Alexa আজিজ বোর্ডিংয়ের সেই ভবঘুরে আজকের ‘গুরু’

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৬ ১৪২৬,   ২২ সফর ১৪৪১

Akash

আজিজ বোর্ডিংয়ের সেই ভবঘুরে আজকের ‘গুরু’

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৫১ ২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১২:০১ ২ অক্টোবর ২০১৯

১৯৯২ সালের এক কনসার্টে জেমস

১৯৯২ সালের এক কনসার্টে জেমস

কি কথা, কি সুর, কি কণ্ঠ! কি জাদু! সেই শুরু! নগরবাউলের জন্মদিনে এভাবেই তাকে শুভেচ্ছা জানালেন এক ভক্ত। দেশ-বিদেশে জেমসের কত-শত ‘পাগলাটে’ ভক্ত আছে তা গোনা অসম্ভব। আজিজ বোর্ডিংয়ের সেই ভবঘুরে ছেলেটির ‘গুরু’ বনে যাওয়া নিচকই একটি গল্প নয়। তার শূণ্য থেকে নগরবাউল হওয়ার গল্পটা কাউকে কাউকে অবাক করে, কারো বা অনুপ্রেরণার একমাত্র গদ্য! তার ৫৫ বছরের জীবনী না জেনেও স্বকীয় গায়কির কারণে অন্ধ ভক্ত হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও অগণিত। তারা শুধু জানেন, জেমস তো জেমসই। তার গানের কথায় ভিন্নতা ও কাব্যধর্মী শব্দের আধিক্য যে আর কারো মাঝে নেই।

বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় বাবার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াতে হতো। বাবা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারমান হলেন আর তাকেও থাকতে হলো চট্টগ্রামে সেখান থেকে মাথায় উঁকি দিল নতুন পাগলামি। জেমসের পাগলামোটা যখন শুরু আশির দশকের একেবারে শুরুতে, চট্টগ্রামে। বাবা যখন ঢাকা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ডিরেক্টর জেনারেল হয়ে চলে আসেন রাজধানীতে, জেমস থেকে যান চট্টগ্রামে। তার বাবাও জানতেন এমন ভবঘুরে ছেলেকে দিয়ে আর যাই হোক, পড়ালেখা হবেনা। চট্টগ্রামে থেকে যেতে তাই তিনিও ‘না’ করেননি।

আরো পড়ুন: শুভ জন্মদিন নগরবাউল জেমস

আজিজ বোর্ডিং এর ‘বারো বাই বারো’র একটি ছোট্ট রুমে চলে সংগ্রামী জীবন। সামনের একটা রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া আর সন্ধ্যায় চলে যেতেন আগ্রাবাদের হোটেলে। কিন্তু আসল কাজটাই করতেন না! ক্লাসে মন নেই, পড়ালেখায় তীব্র অনীহা, পরীক্ষার আগের রাতে বন্ধুর বাসায় লুকিয়ে রাখা গিটার নিয়ে গান গাইতে ছুটে যাওয়া। কখনো কখনো গান-বাজটা করতে নাইট ক্লাবে।

এসব বাউণ্ডুলে রুটিনের কথা শুনে মেজাজী ওই ভদ্রলোক রাগের মাথায় ছেলেকে বকাবকি করলেন ইচ্ছেমতো! তাতে ছেলে যে বাবার ওপর খুব অভিমান করেছিল, এমনটা বলা যাবে না। বাবা জানতেন না, অনেকগুলো বছর পরে, ছেলেটা তখন পরিপূর্ণ যুবক, দেশের কোটি মানুষ তাকে চিনবে, গিটারে ঝংকার তুলে সে গাইবে- ‘বাবা কতদিন কতদিন দেখি না তোমায়!’

ক্যারিয়ারের শুরু দিকে ঢাকার ফকিরেরপুলে জেমস ও তার বন্ধুরা

বাবাকে কখনো সেই গানটা শোনাতে পারেননি জেমস, বাবা ততদিনে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ‘ফিলিংস’ নামের একটা ব্যান্ডের হয়ে পারফর্ম করতেন তখন। আজিজ বোর্ডিং-এর সেই কামরায় তাদের কত বিনিদ্র রাত কেটেছে শুধু গান তৈরির নেশায়। বোর্ডিঙের বারো ফিট বাই বারো ফিটের ছোট্ট একটা কামরায় চাষবাস হতো গানের, সেখানেই জন্ম হতে লাগলো বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজনের।

প্রথম দিনে নিজেদের কোনো গান ছিল না। ইংরেজি গানগুলোর কভারই করতেন সেসময়ে। এক একপর্যায়ে বুঝতে পারলেন, প্রতিষ্ঠিত হতে হলে মৌলিক গানের উপরে জোর দিতে হবে। নিজের ব্যান্ড দলের একক অ্যালবাম করার জন্য ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন জেমস ও তার বন্ধুরা। পরের বছরেই বের করেন নিজেদের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। এই অ্যালবামের সবগুলো গানের সুর জেমস নিজেই করেছিলেন। ব্যবসায়িকভাবে অ্যালবামটি সফল না হলেও নিজের মৌলিক কন্ঠ দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন এই শিল্পী।

জেমসের প্রথম একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ প্রকাশ হয় ১৯৮৮ সালে। সেটা সাড়া পেলেও খুব আহামরি নয়। ফিলিংস এর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জেল থেকে বলছি’র মাধ্যমেই প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ফাঁসির এক আসামীর শেষ দিনগুলো নিয়ে অসাধারণ এক গান ছিল জেল থেকে বলছি  গানটি। এই একটি গানের মাধ্যমে সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তিনি। নন মেটালিক গানগুলো যে এত জনপ্রিয়তা পাবে, সেটা ভাবেনি কেউই। জেনে রাখা ভালো, সাইকিডেলিক রক ধরনের গান শুরু করার পর থেকেই জেমস কিছুটা উচ্চস্বরে গান গাইতে শুরু করেন। বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসে জেমসই প্রথম এই ধরনের গান শুরু করেন।

১৯৯৫ সালে এল ‘প্রিয় আকাশী’, এই গানটা ছিল সেই সময়ের তরুণদের কাছে নেশার আরেক নাম। এরপরের গল্পটা এগিয়ে যাওয়ার, একটার পর একটা হিট গান উপহার দেয়ার, নতুন নতুন মাইলফলক তৈরি করার। ‘মীরা বাঈ’, ‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে’, ‘যদি কখনও ভুল হয়ে যায়’ ‘মা’, ‘বাবা’ কিংবা ‘ফুল নেবে না অশ্রু নেবে বন্ধু’, ‘বাংলাদেশ’ অথবা লাকী আখন্দের লেখা ও সুরে ‘লিখতে পারি না কোন গান’- এসবে তখনো এবং এখনো বুঁদ হয়ে আছে তরুণ প্রজন্ম।

নব্বইয়ের দশকে ফিলিংসের সদস্যদের সঙ্গে জেমস

যখন তিনি সাফল্যে শীর্ষপথের ধারে তখনই নিজেদেরকে বিশুদ্ধবাদী দাবি করা একদল বলতে শুরু করল, ব্যান্ডসঙ্গীতের নামে জেমস বাংলা গানের ধরণটাকেই নষ্ট করে দিচ্ছেন! তাদের জন্যেই সম্ভবত তিনি নিয়ে এলেন ‘মান্নান মিয়ার তিতাস মলম’ অথবা শামসুর রাহমানের ‘সুন্দরীতমা’ কবিতা থেকে- ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’, এই এক গানেই ভেসে গেল সমালোচনার বালির বাঁধ। এর মাঝে ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ দিয়ে সবাইকে মাতালেন আবার।

১৯৯৬ সালে নগর বাউল  নামে একটি অ্যালবাম বের করে জেমসের ব্যান্ড দল ফিলিংস। তার ক্যারিয়ার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায় ১৯৯৭ সালে। এ বছর বের হওয়া ‘দুখিনী দুঃখ করো না’ একক অ্যালবামটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এই গানটি এতটাই শ্রোতাপ্রিয়তা পায় যে ব্যান্ড বলতে যাদের নাক সিঁটকে যেত সেই মুরব্বিরাও মনোযোগ দিয়ে শুনলেন গানটি! প্রেমিক-প্রেমিকাদের মনে জেমস স্থান করে নেয়, স্থান করে নেয় পাড়ার রকের আড্ডাবাজদের মনে। অনেকেই বলেন এই অ্যালবামের ‘যদি কখনও ভুল হয়ে যায়’ গানটি জেমস এর সর্বকালের সেরা একটি গান কেন না এই গানে জেমস এর আবেগ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কোনো মানুষ এর চোখে জল আনতে বাধ্য করতো।

‘লেইস ফিতা লেইস' অ্যালবামটি ব্যানারে সর্বশেষ অ্যালবাম। এই অ্যালবামের ‘সিনায় সিনায় লাগে টান’ গানটা শ্রোতাদের হৃদয়ের খুব গভীরে পৌঁছেছে। সেই সময়ের সেরা সব গীতিকার- লতিফুল ইসলাম শিবলী, বাপ্পি খান, দেহলভি, আনন্দ, তরুণ, মারজুক রাসেল, গোলাম মোরশেদ, প্রিন্স মাহমুদ ও জুয়েল-বাবুদের জেমস এর জন্য আলাদা ভাবে গান লিখতে হতো। কেননা জেমসের গানটা শুধুমাত্র সুর নির্ভর নয় তারচেয়ে বহুগুণ বেশি কথা নির্ভর।

২০০০ সালে আরেক ইতিহাসের অংশ হন জেমস। বাংলা সঙ্গীতের রাজপুত্র প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে ব্যান্ড সঙ্গীতের আরেক লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুর সাথে পিয়ানো নামের একটি ডুয়েট অ্যালবাম সেই বছরের ডিসেম্বরে মুক্তি পায়। বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসে সেরা ডুয়েট অ্যালবামগুলোর তালিকা করলে একদম উপরের দিকেই এই অ্যালবামটি থাকবে। আইয়ুব বাচ্চুর দুনিয়া, তাজমহল গানগুলোর সঙ্গে গুরু জেমসের বাংলাদেশ, এক নদী যমুনা, তুমি জানলে না গানগুলো এই অ্যালবামেরই ছিল।

এই সময়ের জেমস

শহুরে সন্ধ্যার আড্ডা থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রামীণ হাটেও বাজতে থাকে তার গান। সহজ ভাষায় গানের গল্পগুলো শুনিয়েছেন তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে। কখনো ফাঁসির আসামীর কনডেম সেলে মৃত্যুর দিন গোনার গল্প আবার কখনো একপাশে জমিয়ে রাখা অশ্রু, দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতির হাত থেকে পালিয়ে থাকার গল্প। জেমসের ভরাট গলা শুনেই প্রেমিকেরা তাদের সুন্দরীতমাকে আকাশ বিলিয়ে দেয়, ভার্সিটির হলগুলোর ছাদে কেউবা চিৎকার করে জানান দেয়, ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার’।

লম্বা কোঁকড়ানো চুল নিয়ে গিটার হাতে যেই মানুষটা মঞ্চে উঠেন তখন বুঝতে বাকি থাকেনা বাংলাদেশে পুরোনো থেকে উঠতি যত ব্যান্ড আছে এদের মাঝে জেমস যেন এখনো এক অনন্য উচ্চতায়। জেমস মানেই যেন অন্য গ্রহের কেউ একজন। নগর বাউলের গান আমাদের হাসায়, কাঁদায়, নতুন উদ্যমে বাঁচতে শেখায়। তাই তো এখনো জেমসের জন্মদিনে শহর ছেয়ে যায় ভালোবাসায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে