আগ্নেয়গিরির মজাদার কিন্তু ভয়ংকর তথ্য (দ্বিতীয় পর্ব)

.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১০ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

আগ্নেয়গিরির মজাদার কিন্তু ভয়ংকর তথ্য (দ্বিতীয় পর্ব)

সিফাত সোহা

 প্রকাশিত: ১৩:১৩ ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৩:১৮ ৯ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আগ্নেয়গিরির মজাদার কিন্তু ভয়ংকর কিছু তথ্য নিয়ে এরইমধ্যে আমরা প্রথম পর্বে আলোচনা করেছি। আমাদের খোঁজ সেখানে শেষ হয়নি। আরো কিছু চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে ফের এসেছি আমরা।  

প্রশান্ত মহাসাগরে গভীরে কাবাচি ভল্কানোর আশেপাশের ৪৫ মিটারের গভীরতায় বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছে এমন কিছু যা রীতিমত চমকে দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে পাড়ি দেয়ার সময় ন্যাশনাল জিওগ্রাফি টিমের কিছু মেম্বাররা উদ্দোগ নেয় কাবাচি আশেপাশের দৃশ্যকে নিজের চোখে দেখার। আর কেনইবা হবে না ২০০৩ সালে এই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের দরুনে তৈরি হয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্রে আইল্যান্ড বা ভূখণ্ড। একটি আন্ডার ওয়াটার ডিপ ডাইপ সাবমারসাব্লকে সমুদ্রস্তর থেকে ১৭ তালা বিল্ডিং এর সমান গভীরতায় পাঠায় তারা। কাবাচি আগ্নিয়গিরির আশেপাশে দৃশ্যকে রেকর্ড করার জন্য। ধরা পড়ে এমন কিছু দৃশ্য যা রীতিমত চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। 

অবাক হতে হয় এটা জেনে যে, সমুদ্রের এই গভীরতা এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব কোনোভাবেই সম্ভব না সেখানে কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল বৃহৎ আকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ? জেলিফিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির সমাবেশ সমুদ্রের এই গভীরতায়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন একটি দৃশ্য এক নতুন দিশার উন্মোচন করে। বিজ্ঞানীদের চিন্তা ভাবনারও বাইরে ছিল কিভাবে এমন অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব। তারা অবাক হয় এটা জেনে যে কিভাবে এমন উত্তপ্ত এসিডিক পানির মধ্যে এই সমস্ত জলজ প্রাণীরা নির্ভয়ে সাতার কেটে যাচ্ছে এমনকি বসবাস করছে রীতিমত তারা সেখানে। 

শুধুমাত্র কি তাই? এই প্রক্রিয়ার দরুন তারা খুঁজে পায় পানির এমন গভীরতায় অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে অসম্ভবভাবে বিভিন্ন প্রজাতির সার্ক বা হাঙ্গর। এই খোঁজ তাদেরকে রীতিমত হতভম্ব করে দেয়। পানির এমন এক পরিবেশে যেখানে খুব বেশি হলে এককোষী বাক্টেরিয়ারা বেঁচে থাকতে পারে, সেখানে কিভাবে সার্ক এর মতন কমপ্লেক্স ডিএনএ স্টাকচার এর প্রাণীর অস্তিত্ব সম্ভব। এবার যদি আমরা একটু ভেবে দেখার করে যে এইরকম অনন্ত বিস্তৃত  সমুদ্রের মধ্যে কেন সমস্ত জলজ প্রাণীরা এই স্থানটিকে বেছে নিলো। তাহলে সত্যিই হয়তো তার কোনো সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু একটু অন্যরকমভাবে ভেবে দেখলে আমরা বুঝতে পারব যে, ভাবেই হোক না কেন কোন রকমভাবেই এই সমন্ত জলজ প্রাণীর এরকম একটি জলীয় পরিবেশের মধ্যে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং এভাবে তারা হয়ে উঠেছে এখানকার জলিয় পরিবেশের রাজা। 

আরও পড়ুন>>> আগ্নেয়গিরির মজাদার কিন্তু ভয়ংকর তথ্য (প্রথম পর্ব)

দৈনন্দিন জীবনে তাদের বেঁচে থাকার জন্য যে সমস্ত ভাইটাল বা গুরুত্বপূর্ণ উপায় দরকার সেগুলো এখানে বহুমাত্রায় অবস্থিত। যদি নিজেদেরকে এখানে মানিয়ে নেয়া যায় তাহলে বেঁচে থাকার মত আর কোনো অসুবিধে তাদের এখানে হতে পারে না। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো এই প্রাণীরা বসবাস করছে একটি অগ্নি চুড়ার আশেপাশে। মাত্র এক সেকেন্ড লাগবে একবার এই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ এবং এখানকার সমস্ত জলীয় প্রাণিদের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে যাবে। ছোট ছোট এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে জেলিফিশ থেকে বৃহৎ আকার মাছ থেকে বড় বড় সার্ক কেউই এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে না। 

হয়তো এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভবনার ব্যাপারে এখানকার সামুদ্রিক জীবেরা অবগত। কোনো রকমভাবে তাদের মধ্যে বিবর্তন হয়ে উঠেছে যার দরুন তারা অসম্ভব পরিবেশের মধ্যেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। কিন্তু এই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ থেকে তাদের বেঁচে ফেরা কোনোমতেই সম্ভব না। আর যদি সত্যি এটা হয় তবে সেটা আমাদের প্রকৃতির জন্য বায়োলজিক্যাল ডিস্টারবেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ রকম একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় সত্যিই কি পৃথিবীকে প্রাণহীন একটি প্ল্যানেটে পরিণত করতে পারে? বিশ্বাস করুন বা নাই করুন ভল্কানো বা সুপার ভল্কানো বা আগ্নিয়গিরি এই রকম একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের জন্য তৈরি করতে পারে। 

এই বিষয়ে পুনরায় কথা বলতে গেলে নিঃসন্দেহে সবথেকে প্রথমে না মাসে উত্তর আমেরিকার এক অতি জনপ্রিয় স্থান ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্ক। নর্থ অ্যামেরিকার জনপ্রিয় স্থান গুলির মধ্যে এটি অন্যতম। এখানকার অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ওয়াইল্ড লাইফ যে কাউকে মুগ্ধ করতে পারে। কিন্তু জানেন কি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক স্বর্গ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রীতিমতো ধুলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। নর্থ আমেরিকার ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কের অধিকাংশ স্থানই একটি বিশাল আকার ফুটন্ত নিষ্ক্রিয় আগ্নিয়গিরির উপর অবস্থিত। এটি রীতিমতো একটি সুপার ভল্কান যা যে কোন মুহূর্তে জেগে উঠতে পারে। যা ১৭০০ স্কয়ার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত, ৪৪০০ স্কয়ার কিলোমিটার। অনুমানের খাতিরে উদাহরন স্বরূপ ধরে নেয়া যায় যে চারশো কুড়ি হাজার ফুটবল মাঠের সমান এর আকার। কিন্তু পৃথিবীর বুকে বিরাজমান এই বিশালাকার অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক স্থানটির খোঁজ খুব একটা পুরনো না। 

স্যাটেলাইট ফটোগ্রাফির মাধ্যমে এই স্থানটি খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আসল সত্যি হল এই স্থানটিকে একটি ফুটন্ত পানির ম্যাগমার বোতলের সাথে তুলনা করা যায়। যেখানেই উত্তপ্ত ফুটন্ত ম্যাগমা ভূ-স্তর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার নিচে আছে। যার ফুটন্ত তাপমাত্রা ১৫০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ৮১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এবার যদি আমরা ভল্কানোলজিস্টদের কথা শুনে থাকি এই অভূতপূর্ব সুন্দর স্থানটির খোঁজ উল্লেখযোগ্য, কিন্তু কি হবে যদি এই বিশাল আকার নিষ্ক্রিয় আগ্নিয়গিরি একদিন হঠাৎ করে জেগে উঠে? নিঃসন্দেহে মুহূর্তের মধ্যে পুরো পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে চলে আসবে। ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কের এই সুপার ভল্কান ফারদার স্টাডি করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছে এর আগেও অতীতে এই স্থানে বহুবার আগ্নিয়গিরির বিস্ফোরণ হয়েছে।

আজ থেকে কয়েক মিলিয়ন বছর আগেকার কথা যখন ওই স্থানে হয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ এর দরুন ৯০ শতাংশ স্থান কালো ধুয়াতে ধেকে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। বর্তমান সময়ে এই ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্ক পৃথিবীতে মনুষ্য জাতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি আশঙ্কার বিষয় তাই এখানে থাকা যেকোনো ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয় আসলে আশঙ্কার বিষয়। তাই এই স্থানকে ঘিরে রয়েছে বহু বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। যারা প্রত্যেকটি মুহূর্তে এই স্থানটিতে ঘটে থাকা প্রতিটি আক্টিভিটিসকে খুব কাছে থেকে মনিটর করছে। এখানে ঘটে থাকা যেকোনো ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর আসংকার বিষয় পুরো পৃথিবীতে মাবন জাতির সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। এই উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানীরা নর্থ আমেরিকার ইয়োলো স্টোন ন্যাশনাল পার্কের অতিত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে ভালোভাবে স্টাডি করছে। 

এই বিষয়ে পুনরায় স্টাডি করে এখানে ঘটে থাকা আগ্নিয়গিরির বিস্ফোরণগুলোর মধ্যেকার ইন্টারভেলের সময় জানা গেছে এখানে বিস্ফোরণ হয় আজ থেকে দুই মিলিয়ন বছর আগে। তারপরে ওয়ান পয়েন্ট থ্রি মিলিয়ন বছর আগে। আর খুব  রিসেন্টলি ছয়'শ হাজার বছর আগে। অ্যামেরিকান জিওলসিস্টরা এই ধারণাকে আগে নিয়ে গিয়ে কল্পনা করছে আজ থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে এই ফুটন্ত নিষ্ক্রিয় সুপার ভল্কানো জেগে উঠবে না। কিন্তু রিসেন্টলি এখানে ঘটে থাকা কিছু ঘটনা দরুণ বিজ্ঞানীদের এই ক্যালকুলেশনের মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে। সামনে এসেছে নতুন একটি তারিখ, নতুন একটি দিন। যখন প্রাকৃতিক দানব জেগে উঠবে এবং সমগ্র মানবজাতিকে ডুবিয়ে নিয়ে যাবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ