অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চেতনায় সন্নিবেশকারী উপন্যাস ।। শোয়েব শাহরি

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চেতনায় সন্নিবেশকারী উপন্যাস ।। শোয়েব শাহরি

বুক রিভিউ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৫৯ ২৮ মার্চ ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ইতিহাস, মিথ এবং আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ নামক অনবদ্য উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে। এই উপন্যাসে তিনি করতোয়ার যে প্রসঙ্গ টেনেছেন সেটা একদম খাঁটি কথা।

করতোয়া নদী নিয়ে কেউ আবার এরকম মিথ বলেছেন যে, করতোয়া নদীটা একেবারে দেবতার হাত দিয়ে পানির স্রোতধারা বয়ে যাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এই পানি পবিত্র। এই করতোয়ার তীরে যদি কেউ তিন রাত যজ্ঞ করে, উপাসনা করে, তাহলে তিনি অর্শ্বমেধের পূণ্যলাভ করবেন। এই পুণ্ড্রবর্ধনকে বা পুণ্ড্র নগরকে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যমণি বলা হয়েছে। করতোয়ার এলাকাটাকে পৃথিবীর নাভী বলা হয়েছে। করতোয়ার জল দ্বারা প্লাবিত পৃথিবীর যে নাভী, কেন্দ্রভূমি যেটা সেটা হলো এই মহাস্থান।      

অতীতে মাঘ মাসের শেষে যখন মাঘী পূর্ণিমা হতো বা চৈত্র সংক্রান্তি হতো তখন হাজার হাজার হিন্দুরা বাইরে থেকে এসে এখানে স্নান করতো। ব্রাক্ষ্মীলিপি নামের বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বাংলাদেশের মহাস্থানে পাওয়া গেছে। এটা ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ব্রাক্ষ্মীলিপি এখনো পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এই সব তথ্য তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিতে তার মহাকাব্যিক উপন্যাসের প্রেক্ষাপট এবং আখ্যানে সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করেছেন। মহাস্থানের পাশেই ভাসুবিহার বলে একটি জায়গা আছে। সেইখানে ধর্ম প্রচারের জন্য বৌদ্ধদের ভগবান বুদ্ধ নিজে এসেছিলেন এবং আমাদের বগুড়া জেলার ইতিহাস রচিয়তা প্রভাস চন্দ্র সেন বলেছেন, ‘যেদিন গৌতম বুদ্ধ পুণ্ড্রবর্ধনে আসেন সেদিন তিনি গোটা আকাশে উড়েছিলেন এবং গোটা আকাশটা আলোকিত করে ভাসুবিহারে নেমেছেন।’ 

ত্রিমোহিনীতে যেটা বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়েছে, ভাসুবিহারে, কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন এটা আসলে মহাবিদ্যালয়। এইখানে ভারতবর্ষের শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পড়ে সোমপুর বিহার, নালন্দা বিহার। এখানে তিনি এসে তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। আমাদের দেশে আর একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এবং গাল্পিক শওকত আলী। তিনি একবার বগুড়ায় এসেছিলেন এবং আমাদের বলেছিলেন, ‘যিনি এই বগুড়ার মহাস্থানগড়ে আসেননি, তিনি সত্যিকার অর্থে কখনো বাঙালি নয়। যদি কেউ সত্যিকার অর্থে বাঙালি হয়, তাকে বগুড়ায় আসতেই হবে।’ এর মধ্যে কতগুলো কারণ রয়েছে, কারণগুলো কী?  

বগুড়া শুধুমাত্র ভারতবর্ষের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল এটা নয়। বগুড়া ভীমের যে জাঙ্গাল ছিল সেটা ঐতিহাসিক। তান্ত্রিসিজমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বগুড়ায়। বগুড়ায় হিউয়েন সাং কেন এসেছিলেন? তারা এসে কাঁঠালের মতো ফল খেয়ে প্রাণবন্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, এত চমৎকার, সুন্দর এবং সুস্বাদু ফল আর কোথাও পাওয়া যায় না। এখানকার বিশেষত মেয়েদের এবং মানুষদের তারা খুব সুনাম করেছিলেন। শুধু তাই নয়, আমাসের ঐতিহাসিক প্রভাস চন্দ্র সেন বলেছিলেন, আজ থেকে ১০০ বছর বা ২০০ বছর আগে বগুড়ায় যে বন-জঙ্গল ছিল, সে বন-জঙ্গলে হরিণ এবং ময়ূর পাওয়া যেত। এই হরিণ পাওয়ার ঘটনাটা কাজী রাফি তার উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন।   

ত্রিমোহিনী উপন্যাসের মহত্ব হলো, কতগুলো কল্পনাকে তিনি আকৃতি দিয়েছেন। কল্পনার দ্বারা তিনি কতগুলো ঘটনা এবং স্থানের সৃষ্টি করেছেন। সে কল্পনার স্থানগুলোর সঙ্গে অতীতের ইতিহাসগুলো এক করে মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি অসাধারণত্ব তৈরি করেছেন। এগুলো কখনো অবিশ্বাস্য বলে মনে হয় না। 
যেমন তিনি বলেছেন যে, আর্যরা ভারতীয় এবং আর্যের স্বস্তিকা তারা (জার্মানরা) চুরি করেছে। এটা অবশ্য ঠিক যে, ভারতীয়রা প্রথম সভ্যতা তৈরি করেছে। 

এখন থেকে এক হাজার বছর আগে ইউরোপের লোকেরা বিশেষ করে ইংল্যান্ড, জার্মানি, এবং ফ্রান্সের লোকেরা নর মাংসভোজী ছিল। তারা ক্যানিবাল ছিল এটা তো ইতিহাস। আমরা দুই হাজার, আড়াই হাজার বছর আগে রীতিমতো কীভাবে সভ্য জীবন যাপন করতে হয় সেগুলোর আমরা প্রমাণ দেখছি ভারতবর্ষীয়দের সাহিত্যের মধ্যে। সেটা আমরা জানি, ওরা জনত না।  

‘ত্রিমোহিনী’ উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধতর অংশ হলো, এদেশের মানুষকে অতীত ইতিহাস বা গল্পগুলো বলার জন্য এখানে একটা ‘গল্পঘর’ তৈরি করে দেওয়া হয় এবং শুভ্রকে মাহজাবিনের পক্ষ থেকে সেই গল্প পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুভ্র প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় যে অসংখ্য মানুষের তাদের সামনে এই অঞ্চলের অতীত ইতিহাসকে নিয়ে, সভ্যতা-সংস্কৃতি আর মিথ নিয়ে এই গল্পগুলো বলতো।  এই গল্প বা ইতিহাস শুনে এখানকার মানুষ তথা পুণ্ড্রবর্ধনের মানুষগুলোর মধ্যে একটা ইতিহাস চেতনা, সভ্যতার প্রতি চেতনা এবং দেশপ্রেমটা বলিষ্ঠ হতো, ঘনিষ্ঠতর হতো। এই ইতিহাস চেতনা পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে কাজে লাগিয়েছি। 

এইখানে কিন্তু তিনি আরো কিছু ঘটনা উল্লেখ করার চেষ্টা করেছেন সেটা হলো, অষ্টম শতকে কলহন বলে  কাশ্মীরের যে একজন ঐতিহাসিক ছিলেন, তিনি তার ‘রাজতরঙ্গিনীর’ মধ্যে কমলা সুন্দরীর একটা ঘটনা উল্লেখ করে ছিলেন। সে ঘটনাকে আমরা দেখেছি কথা ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ নাটকের মধ্যে। এটা পুণ্ড্রবর্ধনের তথা এই এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য উপকথা সেটাও তিনি তার কল্পনা দিয়ে সেই সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তা চমৎকারভাবে দৃশ্যায়ণ করেছেন এই উপন্যাসে। এই দৃশ্যকল্পই একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে। 

মৃত্যুর আগে একটি চরিত্রের একটি কথা উপন্যাস থেকে উল্লেখ করছি, ‘আমি অত্যন্ত খুশি যে, সদানন্দ মরে যাওয়ার আগে লেফটেনেন্টের মুখে থু থু নিক্ষেপ করেছে।’ দেশপ্রেমের এই একটি বাক্য তৎকালীন ভারতবর্ষীয় সাধারণ মানুষের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবকে ফুটিয়ে তোলে। যে সমস্ত চরিত্র ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছেন –এই উপন্যাসে যাদের নাম আছে- তার সমস্তগুলো ঐতিহাসিক। ত্রিমোহিনীর ঔপন্যাসিক খুব সুন্দর করে আজিজুল হক কলেজকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে একটা ক্যাম্প হিসাবে তৈরি করেছেন। সেখানে কিছু মহিলাদেরকে নিয়ে পাকিস্তানীরা যে অত্যাচার করেছে, তাদেরকে ভোগ করেছে এবং সুশীলা নামের মেয়েটিকে পরবর্তীকালে মুসলমান বানায় এবং তাকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে তারা ধর্ষণ করে। একটা সময় সে যখন মৃত্যুবরণ করে মৃত্যুর পরেও উপন্যাসে যে দৃশ্যায়ন তা পাকিস্তানীদের নজিরবিহীন নৃশংসতার এক দলিল।

উপন্যাসের একটি চরিত্র নবাব পরিবারের মোহাম্মদ আলী। ইতিহাস আমাদের সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম পরিবার এই নবাব পরিবারে যে সব মানুষগুলো ছিল তারা কখনো বাংলাদেশকে ভালোবেসেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার আলাপ-আলোচনা হয়েছিল এটা সঠিক। তবে মোহাম্মদ আলী এখানে একটা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তিনি স্টেশন নির্মাণ করার জন্য জায়গা দিয়েছেন। এসব ঐতিহাসিক ঘটনা সত্য। অনেক রাজা, অনেক সামন্ত প্রভু, অনেক জমিদাররা শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে অকাতরে দান করেছেন আবার অত্যাচারও করেছেন। শোষণও করেছেন আবার তারা জনকল্যাণমূলক কাজও করেছেন। দ্বৈত সত্তা তাদের মধ্যে কাজ করেছে এবং এরকম দ্বৈত সত্তা মোহাম্মদ আলীর ভিতরে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত উনি কি করেছেন বা কি করতেন স্বাধীনতা পর্যন্ত বা বেঁচে থাকলে তা বলা খুব কঠিন।  
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে নিয়ে একটা ঘটনা আছে। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমাদের ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে একটা রিউমার উঠেছিল সেটা পরবর্তীকালে আবার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। একই রকমভাবে সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। 

সবকিছু মিলিয়ে এই উপন্যাসটি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য এবং সবার পাঠ্যযোগ্য। ধৈর্য সহকারে এই উপন্যাসটি পড়লে একজন মানুষ সমৃদ্ধ হবেন নিঃসন্দেহে। আমরা যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী তা স্পষ্ট হবে। পরিশেষে, আমি শুধু একটা কথাই বলবো, কাজী রাফির দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষাগত গুণাবলি অত্যন্ত সুন্দর, গভীর অথচ আধুনিক এবং তা অত্যন্ত চমৎকার। ঔপন্যাসিক ইচ্ছা করলে উপন্যাসটিকে একটা সাম্প্রদায়িক বা সংকীর্ণতার আবেশ দিতে পারতেন। হিন্দুদের বা বৌদ্ধদের চার হাজার, তিন হাজার বছর আগেকার ঐতিহ্যকে তিনি আমাদের ঐতিহ্য বলে শনাক্ত করেছেন। কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা বলেন যে, আমাদের এই মুসলিম ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের ঐতিহ্য কখনো মিলতে পারে না এই সাম্প্রদায়িক ভাবনাও ঔপন্যাসিকের মধ্যে কখনো কাজ করেনি। উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি আড়াই হাজার, তিন হাজার বছর আগের সমস্ত ইতিহাস- ঐতিহ্য-সামাজিকতা-কৃষ্টি- সবকিছু নিয়ে, সেগুলোকে আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে বহন করে নিয়ে এসে এই মুহুর্তে, এই কালে সমস্ত মানুষের চেতনার মধ্যে একেবারে সংশ্লিষ্ট করেছেন, সন্নিবদ্ধ করেছেন, সন্নিবেশিত করেছেন। রক্তের ধারার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন যে, ঐগুলো এখন এই মুহুর্তে আমাদের উত্তরাধিকার এবং আমাদের সংস্কৃতির একটা অংশ। তার গভীর বোধ থেকে, দর্শন থেকে এই জিনিসটি তিনি দেখাবার চেষ্টা করেছেন বলে আমরা গর্ববোধ করতে পারি। এইখানে কাজী রাফি নমস্য এবং এইখানে কাজী রাফি আমাদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন।

তিনি পরবর্তীকালে আরো সুন্দর, চমৎকার, অসাধারণ উপন্যাস আমাদের উপহার দেবেন। তার গদ্যশৈলী অসাধারণ এবং অত্যন্ত গতিময়। তার কল্পনাশক্তি অসাধারণ এবং চরিত্র নির্মাণ করার যে অনন্য ক্ষমতা -সেটাও তার আছে। যদিও ইতিমধ্যে তিনি ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ উপন্যাসে আফ্রিকা তথা সমগ্র মানব জাতিকে নিয়ে সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, এখন সময় অপেক্ষা করবে যে, পরবর্তীকালে গোটা বাংলাদেশকে নিয়ে, বাঙালি জাতিকে নিয়ে, গোটা মানব জাতিকে নিয়ে, গোটা পৃথিবীকে নিয়ে সর্বকালের, সর্বসেরা উপন্যাস কাজী রাফির হাতে বের হবে। বাংলা সাহিত্যে এবং পৃথিবীর সাহিত্যে তার স্থান অমরতা লাভ করুক, এটি আমি প্রার্থনা করি।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস