Alexa আত্মহত্যার গহীন অরণ্য: আওকিঘারা, জাপান!

ঢাকা, সোমবার   ১৯ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৪ ১৪২৬,   ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

আত্মহত্যার গহীন অরণ্য: আওকিঘারা, জাপান!

 প্রকাশিত: ১৬:১৮ ৮ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৬:১৯ ৮ জুন ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

অরণ্যের সৌন্দর্য দেখতে ভ্রমণ পিপাসুদের নিরন্তর যাত্রা ও কৌতূহলের সাথে আমরা তো কম বেশি সবাই পরিচিত। আমরা প্রকৃতির সান্নিধ্যের লোভে অরণ্যের খোঁজ করি। নাগরিক ক্লান্ত জীবন থেকে বেরিয়ে পান করতে চাই প্রকৃতির অমীয় সুধা। নিতে চাই সজীব নিঃশ্বাস। কিন্তু এমন যদি হয় জীবনের ঘাত প্রতিঘাতে পরাজিত হয়ে আপনি প্রকৃতির আশ্রয়ে খুঁজেন মৃত্যু বীজ? কেমন হবে অরণ্যের বুকে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুর স্বাদ যা গ্রহণ করতে মানুষ নিজেই আশ্রয় নেয়! ভাবতে গিয়ে খানিকটা হলেও গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় বৈকি। এমনই এক বিভীষিকাময় অরণ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে আমাদের আজকের আয়োজন।

আওকিঘারা বন, সাধারণের কাছে আত্মঘাতী বন হিসেবে সুপরিচিত। জাপানের ফুজি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই অরণ্যকে পৃথিবীর বুকে জেগে থাকা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। অপরিমেয় ঘনত্বের মাঝে অগনিত বৃক্ষরাজির মহাসমুদ্র এবং রহস্যময়ভাবে লোকজনের হারিয়ে যাওয়ার নাটকীয় সাক্ষী এই বন। এই অরণ্যকে বৃক্ষরাজির মহাসমুদ্র নামেও ডাকা হয়।

Suicide Forest নামে পরিচিত জাপানের আওকিঘারা অরণ্যটি প্রায় ১৩ বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই অদ্ভুত এবং রহস্যময় অরণ্যটি বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত আত্মহত্যার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত।

আত্মঘাতী বনে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাঃ
আত্মঘাতী বনকে অনেকে ভুতুড়ে বলে বিশ্বাস করেন। তবে যারা ভৌতিক আবহ বা অভিজ্ঞতা ভালোবাসেন এমন পর্যটকদের জন্য আওকিঘারা বন, ক্রমেই জনপ্রিয় ভ্রমণের স্থান হয়ে ওঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এই অরণ্যে যারা ভীতিকর ছুটি কাটানোর মাধ্যমে নিজেদের সাহসিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেন তারা বিকারগ্রস্ত অথবা বিষাদ এর শিকার। কিন্তু যারা এই বিস্ময়কর জায়গায় সত্যি সত্যি প্রবেশ করতে চান, তাদের এই অরণ্যে লুকানো ছায়া বিপদ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেন্দ্র:
শুনতে যথেষ্ট নাটকীয় শোনালেও, আওকিঘারা বনটিতে প্রবেশ করার সময় আপনার নজর কাড়তে পারে, মরা পাতায় ঢেকে যাওয়া পরিত্যাক্ত গাড়ি। কথিত রয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচিত ব্যক্তিরা অরণ্যে প্রবেশ করার সময় তাদের বাহন ফেলে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। অরণ্যে প্রবেশ করার পর পথের আঁকে বাঁকে ভ্রমণকারী সতর্ক বার্তা সম্বলিত অনেক সাইন দেখতে পান। এসব সাইনে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করা ব্যক্তিকে তার পরিবারের কথা বিবেচনা করতে অনুরোধ করা হয়। প্রয়োজনে আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেন্দ্রের সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ ও দেয়া হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে আগ্রহী কোন সতর্ক বার্তাই তার মনে দাগ কাটে না।

রহস্যের অন্তরালেঃ:
অরণ্যের সরু পায়ে হাঁটা পথ চিহ্নিত রয়েছে ফিতা, দড়ি এবং প্লাস্টিকের টেপ দিয়ে, যেন তা অরণ্যের মাঝে পথের দিশা রাখতে পারে। কোন ভ্রমণকারী যেন পথ হারিয়ে দিকভ্রান্ত না হয়। কিন্তু যারা আত্মহত্যার চিন্তা করছে, তারা এই পথগুলো প্রথমেই এড়িয়ে চলা শুরু করে। আর তাদের পরিত্যাক্ত জিনিস যেমনঃ- ব্যাগ, মোজা, ছাতা, ব্যাকপ্যাক পথের ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। ট্র্যাকিং করতে করতে ভ্রমণকারী হোঁচট খেতে পারেন বিপজ্জনক গাছের শিকড়ে, যা ভূগর্ভস্থ পানির কারণে পচে নরম হয়ে থাকে। মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এই পানি ক্রমবর্ধমান বৃক্ষের শিকড়কে আরও বিস্তৃত করে। অরণ্যের সর্বত্রই এমন অবস্থা বিরাজমান।

জিপিএস ট্র্যাকিং এবং কম্পাস নিষ্ক্রিয়তা:
আত্মঘাতী বন, আওকিঘারায় প্রতিমুহূর্তেই যেন অস্বস্তিকর এবং অশুভ আবহের বাস। পরিত্যক্ত ক্যাম্পিংয়ের বিপুল সংখ্যক জিনিসপত্র শুধু মনকে খারাপ করে তোলে। সেলফোন, জিপিএস, এমনকি কম্পাসও নিস্ক্রিয় হয়ে পরে। ঘন ঘন মাউন্ট ফুজির অগ্নুৎপাত থেকে নির্গত লাভা আওকিঘারা অরণ্যের মাটির নীচে যে কঠিন আবরন সৃষ্টি করেছে তাকেই এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন ভূ-বিজ্ঞানীরা।  

অশুভ বা আধ্যাত্মিক উপস্থিতির অনুভব:
আওকিঘারা বনের অভ্যন্তরে ভয় ও রোমাঞ্চের খোঁজে প্রবেশ করা ভ্রমণকারীদের অনেকেই অজানা উপস্থিতি, ভুতুড়ে ও পৈশাচিক কণ্ঠস্বর এবং দূরবর্তী চিৎকার শুনেছে। এছাড়াও গাছের শাখাপ্রশাখা হতে ঝুলানো ফাঁসির দড়ি, ক্ষয়ে যাওয়া মৃতদেহ বা কঙ্কালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেন নিত্য দিনের ঘটনা। যতই কেউ বনের গভীরে যেতে থাকে ততই যেন সে অশরীরী অশুভ আত্মাদের ভয়াল জগতে প্রবেশ করে। যেন কারো মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটতে চলেছে মৃত্যুর সাথে। কেউ যদি বেঁচে ফিরেও আসে তাকে পাওয়া যায় উন্মাদ অবস্থায়।

আত্মহত্যার পরিসংখ্যান:
ধারণা করা হয় যে প্রতি বছর আওকিঘারাতে ১০০ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। ২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে ২৪৭ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করে যার মধ্যে ৫৪ টি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। আওকিঘারাতে পাওয়া মৃতদেহের সংখ্যা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগত তথ্য জাপানী কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই প্রকাশ করেনা। এর কারণ হিসেবে জাপান সরকারের অভিমত, আত্মহত্যাকারীদের নিরুৎসাহিত করতেই প্রশাসন এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। জানা যায় আওকিঘারা অরণ্যে আত্মহত্যার বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতির মধ্যে ফাঁসি বা মাত্রাতিরিক্ত মাদক গ্রহণ অন্যতম।

জাপানী ঐতিহ্য বনাম আত্মঘাতী অরণ্য :
এই ভয়াবহ অরণ্যের অতীত ইতিহাস মূলত জাপানি পুরানো ধারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে মনে করে এই অরণ্যের গভীরে ইয়ুরেই বা মৃতের অভিশপ্ত আত্মারা বাস করে। জাপানী ঐতিহ্য অনুসারে, বিশ্বাস করা হয় যে সমস্ত মানুষের মাঝে রয়েছে আত্মার বসবাস তাকে ড়েইকন বলা হয়। আর মৃতের অভিশপ্ত আত্মাকে বলে ইয়ুরেয়ি

মৃত্যুর পরে, আত্মা শরীর থেকে প্রস্থান করে এবং প্রায়শ্চিত্তমূলক কাজে লিপ্ত হয়। যতক্ষণ না মৃতের শরীর যথাযথ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সঙ্গে বিশ্রামের জন্য সম্মানিত করা হয় ততক্ষণ আত্মা অপেক্ষা করে। জাপানীরা বিশ্বাস করে মৃতের শান্তিপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যদি যথাযথ সম্মানপূর্বক পালন করা হয় তবে আত্মা তার পূর্বপুরুষদের সাথে একত্রিত হবার অনুমতি পায়। বার্ষিক ওবনের উৎসবে মৃতকে সম্মানিত করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে এই ভাল আত্মারা প্রয়োজনের সময় অবশিষ্ট জীবিত পরিবারকে রক্ষা করবে।

যখন কেউ আত্মহত্যা করে, যদি তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সঠিক রীতিতে সম্পন্ন না হয়, তবে মৃতের আত্মা ইয়ুরেই বা মন্দ আত্মায় রূপান্তরিত হয়। ইয়ুয়েরি তখন ভৌত জগতের ভূত-প্রেতাত্মাদের সাথে জীবনযাপন করবে। জাপানীদের এই বিশ্বাসের প্রতিফলন আওকিঘারা অরণ্য। কারন এই অরণ্যেই যে ইয়ুরেইদের অবস্থান।

আওকিঘারা অরণ্যের ভৌতিক সত্য ঘটনা, জাপানঃ
আওকিঘারা অরণ্যে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক ঘটনা এবং লোমহর্ষক অনুভূতির সম্মুখীন হওয়া ব্যক্তিদের থেকে অনেক ঘটনার কথাই জানতে পারা যায়।

কাট টেপ:
একজন মহিলা নিজের অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন যে তিনি বনের গভীরতায় হারিয়ে যান। কারণ ছিল দিক নির্ণয়ের চিহ্নিত টেপ। অজ্ঞাত কেউ তার টেপ কেটে দিয়েছিলো। তিনি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছেন কিন্তু কিভাবে তার টেপ কাটা ছিল সেটি এখনও রহস্য। এটা কি সম্ভব যে কোন এক ইউরিই ঘটনার জন্য দায়ী?

ইয়ুরেইর উপস্থিতি:
অতি প্রাকৃত ঘটনা নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষ অনুষ্ঠান সাইফাই শো ২০০৮ সালে আওকিঘারা অরণ্য নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করে। এই ডকুমেন্টারি নির্মাণের কিছু অস্পস্ট ছায়াচিত্র ও আকারের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। এটি কি সত্যি ইউরেইর উপস্থিতি ছিল না বানানো নাটক তা আজও অজানা।

আর্তনাদ:
অনেক মানুষই যখন এই আত্মঘাতী বন পরিদর্শন করেন তখন উচ্চস্বরের চিৎকার বা আর্তনাদ শুনতে পান। এই চিৎকার কোন মানুষের বা পশুর হতে পারে না বলেই ভ্রমণকারীরা বলেন। ঠিক এই ধরণের দাবিই করেছেন জাপানের টাইমস পত্রিকায় একজন লেখক।

তিনি আত্মঘাতী বনভূমির গভীরে ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনে অনুসন্ধানে যান। অনুসন্ধানে তিনি একটি ক্ষয়প্রাপ্ত মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন মৃতদেহের ইয়ুরেই (আত্মা) ছিল ভয়াবহ চিৎকারের উৎস।

আত্মহত্যার আমন্ত্রণ:
কিউমো ফুকুয়ী, একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, আত্মঘাতী বনে গিয়ে একটি শুদ্ধি অনুষ্ঠানে যোগ দেন যেন অরণ্যে ইয়ুরেইয়ের উপস্থিতি হ্রাস পায়। পরবর্তী সময় নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আত্মারা সকলকে এই বনে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করে - এমনকি আজও তারা সেখানে আত্মহত্যা করতে মানুষকে আহ্বান জানাচ্ছে। 

বই, ডকুমেন্টস এবং আওকিঘারা সম্পর্কে চলচ্চিত্র:
আওকিঘারা প্রবেশের পরবর্তী সময় প্রতিটি মানুষ এক অতিপ্রাকৃত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাত্রা করে। যেন কেউ বাস্তব জীবনে স্টিফেন কিং এর ভৌতিক বইয়ের নাটকীয় চিত্রায়ন দেখছে বা "দ্য কনজুরিং" এর মত ভয়াবহ চলচ্চিত্রে নিজেই অভিনয় করছে। আত্মঘাতী বনে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা সম্পর্কে ভৌতিক সিনেমা, ডকুমেন্টারী, বই এবং এমনকি কমিক বই আছে।

আত্মঘাতী বন সম্পর্কে সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং সুপরিচিত চলচ্চিত্রগুলি হল ২০১৬ সালে নির্মিত "দ্য ফরেস্ট" এবং ২০১৫ সালে নির্মিত ম্যাথু ম্যাককোনাজেই অভিনিত চলচিত্র  "দ্য সী অফ ট্রীজ"।

জাপান এবং বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষের কাছে, আওকিঘারার আত্মঘাতী বনভূমি হল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহতম জায়গা। তবে মৃত্যু বিলাসী মানুষের সংখ্যা তো নিতান্ত কম নয়, আর জাপানেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তাই এই ভয়াল বনভূমির অস্তিত্ব রয়েছে আজো মানুষের অনুভূতির পাশাপাশি প্রকৃতির বুকেও।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

Best Electronics
Best Electronics