আটক সোনা জমা দেয়া নিয়ে বিপাকে বিভিন্ন সংস্থা

ঢাকা, রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৩ ১৪২৬,   ১২ শা'বান ১৪৪১

Akash

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শর্ত 

আটক সোনা জমা দেয়া নিয়ে বিপাকে বিভিন্ন সংস্থা

শফিকুল বারী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫৫ ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:২৫ ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯

সংগৃহীত

সংগৃহীত

বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী সোনা জমা দিতে না পারায় বিপাকে পড়েছে কাস্টমসসহ বিভিন্ন সংস্থা। এসব সংস্থা আটক হওয়া শত শত কেজি সোনার বার ও অলঙ্কার কোথায় কিভাবে রাখবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে। ইতিমধ্যে কিছু সোনা চুরির ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ।

বর্তমানে ঢাকা কাস্টমস হাউজের হেফাজতে ৬০০ কেজিরও বেশি জব্দকৃত সোনা জমা রয়েছে। যার মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার হেফাজতে হয়েছে বিপুল পরিমান সোনা।

সূত্র জানায়, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক অনুসন্ধানে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপদ ভল্টে গচ্ছিত সোনা নিয়ে গরমিলের চিত্র ফুটে উঠে। এরপর থেকে জব্দকৃত সোনা জমা নিতে নতুন শর্তারোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নতুন নিয়মে সোনা জমা দিতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমস, বিজিবি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আটক করা সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা হয়। সোনা জমা রাখার পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষজ্ঞ দিয়ে ওইসব সোনার মান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জমা রাখে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জমাকৃত সোনার পরিমান ও মান উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক রসিদ দেয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতেও এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেয়া হয়। মান নির্ধারনের সময় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ উপস্থিত থাকে। পরবর্তীতে এসব সোনা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়। 

সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন সময় চোরাচালকৃত সোনা জব্দ করে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দারা। নিয়ম অনুযায়ী সেসব সোনা জমা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। মাঝে মধ্যে জমাকৃত সোনা পরীক্ষা করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর এরকম একটি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। পর্যবেক্ষণের সময় জমাকৃত সোনা রসিদের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত সোনায় বেশ কিছু গরমিল খুঁজে পায় নিরীক্ষক দল। যা প্রতিবেদন আকারে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০ থেকে ২৪ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি স্বর্ণালঙ্কার ও সোনার বারের অধিকাংশেরই ক্যারেটে তারতম্য রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের পক্ষ থেকে ২০ থেকে ২৪ ক্যারেটের সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে গচ্ছিত রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পরীক্ষায় দেখা যায় সেগুলো ১৮ ক্যরেট হয়ে গেছে। অধিদফতরের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করে বলা হয়, উচ্চ ক্যারেটের সোনা সরিয়ে সেখানে নিম্ন ক্যারেটের সোনা গচ্ছিত রাখা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করা হয় প্রতিবেদনে।

যদিও পরবর্তীতে সংবাদ সন্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দাবি ছিলো, ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত সোনা ঠিক আছে। 

এদিকে বিতর্কিত এ ঘটনার পর সোনা গচ্ছিত রাখতে নতুন শর্তারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা এখন আর পূর্বের নিয়মে সোনা গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। জব্দকৃত সোনা বক্সে জমা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তাদের এই শর্ত মেনে স্বর্ণ গচ্ছিত রাখতে নারাজ সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো.সিরাজুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সোনা জমা নিচ্ছেনা বলা ঠিক নয়। ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্থাকে জব্দ করা সোনা একটি পুটলিতে সিলগালা করে জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া, পুটলিতে অবৈধ বা বিপদজনক কোনো বস্তু নেই বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার লিখিত দেয়ার নিয়ম রয়েছে। সিলগালা করার পর পুটলিটি একটি লকারে রেখে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে লকারের চাবি দিয়ে দেয়া হয়। কারণ প্রতিটি জব্দ করা সোনার বিষয়ে সংস্থাগুলো মামলা করে। মামলা শেষ হওয়ার আগে এসব সোনা ব্যাংকের অধিকারে নেয়ার নিয়ম নেই। আইনগত বিষয় নিষ্পত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক চূড়ান্তভাবে সোনা গ্রহণ করে। তখন এসব সোনা রাষ্টের সম্পত্তি। পরে জব্দকৃত সোনার মধ্যে শুধু অলঙ্কার নিলামে বিক্রি বা বিদেশে রফতানি করা হয়।   

এ প্রসঙ্গে ঢাকা কাস্টমস হাউজের সহকারী পরিচালক (প্রিভেনটিভ) মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এভাবে সোনা গচ্ছিত রাখলে পরবর্তীতে সোনার গরমিল হলে আমরা বিতর্কের মধ্যে পড়ে যাব। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে একটি বক্সে বা পুটলির ভেতর সোনা রেখে ব্যাংকে জমা দিতে। বক্সের ভেতর কি আছে না আছে তা তারা দেখবেন না। কিন্তু আমরা বলেছি সোনা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সোনার মান ও পরিমান যাচাই করে রশিদের বিপরীতে তা জমা রাখতে। 

তিনি আরো বলেন, এভাবে সোনার মত মূল্যবান ধাতু গচ্ছিত রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এ কারণে তাদের লোকবল সংকটে পড়তে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন শর্তারোপের কারণে ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে তারা জব্দকৃত সোনা আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা দিতে পারছেন না। ফলে সব সোনা নিজেদের হেফাজতে রাখতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে কাস্টমস হাউজের হেফাজতে ৬০০ কেজিরও বেশি জব্দকৃত সোনা রক্ষিত রয়েছে। যার মূল্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানায়, এবছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৭১ কেজি ৬১ গ্রাম চোরাচালানের সোনার বার ও অলঙ্কার জব্দ করেছে তারা। যার মূল্য প্রায় ৮৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। 
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের উপ-কমিশনার মো. রিয়াদুল ইসলাম জানান, একই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস জব্দ করেছে ১১৭ কেজি ৪০৩ গ্রাম সোনার বার ও অলঙ্কার।

এভাবে বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছে শত শত কেজি জব্দকৃত সোনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন শর্তারোপের ফলে কাস্টমস, বিজিবিসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এখন তাদের নিজেদের হেফাজতেই জব্দকৃত সোনা গচ্ছিত রাখছে। ফলে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি যশোরের বেনাপোল কাস্টমস হাউসের লকার থেকে সোনা চুরি হয়েছে। গত ৮ থেকে ১০ নভেম্বর বেনাপোল কাস্টমসের গুদাম থেকে ১৯ কেজি ৩৮৫ গ্রাম স্বর্ণ চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ওই গুদামে মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জন্য কোনো ভল্ট ছিল না। দুর্বৃত্তরা বিকল্প চাবি দিয়ে তালা খুলে স্বর্ণ চুরি করে। ওই ঘটনায় ৫ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসবি/এসএএম/এস