আট হাজার সৈন্য আজো পাহারারত চীনের প্রথম সম্রাটের সমাধিস্থলে!

ঢাকা, শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৬ ১৪২৭,   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

আট হাজার সৈন্য আজো পাহারারত চীনের প্রথম সম্রাটের সমাধিস্থলে!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৫ ৩০ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:২১ ৩০ মে ২০২০

ছবি: টেরাকোটার সৈন্যরা

ছবি: টেরাকোটার সৈন্যরা

হাজারো সৈন্য যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের সমাধিস্থলে। চীনের প্রথম সম্রাটের সমাধি বলে কথা! পহারারত সৈন্যরা হলো টেরাকোটা আর্মি, অর্থাৎ পোড়ামাটির ভাস্কর্যের সংগ্রহ।

চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের সেনাবাহিনীকে চিত্রিত করা হয়েছে টেরাকোটা আর্মির মাধ্যমে। খ্রিষ্টপূর্ব ২১০ থেকে ২০৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই ভাস্কর্য তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা পাওয়া যায়। সম্রাটের মৃত্যু পরবর্তী জীবন রক্ষার জন্য নাকি টেরাকোটা আর্মি তৈরি করে তার সঙ্গে সমাহিত করা হয়েছিল।

টেরাকোটার সৈন্যরাটেরাকোটা আর্মির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। চীনের শানজির লিন্টং কাউন্টির স্থানীয় কৃষকরা মাটি খনন করার সময় এর সন্ধান পেয়েছিলেন। সৈন্যদের মূর্তিগুলো নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর শেষার্ধে। টেরাকোটা আর্মির মূর্তিগুলোর উচ্চতা নির্ধারিত হয়েছিল পদ অনুযায়ী। জেনারেলদের মূর্তিগুলো সবচেয়ে উঁচু। 

টেরাকোটা আর্মির মধ্যে যোদ্ধা, রথ এবং ঘোড়ার মূর্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৭ সালে পরিচালিত একটি গণনা কার্যক্রম অনুযায়ী, টেরাকোটা আর্মি সম্বলিত তিনটি গর্ত থেকে আট হাজারেরও বেশি সৈন্য, ১৩০টি রথ, ৫২০টি ঘোড়া এবং ১৫০টি অশ্বারোহী সৈন্যের মূর্তি আছে। টেরাকোটা আর্মির বেশিরভাগই সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের সমাধিস্থলের নিকটবর্তী গর্তে সমাহিত অবস্থায় ছিল। 

সম্রাটকে পাহারারত সৈন্যরাঅন্য কিছু টেরাকোটাযুক্ত গর্তে বেসামরিক কর্মকর্তা, আধিকারিক, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সঙ্গীত শিল্পীদেরও ভাস্কর্যের সন্ধান মিলেছে। চীনের প্রাচীন ইতিহাসবিদ সিমা কিয়ানের (১৪৫-৯০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) ‘রেকর্ডস অব দ্য গ্র্যান্ড হিস্ট্রি’ থেকে টেরাকোটা আর্মি এবং সম্রাটে কিন শি হুয়াংয়ের সমাধি নির্মাণ সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায়। সম্রাটের সমাধিস্তম্ভ নির্মিত হওয়ার প্রায় ১০০ বছর পর ইতিহাস গ্রন্থটি রচিত হয়।

সম্রাট কিন সিংহাসন আরোহণের পরপরই ২৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই সমাধিস্থলের কাজ শুরু হয়েছিল। সম্রাট কিনের বয়স ছিল তখন মাত্র ১৩ বছর। সমগ্র কাজ শেষ করতে প্রায় ৭ লাখ শ্রমিক কাজ করেছিল। প্রাচীন চীনা ভূগোল বিষয়ক একটি রেকর্ড থেকে জানা যায়, মাউন্ট লি ভৌগোলিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ স্থান ছিল। এর উত্তর দিকে স্বর্ণের খনি ছিল এবং দক্ষিণ দিকে অন্যান্য মূল্যবান বস্তুর খনি ছিল। 

রয়েছে অশ্বারোহীসম্রাট সমাধিস্থল হিসেবে এমনই এক সমৃদ্ধ স্থানই বেছে নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ সিমা কিয়ানের বর্ণনা অনুযায়ী, চীনের প্রথম সম্রাট কিনকে প্রাসাদ, টাওয়ার, কর্মকর্তা, মূল্যবান বস্তু এবং বিস্ময়কর নিদর্শনসহ সমাহিত করা হয়েছিল। সমাধিস্তম্ভে পারদের ব্যবহার হয়েছিল বলে জানা যায়। টেরাকোটা আর্মি ভাস্কর্যগুলোর প্রথম সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৪ সালের ২৯শে মার্চ। 

মাউন্ট লিতে অবস্থিত সম্রাট কিন শির সমাধিস্তম্ভের প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বে একটি পানির কূপ খননের সময় কৃষকরা ভাস্কর্যগুলো দেখতে পেয়েছিলেন। প্রত্নতত্ত্ববিদদের নিকট এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। অনেক বড় একটি সমাধিস্থলের অংশ টেরাকোটা আর্মি ভাস্কর্যগুলো। প্রায় ৯৮ বর্গ কিলোমিটার অংশ জুড়ে এর বিস্তৃতি। 

টেরাকোটার সৈন্যরাভাস্কর্যগুলো এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যোদ্ধারা সমাধির পূর্বদিকে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। সমাধিস্থলের চারটি স্থানে খনন করে হয়েছে। কিছু স্থানে প্রায় সাত মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। মূলত সৈন্যদের মূর্তিগুলো স্থাপিত হয়েছে সম্রাটের সমাধি পাহারারত অবস্থায়। সামরিক পদবী অনুযায়ী, সৈন্যদের মূর্তি সাজান হয়েছে।

টেরাকোটা আর্মি সম্বলিত প্রথম খনন করা স্থানটির দৈর্ঘ্য ২৩০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬২ মিটার। সেখানে প্রায় ছয় হাজার সৈন্যের মূর্তি পাওয়া যায়। দ্বিতীয় স্থানে অশ্বারোহী এবং পদাতিক ইউনিটসহ যুদ্ধ রথও ছিল। এর দ্বারা মিলিটারি গার্ড প্রদর্শন বোঝান হয়েছে। তৃতীয় স্থানে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মূর্তি আছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূর্তির সঙ্গে এখানে একটি যুদ্ধের রথ আছে। চতুর্থ স্থানটি খালি আছে। 

যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সৈন্যরাধারণা করা হয়, নির্মাতারা এই স্থানটি অসম্পূর্ণ রেখেছেন। মূর্তিগুলো অনেকটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের আকারের। পদ অনুযায়ী উচ্চতা, ইউনিফর্ম এবং চুলের ধরণের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিটি মূর্তির মুখের অবয়বের পার্থক্য আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মূর্তিগুলোর মুখের অবয়বের দশটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করেছেন। সৈন্যেদের বেশিরভাগ মূর্তি অস্ত্র দ্বারা সজ্জিত ছিল। অস্ত্রগুলো আসল অস্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস