আজব গুহা নগরী কাপাডোশিয়া

ঢাকা, বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৭,   ১২ সফর ১৪৪২

আজব গুহা নগরী কাপাডোশিয়া

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৫ ৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৭:০৩ ৫ আগস্ট ২০২০

কাপাডোশিয়ার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে এখানকার উইপোকার ডিবির মতো গুহাগুলো। ছবি: সংগৃহীত

কাপাডোশিয়ার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে এখানকার উইপোকার ডিবির মতো গুহাগুলো। ছবি: সংগৃহীত

কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী টিকে আছে অপার বিস্ময় নিয়ে। যার অনেক কিছুই এখনো রহস্যের জালে আবৃত। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। কিছু জায়গা দেখলে মনে হবে যেন শিল্পীর তুলির আঁচড়ে আঁকা। তেমনি তুরস্কের আনাতোলিয়ার একটি অঞ্চল কাপাডোশিয়া। যেন কেউ মনের ইচ্ছায় রং ঢেলে সাজিয়েছে এই শহরটিকে। এটি পূর্ব-মধ্য আনাতোলিয়ার প্রাচীন জেলা। বর্তমানে তুরস্কের কেন্দ্রে বৃষ পর্বতমালার উত্তরে মালভূমির উপরে অবস্থিত এটি।

এমনিতেই তুরস্ক ঝকঝকে সুন্দর এক দেশ। তবে কাপাডোশিয়ার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে এখানকার উইপোকার  ডিবির মতো গুহাগুলো। এগুলো দেখলে মনে হবে আপনি হয়তো পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে আছেন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। এই গুহাগুলো তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই। পৃথিবীর কোথাও এমন ভূমিরূপ দ্বিতীয়টি নেই। আর তাই এই অঞ্চলের  গোরমে ন্যাশনাল পার্ক  এবং কাপাডোশিয়া রক সাইড বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থানের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

কাপাডোশিয়া হচ্ছে আজব এই প্রাকৃতিক নগর; যা প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকালে অগ্লুতপাতের কারণে এখানকার বিস্তৃর্ন অঞ্চল আগ্নেয়গিরির ছাই দিয়ে ঢেকে যায়। লাখ লাখ বছর ধরে এই ছাই থেকে তৈরি হয় এক ধরনের পাথর। যাকে বলা হয় টাফ। এই পাথর তুলনামূলক অনেক নরম থাকে। তাই এই পাথর খোদাই করতে তেমন বেগ পেতে হয় না। খুব সহজেই খোদাই করে তৈরি করা যায় যেকোনো কিছু। কাপাডোশিয়ার গোরমে উপত্যকা বাতাস এবং পানিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অদ্ভূত রূপ ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে মানুষের শৈল্পিক দক্ষতা একে করেছে নান্দনিক।

কাপাডোশিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে পর্যটকদের। ছবি: সংগৃহীত

বিশাল আকৃতির কোণ, মাশরুম, পিলার বা চিমনির আকৃতির এসব গুহা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি। এগুলোর মধ্যে আছে ফেইরি চিমনি। লোকমুখে প্রচলিত আছে অতীতে পাতাল রাজ্যের পরীরা এখানে বসবাস করত। তাই এই আকৃতির পাথরগুলোর নাম হয়েছে ফেইরি চিমনি। এসব চিমনি একেকটি প্রায় ১৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক এসব পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে সুড়ঙ্গ।

এখন থেকে প্রায় ১৬০০ বছর পূর্বে খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতাব্দীতে মানুষ এসব পাথরের গুহায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। শুধু তাইই নয়, মাটির নিচে আন্তঃসংযোগ একাধিক ঘর, গির্জা, সুড়ঙ্গ, লাইব্রেরিসহ পুরো এক শহর তৈরি করেছে তারা। মাটির নিচের এই শহরে মানুষের বসবাসের ঘর, উপাসনালয় ছাড়াও রয়েছে গৃহপালিত পশুর আস্তাবল।

মাটির নিচের এই শহর আটতলা পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এখন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে মাত্র তিন থেকে চারতলা। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ থেকে ১২০০ সালের মধ্যে হিট্টিয়দের সময় থেকে গোরমে উপত্যকায় মানুষের বসবাস ছিল বলে ধারণা করা হয়। দীর্ঘদিন এই উপত্যকার বাসিন্দারা দুইটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় বসবাস করছেন। প্রথমে এই অঞ্চল ছিল গ্রিক ও পারস্যের সীমান্ত। এরপর হয় বার্জেন্টাইন ও গ্রিকদের সীমান্ত এলাকা। সাম্রাজ্যগুলোর সক্রিয় দ্বন্দ্বের সময় স্থানীয়দের নিরাপদ লুকানোর জায়গার প্রয়োজন ছিল। সেই জন্যই মূলত এই গুহাগুলোতে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে থাকে। এভাবেই একসময় এই সুড়ঙ্গগুলো থেকে পরিপূর্ণ এক শহরে রূপ নেয় পাথরের গুহাগুলো।

গুহাগুলো দেখলে মনে হবে আপনি হয়তো পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে আছেন। ছবি: সংগৃহীত

চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের উপর চরম নির্যাতন করা হত। তখন রোম থেকে পালিয়ে এখানে বহু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করতে শুরু করে। তারা গড়ে তোলে ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়। এসব গুহার ভেতরের গির্জায় সপ্তম শতাব্দীতে আঁকা গুহাচিত্র তারই প্রমাণ দেয়। রূপকথার এই রাজ্য শুধু ঐতিহাসিক আলামত হয়। বর্তমানে বহু লোক এসব গুহায় বসবাস করছেন। কিছু কিছু গুহাকে শুধু বাড়ি বললে ভুলই হবে। রীতিমতো প্রাসাদে রূপ নিয়েছে মানুষের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায়। কোনোটিতে আবার পুরোদস্তুর রেস্তোরাঁও আছে।  

কাপাডোশিয়ার গোরমে শহরই পর্যটকদের মূল আকর্ষণের জায়গা। তবে এই অঞ্চলে আরো বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। নেভশেহির, আভানোস, উরগুপ, উছিছার ভিলেজ, কাভুসান ভিলেজ এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও এই শহরে আছে বিশাল এক উন্মুক্ত জাদুঘর। এর নাম জেলভে ওপেন এয়ার মিউজিয়াম। এই এলাকার মানুষেরা কতোটা ধর্মপরায়ণ ছিল। তার প্রমাণ মেলে এখানকার গির্জাগুলো দেখলে। অসংখ্য গির্জা তারা তৈরি করেছিল।

শুধুমাত্র এই জাদুঘরের মধ্যেই আছে আটটি গির্জা। আর এসব গির্জা তারা তৈরি করেছে পাথর কেটে এবং সজ্জিত করেছে নানা গুহাচিত্র দিয়ে। এমন বিস্তৃত আর উন্মুক্ত জাদুঘর পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। সমগ্র আনাতোলিয়া জুড়ে এমন আর ২০টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। তবে শুধু গোরমে উপত্যকায়ই আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সমৃদ্ধ মানব ইতিহাস। বিস্তৃর্ন এই অঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বেলুন। কাপাডোশিয়ার হট এয়ার বেলুন পৃথিবী বিখ্যাত। বেলুনে করে ভেসে ভেসে ই পরাবাস্তব দৃশ্য দেখতে বছরে হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় জমান।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে