আনিসুজ্জামান স্যারের প্রেরণায় আমি শিক্ষক হয়েছি

ঢাকা, সোমবার   ০১ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

স্মৃ তি চা র ণ

আনিসুজ্জামান স্যারের প্রেরণায় আমি শিক্ষক হয়েছি

আনোয়ার ইমাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:০১ ১৪ মে ২০২০   আপডেট: ২৩:১০ ১৪ মে ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষ অনার্স এ ভর্তি হলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউকে চিনতাম না। কেবলই কয়েকজন স্বনামধন্য শিক্ষকদের নাম জানতাম। বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আব্দুল হাই। শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে দেশের প্রথম সারির পণ্ডিতবর্গ ছিলেন বাংলা বিভাগের শিক্ষকগণ।

সাহিত্য, দর্শন, সংগীত, নাটকে তারা ছিলেন কিংবদন্তি। শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. আহমদ শরীফ, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. কাজী দীন মুহাম্মদ, ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ড. রফিকুল ইসলাম, ড. ওয়াকিল আহমেদ তখন বিভাগের অধ্যাপক। ড. আনিসুজ্জামান এবং মুনীর চৌধুরী ছিলেন কিংবদন্তি। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান গীতি কবি হওয়ায় তার গানগুলো তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলো।

আমরা প্রথম বর্ষে ভর্তি হবার পর প্রথম ক্লাসটিই ছিলো আনিসুজ্জামান স্যারের। প্রথম দর্শনেই শুধু তাকিয়ে থাকার মতো ছিলেন। যেমন লম্বা, তেমনি সুন্দর এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিলো তার বাচনভঙ্গি। আমরা ৪০/৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম। স্যার সবার পরিচয় নিলেন এবং নিজের পরিচয় দিলেন। প্রথম ক্লাসেই তিনি আধুনিক গদ্যের পাঠ নিলেন। তিনি আধুনিক গদ্যের ইতিহাসের বিশেষ পণ্ডিত ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এতো কম বয়সে কেউ শিক্ষকতায় যোগদান করতে পারেননি। তিনিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদানের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলেন অত্যন্ত অল্প বয়সে যোগদান করে। তার গবেষণার বিষয় ছিলো ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গদ্য। সেটি পরে মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্যে পরিণত হয়। আমি হাজী মো. মহসিন হলের ছাত্র ছিলাম। প্রথমেই হলে সিট পাইনি। স্যারের বইটা তখন আমি লাইব্রেরি থেকে গ্রহণ করি। বইটি আমাকে স্যারই পড়তে বলেছিলেন। পরে স্যারের সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে উঠতে থাকে।

এইসব প্রথিতযশা শিক্ষকদের জন্য আমরা সৌভাগ্যবান ছিলাম, তাদের কাছে প্রকৃত শিক্ষা পাবার জন্য। কিন্তু দুখের বিষয় এই প্রথিতযশা শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান হঠাৎ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে রিডার পদে যোগদান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার বলে একটা পদ ছিলো। শুরু হলো ৬৯ এর গণঅভ্যুথ্থান। ক্লাস বন্ধ থাকায় স্যারের অভাব আমরা বুঝতে পারিনি। পরে সব স্বাভাবিক হলে আমরা স্যারের অভাব বুঝতে শুরু করলাম। এই সময়ে অনেকটা অভাব মেটালেন মুনীর চৌধুরী স্যার। তবে স্যারকে যে কটাদিন পেয়েছিলাম তাতে আমরা সমৃদ্ধ হয়েছিলাম অনেকটুকু। বিভিন্ন সেমিনারে স্যারের কথা শুনতাম। বিশেষ করে বাংলা একাডেমিতে স্যারের বক্তৃতা শুনতে যেতাম আমরা। মুগ্ধ হয়ে স্যারের কথা শুনতাম।

সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি তিনি স্বদেশ এবং সংস্কৃতি চর্চায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। কোনো লোভ কিংবা কোনো মোহই তাকে আদর্শভ্রষ্ট করতে পারেনি। শিক্ষকতাকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে আজীবন শিক্ষকই ছিলেন। তিনি সমগ্র জাতির শিক্ষক ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহম্মদের বক্তৃতা তিনি লিখে দিতেন। তিনি প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন কিন্তু কখনো এগুলো পুঁজি করেননি। তিনি অনেক লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি শুধুই শিক্ষক ছিলেন। তার অনুপ্রেরণাতেই আমি শিক্ষক হয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি যে ঘৃণা স্যারের কাছে শিক্ষা লাভ করেছি তা আজও ধারণ করে আছি। ড. আনিসুজ্জামানের নির্লোভ চরিত্র তার সব ছাত্রের মাঝে আলো ছড়াবে। তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা। তার স্পর্শে না এলে বোঝা যাবে না তিনি কত মহৎ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তার ঋণ অপরিশোধ্য।

বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন যে, আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্যারের বিশেষ স্নেহভাজন ছাত্রী ছিলেন। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত তিনি স্যারকে অসীম শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছেন। আমি বোধ করছি আমার সব সহপাঠী আজ গভীর বেদনায় নিমজ্জিত। স্যারের আত্মার শান্তি কামনা  করছি। ওপারে আপনি ভালো থাকবেন স্যার।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, নারান্দিয়া কলেজ, কালিহাতি, টাঙ্গাইল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/আরএম