আদৌ কি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন গোপাল, নাকি তার অস্তিত্বই নেই?

ঢাকা, শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১১ ১৪২৭,   ০৮ সফর ১৪৪২

আদৌ কি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন গোপাল, নাকি তার অস্তিত্বই নেই?

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪০ ১২ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৬:০৫ ১৯ আগস্ট ২০২০

গোপাল ভাঁড় বাংলার হাসি রসের রত্ন।

গোপাল ভাঁড় বাংলার হাসি রসের রত্ন।

হাসির রাজা, জ্ঞানের রাজা, রসিক রাজা গোপাল ভাঁড়। গোপাল ভাঁড়কে চেনেন না বা তার কথা জানেন না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। 

সেই ছোট বেলা থেকেই দাদি নানির মুখে শুনে আসছি আমরা গোপাল ভাঁড়ের নানা রসালো গল্প। গোপালের কথা মনে হলেই বাঙালির চোখে ভেসে ওঠে, টাক মাথাওয়ালা পেট মোটা দারুণ এক রগুড়ে লোকের চেহারাই।

কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়

আর এখন তো টেলিভিশনেই দেখা যায় এর কার্টুন সিরিজ। ৯০ দশক কিংবা তারও আগে থেকে শিশু থেকে বৃদ্ধ যেমন গোপাল ভাঁড়ের নানা কীর্তি কলাপ পছন্দ করত। তেমনি এখনকার শিশুরাও বেশ পছন্দ করে গোপাল ভাঁড়ের রস কৌতুক।

তবে ইতিহাসে গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। কেউ কেউ বলেন গোপাল ভাঁড়ের কোনো অস্তিত্বই ছিল না কোনো দিন। আবার অনেকের দাবি গোপাল ভাঁড় স্বয়ং কৃষ্ণনগরের (পশ্চিমবঙ্গের অধিভুক্ত ঐতিহাসিক স্থান) রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাসদ ছিলেন। অন্যদিকে তিনি নাকি কবিও ছিলেন। মিলানসাগর নামক তার কবিতা আছে। ভাঁড়ামি আর বুদ্ধির খেল দেখিয়ে তিনি রাজপ্রাসাদের সবার মন জয় করেছিলেন। মোটকথা, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ও কৃষ্ণনগরের জনগণের যাবতীয় বিনোদনের আস্ত এক ভান্ডার ছিলেন বুদ্ধিমান গোপাল।

তবে এত প্রিয় মানুষ হয়েও এই বাংলাতে তার ঠাঁই হয়নি। এই তর্ক বিতর্কের মাঝে ১৯৫২ সালে হোমশিখা পত্রিকা গোপাল ভাঁড়ের ওপর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে নতুনভাবে বোঝাপড়াই ছিল পত্রিকাটির উদ্দেশ্য। সেখানে গোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পসংগ্রহ নামের প্রবন্ধে অধ্যাপক মদনমোহন গোস্বামী লেখেন, শোনা যায়, মহারাজের (রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের) সভায় আরেকটি রত্ন ছিলেন। তিনি স্বনামখ্যাত রসসাগর গোপাল ভাঁড়।

বাংলা অঞ্চলের প্রবল প্রতাপশালী ছিলেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। ১৭১০ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ৫৫ বছর তিনি রাজত্ব করেছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন ১৭২৮ সাল। শাস্ত্র  ধর্মে বিশ্বাসী কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও শিল্প-সাহিত্যানুরাগী। যদিও ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ছিলেন তিনি। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের দায়ে ইতিহাসে তিনি বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত। তবু এতে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগের কাহিনী মুছে যায়নি। তবে গোপালই নাকি তাকে একাজে বাধা দিয়েছিলেন। তার সভাসদ ছিলেন মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, জগন্নাথ তর্ক পঞ্চানন, হরিরাম তর্কসিদ্ধান্ত প্রমুখ।  

এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়, এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে তারা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, গোপাল রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।

সময়টা ছিল ১৭৫৭ সাল। তখন তরুণ নবাব সিরাজ বাংলা প্রেসিডেন্সি, বিহার ও উড়িষ্যার নবাবি করতেন। তখনকার প্রেসিডেন্সি এখনকার বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে ছিল। সে সময় মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রায় দূর্লভ, উমিচাঁদরা নবাবকে সিংহাসনচ্যূত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। নবাবের বিরুদ্ধে লিপ্ত হয় সেই নির্মম এবং ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে। ঠিক এই সময় কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নবাব বিরোধী এই ভয়ঙ্কর  বলয়ে যোগদান করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের সব সভাসদ তার যোগদানকে সমর্থন করলেও শুধু একজন ব্যক্তি সমর্থন করলেন না। আর সেই ব্যক্তিটি হলেন গোপাল ভাঁড়।

গোপাল বোঝাতে লাগলেন কৃষ্ণচন্দ্রকে। মানা করলেন এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে নিজেকে না জড়াতে। নিজ দেশের নবাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করতে নিষেধ করলেন বারবার। তিনি রাজাকে বলেছিলেন, ইংরেজরা গায়ে সুচ হয়ে ঢুকে কুড়াল হয়ে বের হবে। তাদের স্বাঃর্থ-বিরোধী কাজ করলে আপনার সব উপকারের কথা ভুলে আপনাকে শূলে চড়াতে পিছপা হবেন না।

সর্বোপরি, গোপাল বাংলার এমন সর্বনাশ না করতে কৃষ্ণচন্দ্রকে বার বার অনুরোধ করলেন। তবে কৃষ্ণচন্দ্র তার কথায় মোটেই কর্ণপাত করলেন না। বরং তার সভাসদদের নিয়ে গোপালকে বিদ্রুপ করতে লাগলেন। কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে শর্ত দিলেন, গোপাল যদি নবাবকে মুখ ভেংচি দিয়ে আসতে পারে তবেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এমন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবে।

গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। তবে নবাবের হীরাঝিল প্রাসাদ (বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন) রক্ষিরা কিছুতেই ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। উপায় খুঁজে না পেয়ে গোপাল এক রক্ষির হাতে কামড় বসিয়ে দিলেন। ফলশ্রুতিতে, প্রাসাদ-রক্ষি গোপালকে ধরে নিয়ে নবাবের কাছে গেলেন। সব শুনে নবাব বললেন, কে তুমি? কোথায় থেকে এসেছো? আমাকে কি প্রয়োজন? গোপাল কোনো কথা না বলে নবাবকে মুখ ভেংচি দিলেন। নবাব ভাবলেন, কি ব্যাপার? গোপাল আবারো নবাবকে ভেংচি দিলেন। নবাব গোপালকে আটক করলেন। বললেন, আগামীকাল তোমার বিচার হবে।

এরই মধ্যে গোপাল মীরজাফরকে বল বসলেন, আমি এসেছিলাম তোমাদের সব ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিতে। কিন্তু আমি কিছু বলবো না। কারণ এই ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে কৃষ্ণচন্দ্রও ফেঁসে যাবে। নবাব তাকে সরিয়ে অন্যজনকে ক্ষমতায় বসাবেন। আমি চাই না কৃষ্ণচন্দ্র তার ক্ষমতা হারাক। কারণ তিনি যে আমার অন্নদাতা, পরমান্নদাতা। মীরজাফর তার এমন কথা শুনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। সে নবাবকে জানালো যে,  গোপাল তাকে শয়তান বলে গালি দিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তার ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।

পরদিন সকালে গোপালের ফাঁসির ব্যবস্থা করা হলো। তবে এতে গোপালের মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। নবাব গোপালের মুখের দিকে তাকাতেই গোপাল আবার ভেংচি দিলো তাকে। এবার নবাব রীতিমত ভাবনায় পরে গেল। নবাব ভাবলেন, এ হয়তো বদ্ধ উন্মাদ। পাগলকে ফাঁসি দেয়া ঠিক হবে না। নবাব কবিরাজকে ডেকে গোপালকে পরীক্ষা করতে বললেন। কবিরাজও রায় দিলেন গোপাল এক উন্মাদ। এক উন্মাদকে তো আর ফাঁসি দেয়া যায় না। তাই নবাব গোপালকে মুক্ত করে দিলেন।

নবাবকে ভেংচি কাটায় ফাঁসির আদেশ পান গোপাল 

দেশপ্রেমিক গোপাল ফিরে এলেন কৃষ্ণ নগরে। যখন জানতে পারলেন কৃষ্ণচন্দ্র তার সিদ্ধান্তে অটল, গোপাল ঠিক করলেন কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় আর যাবেন না। গোপাল এও ঠিক করলেন যে তিনি এই কৃষ্ণনগরে আর থাকবেন না। অত্যন্ত ব্যথিত মন নিয়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে রাজ্য ত্যাগ করলেন গোপাল ভাঁড়। এরপর থেকে সদাহাস্যময় গোপাল ভাঁড়কে বাংলায় আর দেখা যায়নি। তিনি রাতের অন্ধকারে কোথায় চলে গিয়েছিলেন কেউই জানেন না। পরবর্তীতে দেশদ্রোহী ও অত্যাচারী রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং বেঈমান মীরজাফররা ইংরেজদের পা চাটা গোলামে পরিণত হয়েছিল। এই ষড়যন্ত্রকারীদের করুণ পরিণতির কথা তো সবাই জানেন । 

১৯২৬ সালে (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গভূমিতে মৃদু কম্পন জাগালো নবদ্বীপ কাহিনী বা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড় নামের একটি পুস্তক। লেখক শ্রীনগেন্দ্রনাথ দাস। তিনি নিজেকে গোপাল ভাঁড়ের বংশধর দাবি করলেন। শুধু কি দাবি? তার বক্তব্যে প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত হলেন গোপাল ভাঁড়। নগেন্দ্রনাথের মতে, গোপালের প্রকৃত নাম গোপাল চন্দ্র। তিনি ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ অন্তঃপুরের ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক। তাই গোপাল চন্দ্র থেকে তার পদবি হয়ে গেল ভান্ডারি। ভান্ডারি থেকে আরো পরে ভাঁড়। তার বাবার নাম দুলাল চন্দ্র। প্রপিতা আনন্দরাম। জাতিতে তারা নাপিত। তবে দুলাল চন্দ্র ছিলেন নবাব আলিবর্দী খাঁর শল্যচিকিৎসক বা বৈদ্য।

তৎকালে অস্ত্র-চিকিৎসা নাপিত জাতির অধিকৃত ছিল মন্তব্য করে নগেন্দ্রনাথ দাস নবদ্বীপ কাহিনীতে তথ্য দিয়েছেন। গোপালরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই কল্যাণ আর ছোট ভাই গোপাল। তার জন্ম অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, মুর্শিদাবাদে। নগেন্দ্রনাথ আরো লিখেছেন, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় গোপালের গুণে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরে লইয়া যান। গোপাল অতি সুপুরুষ ও বাল্যকাল হইতে সুচতুর ও হাস্যোদ্দীপক বাক্যাবলী প্রয়োগে বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ন্যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের একটি পঞ্চরত্নের সভা ছিল। মহারাজ কৃষ্ণ গোপালের প্রত্যুৎপন্নমতি ও বাকপটুতা দেখিয়া তাহাকে স্বীয় সভায় অন্যতম সদস্য পদে নিযুক্ত করেন। গোপালের এক পুত্র ও রাধারাণী নামে এক কন্যা ছিল। রাধারাণীর দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। বহুদিন হলো সে বংশ লোপ পাইয়াছে। তবে গোপালের বংশ লোপ পেলেও তিনি তার ভাই কল্যাণের নবম অধস্তন পুরুষ।

তবে গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। গোপালের অস্তিত্ব নিয়ে যাদের খটকা বেশি, তাদের ইন্ধন জুগিয়েছে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে। সেখানে তিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তার সভাসদদের অনেকের সম্পর্কে লিখলেও লক্ষণীয়ভাবে এতে গোপাল ভাঁড় বিষয়ে কিছুই লেখেননি। গোপাল যদি তার সমসাময়িক এবং একই সভার সদস্য হতেন, তবে ভারতচন্দ্রের লেখায় তাকে পাওয়া যেতই।

তবে গোপাল ভাঁড় ছিলেন কিংবা ছিলেন না। দুই পক্ষেরই নানা প্রমাণ পাওয়া যায় ইতিহাসে। তবে যাই হোক না কেন, গোপাল ভাঁড় বাংলার হাসি রসের রত্ন। তার সেসব কৌতুক আর বুদ্ধির খেল আজো মানুষকে আনন্দ দেয়। যুগ যুগ ধরে আবাল থেকে বণিতা সবারই প্রিয় পাত্র হয়ে থাকবেন গোপাল ভাঁড়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে