আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে যাচ্ছে রেল

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৩ ১৪২৬,   ১২ শা'বান ১৪৪১

Akash

আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে যাচ্ছে রেল

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৯ ২২ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৫২ ২২ ডিসেম্বর ২০১৯

সংগৃহীত

সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়েকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। রেলকে সার্ক করিডরের সঙ্গে যুক্ত করতে নেয়া হয়েছে যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা। আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে বৃদ্ধি করা হচ্ছে রেলের গতিবেগ। এ লক্ষ্যে লাইন সম্প্রসারণ ও সিগন্যাল ডিজিটালাইজেশনসহ নানামুখী পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে। এগুলো বাস্তবায়ন হলেই যাত্রীসেবার মান বাড়বে।

২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকার মোট ২৩৫টি প্রকল্প বিভিন্ন মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। গ্রহণ করা হয়েছে ৬২টি নতুন প্রকল্প। মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরের সঙ্গে স্থাপিত হবে রেল যোগাযোগ। আপাতত ২০৩০ সালের মধ্যে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করা হবে ১৫টি জেলাকে।

এদিকে পদ্মা সেতুর ওপর রেল সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সূচনা হতে যাচ্ছে নতুন যুগের। শুধু তাই নয়, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব রেল লিংক চালুর পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। মহাপরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনেক রাজ্যের ও মিয়ানমারের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, রেলকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে যেসব বিষয়কে বিবেচনায় রাখা হয় সেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মহাপরিকল্পনায়। এর মধ্যে আছে রেলের গতি বৃদ্ধি করা, ডাবল লাইন স্থাপন, রেলস্টেশনগুলোকে আধুনিকায়ন করা অন্যতম। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের টার্গেট রয়েছে বলে জানান তিনি। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রেল সংযোগ স্থাপন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। যেহেতু বাংলাদেশ রেলওয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে, তাই রেলের সব ধরনের সেবাকেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলা হচ্ছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় রয়েছে দেশে নতুন রেলপথ তৈরি করা, বিদ্যমান রেলপথ ডাবল-ট্রিপল ও চার লেন করা। পাশাপাশি এ মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করে ট্রান্স-এশিয়ান রুটে বাংলাদেশ রেলওয়েকে যুক্ত করা হবে।

প্ল্যানের আওতায় রয়েছে সার্কুলার রেলের পরিকল্পনা। রয়েছে ১৫টি করিডর স্থাপন করা। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ঢাকা-কক্সবাজার ডাবল লাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে সোনাদিয়া (গভীর সমুদ্র), আবার হাটহাজারী হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত ঘুমধুুম পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ।

পরিকল্পনার আওতায় আরো আছে- রেলের সিগন্যাল ব্যবস্থা কম্পিউটারাইজড করাসহ রেল টেলিকমিউনিকেশনের আমূল পরিবর্তন, রেলের টিকেট সিস্টেমসহ সব বিষয় অত্যাধুনিক করা। এছাড়া কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, যাত্রী সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অত্যাধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বগি ও পণ্য পরিবহনের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহের মধ্যে আছে- ১৮৬টি রেল ইঞ্জিন ক্রয়, এক হাজার ৯৫টি কোচ, উন্নত ধরনের ৮ চাকার ওয়াগান ক্রয়, ৫০০টি ফ্ল্যাট ওয়াগান ক্রয়, ৫৩১টি মিটার গেজ ও ২৫৯টি ব্রড গেজ ওয়াগান সংগ্রহ। উন্নত ও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন ক্রয়, অত্যাধুনিক রেল ওয়ার্কশপ তৈরিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে প্ল্যানে। মাস্টারপ্ল্যানে দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় এনে পণ্য পরিষেবার সিংহভাগ রেলের মাধ্যমে করে আয় বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে দ্রুতই চালু হচ্ছে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেলপথ। এ রেললাইন নির্মিত হলে পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে দেশি ও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এ রেললাইন দ্বারা বাংলাদেশ ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়েতে যুক্ত হবে। প্রকল্পটি ২টি লটে ভাগ করে সম্পাদন করা হচ্ছে। প্রথম লট দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয় লট চকরিয়া থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০২ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া কক্সবাজারে ঝিনুকের আদলে একটি আইকনিক স্টেশন বিল্ডিং বানানো হবে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে চট্টগ্রামের দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় ধাপে রামু থেকে মিয়ানমার সংলগ্ন ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেললাইন হয়ে ট্রান্স-এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে এ রেলপথ। এর মাধ্যমে মিয়ানমার, ভারত, নেপালসহ এশিয়াভুক্ত দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। এ প্রসঙ্গে রেলের মহাপরিচালক জানান, আগামী ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।

রেলের যুগান্তকারী আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ। এতে রাজধানীর সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের।

জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে মাওয়া থেকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেললাইন জাজিরা, শিবচর হয়ে ভাঙ্গা স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোর জেলা সংযুক্ত হবে। এ রুটে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্রডগেজ মালবাহী ও কন্টেইনার ট্রেন চলবে। বাংলাদেশের মধ্যে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আরেকটি উপ-রুট হবে এটি। ভবিষ্যতে এ রুটে দ্বিতীয় লাইন নির্মাণ এবং বরিশাল ও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরকে এই রুটের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এদিকে দীর্ঘদিন ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর ২০০৮ সালে ঢাকা- কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং ২০১৭ সালে খুলনা-কলকাতা-খুলনা বন্ধন এক্সপ্রেস চালু হয়। এছাড়া হলদিবাড়ি-চিলাহাটি, আখাউড়া-আগরতলাসহ কয়েকটি রুট পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।

জানা যায়, আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে রেলওয়েতে নতুন ট্রেন চালু করার একটি বড় বাধা হচ্ছে ডাবল লাইন না থাকা। এজন্য বর্তমান সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডরকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার কাজ শুরু করে। এদিকে যাত্রী সাধারণের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনসহ ১১৪টি নতুন ট্রেন বিভিন্ন রুটে চলাচল শুরু করেছে। বৃদ্ধি করা হয়েছে ৩৬টি ট্রেন সার্ভিস। এর মধ্যে কমিউটার ট্রেনও রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের যানজট নিরসনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে ১৬ জোড়া কমিউটার ট্রেন এবং জয়দেবপুর-ঢাকা সেকশনে ৪ জোড়া কমিউটার ট্রেন চালু করা হয়েছে।

রেলওয়ে গেজ পদ্ধতিকে সুসংহত করার জন্য বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ লাইন নির্মিত হচ্ছে এবং জয়দেবপুর থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। ২৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পার্বতীপুর-ঈশ্বরদী-জামতৈল ব্রডগেজ রেলপথ বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে মিলেছে। সেটিকে ডুয়ালগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে।

রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন জানান, বর্তমান সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রেলকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে বরাদ্দও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রেলের উন্নয়নে এডিবি, ভারত, চীন, জাইকাসহ কয়েকটি দাতা সংস্থাও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসসি/এস