Alexa আত্মহত্যার ঝুঁকি ও করণীয়

ঢাকা, সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৩ ১৪২৬,   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

আত্মহত্যার ঝুঁকি ও করণীয়

 প্রকাশিত: ১৬:১৯ ১৭ অক্টোবর ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষ বেশি আবেগপ্রবণ। 

উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকায় এদের মধ্যে সব সময় এক ধরণের অস্থিরতা বিরাজ করে। বাংলাদেশও এই কাতারের একটি উন্নয়নশীল দেশ। নানা চাওয়া-পাওয়ার অভিঘাতে জর্জরিত বাঙালি জাতির আবেগ প্রবণতাটাও তাই বেশিমাত্রায় লক্ষণীয়। সামাজিক অস্থিরতা, দরিদ্রতা, অশিক্ষা, প্রতারণা, বেকারত্বসহ জীবন-জীবিকার নানা ক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে মানুষ তার নিজের জীবনের প্রতি আস্থার সংকট উপলব্ধি করে। ফলে এ অভিঘাত সহ্য করার মানসিকতা, ধৈর্য হারিয়ে তারা আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। ১৪ অক্টোবর ‘দৈনিক মানবকণ্ঠ’ পত্রিকায় ‘দেশে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ৬৫ লাখ মানুষ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

আত্মহত্যার কারণ অন্বেষণ ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে জানা যায়, সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন ধর্মে আত্মহত্যা বা আত্মহননকে ‘মহাপাপ’ হিসাবে চিহ্নিত করে এ মহাপাপ করতে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আবার কোন কোন    ক্ষেত্রে সামাজিক অবক্ষয় রোধে বিপথগামী নারী বা পুরুষের আত্মহত্যার মাধ্যমে সামাজিক শুদ্ধিতার ক্ষেত্র তৈরির কথাও সমর্থন করা হয়েছে। আত্মহত্যার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে আরও মজাদার, রোমাঞ্চকর, লোমহর্ষক ও ব্যথাভারাতুর কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায়। জানা যায়, জাপানে ‘হারাকিরি’ নামে এক ধরণের বাধ্যতামূলক আত্মহত্যার প্রচলন ছিল। সে দেশের যোদ্ধা ‘সামুরাই’রা যুদ্ধে পরাজিত হলে তাদের আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো। এ ক্ষেত্রে তারা আগে থেকে আত্মহত্যার দিন নির্দিষ্ট করে নাচ-গান অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। এরপর উন্নত খাদ্য আহার এবং পবিত্র মন্ত্র পাঠ করে আত্মহত্যার জন্য নিজেকে তৈরি করতো। পরাজিত সামুরাইদের স্ত্রীরা কাঠের ছোরা দিয়ে প্রথমে স্বামীকে হত্যা করতো এবং পরে ওই চাকু দিয়ে তারা নিজেদেরও শিরচ্ছেদ করতো। জাপানে অসুখী প্রেমিক-প্রেমিকা নিজেরা এ জীবনে মিলিত হতে না পেরে জীবনের ওই পারে মিলনের মোহে একই সঙ্গে আত্মহত্যা করতো। এ আত্মহত্যাকে বলা হতো ‘শিঞ্জু’। আবার দেখা যায় কোন গৃহভৃত্যের মালিক মারা গেলে ওই গৃহভৃত্যও আত্মহত্যা করতো, একে বলা হতো ‘জুন্সি’। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে জাপানে এই বাধ্যতামূলক ‘হারাকিরি’ বন্ধ করা হয়েছে। আর সর্বশেষ জুন্সির ঘটনা ঘটে ১৯১২ সালে। বর্তমানে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে ফলে তারা জীবন ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি ধৈর্য ধারণে সক্ষম। তারপরও আত্মহত্যার এ ভয়াবহ পরিসংখ্যান আমাদের ব্যথিত করে।

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা নানা ক্ষেত্রে, নানামুখী হয়রানীর শিকার হয়ে আত্মহননের মতো ভয়াবহ পথে পা বাড়ায়। পারিবারিক কলহ, সামাজিকভাবে নিঃগৃহিত হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, হতাশা, বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, প্রেমবিচ্ছেদ, বন্ধত্বের মধ্যে মনোমালিন্যসহ এবং অতি সাম্প্রতিক সময়ের ইভটিজিং জাতীয় সমস্যার কারণে আমাদের দেশে আত্মঘাতী প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই ক্রমোন্নতির একুশ শতক মানুষের জীবনে এনেছে সুখ ও সমৃদ্ধি। সেই সঙ্গে এনেছে বিপুল চাহিদা ও প্রত্যাশা। অথচ দরিদ্র মানুষ তার প্রত্যাশা অনুযায়ী চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। যে কারণে সকলের মধ্যে এক ধরণের তীব্র প্রতিযোগিতা বিরাজ করে। এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে মানুষ আক্রান্ত হয় প্রবল স্ট্রেসে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, যুবকরাই এতে বেশি আক্রান্ত হওয়ায় আত্মহননের প্রবণতাটাও তাদের মধ্যে অতিমাত্রায় দেখা যায়। 

শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। এর অবশ্য নানা কারণও রয়েছে। গ্রামে বসবাসরত অধিকাংশ মানুষই কৃষি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশকও সেখানে হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। কৃষিজীবি সকল পরিবারেই কম বেশি কীটনাশক বা বালাইনাশক কিংবা ইঁদুর দমনের ওষুধ রক্ষিত থাকে। ফলে সংসারে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দিলে সেখানে আত্মহত্যার উপকরণ পাওয়া সহজ একটি বিষয়। এতে করে গ্রামাঞ্চলে কীটনাশক পানে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। শহরে কীটনাশক সহজলভ্য না হওয়ায় অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি সেবন এবং গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে দেকা যায়। কখনও কখনও গায়ে আগুন লাগিয়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে আত্মহত্যার খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সত্যিকথা বলতে কি যে উপায়েই হোক না কেন আত্মহত্যা কোন সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না।   

হিন্দু ধর্মে আত্মহত্যাকে মূলত ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছে। ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে- ‘মানুষ হিসাবে জন্মানোই একটি কঠিন কাজ, এই জন্মগ্রহণের সুযোগ পেয়ে যদি কেউ স˜্গুরুর সাহায্যে মোক্ষলাভ বা মুক্তির চেষ্টা না করে তবে সে আত্মহত্যা করার মতোই অপরাধী।’ তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পাপস্খালন, পূণ্যলাভ বা স্বর্গলাভের জন্য আত্মহত্যাকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। যুগের পরিবর্তনে এখন আর কেউ পূণ্যলাভের জন্য আত্মহত্যা করে না। আত্মহত্যা করছে মূলত নিজের জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে। আর এমনটিই বলছেন সমাজ গবেষকরা।

ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যাকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। হাদিস বুখারির মতে, ‘যারা কোন অস্ত্রের সাহায্যে আত্মহত্যা করে তাদেরকে নরকের আগুনে পুড়ে যন্ত্রণা পেতে হয়।’ এছাড়া আত্মহত্যাকারীর মৃতদেহকে সাধারণ কবরস্থানে দাফন এবং শেষ প্রার্থনা করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে খ্রিষ্টধর্মে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব না নিয়ে ধৈর্য, সদিচ্ছা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আকাশ সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা কারণে মানুষের ধর্মীয় বাঁধন অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছে। মানুষ যদি ধর্মের প্রতি নির্মোহ থেকেও ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর কথা নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে চেষ্টা করে তাহলেও আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকটা কমে আসতে পারে।  

‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’ কবির এ বাক্যটিকে আপ্ত করতে পারলে মানুষ আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য পথে অগ্রসর হতো না। আত্মহত্যা মূলত একটি মানসিক ঘটনা। শারীরিক, অর্থনৈতিক কারণসহ বিভিন্ন জটিলতার ক্ষত যখন মানুষ প্রশমন করতে ব্যর্থ হয় তখনই সে হয়ে পড়ে অবসাদগ্রস্ত। এর ফলে নিজেকেই সে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিয়ে আত্মিক মুক্তির কথা ভাবে। সমাজতাত্তি¡ক, গবেষকরা আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসাবে অবসাদগ্রস্ততাকেই সনাক্ত করেছেন। এবং আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে সহানুভূতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সুতরাং যেসব সামাজিক অসংগতি আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজে সহায়তা করে সেগুলো সমাজ থেকে দূর করতে হবে। 

আমাদের দেশের জনগণকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, এসিড নিক্ষেপ, ইভটিজিং, বিদেশ গমনাগমনসহ নানা বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কমতি নেই। কিন্তু আত্মহত্যা প্রবণতা রোধে সরকারি-বেসরকারি কোন পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক অনুষদের অধীন কাউন্সিলিংয়ের জন্য ব্যবস্থাও অপ্রতুল। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানেও নিয়মিত কাউন্সিলিং পরিচালিত হয় না। আত্মহত্যা প্রবণতা রোধ বা এ জাতীয় ঘৃণ্য কাজ থেকে জনগণকে সচেতন করতে সরকারকেই কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারিভাবে মাঠ পর্যায়ে জনসচেনতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলো জনসচেতনতামূলক এ কাজ আরও গতিশীল হবে। সমাজের নানামুখী অস্থিরতা দূর করা গেলে আত্মহত্যাও কমবে পাশাপাশি জনগণও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর