আজ ইসলামপুর মুক্ত দিবস

.ঢাকা, শুক্রবার   ২৬ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১২ ১৪২৬,   ২০ শা'বান ১৪৪০

আজ ইসলামপুর মুক্ত দিবস

জামালপুর প্রতিনিধি

 প্রকাশিত: ১১:৩৭ ৭ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১২:৫১ ৭ ডিসেম্বর ২০১৮

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আজ ইসলামপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে জামালপুরের ইসলামপুরের মাটি পাকহানাদার মুক্ত হয়েছে। 

হাজার মুক্তিকামী ছাত্রজনতা আনন্দ উল্লাসের মধ্যে দিয়ে থানা চত্বরে জালাল কোম্পানীর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন স্বাধীনতার প্রথম বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন।

মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত হোসেন স্বাধীন বলেন, ডিসেম্বর আসলেই মনটা ফিরে যায় সেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। বিশাল জনসমুদ্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কণ্ঠে ঘোষিত হয় বাঙ্গালী জাতির বঞ্চনার ২৩ বছরের ইতিহাস।

উপজেলার উত্তর দরিয়াবাদ ফকিরপাড়ার সন্তান জালাল কোম্পানী কমান্ডার বীর সন্তান শাহ্ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ইসলামপুরসহ বিভিন্ন থানার সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা মুজাহিদ বাহিনীর শতাধিক সদস্য সংগঠিত হয়।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে কমান্ডার আশরাফ ও শাহ্ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে শতাধিক মুজাহিদ সদস্যদের নিয়ে জামালপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

১৯ মার্চ জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহ করে ময়মনসিংহে অবস্থানকারী সেক্টর কমান্ডার এস.ফোর্সের অধিনায়ক বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন হাকিমের তত্ত্বাবধানে টাঙ্গাইলের মধুপুরে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ১ এপ্রিল হতে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিরোধ ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। 

পাক হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল, মধুপুর হতে জামালপুর পর্যন্ত সব প্রতিরোধ ভেঙে ২২ এপ্রিল জামালপুর দখল করে নেয়। ২৭ এপ্রিল ইসলামপুর থানাও দখল করে নেয়। ইসলামপুর থানার রাজাকারদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

এরপর শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইল প্রতিরোধ যুদ্ধ থেকে ফেরত কিছু সংখ্যক মুজাহিদ সদস্য ও অন্যান্য পেশার লোকজনদের নিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে মহেন্দ্রগঞ্জে প্রাথমিক রিক্রুট মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগদান করেন।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ইনচার্জ করিমুজ্জামান তালুকদার এমএনএ, রাশেদ মোশারফ এমপিএ, আশরাফ হোসেন এমপির নির্দেশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পাকহানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন।

অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্য মতিউর রহমান মতি, গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আনোয়ার হোসেন, শাহাদত  হোসেন মজির উদ্দিন আহমেদ, শ্রী পরিমল সেন (নারু বাবু), আ. গণি সর্দার, ইদ্রিস আলী বাহাদুর, ও স্কাউট লিডার শ্রী সুভাষ চন্দ্র দাস বিভিন্ন পেশার মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

ভারতের মহন্দেগঞ্জে রিক্রুটিং প্রশিক্ষণ শিবিরে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অবস্থান করা হয়। বাছাইকৃত লোকদের তুরাসহ অন্যান্য স্থানে ভারতীর সামরিক বাহিনীর অধীনে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠনো হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে তারা বিভিন্ন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১২ আগস্ট কর্ণেল আবু তাহের সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগদান করেন।

এ সময় ১১নং সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন পেশার  লোকজনদের নিয়ে জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি  কোম্পানী গঠন করা হয়। সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক ওই কোম্পানীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ইসলামপুর থানাধীন সিরাজাবাদ এলাকার বহ্ম্রপুত্র নদীর পাড়ে মাদারি ছন আখ  ক্ষেতে নামক স্থানে একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

সেখানে থ্রিউরিক্যাল ও  প্রেক্টিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রদানসহ গেরিলা যুদ্ধ চালানো হয়। জালালের নাম অনুসারে জালাল বাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিদিন জালাল বাহিনী নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের স্থাপনা আক্রমন করেন। কমান্ডার জালাল উদ্দিন,  আলাউদ্দিন জোদ্দার, মমতাজ উদ্দিন,  জয়নাল আবেদীন, এসএম কুদ্দুছ, নাগর আলী  সুলতান মাহমুদসহ আমাদের পুরস্কৃত করেন।

মুক্তিযোদ্ধের চুড়ান্ত পর্যায়ে জালাল বাহিনী ইসলামপুরের পাকহানাদার বাহিনী ক্যাম্প দখলে প্রস্তুতির উদেশ্যে ৬ ডিসেম্বর দুপুর পলবান্ধা ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর পাইমারি স্কুল মাঠ সংলগ্ন ইসলামপুর সিরাজাবাদ রোডে অবস্থান নেয়।

মুক্তিযোদ্ধারা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে ১ প্লাটুন থানা পরিষদের উত্তরপশ্চিম কর্ণারে ঋষিপাড়া  রেলক্রসিং এলাকা ২নং প্লাটুনকে সর্দারপাড়া খেয়াঘাট সংগলœ ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণপাড় ইসলামপুর টু সিরাজাবাদ রোড এলাকায় ৩নং প্লাটুনকে থানার পূর্বপাশে পাকামুড়ি মোড় বর্তমানে ইসলামপুর হাসপাতাল সংলগ্ন রোডে এবং ৪নং রিজার্ভ প্লাটুনকে পশ্চিম বাহাদুরপুর প্রাইমারি স্কুলের উত্তরে অবস্থান নেয়।

ওইদিন দুপুর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত একটানা যুদ্ধ হয়। হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাগুলির দাপটে টিকতে না পেরে স্পেশাল ট্রেনযোগে জামালপুরের দিকে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঝিনাই ব্রিজসহ তিনটি রেল ব্রিজ ধ্বংস করে জামালপুর পর্যন্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

এরপর ৭ ডিসেম্বর সকালে থানা প্রশাসন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মজির উদ্দিন আহমেদ, গণি সরদার, টুআইসি আলাউদ্দিন জোয়ার্দার, প্লাটুন কমান্ডার শাহাদত হোসেন স্বাধীন ও হাজারো মুক্তিকামী ছাত্রজনতা আনন্দ উল্লাসের মধ্যে দিয়ে থানা চত্ত্বরে জালাল কোম্পানীর কমান্ডার শাহ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন স্বাধীনতার প্রথম বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। সেই সঙ্গে ইসলামপুরের মাটি শত্রুমুক্ত হয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস