের সদস্যদেরকে পরকালের শাস্তি থেকে বাঁচাতে তাকিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, তাতে নিয়োজিত আছে কঠোর স্বভাববিশিষ্ট ও শক্তিশালী ফেরেশতারা।’ (সূরা: আত তাহরীম, আয়াত: ৬)। তেমনিভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে  দুনিয়ার জীবন সুখে-শান্তিতে পার করার ওপর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো তাহলে এমন হতে পারে যে, তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করো, অথচ আল্লাহ তায়ালা তাতে  (তোমাদের জন্য) বহু কল্যাণ রেখেছেন।’ (সূরা: নিসা, আয়াত নম্বর:১৯)। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মাঝে পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী ওই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। আর তোমাদের মাঝে উত্তম ব্যক্তি সে, পরিবারের কাছেও যে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ১১৬২)।

করোনার এই সময়ে পারিবারিক অশান্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় এ ব্যাপারে সংবাদ ছাপা হচ্ছে। বর্তমানে এর অন্যতম কারণ ধরা হচ্ছে আর্থিক অভাব-অনটকে। কিন্তু এর জন্য শুধু অর্থ সংকট দায়ী নয়। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও সামাজিক-পারিবারিক রেওয়াজও দায়ী।

দাম্পত্য জীবনের অর্থনৈতিক দিক নিয়ে কোরআনে অনেক সুন্দর আলোচনা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সম্পদশালী ব্যক্তি (স্ত্রীর জন্য) তার সম্পদ অনুযায়ী ব্যয় করবে। যার আয় সীমিত, সে আল্লাহ যা দেন তা থেকে (সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য) ব্যয় করবে। আল্লাহ তায়ালা যাকে যে পরিমাণ সম্পদ দেন, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করতে আদেশ দেন না। আল্লাহ তায়ালা কষ্টের পর সুখ দেন।’ (সূরা: তালাক, আয়াত নম্বর: ৭)। এই আয়াতে দাম্পত্য জীবনে অর্থনৈতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নির্দেশনা রয়েছে।

স্ত্রীর চাহিদা থাকবে, স্বামীর অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে:

অনেকের স্ত্রী আয়েশী ও বিলাসী জীবন যাপন করার আকাঙক্ষা পোষণ করেন। নিজের আশা-আকাঙক্ষা পূরণের জন্য স্বামীকে চাপে রাখেন। স্বামীর আয়-ব্যয়ের দিকে তাকান না। কেউ কেউ তো এত মারাত্মক যে, স্বামীকে কষ্টে ফেলে হলেও নিজের আকাঙক্ষা পূরণ করেন। স্ত্রীর ভরণ পোষণের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে, স্ত্রীর চাহিদা, স্বামীর আর্থিক অবস্থার অনুযায়ী হতে হবে। স্বামী যদি সম্পদশালী হয় তাহলে স্ত্রীকে সে অনুযায়ী ভরণ-পোষণ করতে হবে, যদিও স্ত্রী গরিবের মেয়ে হয়। স্বামী আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে, সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করবে, যদিও স্ত্রী ধনী পরিবারের মেয়ে হয়। তাই স্বামীর অবস্থার দিকে না তাকিয়ে নিজের আকাঙক্ষা পূরণের জন্য চাপে রাখা কোথাও গ্রহণযোগ্য নয়। না সামাজিকভাবে আর না ধর্মীয় দিক থেকে। এতে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে আসে।

অসচ্ছল স্বামীর ঘরে ধৈর্য ধরে থাকার উপকার:

আল্লাহ তায়ালা সূরা তালাকের ৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘কষ্টের পর সুখ দেন’। কোরআনের এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, সীমিত আয়ের পুরুষ স্ত্রীর জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে। এতে অনেক সময় স্ত্রীর জন্য কষ্ট হতে পারে। তাই আল্লাহ তায়ালা শান্তনার বাণী শোনাচ্ছেন যে, অসচ্ছলতা ও দারিদ্রতা চিরস্থায়ী হয় না। আজ কষ্ট করে স্বামীর ঘরে থাকলে আগামীতে এর বদলায় সুখ দেবেন। তাই স্বামীর আর্থিক অসচ্ছলতায় মনঃক্ষুন্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।  ধৈর্য ধরতে হবে।

স্ত্রীর জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করার ফজিলত:

সূরা তাহরীমের ওই আয়াত থেকে এ দিকেও ইঙ্গিত মিলে যে, অসচ্ছল স্বামী যদি সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য ভরণ-পোষণ করে তাহলে তার দারিদ্রতা দূর হয়ে যাবে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করায় কৃপণতা নয়। এ ক্ষেত্রে কৃপণতা দ্বারা সচ্ছল হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়। যদিও কৃপণতার কারণে বাহ্যিকভাবে কিছু টাকা থেকে যায়। তাছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য খরচ করা দ্বারা নেকি লাভ হয়। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

স্বামী-স্ত্রীর পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহে অন্যকে হস্তক্ষেপের সুযোগ না দেয়া:

সূরা নিসার ১২৮ নম্বর আয়াতে এসেছে, স্ত্রী যদি স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো অসৎ আচরণ বা ফেলে রাখার আশঙ্কা করে তাহলে পরস্পর সমঝোতা করে নেবে। পরস্পর এই সমঝোতা বা মিমাংসাকে ইসলাম কোনো অন্যায় হিসেবে দেখেনি। কোরআনের ভাষায় ‘যদি কোনো স্ত্রী নিজ স্বামীর পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহার বা তাকে উপেক্ষা করার আশঙ্কা করে , তবে তাদের এতে কোনো গোনাহ নেই যে, তারা পরস্পরের মাঝে কোনরূপ আপোষ-নিষ্পত্তি করে নেবে।’ মুফতী শফি (রাহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘আয়াতের নির্দেশনা হলো, স্বামী-স্ত্রী মিলে নিজেরাই সমঝোতা ও মিমাংসা করে নেবে। এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া কলহে তৃতীয় পক্ষ নাক গলাবে না। এবং নিজেরাও তৃতীয় পক্ষকে এ বিষয়ে সুযোগ দেবে না। কারণ, এতে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। প্রথমত, তৃতীয় পক্ষের সামনে নিজেদের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ পায়, যা উভয়ের জন্য লজ্জাজনক। দ্বিতীয়ত, তৃতীয় পক্ষকে জড়ালে অনেক সময় মিমাংসা বা সমঝোতায় আসা কঠিন হয়ে যায়। তাই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিদ্যমান সমস্যা তাদেরই সমাধান করতে হবে। এখানে তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনা উচিত হবে না। (মাআরেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ২৮৭)।

স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ ও তার মতামতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান:

দাম্পত্য জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মতের আদান-প্রদান। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজ স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরামর্শেও মাধ্যমে করবে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মহব্বত সৃষ্টি হবে। একে অপরকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা জন্মাবে না। প্রসিদ্ধ একটি বাণী হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি পরামর্শ করে কাজ করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না। আর যে লোক নিজে সব করে, কারো সঙ্গে পরামর্শ করে না সে কখনো সফল হয় না।’ তাই দাম্পত্য জীবনে পরামর্শ করে কাজ করতে হবে। স্ত্রী যেন কখনো না ভাবতে পারে যে, আমাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা স্ত্রীর কাছে নয়, স্বামীর কাছে থাকবে। সে বিবেচনা করে চাইলে স্ত্রীর মত অনুযায়ীও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আল কোরআনে এসেছে, ‘যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে দুধ পান করায় তাহলে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে। এবং এ ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরামর্শ করবে। (সূরা: তালাক, আয়াত নম্বর: ৬)।

আয়াতে স্বামী-স্ত্রী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কোনো কারণে বর্তমানে যাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। উক্ত অবস্থায় স্ত্রী, সন্তানকে দুধ পান করানোর পারিশ্রমিক স্বামীর কাছ থেকে নিতে পারবে। পারিশ্রমিক নিয়ে যেন কোনো বিরোধ সৃষ্টি না হয়। তাই কোরআনের নির্দেশ হচ্ছে, পরামর্শ করে তা ঠিক করে নেয়া। অথচ তখন বিরোধের দ্বারা ওই ক্ষতি হবে না, বিবাহ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় বিরোধ হলে যে পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। এতদ্সত্তেও কোরআন নির্দেশ দিচ্ছে পরামর্শ করে নিতে। তাহলে দাম্পত্য জীবনে দ্বন্দ্ব-কলহ থেকে বাঁচতে পরামর্শের গুরুত্ব কতটুকু দেয়া দরকার?

দাম্পত্য জীবনে সুখের জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সম্মান দিয়ে চলা জরুরি। কেউ কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা। ছোট বিষয় এড়িয়ে চলা। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, যে শাসক তার প্রজাদের পেছনে হরদম লেগে থাকে সে প্রজাদের চরিত্রকে নষ্ট করে ফেলে। তাই স্বামী-স্ত্রী একজন অন্যজনের পেছনে লেগে না থাকা। আমরা যদি কোরআন হাদিস অধ্যয়ন করি তাহলে এরূপ আরো নির্দেশনা জানতে পারবো, যা দাম্পত্য জীবনে  সুখী হতে সহায়ক হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে