আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অজানা নায়ক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৯ ১৪২৬,   ০৮ শা'বান ১৪৪১

Akash

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অজানা নায়ক

শুভ্র কিশোর বসু ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৩০ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: বাংলা ভাষায় লিখিত অন্যতম প্রাচীন ছড়া। প্রাইমারি শিশুদের জন্য লিখিত `শিশু শিক্ষা` নামক গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।

ছবি: বাংলা ভাষায় লিখিত অন্যতম প্রাচীন ছড়া। প্রাইমারি শিশুদের জন্য লিখিত `শিশু শিক্ষা` নামক গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সারাবিশ্ব জুড়েই পালিত হয় প্রতিবছর ২১শে ফ্রেবুয়ারি। মূলত বিশ্বময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল ভাষা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে, স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যেই এই আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের উপস্থাপনা।

ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে, ২১শে ফ্রেবুয়ারিকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের আজকের দিনটি থেকে সারাবিশ্বে এই আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পালিত হওয়া শুরু হয়। তারই সূত্র ধরে, ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল এসেম্বলিও ২০০৮ সালকে আন্তর্জাতিক ভাষা বছর হিসেবে ঘোষণা করে। মূলত বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতেই বিশ্বজুড়ে এই উদ্যোগ।

১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়াকে মাঝখানে রেখে, দুটি খণ্ডে তৈরি হয় একটি দেশ পাকিস্তান। খণ্ড দুটি পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান)। বলা বাহুল্য, দুটি দেশই ধর্মটুকু বাদ দিয়ে, আর সবকিছুতেই একদম ভিন্ন ছিল। তা সে ভাষাই হোক বা সংস্কৃতি।

১৯৪৮ সালে অধুনা পাকিস্তান সরকার, উর্দু ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গতভাবেই এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে শুরু করেন। কারণ, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তখন বাংলাদেশেরই বাসিন্দা ছিলেন যাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। যুক্তিসঙ্গতভাবেই তাদের দাবি ছিল, উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেয়া হোক।

এই প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভকে দমাতে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে সমস্ত রকম বিক্ষোভ এবং সমাবেশকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু আইন আর কবে মানুষের অধিকারকে দমাতে পেরেছে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জাতীয় ভাষা অর্জনের অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের সমর্থনে উদ্দীপ্ত হয়ে এক সুবিশাল জমায়েত এবং মিছিলের আয়োজন করে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফ্রেবুয়ারি পুলিশ সেই মিছিল এবং সমাবেশের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে আরম্ভ করে যার ফলশ্রুতিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শাহিফুর নামক পাঁচ ছাত্র আরো কয়েকশ' প্রতিবাদির সঙ্গে বীরের মতন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

বিশ্বের ইতিহাসে, এক অতি ব্যতিক্রমী ঘটনা যেখানে নিজের মাতৃভাষার অবমাননা ঠেকাতে গিয়ে এতজন মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়। কিন্তু শহীদদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরং এই অমানবিক হত্যালিলার পরিণামে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ ফুঁসে ওঠেন। তাদের সর্বস্ব উজাড় করা গণতান্ত্রিক বিরোধের মুখে পড়ে পাকিস্তান সরকার অবশেষে ২৯শে ফ্রেবুয়ারি, ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। তারপর থেকেই, প্রতিবছর ২১শে ফ্রেবুয়ারি সারা বাংলাদেশ জুড়েই, এক সুগভীর বেদনার দিন- শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়।

কিন্তু ইতিহাসের এই সামগ্রিক নিঃশব্দ পদচারণায় একজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত আর এক বাংলাদেশি নাগরিক- মি. রফিকুল ইসলাম।

রফিকুল বাবু ৯ই জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক, কোফি আন্নান সাহেবকে একটা চিঠি লেখেন। সেই আবেগঘন চিঠিতে উনি রাষ্ট্রসংঘকে প্রতিবছর ২১ শে ফ্রেবুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সম্মান জানাতে অনুরোধ করেন। বিভিন্ন প্রমাণ এবং তথ্যাদিতে সম্পৃক্ত তার চিঠির বয়ান এতটাই ব্যতিক্রমী , মর্মস্পর্শী, সংবেদনশীল এবং বেদনাদায়ক ছিল যে রাষ্ট্রসংঘ পর্যন্ত রফিকুল সাহেবের অনুরোধ ফেরাতে পারেনি।

রফিকুল সাহেবের একটাই অনুরোধ ছিল রাষ্ট্রসংঘের কাছে, তারা যেন বিশ্বজুড়ে বিশ্বের সমস্ত ভাষা, তা যতই ক্ষুদ্র বা নগণ্য হোক না কেন, সেগুলোকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ করে।

রফিকুল ইসলামের সেই দাবি মেনে নিয়ে রাষ্ট্রসংঘ উপরিউক্ত রেজুলিউশনটি গ্রহণ করে।

এও এক যুদ্ধ। সারা জীবন ধরে এক একাকী মানুষের, সিস্টেমের মধ্যে দাঁড়িয়ে, সিস্টেমকে আরো মহানতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে এই স্মরণীয় অবদানের জন্য মি রফিকুল ইসলামকে সর্বাধিক রাষ্ট্রীয় সম্মান মরণোত্তর 'স্বাধীনতা পদক'-এ ভূষিত করে।

>>>লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত<<<

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ