আকাশের তারকারাজির মাঝে খচিত প্রাচীন গল্পগাঁথা

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

আকাশের তারকারাজির মাঝে খচিত প্রাচীন গল্পগাঁথা

 প্রকাশিত: ১৪:১৫ ১৮ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১৪:২৭ ১৮ জুলাই ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

যুগ যুগান্তর হতে রাতের আকাশ মানুষকে করেছে বিমোহিত, করেছে ভাবালু, স্বপ্নাতুর। তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মানুষের মনে এসেছে বিচিত্র সব খেয়াল, কষতে হয়েছে নানা হিসাব। প্রাচীন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভবিষ্যদ্বাণী এসেছে এই রাতের আকাশের তারা দেখতে দেখতেই। লিটল ডগস, হান্টার্স, স্করপিয়ন এমনকি আরও নানা পৌরাণিক প্রাণীর নাম এবং তাদের অবয়ব নাকি দেখা যায় আকাশের তারাদের ছোটাছুটির মাঝে। দিগন্ত বিস্তৃত এসব ঝিকমিক করতে থাকা তারাদের নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গল্প, নানা প্রাচীন কাহিনী। এদের কিছু কিছু আবার মানুষের মনে করেছে ভয়ের সঞ্চার। এমনই কিছু পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে আজকের আয়োজন, যেখানে প্রাচীন মানুষ আকাশের এই তারাদের সম্পর্কে রেখে গিয়েছিল বিচিত্র সব গল্পের সম্ভারঃ

তিয়ামাত এবং তার ভয়ানক বাচ্চারাঃ

প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পুরাণ অনুযায়ী, রাতের আকাশের দিকে তাকালে মহান ড্রাগন তিয়ামাতের শরীরের আদ্দেকাংশ নাকি জ্বলজ্বল করতে দেখা যায়। পৃথিবীর প্রথম স্বর্গীয় অংশ হিসেবে প্রথমে এসেছিল তিয়ামাত (সাগর), আপসু (পরিষ্কার জল), মুম্মু (সাগর ও পরিষ্কার পানি থেকে তৈরি হওয়া ধোঁয়াটে অংশ)। তিয়ামাত ও আপসুর সন্তানের সংখ্যা ছিল সমান। তারাও ছিল স্বর্গেরই অংশ। তবে এই সন্তানেরা এতটাই ভয়ানক ছিল যে আপসু তিয়ামাতকে বলল এদের মেরে ফেলতে, তা না হলে পৃথিবীর বুকে সঞ্চারিত হবে অনাসৃষ্টি। নিজের বাচ্চাদের এভাবে হত্যা করতে মানা করে দিলো তিয়ামাত। আপসু নিজের স্ত্রী তিয়ামাতকে বাদ দিয়েই নিজের হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ব্রতী হলো। তবে ভাগ্যের পরিহাস, প্রথম সন্তান ইয়াকে হত্যা করবার আগেই পিতাকে খুন করে ফেলল সে। বাবা আপসুর স্মৃতির রক্ষার্থে একটি প্রাসাদ তৈরি করল ইয়া। এক দেবীকে বিয়ে করল সে। তাদের ঘরে সন্তান হিসেবে এল মারদুক, ঝড়ের দেবতা। খেপে গেল এবার তিয়ামাত। দেবতা কিঙ্গুর পরিচালনায় মারদুককে হত্যা করবার জন্য বিশাল একটি বাহিনী পাঠাল সে।

একে একে সবাই মারা পড়ল মারদুকের হাতে। বেঁচে রইল কেবল তিয়ামাত আর মারদুক। মারদুক নিজের নানীকে হত্যা করবার জন্য নানা ছলাকলার আয়োজন করল। বাতাসের সাহায্যে যেন নিজের মুখ না বন্ধ করতে পারে তিয়ামাত, সে ব্যবস্থা করল সে। এবার একটি তীরের সাহায্যে সহজেই হত্যা করে ফেলল। অর্ধেক অংশ আটকে রইল আকাশে। বাকি অর্ধেক অংশ থেকে যেন পৃথিবীর ওপর কোনো ধরনের সমস্যা তৈরি হতে না পারে, সেজন্য একটি প্রাসাদ তৈরি করে সুরক্ষিত করল মারদুক। ব্যাবিলনীয় পুরাকাহিনী অনুযায়ী মারদুক আর তিয়ামাতের ভয়াবহ এই যুদ্ধ নাকি আকাশের তারাদের মাঝে লেখা আছে। 

ডেলফিনাস দ্য ডলফিন- ডায়োনিসাস এবং জলদস্যুরাঃ

রাতের আকাশে দেখতে পাওয়া নক্ষত্ররাজির মাঝে অন্যতম ছোট হলো ডেলফিনাস দ্য ডলফিন। যদিও এটিকে স্পষ্টভাবে তেমন দেখা যায় না, তবে এর চারপাশে ঝিলমিল করতে থাকা অসংখ্য তারাদের জন্য এটিকে একটি বিশেষরূপে দেখতে পাওয়া যায়। যদিও এটাকে সবসময় ডলফিন নামে ডাকা হয় না। কেউ কেউ এটিকে ‘জব’স কফিন’ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। কেন, তার কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। একটি ডলফিন কীভাবে রাতের আকাশে ঠাই পেল, তা জানতে হলে আমাদের যেতে হবে প্রাচীন গ্রীসের পুরাকাহিনীর ডায়োনিসাসের সাথে। মরণশীল একজন মানুষ হিসেবেই ডায়োনিসাস সমুদ্রযাত্রা করেছিল। দেখতে অপূর্ব সুন্দর এই যুবককে আটক করে ফেলল টেরেনিয়ান কিছু জলদস্যু। হাতে কোনো টাকাপয়সা না থাকলেও দাস হিসেবে অপরুপ এই যুবককে বিক্রি করে দিলে প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে। সে হিসেব করেই জলদস্যুরা ডায়োনিসাসকে আটক করে ফেলল। কিন্তু দড়ি দিয়ে বাঁধার সাথে সাথেই দড়িটি পিছলে পড়ে গেল। জাহাজের একজন মাল্লা বুঝতে পারল যে এই যুবক কোনো মর্ত্যের মানুষ নয়, স্বর্গে তার আবাসন। বাকীদের সে কথাটিই বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগল সে। তবে কেউ তার কথায় কর্ণপাত করল না। এই যুবককে বিক্রি করলে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যাবে, সে চিন্তাতেই তারা ছিল আচ্ছন্ন। এবার প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেয়া শুরু করল। আকাশ থেকে বর্ষিত হতে শুরু করল ওয়াইন, জাহাজের চারপাশ জুড়ে বিষাক্ত লতানো গাছ বেয়ে উঠতে লাগল। জলদস্যুরা বুঝতে পারল কী ভুল করে বসেছে। তবে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। ডায়োনিসিস বিকটদর্শন একটি সিংহে রূপান্তরিত হলো।

তাকে উদ্ধার করতে চেয়েছিল জাহাজের যে মাল্লা, তাকে রেহাই দিলো শুধু। বাকী সবাইকে হত্যা করে গর্জন করতে শুরু করল তারস্বরে। কিছু কিছু জলদস্যু প্রাণে বাঁচতে প্রমত্তা সে সাগরে ঝাঁপ দিলো। ডায়োনিসিস তাদেরকে রুপান্তরিত করল ডলফিনে। রাতের আকাশে এই ডলফিনের একটি ছবি সেঁটে দিলো ডায়োনিসিস তারাদের মাধ্যমে। তবে ডায়োনিসিস সবাইকে খুন না করে পাগল বানিয়ে ফেলেছিল, এমনও একটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। সে গল্প অনুযায়ী, বাতাস জুড়ে বয়ে চলছিল সুরেলা ধ্বনি। অপার্থিব সে ধ্বনি শুনে জাহাজের সব জলদস্যু পাগল হয়ে গিয়েছিল। নাচ শুরু করে দিয়েছিল তারা। নাচতে নাচতে জাহাজের একদম কিনারে চলে গিয়েছিল তারা। ডায়োনিসিস এবার সিংহ, চিতাবাঘ, বড় বড় বনবেড়ালদের স্বর্গ থেকে ডেকে আনতে শুরু করল ভয় দেখাবার জন্য। জলদস্যুর দল ঝাঁপিয়ে পড়ল পানিতে। পা অদৃশ্য হয়ে গেল তাদের, সেখানে দেখা গেল ফিন। মাথা ধীরে ধীরে লম্বাটে হয়ে আকার নিল ডলফিনের। হাত অদৃশ্য হয়ে গেল, সেখানে দেখা দিলো পাখনা। এবার ডায়োজিনিস এই জলদস্যুদের শাস্তির কাহিনী মানুষের যাতে মনে থাকে, সেজন্য স্থান করে দিলেন রাতের আকাশে, তারাদের মাঝে।

ড্রাকো এন্ড দ্য ভার্জিন (রেভেলিশন)

উনিশ শতকের লেখিকা এলিজাবেথ ক্যাডি বাইবেলে বর্ণিত নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে যা লেখা আছে, তা বলতে গিয়ে রেভেলিশন ১২:১ এর কথা বলেন।

“স্বর্গপানে চেয়ে আমি দেখলাম গুরুত্ববহ একটি ঘটনা। একজন নারী সূর্যকে নিজের পোষাক হিসেবে গায়ে জড়িয়ে আছে, পায়ের নিচে তার চন্দ্র। মস্তকের ওপর বারোটি তারাখচিত একটি মুকুট”- এরপর সেখানে বলা হয়েছিল ‘গ্রেট রেড ড্রাগন’এর কথা, যে অপরুপা এক নারীর রুপ নিয়ে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছিল। যদিও এই নারীকে ঈশ্বর তার নিজের হেফাযতে নিয়ে গিয়েছিলেন, ড্রাগন সন্তানটিকে কব্জা করে। একে রক্ষার জন্য মাইকেল ও অন্যান্য দেবতারা এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধে মাইকেল জয়লাভ করে এবং ড্রাগনটিকে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে মর্ত্যে পাঠিয়ে দেয়। এই ড্রাগনকেই শয়তান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ড্রাগনের বর্ণনা হিসেবে দেয়া হয়েছে সাতটি মাথা ও ১০টি শিংয়ের সমাহারে সজ্জিত। রাতের আকাশের নক্ষত্ররাজিদের মাঝে ড্রাকো অন্যতম বড়। জোডিয়াক সাইন বা রাশিচক্রের চিহ্নগুলোর মাঝে এটি অন্যতম বড় এবং সাতটি চিহ্নের সাথে জড়িত।

প্রাচীন মিশরের পুরাকাহিনী অনুযায়ী, ড্রাকো ছিলেন একজন দেবতা। সর্পের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে তিনি স্বর্গের অনুকম্পা হারান এবং শয়তানে পরিণত হন। ড্রাকো ছাড়াও ক্যাসিওপিয়া নামক আরও একজন নারী ছিলেন, যিনি নক্ষত্ররাজির মাঝে ঠাই পেয়েছিলেন। তার মাথায় ছিল ১২টি তারকাখচিত মুকুট। বলা হতো এই ক্যাসিওপিয়া একজন সন্তানের জন্মদাত্রী এবং সেটি কোনো পুরুষের সাহায্য ছাড়াই। টাইকো ব্রাহের মতানুসারে ৯৪৫, ১২৬৪ এবং ১৫৬২ সালে ক্যাসিওপিয়া রাতের আকাশে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন ড্রাকো হচ্ছে শয়তানেরই একটি রুপ। রাতের আকাশে যদি ড্রাকোকে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে যে মাইকেল ও অন্যান্য দেবতাদের সাথে ড্রাকোর যুদ্ধ আসন্ন এবং রাতের আকাশ থেকে শয়তানের ছায়া এখনও দূর হয়নি। বাইবেল অনুযায়ী বলা হয়, যখন এই যুদ্ধ সংঘটিত হবে, শয়তান তার কর্তৃত্ব একজন অ্যান্টিক্রাইস্টের হাতে ছেড়ে দেবে। 

কোমা বেরেনিসেস- স্বর্গীয় কেশ

এতক্ষণ পর্যন্ত যেসব পুরাকাহিনী জানলেন, আত্র সবকিছুই প্রাচীন মানুষের মনগড়া গল্প কিংবা তাদের মনের আকাশকুসুম কল্পনা অনুযায়ী রচনা করা হয়েছিল। এর কোনো সত্যতা নেই, না আছে কোনো ভিত্তি। তবে ব্যতিক্রমও যে নেই, এমনটি কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। তৃতীয় টলেমির স্ত্রীর নামানুসারে আকাশের তারকারাজির মাঝে একটি কন্সটেলেশন রয়েছে, যার নাম কোনা বেরেনিসেস। তৃতীয় টলেমি মিশরের সিংহাসনে বসেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সালে। সিরিয়ার সাথে একটি যুদ্ধে যাবার সময় তার স্ত্রী স্বামীর সৌভাগ্য কামনায় দেবতাদের কাছে একটি মানত করেন। যদি রাজা যুদ্ধ জয় করে অক্ষত শরীরে ফিরে আসতে পারেন, তাহলে তিনি তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ দান করে দেবেন। সেটি হচ্ছে তার চমৎকার স্বর্ণকেশ। রাজা টলেমি যুদ্ধজয় করে অক্ষত শরীরে মিশরে ফিরে এলেন। কথার খেলাপ করলেন না স্ত্রী। মানত অনুযায়ী জেফিরিয়ামে অবস্থিত আফ্রোদিতির সুউচ্চ বেদীর ওপর চুলগুলো অর্পণ করলেন তিনি।

তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পরই দেখা গেল চুলগুলো কেউ চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। স্বর্গের দেবতারা এবার ক্রোধে ফুঁসতে শুরু করলেন। বিপাকে পড়লেন রাজা টলেমি। দোষ পড়ল এক ভবঘুরের ওপর। বেচারার জীবনটা প্রায় যায় যায়, এমন সময় বাধ সাধলেন মিশরে আসা একজন জ্যোতিষী। তিনি রাজা টলেমিকে চুপিচুপি বললেন, এই কাজ ভবঘুরের নয়, বরং দেবরাজ জিউসের। তিনিই রানী বেরেনিসেসের কেশ চুরি করেছেন।

এই জ্যোতিষীর নাম ছিল স্যামোস দ্য কোনোন। তার কথানুযায়ী জিউসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একসময় তিনি স্বীকার করেন যে হ্যাঁ, রানীর কেশ তিনিই চুরি করেছেন। দেবতারা বেরেনিসেসকেই সন্দেহ করে বসেছিলেন যে তিনি হয়ত নিজের কেশ রক্ষার জন্য মিথ্যে কথা বলেছিলেন। তবে এবার রানীর কথা শুনে ও সত্য বেরিয়ে এসেছে দেখে তারা উল্লসিত হলেন। রানীর এই ত্যাগের জন্য তারা এই কেশকে রাতের আকাশের তারকারাজির মাঝে রেখে দিলেন যাতে সবসময় এটি জ্বলজ্বল করতে থাকে। ১৬০২ সালে টাইকো ব্রাহে এই তারকারাজির নামকরণ করেন কোমা বেরেনিসেস। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ